#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১৮
#সমৃদ্ধি_রিধী
রুমঝুম কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। রিমি ভীষণ বিরক্ত। দেখেও না দেখার ভান করে আধশোয়া হয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে। মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু হবে সামনেই। পড়া বাকি আছে অনেক। এইসব কান্না দেখার সময় নেই ওর। বকুল তখন মেয়ের রুমে আসে। রুমঝুমের চোখমুখের এই হাল দেখে জিজ্ঞাসা করে,
“কাঁদছিস কেনো?”
রুমঝুম কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার পেজ হ্যাক করে ফেলেছে।”
বকুল চমকে উঠে। রুমঝুম যে পেজের পিছনে কত সময় দিয়েছে তার হিসেব নেই। আর্ট, ক্রাফ্টিং নিয়েই পড়ে থাকতো। এইসবের জন্য বকুলের কাছে কত যে বকা খেয়েছে, সেই হিসেবও বকুল করতে পারবে না।
“কে করেছে?”
রুমঝুমের চোখ মুখ ফোলা। কেঁদেই যাচ্ছে, উত্তর দিলো না। বকুল বলে, “পেজ ফিরিয়ে আনা যাবে না?”
“একটা ভাইয়ার সাথে কথা বলেছি, উনি বলেছেন সাইবার ক্রাইমের সাথে জড়িত বা আইনের সাথে জড়িত কারো কাছ থেকে সাহায্য নিতে।”
“তো নে? আরিফকে কল দে? আরিফ তো সহজেই পারবে তোকে সাহায্য করতে।”
রুমঝুমের অবস্থা বেগতিক। ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলে,
“আরিফ ভাইয়াই তো হ্যাক করেছে, উনি কি সাহায্য করবে?”
বকুলের ভ্রু কুচকে গেল। “ধূর! আরিফ কেনো করবে? পাগল নাকি?”
“আরিফ ভাইয়াই করেছে। আমাকে মেসেজ দিয়েছে, না বিশ্বাস হলে দেখো। ওর কথা মতো কাজ না করলে আমার আইডি, পেজ, ইনস্ট্রাগ্রাম আইডি কিছুই ফেরত দিবে না।”
“কি কাজ করতে বলেছে?”
রুমঝুম টান টানতে লাগলো। বকুলের প্রশ্নের জবাব দিলো না। বকুল ফের করে,
“বলছিস না কেনো?”
রিমি বই বন্ধ করে সোজা হয়ে বসে। “বল আম্মুকে।”
রুমঝুম মুখ খোলে না। বকুল রিমির দিকে তাকিয়ে বলে,
“কি হয়েছে রে?”
রিমি একগাল হেসে বলে, “তোমার ছোট মেয়ে একজনকে পছন্দ করে। ওর ভাষ্যমতে ভালোও বাসে। ছেলেটা তোমার অনেক চেনা।”
বকুল রুমঝুমের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। রুমঝুমের এতদিকে খেয়াল নেই। ও পেজের শোকে পাগলপ্রায়। বকুল যেন দম আটকে বলে,
“এই রুমঝুম তুই কি আরিফকে পছন্দ করিস? আল্লাহ! তোরা কি কোনো সম্পর্কে আছিস? আরিফের জন্য না মেয়ে ঠিক করা হয়েছে? এই কিছু বলছিস না কেনো?”
রুমঝুম জবাব দেয় না। বকুল রুমঝুমের হাতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে, “কি হলো? কথা বল? কি লুকাচ্ছিস? তোদের সম্পর্ক আছে কোনো?”
রুমঝুম ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলে, “আরিফ ভাইয়ার সাথে আমার অনেকদিনের রিলেশন।”
“কতদিনের?”
“ওটা বলতে পারবো না। আমি এখন খালুর ব্যবহার, খালামণির বলা কথা সবদিক বিবেচনা করে আরিফ ভাইয়াকে বিয়ে করবো না বলেছি। কিন্তু আরিফ ভাইয়া আমাকে জোর করছে। বলেছে আমাদের কথা উনি সবাইকে জানাবে। আমি মানতে না চাওয়ায় আমার পেজ, আইডি সব হ্যাক করে ফেলেছে। বলেছে বিয়ে না করলে দিবে না।”
“আরিফ তোকে বিয়ে করতে চায়?”
“জ্বি।”
“তুই চাস?”
রুমঝুম উত্তর দেওয়ার আগেই বকুল বলে, “অবশ্য তুই চাইলেও তো আমি আমার মেয়েকে ওই পরিবারে বিয়ে দিবো না।”
রুমঝুম নাক টানতে টানতে বলে, “কেনো?”
বকুল রুমঝুমের বাহুতে একটা থাপ্পড় দিয়ে বসে।
“বড় খালামণির জীবন দেখে শিক্ষা হয় নি? হ্যাঁ হয়নি? ওদের পরিবার কেমন তুই জানিস না? নিম্ন মন মানসিকতার একটা পরিবার। তোর খালু কেমন জানিস না? সবাইকে কিভাবে মুখের উপর অপমান করে তুই জানিস না? তোর বাপকে, আমাদেরকে কিভাবে অপমান করে জানিস না? আরিফের কথাবার্তা কেমন জানিস না তুই? অবুঝ তুই? এই তুই আরিফকে আগে প্রস্তাব দিয়েছিস নাকি আরিফ তোকে দিয়েছে?”
রুমঝুম উত্তর দিলো না। হাতে আম্মু জোরেসোরেই থাপ্পড়টা দিয়েছে। রুমঝুমের হাত জ্বলে গিয়েছে এক থাপ্পড়ে। বকুল তেড়ে এসে বলে,
“তুই দিয়েছিস না?”
রুমঝুম আবারও ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয়। বকুল বলে,
“তুই মরে গেলেও আমি তোকে ওই পরিবারে বিয়ে দিবো না। যতই আমার বোনের ছেলে হোক না কেনো? তাও আমি দিবো না।”
“আমার পেজ ফেরত দিতে বলো।”
“আমি কেনো বলবো? প্রেম করেছিস কেনো? আমি কিছু জানি না।”
“প্লিজ বলো আম্মু। আমি সবার কথা ভেবে বলছি তো বিয়ে করবো না। তাই বলে আমার পেজ, আইডি নিয়ে গেল কেনো? ওকে বলো ফেরত দিতে। আমার কত পরিশ্রম ছিল, ও পেজ হ্যাক করে কি করবে বলো? ইচ্ছে করে এমন করলো আম্মু। প্লিজ বলো ফেরত দিতে।”
বকুল ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে, “আমি বলবো না তো। তুই কোন সাহসে আমাকে বলতে বলছিস?”
রুমঝুম শেষমেশ বকুলের পা ধরে। “প্লিজ আম্মু। প্লিজ।”
রিমির মোবাইলে কল এলো। রিমি বলে,”আম্মু বড় খালামণি কল করেছে।”
রুমঝুম বলে, “খালামণিকে বলো না আরিফ ভাইয়াকে বলতে। প্লিজ আম্মু।”
বকুল হাসনাহেনার কল রিসিভ করে। রুমঝুমের রুম থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পর রিমি, রুমঝুম দুজনই বকুলের চিল্লাচিল্লি শোনো। বকুল যে হাসনাহেনার সাথে চেঁচামিচি করছে বুঝতে বাকি রইলো না। রিমি বলে,
“ভালো হয়েছে না? তোর জন্য এখন আম্মু, খালামণির মধ্যে ঝামেলা হোক! ভালো হবে না?”
রুমঝুম পেজের চিন্তা নিমিষেই ভুল গেল। পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে এখন কাঁদতে শুরু করে।
———-
বাইরে থেকে খেয়েদেয়ে এসে পুনম আর নওশাদ দুজনেই ঘুমিয়েছিল। নওশাদ তো এইসময় বাসায় থাকে না। আর পুনম এইসময় রোজই ঘুমায়। নওশাদের ঘুমানোর নিয়ত ছিল না। পুনমকে ঘুমাতে দেখেই মেইনলি নওশাদ ওর পাশে এসে শুয়েছিল। কিন্তু কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে বলতে পারে না। নওশাদের ঘুম ভাঙে মাগরিবের আজান শুনে।
“এই পুনম উঠো।”
পুনম ঘুমঘুম গলায় বলে, “পরে।”
“নামাজ পড়বে না? উঠো।”
“পড়তে পারবো না।”
নওশাদ উঠে গেল। নামাজ পড়ে চা বানায়। চা খেতে খেতে জোর করে পুনমকে উঠায়। পুনম ওয়াশরুম থেকে বের হতেই নওশাদ বলে,
“বাসায় একা থাকতে পারবে?”
“কেনো?”
“বড় আপা কল দিয়ে বললো সেজো আপাকে বোঝাতে। কি বুঝাবো কিছুই বুঝলাম না। সেজো আপাকে কল দিলাম, সেজো আপা বললো এখুনি বাসায় যেতে। সেজো আপার বাসায় যাবো এখন আমি।”
“সেজো আপার বাসায় যাবেন কেনো?”
“কিছুই জানি না। কিছুই বলেনি। ওই বাসায় গিয়ে শুনবো।”
“ওহ।”
“থাকতে পারবে না একা?”
“রাতে আসবেন না?”
“দেরী হবে।”
পুনম কাচুমাচু করে বলে, “পারবো মনে হয়।”
“ভয় পাবে?”
“আগে থাকিনি একা। ওই বাসা হলেও হতো, এই বাসায় আরো নতুন।”
“জাইমা জেরিনকে বলি আসতে?”
“ওরা তো ওদের চাচায় বসায় গিয়েছে।”
নওশাদ ঘাড়ে হাত ঘষে। “রেডি হও যাও। তোমাকে নিয়ে যাবো।”
“যাবো না আমি। আপনাকে যেতে বলেছে শুধু।”
“আপা আমাদের দুজনকেই যেতে বলেছে। আমার ফিরতে বেশি রাত হবে দেখে তোমাকে নিতে চাইনি। চলো তুমিও। একা রেখে যাবো না।”
“আচ্ছা।”
পুনম আলমারি থেকে থ্রি-পিস, হিজাব বের করে। জামা,পায়জামা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। নওশাদ কমন ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসে। নওশাদ আলমারি থেকে কলাপাতা রঙের শার্ট বের করে। সেন্টু গেঞ্জি পড়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে শার্ট পড়ে, তবে শার্টের বোতাম লাগায় না। পুনম ওয়াশরুম থেকে ড্রেস পড়ে বের হয়। নওশাদের সামনে দাঁড়িয়ে খোপা খুলে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে থাকে। নওশাদ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,
“আমি রেডি হচ্ছিলাম কিনা?”
“আমার সময় লাগবে।”
নওশাদ নিজের চুলে হাত গলায়। ড্রেসিংটেবিলের উপর থেকে আতর নিয়ে সেন্টু গেঞ্জিতে আতর মাখে। ফেস ক্রিম নিয়ে মুখেও মাখে। পুনম চুল আঁচড়ে বেণী করে। মুখে সানস্ক্রিন ক্রিম মাখতেই নওশাদ বলে,
“তুমি সন্ধ্যা সাতটা বাজে মুখে সানক্রিন দিচ্ছো কেনো?”
“এটা ব্রাইটেনিং সানক্রিন। মুখ ব্রাইট লাগে।”
“গাধা।”
পুনম হিজাব হাতে নিয়ে বলে, “আপনার মতো রং, ঢং আমি মেয়ে হয়েও করি না।”
“সেটা তোমার ব্যর্থতা।”
পুনমের হিজাব বাঁধা শেষ। নওশাদের দিকে ঘুরে বলে,
“শার্টের বোতাম লাগাচ্ছেন না কেনো?”
“ইচ্ছে হলে লাগিয়ে দাও।”
পুনম এগিয়ে এসে শার্টের বোতাম লাগায়। আতরের গন্ধটা সুন্দর। পুনমের লজ্জা বেশি না থাকলে পুনম এখন শিওর জড়িয়ে ধরতো। পুনম নওশাদের শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
“আচ্ছা একটা কথা বলি?”
“হুম।”
“রাগ করলে বলবো না।”
“বলো। শুনি।”
“ওয়াদা করুন রাগ করবেন না।”
“তোমার সাথে রাগ করেছি কবে?”
“বলি?”
নওশাদ পুনমের দিকে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। পুনম নওশাদের শার্টের সবগুলো বোতাম লাগিয়ে দিয়ে বলে,
“আমার তো হিসেবে পাঁচটা ননাস না?”
“আমার জানামতে আমার পাঁচটাই বড় বোন।”
“আপারা কুটনি ননাসের মতো আমার সংসারে ছুরি ঘুরায় না কেনো? এমন কুল কুল তো সচারাচর হয় না।”
নওশাদ পুনমকে নিজের সামনে থেকে সরালো। ঘড়ি পড়তে পড়তে বলে,
“বিয়ের দিন সকালেই নিষেধ করে দিয়েছিলাম।”
“কি নিষেধ করেছেন?”
“আমার সংসারে নাক গলাতে নিষেধ করে দিয়েছি।”
পুনমের চক্ষু চড়কগাছ। “মানে?”
“বলেছিলাম আমি যাকে বিয়ে করবো, সে চরিত্রহীন হোক, পাগল হোক, বলদ হোক, ঝামেলাবাজ হোক, বেয়াদব হোক যা ইচ্ছে হোক আমি ম্যানেজ করবো। তোরা আমার সংসারে নাক গলাবি না। তোরা বাইরের মানুষ, বাইরের মানুষের মতো থাকবি।”
একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলে, “সিরিয়াসলি?”
“মিথ্যা বলছি মনে হয়?”
“আপনি আপনার বোনদের এটা বলতে পেরেছিলেন?”
“না পারার কি আছে?”
“আপাদের সাথে এভাবে কথা বলেন কেনো আপনি?”
“কিভাবে?”
“এইরকম রুডভাবে।”
“ওদের সংসারে আমি বাইরের মানুষ হলে আমার সংসারে ওরা বাইরের মানুষ না?”
“ওনারা আপনার আপন বোন।”
“শোনো হাসবেন্ড ওয়াইফের নিজস্ব ঝামেলায় খুব কমই সংসার ভাঙে। সংসার মেইনলি ভাঙে এই আপন বোন, আপন ভাই, আপন ভাবি, আপন ননদ, আপন শ্বাশুড়ি এদের জন্য। আমার বোনেরা একদিন আসবে, তোমাকে বলবে ‘দেখেশুনে বিয়ে করলাম, ওমাহ মেয়ে দেখি রান্না পারে না। ভাইয়ের তো জীবন শেষ।’ এবার তোমার লাগবে খারাপ। ভ্যানভ্যান করবে আমার সাথে। এরপর লাগবে ভেজাল। তাই ভেজাল লাগার আগেই সব স্টপ করে দিলাম। বাইরের মানুষ বাইরের মানুষর মতো থাক। দাওয়াত দিলে এসে খেয়ে যাস।”
“আপনি তো গাদ্দারের মতো কথা বলেছেন।”
“গাদ্দারের মতো বলার কি আছে? আমি গাদ্দারই। ভালো মানুষ হতে শিখিনি আমি।”
“আপনার কোনোরকম বউ পেলেই হতো?”
নওশাদ উত্তর দিলো না। মোবাইল চার্জে দিয়েছিল। সুইচ অফ করে প্লাগ খুলে মোবাইল পকেটে ঢুকায়। পুনম লাফাতে লাফাতে এসে বলে,
“ক্যারেক্টারলেস হলেও সংসার করতেন?”
“থাপ্পড়ে গালের বত্রিশটা দাঁত ভেঙে তারপর সংসার করতাম।”
“আপনি না বলছেন আপনি বউ মারার মতো ছেলে না।”
“তোমার মতো বউ হলে বউ মারার মতো ছেলে না।”
“মানে বউ যেমনই হতো সংসার করতেন?”
“আমার এত টাকা নেই যে বারবার বিয়ে করবো আর মোহরানা দিবো।”
পুনম খুশি খুশি মনে বলে, “আমি অনেক ভালো বলুন?”
“না তুমি গাধা।”
পুনম চোখ সরিয়ে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একপাশে ওড়না নিয়ে সেফটিপিন দেয়। নওশাদ আলমারি খুলে ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে। পুনম পার্সে ওর মোবাইল ঢুকিয়ে পার্স হাতে নিয়েই বেরিয়ে পড়ে। নওশাদ আড়চোখে তাকায়। মানিব্যাগে টাকা ঢুকিয়ে লাইট নিভিয়ে রুম থেকে বের হয়। রান্নাঘরের লাইট জ্বালানো। নওশাদ ভ্রু কুচকে কিচেনে গেল। পুনম লেবু কাটছে।
নওশাদ কপাল কুচকে বলে, “লেবু কাটছো কেনো?”
“যাতে বমি না আসে।”
“মানে?”
“যাতে বাসে উঠলে বমি না আসে।”
“তোমাকে নিয়ে তো বাসে উঠবো না। সিএনজি করে যাবো।”
“এইখান থেকে ওখানে যেতে সাড়ে তিনশো, চারশো টাকা নেয়। বাসে বিশ, বিশ চল্লিশ টাকায় চলে যাওয়া যাবে।”
“বমি করবে তুমি।”
“লেবু থাকলে করবো না।”
নওশাদ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে। “তুমি কি আগে থেকেই এমন কিপ্টে নাকি আমার টাকা কম সেইজন্য হচ্ছো?”
“জানি না।” পুনম লেবুর বাকি অংশ ফ্রিজে রেখে নওশাদের বুকে ধাক্কা মেরে কিচেন থেকে বের হয়ে গেল। নওশাদ বুকে হাত ঘষে কিচেনের লাইট অফ করে পুনমের পিছন পিছন এসে বলে,
“এটা কি হলো?”
“কোনটা?”
“ধাক্কা দিলে কেনো?”
“গাধারা ধাক্কাই দেয়।”
নওশাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। গাধাকে গাধা বলায় আবার রাগও করলো। কিন্তু সেই রাগ বেশিক্ষণ টিকে না। বিল্ডিং থেকে বের হয়েই নিজ থেকে নওশাদের বাহু জড়িয়ে ধরে।
______________
নওশাদ পুনমকে নিয়ে বকুলের বাসায় আসে আটটা নাগাদ। পুনম বাসে বমি করেনি ঠিকই তবে বাস থেকে নেমে বমি করে দেয়। নওশাদ পরে পানির বোতল কিনে আনে। চোখ মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়, পালস চকলেট কিনে দেয়। বকুলের বাসায় ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে পুনমকে বলে, “মজা পেয়েছো বাসে চড়ে?”
“অভ্যাস হয়ে যাবে।”
“বমি করতে অনেক মজা না?”
“না। বমি করার পর সেবা পেতে মজা।”
নওশাদ কিছু বললো না আর। বকুল আসতেই নওশাদ বলে,
“বড় আপা তোকে বোঝাতে বললো। কি বোঝাবো? আগা নেই মাথা নেই বলে তোকে বোঝাতে। ঘটনা কি?”
বকুল নওশাদকে সব বললো। হাসনাহেনার সেদিনের কথাও, আরিফ-রুমঝুমের কথাও। রিমিও বলে। পুনম দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একবার নওশাদের দিকে, আরেকবার বকুলের দিকে একবার, তো আরেকবার রিমির দিকে তাকায়। বকুল সাথে সাথে বলে,
“আমি তো মেয়ের বিয়ে জীবনেও ওখানে দিবো না। রুমঝুম যদি বিষ খাওয়ার হুকমি দেয় তাও না। আরিফের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবো না বলায় ও যদি আমার মেয়েকে মেরেও ফেলে তাও বিয়ে দিবো না আমি। ওই পরিবারে বিয়ে করে ধুঁকে ধুঁকে মরার চাইতে আগেভাগে বিষ খেয়ে মরা অনেক ভালো।”
নওশাদের রাগ হলো। “রুমঝুম জানে না কিছু? জেনে বুঝে সম্পর্কে জড়িয়েছে না? এমন তো না যে ও জানতো না, ও শুধু আরিফকে চিনতো। ওর বাবা-মা বা পরিবার সম্পর্কে জানতো না। জেনে-বুঝে সম্পর্কে জড়িয়ে পিছিয়ে তো লাভ নেই। আমার তো মন চাচ্ছে রুমঝুমকে ঠাসঠাস করে কয়েকটা চড় মারতে।”
রিমি বলে, “মামা আমি রুমঝুমকে বুঝিয়েছি। খালু যখন তখন আব্বুকে যেভাবে ইচ্ছে কথা শোনায়, আমার মনে হয় না রুমঝুম তারপরও আরিফ ভাইয়াকে বিয়ে করবে।”
“বড় আপা আমাকে কল করে অনেকবার অনুরোধ করলো তোকে বোঝানোর জন্য। আরিফ নাকি বাসায় ঝামেলা করেছে।”
বকুল রেগে বলে, “যা ইচ্ছে করুক গিয়ে। আমার মেয়েকে তো ওখানে আমি বিয়ে দিবো না। আমার বড় বোনের জীবন তো শেষ, এখন জেনে বুঝে মেয়ের জীবন নষ্ট করবো নাকি!”
“আমাকে কেনো পাঠালো? আমি তো জীবনেও তোকে বোঝাবো না আরিফের সাথে রুমঝুমের বিয়ে দেওয়ার জন্য। আজাইরা। আমি আমার ভাগ্নিকে জেনে বুঝে জাহান্নামে পাঠাবো নাকি? আরিফও কম না। বংশের ধাঁচ তো ফেলে দিতে পারবে না।”
পুনম এতক্ষণ পর মুখ খুললো। “ওরা তো ভালোবাসে একে অপরকে। তাহলে সমস্যা কোথায়? আরিফ রুমঝুমকে যত্নে রাখবে। আর বড় আপাকে তার শ্বাশুড়ি কষ্ট দিয়েছিল, রুমঝুমকে তো আর বড় আপা কষ্ট দিবে না।”
নওশাদ চোখ রাঙিয়ে তাকায়, অত্যন্ত রুক্ষ গলায় বলে, “যেটা জানো না সেটা নিয়ে মাঝপথে কথা বলবে না পুনম। নতুন, নতুনের মতো থাকো। সব জায়গায় কথা বলবে না।”
পুনম মাথা নিচু করে ফেলে। নওশাদের কথাবার্তার ঠিক নেই জানতো, তা বলে কথাগুলো এতটাই রুক্ষভাবে বলেছে যে পুনমের কান্না চলে এলো। ও ঢোক গিলে কোনোমতে বলে,
“আমি রুমঝুমের ঘরে যাচ্ছি।”
নওশাদ বুঝলো না বধূর অভিমান। বোনের সাথে কথা বলায় মনোযোগ দিলো।
________________
মা, মামার কথা রুমঝুম শুনলো না। ও মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢোকে। নিজের আইডিতে ঢুকতে পারছে না। বারবার ইনকারেক্ট পাসওয়ার্ড আসছে। ফেসবুক লাইটে আরিফের আইডি ওর ফোনে লগ ইন করা আছে। রুমঝুম কি মনে যে আরিফের আইডিতে ঢুকলো। অনেকক্ষণ ধরে অনেক চিন্তাভাবনা করলো। এখন রুমঝুম একটা পোস্ট করবে। কিন্তু তাতে কি আরিফের ক্যারিয়ারের সমস্যা হবে? হতে পারে। রুমঝুম সেই রিস্ক নিবে না। ফ্যামিলি মেম্বারদের স্পেসিফিক ফ্রেন্ডে রাখে। আরিফের মায়ের পরিবার, বাবার পরিবারের সব আত্মীয় স্বজনদের, কেউ বাদ যায়নি।
আরিফের আইডি থেকে স্পেসিফিক ফ্রেন্ডদের উদ্দেশ্য পোস্ট করলো,
“আমি গে। গে মানে আমি ছেলেদেরকে পছন্দ করা। ছেলেদরকে দেখলে আমি আর্কষণবোধ করি। ছেলেদের দৈহিক গঠন, হাঁটাচলা, কথা বলার ধরণ সব ওয়াও। মেয়ে মানুষ আমার ভালো লাগে না। আমার আব্বু আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একটা মেয়ে ঠিক করেছে। আমি সেই মেয়েকে বিয়ে করতে চাইনা, ইভেন কোনো মেয়েকেই চাই না। যেহেতু আমি গে সেহেতু আমার একটা ছেলেকে পছন্দ। ছেলেটা আমার পরিবারেরই। ইনশাআল্লাহ আমি ওকেই বিয়ে করবো।”
কিছুক্ষণ পরই রিয়েক্ট, কমেন্টে ভরে গেল। শাওন তো রীতিমতো ইসরাতকে ম্যানশন দিয়েছে। আরিফের ফুফুরা আস্তাগফিরুল্লাহ রিপ্লাই দিলো। মাহতাব অনেকগুলো অবাক হওয়ার ইমোজি দিয়ে কমেন্ট করলো,
“তুমি এইজন্যই গতকাল আমাকে রাত আড়াইটা বাজে ঘুম থেকে উঠিয়েছিলে? আস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নফল নামাজ পড়তে যাই।”
চলমান…….
(জ্বর এসেছে। রি-চেক দেইনি, রাতে রি-চেক দিবো। হ্যাপি রিডিং)

