#অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (২৫)
#সোফিয়া_সাফা
কেটে গেছে ২ দিন। আজকে ফুলের ভর্তি পরীক্ষা। কিছুক্ষণ আগেই পরীক্ষা শেষ হয়েছে। হল থেকে বের হতেই ফুল দেখল আবেশ দাঁড়িয়ে আছে। সেদিন পায়ে ভালোই ব্যথা পেয়েছিল আবেশ। এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে হাটতে পারছে না।
“কিরে পরীক্ষা কেমন হয়েছে?” আবেশের প্রশ্নে মুচকি হাসে ফুল।
“খুউব ভালো হয়েছে। ভালো ভার্সিটিতেই চান্স পাবো দেখো।”
“তাহলে তো তোকে মিষ্টি মুখ করাতে হচ্ছে।”
বলেই পকেট দেখে চকলেট বের করল আবেশ। নিজের ফেবারিট চকলেট দেখে ফুলের চোখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। চকলেট টা হাতে নিয়ে মৃদু লাফিয়ে উঠে বলল,
“উফ থ্যাংক ইউ আবেশ ভাই।”
ফুলের হাসি হাসি মুখখানা দেখে আবেশের মনেও প্রশান্তি ছেয়ে যায়। চকলেটের প্যাকেট খুলে ইতোমধ্যেই মুখে পুরেছে ফুল। আবেশ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। পরপর দুটো খালি রিকশা সামনে দিয়ে চলে গেলেও আবেশ খেয়াল করল না। এবার খাওয়া বাদ দিয়ে আবেশের দিকে তাকায় ফুল। আবেশের দৃষ্টি অনুমান করতে পেরে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। অস্বস্তি লুকাতে চকলেট এগিয়ে দেয় আবেশের দিকে,
“স্যরি তোমাকে না দিয়েই খাওয়া শুরু করে দিয়েছি।”
ফুলের কথায় হুশ ফেরে আবেশের। ফুলের হাতে থাকা চকলেটের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে। ভ্রু কুচকে যায় ফুলের, নিজ হাতের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেল। নিজের কামড়ে খাওয়া চকলেট কিনা আবেশকে অফার করেছে? তড়িৎ বেগে কামড়ে খাওয়া অংশটুকু ভেঙে ফেলে ফুল। বোকা বোকা হেসে বলে,
“এবার খাও।”
ফুলের এহেন কান্ডে আবেশের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে ওঠে। চকলেট নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায় আবেশ; কিন্তু ফুলকে চমকে দিয়ে অন্য হাতের ভাঙা অংশটুকুই টেনে নিয়ে মুখে ঢুকিয়ে নেয়। বিস্ময়ে হা হয়ে যায় ফুল। হাপিত্যেশ করে উচ্চারণ করে,
“আআআ এটা কি করলে?”
হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শব্দ করে হেসে উঠল আবেশ। আরেক হাত নেড়ে একটা রিকশা থামিয়ে উঠে বসে। ফুল তো এখনও নিজের হাতের দিকেই তাকিয়ে আছে।
“তাড়াতাড়ি উঠে বস। গিয়ে রান্না করতে হবে, আরিফ ভাই ঢাকা থেকে ফিরে এসেছেন। রাতে আমাদের সাথেই ডিনার করবে।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ফুল অবাক হয়ে গেল।
“কি হলো? ওঠ না।”
মাথা ঝেকে অবান্তর চিন্তা ভাবনা দূরে সরিয়ে রিকশায় উঠে বসল ফুল।
রাত ৯ টা, রান্না করা সবগুলো খাবার টেবিলের উপর রাখছে ফুল। তাকে সাহায্য করছে আবেশ।
“ফুল তুই চুপ করে বসবি?”
ফুলের হাত থেকে তরকারি বাটিটা কেড়ে নিয়ে আবেশ নিজেই সেটা টেবিলের উপর রাখল। তারপর ফুলের হাতের আঙুলে নিজের আঙুল ঠেকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“কতোখানি কেঁটে গেছে।”
মৃদু হাসল ফুল। হাত সরিয়ে বলল, “কতোখানি কাঁটেনি আবেশ ভাই। একটুখানি কেঁটেছে। তুমি এমন করছো যেন আমার পুরো আঙুল টাই আলাদা হয়ে গেছে।”
“তোর এই হেয়ালিপনা আমার মোটেও ভালো লাগেনা ফুল।” বলতে বলতেই ফুলকে জোরপূর্বক চেয়ারে বসিয়ে দিল আবেশ। তারপর ড্রইংরুমে বসে থাকা আরিফকে ডেকে একসাথে খেতে বসল। প্লেটের দিকে তাকিয়ে আঙুলের বাধন খুলতে লাগল ফুল। বটি দিয়ে মাছ কাঁটতে গিয়ে ডান হাতের আঙুল কেঁটে গেছে ফুলের। খুব বেশি কাঁটেনি। আঙুলের বাধন খুলতে দেখে চোখ রাঙায় আবেশ,
“এই কি করছিস? খুলছিস কেন?”
বিরক্তিতে চবর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করল ফুল, “আরে না খুললে খাবো কিভাবে?”
“আমি খাইয়ে দিচ্ছি।” বলেই ভাত মাখতে লাগল আবেশ। অন্য চেয়ারে বসে থাকা আরিফ তাদের দুজনের ভালোবাসা দেখে হাসল একটু। ফুলের তো অনেক অস্বস্তি লাগছে। তার উপর আরিফ কি নাকি ভাবছে সেসব ভেবেও লজ্জা মিইয়ে যাচ্ছে।
“দেখি হা কর।” এক লোকমা ভাত নিয়ে ফুলের ঠোঁটের সামনে ধরল আবেশ। ফুল একবার আঁড়চোখে আরিফের দিকে তাকায়। লোকটার বয়স বেশি হবেনা, আবেশের সমবয়সী কিংবা দু এক বছরের বড় হতে পারে।
“কি হলো হা করছিস না কেন? বাচ্চাদের মতো গল্প শুনিয়ে খাওয়াতে হবে নাকি?” লজ্জায় ফুলের ঠোঁট কাঁপছে। হাল্কা হা করে ভাতটুকু মুখে ঢুকিয়ে নিল।
স্ক্রিনের সামনে আয়েসি ভঙ্গিতে বসে তাদের ডিনারের দৃশ্য দেখছে উদ্যান। একহাতে তানের মাথা বুলিয়ে দিচ্ছে আরেক হাতে গোলাপি রঙা ডায়েরিটার পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে। সবুজ ড্রিম লাইটের আলোয় রুমজুড়ে এক ধরনের স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে। বটগাছ আকৃতির টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ডায়েরির লেখায় চোখ বুলাতে অসুবিধা হচ্ছেনা উদ্যানের। ডায়েরির এক পৃষ্ঠায় এসে থেমে যায় উদ্যান; বিরবির করে উচ্চারণ করে, “আমি অন্য কারো হাতে খাবার খেতে লাইক করিনা। নিজের মায়ের হাতেও না। হাত কেঁটে গেলেও চামচ দিয়ে খাওয়া আমার জন্য অধিক স্বাচ্ছন্দ্যের। তবে এসব আমি কাউকে বলতেও পারিনা। মা, মামি আমাকে অনেকদিন খাইয়ে দিয়েছে। আমি তাদেরকে না করতে পারিনি।”
লেখাটা পড়ে ক্রুর হাসল উদ্যান। ব্যঙ্গ করে লেখাটা বারবার পড়তে লাগল।
কয়েক লোকমা খাওয়ার পরেই যেন পেট ভরে গেছে ফুলের। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে ওঠে,
“আর না আবেশ ভাই। পেট ভরে গেছে।”
ফুলের অভিব্যক্তি দেখে মুখ কুচকে যায় আবেশের, “মাত্র ৩ লোকমা খেয়েছিস।”
পেটে হাত রেখে অন্যদিকে ঝুকে গেল ফুল। মিহি গলায় বলল, “আর সম্ভব নয়, আমি গেলাম।”
কোনোদিকে আর তাকাল না ফুল। মাথার ওড়না ঠিকঠাক করে বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেল। তার যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে আবেশ,
“নিকাহনামাতে কিন্তু স্ত্রীর হাতে তালাক দেওয়ার অধিকার দেওয়া নেই আবেশ। উল্টো এমন এমন কিছু লেখা আছে যা দেখলে তোমার হুশ উড়ে যাবে।”
আরিফের কথায় আবেশের মুখাবয়ব ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আরিফ আর তার বাবা আকরাম হোসেনকে আবেশ এই ব্যপারে জানিয়েছে। প্রথম প্রথম তারাও ফুল আর আবেশকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই জানতো ধীরে ধীরে বিশ্বস্ত হবার পর আবেশ জানিয়ে দেয় সে আর ফুল কাজিন; স্বামী-স্ত্রী নয়। আর ফুলের সাথে তার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল। সেই সাথে উদ্যানের আচরণ সম্পর্কেও জানিয়ে দিয়েছে আবেশ। সবকিছু জেনে তারা আবেশকে সাহায্য করবে বলে আশ্বস্ত করে।
“নিকাহনামা নিয়ে আমি কালকে আবারও যাবো রেজিস্ট্রারের কাছে। যেকোনো উপায়ে ফুলের ডিভোর্স করাতেই হবে।”
দরজার অপরপাশ থেকে আবেশের কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় ফুল। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে মেঝেতে। কোনো কিছুই যেন অনুভব করতে পারছেনা। দম বন্ধ হয়ে আসছে, কি যে চায় নিজেও জানেনা।
ফুলকে হাটুতে মুখ গুজে বসে থাকতে দেখে ডায়েরি টা বন্ধ করে রাখে উদ্যান। বুঝতে পারে আজকের মতো ফুল আর বের হবেনা রুম থেকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে দশটা বেজে তেইশ মিনিট। খাট থেকে নেমে দাঁড়ায় উদ্যান। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় বুক শেলফের দিকে। এই বুক শেলফ আগে ছিলনা; দু মাস আগে আনিয়েছে। শেলফ থেকে একটা বই বের করে হাতে নেয় উদ্যান। পেছন ঘুরে খাটের দিকে তাকিয়ে দেখে তান ঘুমিয়ে গেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাটতে হাটতে ব্যালকনি লাউঞ্জে এসে থামে উদ্যান। লাইট অন করে বসে পড়ে কাউচে। পা তুলে রাখে সামনে থাকা কাঁচের টেবিলের উপর। বইটার নামের উপর একনজর তাকায় উদ্যান। বড়বড় অক্ষরে লেখা Descartes’ Error। নামের দিকে বিশেষ পাত্তা দেয়না উদ্যান। নির্বিঘ্ন চিত্তে বইটা খুলে পড়তে থাকে।
পরেরদিন সন্ধ্যার পর, আবেশ ফুলকে নিয়ে আবারও আসে রেজিস্ট্রারের কাছে। নিকাহনামা পর্যবেক্ষণ করে রেজিস্ট্রার সাহেব গম্ভীর মুখে বলেন,
“এখানে তো স্পষ্ট লেখা আছে ফুল চাইলেও কখনও স্বামীকে ডিভোর্স দিতে পারবে না।”
চোখ বন্ধ করে নিল আবেশ। এখানে আসার পূর্বেই নিকাহনামার সবগুলো পয়েন্ট খুটিয়ে খুটিয়ে বিশ্লেষণ করেছে সে। আবেশ বুঝতে পারল এবার আর লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করার অবকাশ নেই। বিষয়টা খোলাসা করে, রেজিস্ট্রারের হেল্প নিতে হবে। ভাবনা মোতাবেক নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল আবেশ। পাশের চেয়ারেই একভাবে বসে আছে ফুল। নীরব শ্রোতা হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিইবা করবে সে। কিছু সময় নিয়ে আবেশ বলতে শুরু করলো,
“অ্যাকচুয়ালি, আমার আপনার সাথে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করতে হবে এই বিষয়ে।”
আগ্রহ প্রকাশ করলেন রেজিস্ট্রার সাহেব, “জি বলুন।”
ফুলের দিকে একবার তাকায় আবেশ। মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ফুল। তপ্ত শ্বাস ফেলল আবেশ। শান্ত গলায় বলল, “প্রায় ১৫ বছর পর হঠাৎ করেই আমার বড় ভাই দেশে ফিরে আসে। সে মেক্সিকোতে ছিল। তাকে যখন দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছিল তখন আমার বয়স ৭ বছর ছিল। আমার বেশি কিছু মনে নেই। শুধু এইটুকুই মনে আছে যে উগ্র, বদমেজাজী, আক্রমণাত্মক স্বভাবের হওয়ায় তাকে মেজ খালার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হয়তো সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিল। পরবর্তীতে মায়ের থেকে জেনেছিলাম, চিকিৎসার জন্যই তাকে খালার কাছে পাঠানো হয়েছে। আমার বাবার ব্যাপারেও কোনো কিছুই আমার মনে নেই। সবকিছুই কেমন যেন একটা ধোয়াশা।”
মন দিয়ে আবেশের কথাগুলো শুনছেন রেজিস্ট্রার। ফুলও শুনছে, যদিও সে এই সম্পর্কে জানে। আবেশের থেকেই জেনেছে। টেবিল থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কিছুটা পানি খেয়ে নেয় আবেশ। এই ব্যপারে ভাবতে গেলেই কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগে।
“পাঁচ মাস আগে সঙ্গে করে এক বিদেশিনীকে নিয়ে আসে আমার ভাই। গার্লফ্রেন্ড হিসেবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি আগ বাড়িয়ে পরিচিত হতে গেলে আমাকে কৌশলে এড়িয়ে যায়। কোনো প্রকার কথা বলেনা। এদিকে আমি তো ভাইকে পেয়ে মহাখুশি। তার আগে পিছে ঘুরঘুর করে কথা বলতে চাইতাম কিন্তু সে সুযোগ দিতোনা। এরইমাঝে আমার মা এসে অদ্ভুত এক আদেশ জুড়ে দিল। বলল, ‘উদ্যানের সাথে কথা বলতে যাবিনা। বুঝিসই তো বিদেশ থেকে এসেছে। এসব নাটুকেপনা পছন্দ করেনা।’ মায়ের কথায় খুব ব্যথিত হয়েছিলাম সেদিন। তবুও নিজের ভাবমূর্তি অটল রাখার প্রয়াসে শক্ত গলায় বলেছিলাম, ‘হুহ! আগ বাড়িয়ে কথা বলতে আমার বয়েই গেছে। বললাম না কথা। এতোবছর যেমন কথা না বলে ছিলাম এখনও থাকতে পারবো সমস্যা নেই।’ মুখে এসব বললেও ভেতরে ভেতরে আমি চাইতাম ভাইয়ার সাথে কথা বলতে।”
আবেশের কণ্ঠে অভিমান প্রকাশ পেল। ফুল বুঝতে পারল ভাইয়ের প্রতি আবেশের মনে প্রবল অনুরাগ লুকায়িত আছে। হয়তো অভিমান, অভিযোগ আর অবহেলার নিচে চাপা পড়ে আছে অনুরাগ নামের সুপ্ত অনূভুতি গুলো। আবেশের নরম কণ্ঠস্বর হঠাৎ করে রুক্ষ কণ্ঠস্বরে পরিনত হলো। তীব্র ক্ষোভ মিশিয়ে বলল,
“আমি সব সহ্য করে নিয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ করেই ফুলের প্রতি তার আচরণ গুলো চোখে বাধতে লাগল। বুঝতে পারলাম ওকে সহ্য করতে পারেনা ডেভিল টা। হ্যাঁ! আমি তাকে ডেভিল উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। আমার মা শুধু কথা বলতেই নিষেধ করেনি ‘ভাই’ সম্মোধনেও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ডেভিলটা ফুলকে রীতিমতো টর্চার করতো। আমি বুঝতে পারতাম না কেন সে এমন করে। আর নাতো তাকে আটকাতে পারতাম। আমার মা সবকিছু সহ্য করে নিতো। আমাকে প্রতিবাদও করতে দিতোনা। ভেবেছিলাম কিছু দিন দেশে থেকে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যাবে মানুষ রূপে থাকা ডেভিল টা। আগের মতো প্রাণখোলা হয়ে যাবে ফুল; হাসতে ভয় পাবে না। এরইমাঝে ডেভিল ঘোষণা করলো সে বিয়ে করবে তার গার্লফ্রেন্ডকে। বিয়ে করবে ভালো কথা। রাজি হলো সবাই, বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হলো একসপ্তাহ পর। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো, বিপত্তি বাধে বিয়ের দিন। গায়ে হলুদের সময় হঠাৎ করেই তার হবু বউ বেকে বসে, বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ডেভিল টা তো রাত থেকেই উধাও ছিল। বিয়ের কিছুক্ষণ পূর্বে বাড়িতে এসে আবদার করে বসল, সে ফুলকে বিয়ে করবে। কি নিদারুণ আবদার ছিল তার। তারপর মাকে কি বলেছে না বলেছে জানিনা। মাও ছেলের আবদার পূরণে হম্বিতম্বি করে ফুলকে রেডি হতে বলল।”
একনিশ্বাসে বলে, দম নিল আবেশ। ফুল অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবেশের দিকে। ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে, আবারও বলতে শুরু করে আবেশ,
“যেনতেন উপায়ে সেদিন ফুলকে বিয়ে করেই নিয়েছিল ডেভিলটা। আমার মনে হয় মা আর ফুপিকে হুমকি ধমকি দিয়েছিল। যদিও অনেক চেষ্টা করেও কারণ উদঘাটন করতে পারিনি আমি। এখন অবধি বুঝে উঠতেই পারলাম না ঠিক কিসের ভয়ে মা আর ফুপি ফুলকে রাক্ষসের হাতে তুলে দিয়েছিল। এরপর শিকারির ন্যায় শিকার স্বরুপ ফুলকে নিজের গুহায় আটকে রেখেছিল ডেভিলটা।”
“মানে ওনাকে নিয়ে চলে গিয়েছিল আপনার ভাই?” প্রথমবারের মতো প্রশ্ন করলেন রেজিস্ট্রার সাহেব। এতোক্ষণ যাবত সে যেন কাহিনীর মধ্যে একেবারে ডুবে গিয়েছিলেন।
উপরনিচ মাথা নাড়ে আবেশ, “হ্যাঁ পুরো দেড়মাস ফুলকে আটকে রেখে পৈশাচিক নির্যাতন করেছে ডেভিলটা। হাস্যকর ব্যপার হলো সেই দেড়মাসের বেশিরভাগ সময়টাই ফুল হসপিটালে কাটিয়েছে।”
“হসপিটালে কেন?” সাবলীল গলায় রেজিস্ট্রার সাহেব শুধালেন,
তিক্ততা যেন মুহুর্তেই জেঁকে ধরল ফুলকে। বিষিয়ে উঠল শরীরের প্রত্যেকটা স্নায়ুকোষ। আবেশ ভুল কিছু বলেনি সেখানে কাটানো ৪৬ দিনের মধ্যে ২৪ দিনই ফুলকে হসপিটালে কাটাতে হয়েছিল।
“নির্যাতনের কারণে। ডেভিলটা ফুলকে এতোটাই নৃশংস ভাবে টর্চার করেছিল যে হসপিটালে পড়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।” কথাটুকু বলে থেমে গেল আবেশ। সবকিছু শুনে শ্বাস ফেললেন রেজিস্ট্রার সাহেব। নিমজ্জিত কণ্ঠে বললেন, “আমার মনে হয়, ডেভিলটা ততোটাও খারাপ ছিলো না। অ্যাটলিস্ট, ক্ষতস্থানে মলম লাগানোর জন্য হলেও, নিজেই আবার হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল। কি বলেন?”
কথাটা বলে আহাম্মক বনে গেলেন রেজিস্ট্রার। বুঝতে পারলেন, এভাবে বলা ঠিক হয়নি। ফুল ও আবেশ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে; চোখে মুখে নৈশব্দ বিস্ময়। খানিকটা সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আবেশ, বুঝতে পারে এখানে বসে সময় নষ্ট করে লাভ হবেনা। এবার আইনের পথ ধরেই হাটবে সে।
“চল ফুল।”
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ফুল উঠতেই যাবে তখনই রেজিস্ট্রার সাহেব বললেন,
“আরে চলে যাচ্ছেন কেন? বসুন, বসুন আমার কাছে উপায় আছে।”
ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাল আবেশ। মুখে কিছুই বলল না। সত্যি বলতে লাস্ট কথা শুনে, বিশ্বাস করতে পারছে না লোকটাকে।
“আইনের দিকে গিয়ে খুব একটা লাভ হবেনা। উল্টো ডেভিলটা আপনাদেরকে খুব সহজেই খুঁজে পেয়ে যাবে।”
রেজিস্ট্রার সাহেবের কথা শুনে ধপ করে পুনরায় চেয়ারে বসে পড়ে ফুল। বাধ্য হয়ে আবেশেও ফিরে আসে। বিরক্তিমাখা গলায় বলে,
“আপনার কাছে কি উপায় আছে? বলুন দেখি।”
কাগজপত্র সরিয়ে রেখে টেবিলের উপর হাত রাখলেন রেজিস্ট্রার সাহেব। অতঃপর কণ্ঠ নিচু করে বললেন,
“উপায় টা বাস্তবায়ন করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হবে। আপনি রাজি?”
আবেশ কিছু বলার আগেই ফুল বলল, “হ্যাঁ আমরা রাজি। শুধু দেখবেন মনস্টার’টা যেন আমাদের লোকেশন কোনোভাবেই জানতে না পারে।”
“সেই বিষয়ে আপনারা একদম নিশ্চিন্ত থাকুন। সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবেনা।”
বলেই উঠে দাড়ালেন রেজিস্ট্রার সাহেব। ডেস্কের ড্রয়ার থেকে বেশ খুঁজে খুঁজে একখানা কাগজ বের করে পুনরায় চেয়ারে বসলেন,
“আপনাকে খুলার প্রস্তাব রাখতে হবে। তারপর কিছুদিন পর স্বামী ডিভোর্স দিতে রাজি নেই দেখিয়ে নির্যাতনের আলামত শো করে ডিভোর্স দেওয়ার অনুমতি পেয়ে যাবেন।”
এবার কিছুটা স্বস্তি পেল ফুল। আবেশের কিছুটা সন্দেহ থাকলেও একবার বিশ্বাস করে দেখবে।
ঘড়ির কাটায় এখন রাত সাড়ে বারোটা। থিয়েটারে বসে বসে হরর মুভি উপভোগ করছে সোলার এস্টেটের সদস্যবৃন্দ। সঙ্গে আছে পপকর্ণ, চিপস আর কোল্ড ড্রিংকস। আজ বহুদিন পর একসাথে বসে মুভি দেখার ফুরসৎ মিলেছে।
“কি মনে হয় রে এরপর কাকে মারবে আত্মাটা?” সোহমের প্রশ্নে লুহান চেপে ধরল তার হাত,
“জানিনা রে, পিচ্চি মেয়েটাকে না মারলেই হয়।”
লুহানের হাতের চাপে সোহমের হাত ছিড়ে যাবার উপক্রম।
“আরে হাতির বাচ্চা সর আমার উপর থেকে। আত্মাটা কাউকে মারার আগে; তুই আমাকে মেরে ফেলবি। সরে বস।”
“ওই চুপ থাক তোরা দুজন।” রিদমের ধমকে লুহান বলল,
“আমার হিসু পেয়েছে। একটু যাবি আমার সাথে?”
লুহানের কথায় চমকিত নয়নে তার দিকে তাকায় অনি। বিদ্রুপ মিশিয়ে বলে, “তুই হাতির বাচ্চার নামে কলঙ্ক। তুই একটা ভীতুর ডিম।”
“আমি মোটেই ভীতু নই। তোদেরকে একা রেখে যেতে ভয় পাচ্ছি। যদি আত্মা গুলো স্ক্রিন থেকে বেরিয়ে এসে তোদের ঘাড় মটকে রেখে যায় তখন? সব দোষ তো আমার ঘাড়েই পড়বে। আফটার অল আমি সবার বডিগার্ড। আত্মাদের ভয় না পেলেও মনস্টারকে আমি খুব ভয় পাই। তোদেরকে প্রোটেক্ট করতে ব্যর্থ হওয়ার অপরাধে, মনস্টার টা আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।”
“ছিহ! তোকে কাঁচা তো দূর দুনিয়ায় বেস্ট শেফ যদি বেস্ট মশলাপাতি দিয়ে ফ্রাই করেও দেয়; তবুও খাবো না আমি।” আচমকা উদ্যানের কণ্ঠ শুনে সবাই একসাথে দরজার দিকে তাকায়। দরজার সামনে বুকের উপর হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে উদ্যান। থিয়েটার রুমে উদ্যানকে দেখে বিস্ময়ে হা হয়ে গেল সবাই। দরজা ভিড়িয়ে রেখে তাদের দিকে অগ্রসর হতে লাগল উদ্যান। একদম সামনে এসে, ধপ করে বসে পড়ল খালি একটা চেয়ারে। রিমোট টা হাতে নিয়ে মুভি চেইঞ্জ করে দিতে দিতে বলল,
“আমাকে দেখা হয়ে গেলে বলিস। একসাথে বসে মুভি দেখবো।”
বিষম খেল সোহম। চোখ ডলে আবারও তাকাল উদ্যানের দিকে তাকে এমন করতে দেখে দ্রিম করে এক চাপড় মেরে দিল মেলো। কাঁধে হাত রেখে বেকুবের মতো মেলোর দিকে তাকায় সোহম,
“তুই আমাকে মারলি কেন?”
হাত দিয়ে নিজের চোখ ডলে মেলো বলল,
“তুই আমাকে ভেঙালি কেন? আমার চোখে একটু প্রবলেম আছে মাঝে মাঝেই ঝাপসা দেখি তাই চোখ পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে চোখ মালিশ করি। তুই তো ঠিকঠাক দেখিস তবুও এমন করার মানে কি?”
মুখটাকে কাঁদোকাঁদো করে ফেলল সোহম, “আমার কি দোষ বল! তেহ ইদানীং আমাদের সবার চোখে এমন ভাবে ধুলো দিচ্ছে যে মাঝে মাঝে চোখে ভুলভাল দেখছি বলে মনে হয়। তুই-ই বল, এর আগে ওকে কখনও থিয়েটারে আসতে দেখেছিস?”
“আমি এখানে আসাতে তোদের প্রবলেম হলে তোরা বেরিয়ে যেতে পারিস। দরজা ওইদিকে!” উদ্যানের কথায় মুখ বন্ধ হয়ে গেল সবার। পুনরায় নিজেদের সিটে বসে পড়ল। সোহমকে টেনেটুনে লুহান নিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে।
রিমোটের বাটন প্রেস করে একটা মুভির নাম টাইপ করতে লাগল উদ্যান। বাকিরা আঁড়চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ১০ মিনিটের মধ্যেই নতুন একটা মুভি শুরু হলো থিয়েটারের স্ক্রিনে। ততক্ষণে লুহান ও সোহমও ফিরে এসেছে। প্রত্যেক সদস্য আঁটসাঁট হয়ে বসেছে। যতই হোক, উদ্যানের ইচ্ছানুযায়ী মুভি দেখতে চলেছে তারা। ব্যাপারটা মোটেও হাল্কা ভাবে নেওয়া যাবেনা। কে বলতে পারে মুভি দেখার পর উদ্যান প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসল, ‘নাইকার মুখে কয়টা দাঁত ছিল। ভিলেনের চোখের রঙ কি ছিল। পরিশেষে মুভিটার শিক্ষনীয় দিকগুলো ব্যাখ্যা কর।’ সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য হলেও পুরোটা মুভি খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।
মুভি শুরু হওয়ার মিনিট দুয়েক হয়েছে। এরইমধ্যে অনিলা ফিসফিস করে অনির কানে কানে জিজ্ঞেস করল, “এটা কি মুভি গো?”
অনির পাশের সিটে বসে থাকা উদ্যান শীতল গলায় উত্তর দিল, “বরবাদ।”
চলবে,,,
[পরবর্তী পর্ব পেতে রেসপন্স করুন]

