#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২৩
#সমৃদ্ধি_রিধী
মাহতাব কাজিন গ্রুপে আরিফের এনগেজমেন্টের ছবি দিয়েছে এক মিনিট আগেই। রুমঝুম তৌহিদা, আরিফের ছবিগুলো জুম করে দেখে। কোনো ছবিতে তৌহিদা আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে আছে, কোনো ছবিতে তৌহিদা আরিফের বাহু জড়িয়ে ধরে আছে, আরিফের গালে হাত দিয়ে রেখেছে। রুমঝুমের চোখে পানি আসে। আরিফ তৌহিদাকে নিষেধ করেনি এভাবে ধরতে? আবার তৌহিদা হাতা কাটা গাউন পড়লো ওর গায়ের সাথে ঢলাঢলি করলো? আর রুমঝুম মাঝে মাঝে হিজাব না বেঁধে মাথায় শুধু ওড়না প্যাঁচালেই কেমন করতো! সব চোটপাট রুমঝুমের উপরেই না?
মাহতাব একটা ভিডিও পাঠালো। নিচে লিখলো আমাদের বড় ভাইয়ের আংটি বদল। রুমঝুম ভিডিওটা দেখে। আরিফ তৌহিদার হাত ধরলো। তারপর হাত ধরে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। আংটি পড়ালো, আবার হাত ছেড়ে দিলো। তারপর আবার হাত ধরলো। একটু পর হাত উঠিয়ে ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেল। ঠোঁটে হাত ছুঁই ছুঁই তখনই ভিডিও অফ হয়ে গেল। আরিফ কতবার, কতবার ওই তৌহিদার হাত ধরেছে। রুমঝুমের চোখে পানি চিকচিক করছে। তৌহিদাকে চুমুও খেয়েছে? ক্যারেক্টার এতটাই লুজ ওর? এতটাই? রুমঝুম নাহয় একটা বোকামি করেছে তাই বলে আরিফ এত বড় পদক্ষেপ নিবে? আরেকজনকে বিয়ে করে নিচ্ছে? আরিফ এমন করতে পারলে রুমঝুমও পারবে। ও গায়ে ওড়না জড়িয়ে বকুলের কাছে গেল।
“আমি বিয়ে করবো।”
বকুল টিভির রিমোট হাতে নিয়ে বলে, “আরিফের বিয়ে পরশু। তোকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল বিয়ে করবি কিনা। তুই না বলেছিস।”
“তোমার আরিফকে বিয়ে করবো না আমি।”
“রুমঝুম এতো তামাশা ভালো লাগছে না।”
“ছেলে দেখো। আব্বুর না কোন ছেলে পছন্দ? আমি ওকে বিয়ে করবো।”
বকুল ধমক দেয়। রুমঝুম বলে, “বিয়ে আমি করবোই। এখনই করবো।”
“আম্মুর সামনে এগুলো কি ধরনের ব্যবহার? তোকে আমি রিমির মতো শাসন করিনি সেটা আমার অপরাধ? এইজন্যই এতটা বোধ জ্ঞানহীন হয়েছিস?”
“বিয়ে দিবে না তুমি? আব্বুর সাথে কথা বলবে না?”
“অজাত পেটে ধরেছি একটা।”
“তুমি আব্বুর সাথে কথা বলবে। আমি কিছু জানি না। এখন বলো আরিফ ভাইয়ার হলুদে যাবে না?”
“না।”
“বড় খালামণি কল দেয়নি?
“দিলেও তো আমি যাবো না।”
“আমার জন্য বড় খালামণির সাথে সম্পর্ক কেনো শেষ করবে?”
“সেটা আমার বিষয়। তোকে মাথা ঘামাতে হবে না৷”
“এই যে বলো নানুমণির পরে বড় খালামণিই তোমাদের কাছে মায়ের মতো। এগুলো বলে তেল দিতে না খালামণিকে? এখন একটা ঝামেলা হয়েছে ওমনি মা জানালা দিয়ে পালালো? তোমরা নোয়াখাইল্লারা আসলেই এক নাম্বারের গাদ্দার। আমার ম্যাথ স্যার ঠিকই বলতো।”
বকুল পায়ের সামনের জুতা খুলে রুমঝুমের দিকে ছুঁড়ে মারে। রুমঝুম তেজ দেখিয়ে বলে,
“বিয়ে আমি করবোই। তুমিও আব্বুর সাথে কথা বলবে। যদি এই শুক্রবার হয় তো এই শুক্রবার।”
বকুল এবার হাতে থাকা রিমোট জোরে রুমঝুমের গায়ে ছুঁড়ে।
“বেয়াদব মায়ের সামনে কিভাবে কথা বলতে হয় শিখে নাই। অজাতের বাচ্চা একটা।”
বকুল চলে গেল। রুমঝুম হাত দিয়ে পেট ঘষতে থাকে। ভালোই ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু বিয়ে ও করবেই। আরিফকেও দেখিয়ে দিবে রুমঝুমও পারে। জামাইয়ের হাত ধরে ছবি তুলে আরিফকে পাঠাবে।
____________________
হাসনাহেনা বাসায় এসেই অনেক চিল্লাচিল্লি শুরু করেছে। জামাই, আত্মীয় স্বজন কারো তোয়াক্কা করলো না।
“ওই মেয়ের সাথে আমি আমার ছেলের বিয়ে দিবো না। ওই মেয়েকে বিয়ে করলে আমার ছেলে মরে যাবে।”
ইসরাত সোফায় বসে আছে। পাশেই শাওন। ডাইনিং টেবিলে আরিফ নিশ্চিন্ত মনে ভাত খাচ্ছে। আলামীন বলে,
“সব ঠিকঠাক, এখন আমি বিয়ে পিছাই কি করে?”
“পিছাই না, বিয়ে ভাঙবেন। আমি জানি না কিভাবে বিয়ে ভাঙবেন। আমি বিয়ে দিবো না ওই পরিবারে।”
ইসরাতও বলে, “ভাইয়া জেদ করছে আব্বু। তুমি বিয়ে ভেঙে দাও। মেয়েটাকে তুমিও দেখেছো। আশা করবো তুমি নিজের ছেলের জীবন নিজের হাতে নষ্ট করবে না।”
“আমার তো ব্যবসা ওদের সাথে। কত টাকার ইনভেস্টমেন্ট। বিয়ে ভাঙলে সব ভেস্তে যাবে।”
হাসনাহেনা গলার স্বর উঁচু করে বলে, “ছেলের থেকে ব্যবসা বড়? কয়েকদিন আগেই তো হাসপাতাল থেকে ঘুরে এসেছেন। কয় টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন সাথে? টাকা তো আল্লাহর রহমতে কম নাই। আর কত? আমি তো শেষই, এবার ছেলের জীবনটা নিজ হাতে শেষ না করলেই হবে না, তাই না? আর কত? এবার শান্তি দেন।”
শাওন উঠে চলে গেল। জামাই, জামাইয়ের মতোই থাকুক। ফ্যামিলি ড্রামায় ইন্টারফেয়ার করবে না ও। শাওন যেতেই ইসরাত আরিফকে বলে,
“ভাইয়া কিছু বলছো না কেনো?”
আরিফ ডাল নেয়। হাসনাহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আম্মু ডালটা মজা হয়েছে। এভাবেই রান্না করো তো এখন থেকে।”
ইসরাত চেঁচিয়ে বলে, “ভাইয়া আর কত জেদ করবে? আব্বুকে বলো বিয়ে করবে না।”
“এদিকে আয় খাইয়ে দেই। খালি পেট দেখে তোর মাথা গরম হয়ে গিয়েছে। খেয়ে দেখ আসলেই মজা হয়েছে।”
ইসরাত টেবিলে থাবা দিয়ে বলে, “কার সাথে জেদ করছো তুমি? আমাদের সাথে? কারণ কি?”
“আস্তে! কাঁচের টেবিল এটা। আমার প্রথম ইনকামের টাকায় কেনা ইসরাত। একটু মায়া দয়া কর?”
ইসরাত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তোমার টেবিল আমি ভেঙে ফেলবো।”
“ভাঙবি? আচ্ছা ভাঙ।”
“কার উপর জেদ করে এইসব করছো সেটা বলো? মেয়েটাকে তুমি বিয়ে করবে? ওই ক্যারেক্টারলেস মেয়েটাকে?”
“বলছি দাঁড়া। আম্মু একটু ভাত দাও।”
ইসরাত দু চামচ ভাত আরিফের প্লেটে দিয়ে রেগে বলে,
“জন্মের ভাত খা তুই। খেয়ে নে, ওইটাকে ঘরে আনলে আর খাওয়া লাগবে না। খা।”
আরিফ চোখ রাঙিয়ে বলে, “আমি তোর বড় না ছোট? তুই তোকারি করছিস আবার আগের মতো? বিয়ে হয়েছে দেখে কি কিছু বলবো না ভেবেছিস?”
“তুমি বিয়েটা করবে না।”
“কেনো করবো না?”
“কেনো করবে? কার উপর এত জেদ? ওই পাগলের উপর? ওই পাগল কালকে আমাকে মেসেজের উপর মেসেজ দিয়েছে। তুমি ব্লক মেরেছো বলে জানো না। ওই পাগলের পাগলামো কি নতুন? জন্মের পর থেকেই তো দেখে আসছো। তাহলে এত রাগ জেদ কিসের?”
“মানুষের উপর রাগ করে লাভ আছে? রাগ-জেদ আমার ভাগ্যের উপর। আমার আব্বু-আম্মুর উপর। কেনো আব্বু জানতো না মেয়েটা খারাপ? আব্বু জানতো না মেয়েটার ড্রেসআপ গেটআপ খারাপ? মেয়েকে আব্বু আগেও দেখেছে। তাও কি করে ওই মেয়েকে নিজের ছেলের জন্য ঠিক করে? আবার দাবি করে ছেলে মেয়ে নাকি ওনার জান।
আম্মু জানতো না আব্বু কেমন? তারপরও আমাকে আব্বুর আচার-আচরণ সম্পর্কে অবগত করেনি কেনো? ইভেন আম্মুও জানতো মেয়েটা খারাপ। তাও একে ওকে বলেছে আমাকে বোঝাতে যাতে আমি ওই মেয়েকে বিয়ে করি। করবো তো বিয়ে। তবে এখন এত ঝামেলা কেনো? আমি আবার কিছু বললেই সমস্যা। আমাকে চুপ থাকতে দে। তুই ঝামেলা কর, মুখ লাড়া শরীরে এনার্জি থাকলে। আমার এত এনর্জি নেই। একসপ্তাহ আগে মুখ খুলেছি একজন হাসপাতালে গিয়েছে। এখন আর মুখ খুলাস না। এবার মুখ খুললে আরেকজনকে নিয়ে হাসপাতালে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হবে।”
ইসরাত আরিফের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাসনাহেনা সোফায় কপাল চাপড়ে কাঁদতে থাকে। আলামীন দাঁড়িয়ে থাকে। আরিফ চিবোতে চিবোতে বলে,
“বেশি ভাত দিয়েছিস তুই। বোস। এগুলো খেয়ে তুই শেষ করবি। এগুলো দিতে বলেছে কে তোকে?”
ইসরাত রুমে চলে যায়। আরিফ সব ভাত খেয়ে আফসোস করে। এভাবে খেলে ফিটনেস থাকবে? ফিটনেস না থাকলে চলবে?
________________
“তো তোমাকে যেভাবে বললাম সেভাবে করতে পারবে না?” আরিফ পুনমকে বলে।
পুনম আমতাআমতা করে। দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“আমিই কেনো?”
মাহতাব পাশ থেকে বলে, “বেশি কঠিন কাজ না তো। ভাইয়া রিং পড়ানোর আগে ঘুরায় পড়ে যাবে। চোখ টোখ বন্ধ করে পড়ে থাকবে। আমি একটু পর গিয়ে তোমার পালস চেক করে বলবো যে প্রেশার লো তাই সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে।”
“তোমাদের মামা জানতে পারলে আমাকে কুঁচি কুঁচি করে কাটবে।”
আরিফ পকেটে হাত গুঁজে বলে, “মামা ভালো মানুষ। আমাদেরকে কাটলেও তোমাকে কিছু বলবে না।”
“বলছি কি! আমি না করি? জাইমা, জেরিনকে বলো? নাহলে ইসরাতকে?”
আরিফ বলে, “ইসরাত সত্যি সত্যিও মাথা ঘুরে পড়লে এতটা এটেনশন পাবে না। কারণ ও অসুস্থ। মানুষ নরমালভাবে নিবে। তুমি নতুন মানুষ, অজ্ঞান টজ্ঞান হলে গ্যাঞ্জাম বেশি হবে।”
পুনম ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। “জাইমা বা জেরিনকে বলো?”
“ওরা ভালো অভিনয় করতে পারে না। দেখা যাবে সিনারির টানটান মোমেন্টে হো হো করে হাসা শুরু করেছে। ওরা তো আর রুমঝুম না যে যেভাবে শিখিয়ে দিবো ওইভাবে অভিনয় করবে।”
বলেই আরিফ চুপ করে গেল। অন্যদিকে তাকিয়ে শ্বাস ফেলে। মাহতাব বলে, “আরিফ ভাইয়া এভাবেই আমাদের রুমঝুমকে অভিনয় শিখিয়ে বড় করেছে। এমন অভিনয় শিখিয়েছে আমরা ধরতেও পারিনি ওরা প্রেম করে। শ্লা রুমঝুম আমার সাথেও যেভাবে কথা বলতো, আরিফ ভাইয়ার সাথেও সেভাবে বলতো। বুঝবো কি করে?”
পুনমের হাতিরঝিলের কথা মনে পড়ে। ওরা তাহলে ডেটে গিয়েছিল? আর ধরা খাওয়ার পর এমন অভিনয় করেছে যে কারো সন্দেহ করার অবকাশ নেই।
“সেসব কথা রাখো। অভিনয়টা ভালো মতো করো।”
পুনম বিরক্ত হলো বেশ। “তোমরা কি বাচ্চা? প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও বিয়ে নিয়ে ছেলেখেলা করছো কেনো? বিয়ে এমন মজা করার জিনিস? বিরক্তবোধ করছি আমি। বুঝলাম না অযথা জেদ করছো কেনো? নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে প্রবলেম সলভ না করে মাঝখানে আমাকে ফাসাচ্ছো! এই আরিফ তুমি বয়সে আমার চেয়ে বড়? তোমার থেকে আমার নিজেকে বেশি ম্যাচিউর লাগছে।”
“তোমাকে যেটা বলেছি তুমি শুধু তাই করো। আংটি পড়ানোর টাইমে চট করে পড়ে যাবে।”
“পড়ার পরে?”
মাহতাব বলে, “আমি পানি খাওয়াতে বলবো। পানি না খাওয়ানো অব্দি উঠবে না।”
পুনম কপাল কুচকে মাহতাবের দিকে তাকিয়ে বলে, “মেডিকেলে পড়ছো এইসব অকাজ করতে?”
“বাংলাদেশে একটু অকাজ করাই যায়।”
আরিফ চলে গেল। পুনম মাহতাবকে বলে, “প্ল্যানটা কি বলো তো?”
“এটাই, ঘুরে পড়ে যাবে। আরিফ ভাইয়াকেও আংটি পড়াতে হবে না।”
“সিনেমা পেয়েছো সবাই? আংটি পড়াতে না চাইলে এত দূর এসেছে কেনো? আগেই নিষেধ করে দিতো। মানসম্মানের ব্যাপার আছে না একটা? মামার হাতে তো এইসবের জন্য চড় খাও, বুঝেছি আমি।”
“শোনো মামি রুমঝুম হচ্ছে আমার নানুমণির সব নাতনিদের মধ্যে চিরকালের নিব্বি ন্যাকা চরিত্র। এই নিব্বির সাথে যুক্ত হয়েছে নানুমণির সব নাতিদের মধ্যে চিরকালের নিব্বা ন্যাকা চরিত্র। এইযে এইসব ক্রিঞ্জ কাজ করে ওরা পরে বলবে বিশুদ্ধ ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছে। যা হচ্ছে দেখে যাও আর মজা নাও। এখন এই অনুষ্ঠানের ভালোমন্দ খাবার পেট পুরে খেয়ে নাও। মূল বিয়েটা আরিফ ভাইয়ার রুমঝুমের সাথেই হবে। তখন সেই বিয়ের খাওয়াও মন ভরে খাবে। আমাদেরই লাভ। এই নিব্বা, নিব্বিই একে অপরের জন্য ঠিক আছে। অন্য কোনো ভদ্র মস্তিষ্কের মানুষ ওদের পাল্লায় পড়লে পাগল হয়ে যেতো।”
“প্ল্যান কি?”
“সিক্রেট মামি।”
“তুমিও যে জানো না সেটা বলো।”
“এগজ্যাক্টলি।”
নওশাদ রাগে গজগজ করছে। পুনম রেগে বোম হয়ে থাকা নওশাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যার পরিকল্পনার কথা ভাবছে। পুনম মিনমিনে গলায় নওশাদকে ডাক দেয়। নওশাদ অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। পুনমের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলেও বলে,
“আপনি আমি সবটা খুলে বলি?”
“আমি তোমাকে খাওয়াই না যে এমন ছোটলোকি করে না খেয়ে থাকো? একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাও? এতগুলো মানুষ কি ভাবলো?”
“আপনাকে আমি সব খুলে বলি। আপনি আমার পাশে এসে বসুন।”
নওশাদ পুনমের পাশে এসে বসে। “ছোটলোকি করা বের করবো। কিপ্টেমি বলে না এগুলোকে। ছোটলোকি বলে।”
“আমি না ইচ্ছে করে পড়ে গিয়েছি।”
নওশাদ বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে, অবাক হয়ে বলে,
“মানে?”
পুনম মিনমিন করে সব বললো। নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে পুনমের দিকে তাকিয়ে থাকে। পুনম মেকি হাসে। নওশাদ পুনমের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে। নাকের পাটা রাগে ফুলে আছে।
“কখন এইসব প্ল্যান করেছো?”
“সেন্টারে যাওয়ার পর পরই ওদের সাথে কথা বলছিলাম দেখেছেন না? তখনই।”
“আমাকে জানিয়েছো?”
“আপনাকে জানাতেই তো আপনার হাত ধরেছিলাম। মানে তখনই পড়ার প্ল্যান ছিল। আপনি তো আমাকে পাত্তাই দেননি।”
“তুমি ইমম্যাচিউর? না পাগল? ওদের কথায় সায় দিয়েছো কেনো? এতগুলো মানুষ কি ভেবেছে সেটা আমাকে বলো। সব জায়গায় মজা পেয়েছো না?”
“তাও তো আরিফ আমাকে পরে বকাবকি করেছে কেনো আরো আগে অজ্ঞান হওয়ার অভিনয় করিনি।”
নওশাদ প্রচন্ড রেগে আছে। গলার স্বর উঁচু করে বলে, “কথা আরিফকে নিয়ে হচ্ছে না। তুমি এরকম ছাগলামি করার আগে আমাকে জানাওনি কেনো সেটা বলো? যখন ওরা এগুলো প্ল্যান করেছে তখনই বলতে পারোনি? তোমাকে হাত ধরতে নিষেধ করেছি, কথা বলতে নিষেধ করিনি। তাছাড়া তুমি আরিফের কথায় সায়ই বা দিয়েছো কি করে?”
পুনম মাথা নিচু করে বলে, “এতবার করে বললো…”
শেষ হওয়ার আগেই নওশাদ বলে, “এতবার করে বলেছে আর তুমি করে ফেলেছো। এখন থেকে যেকেউই যতবার করে যা করতে বলবে, ততবার করে তুমি সব করে ফেলবে। দয়ার সাগর তুমি?”
পুনম মুখ কালো করে বসে রইলো। নওশাদ বলে,
“একদম মুখ কালো করবে না। হিসেবে কিছুই বলিনি তোমাকে।”
পুনম মুখ গোমড়া করে অন্যপাশে তাকিয়ে রইলো। নওশাদ উঠে যায়। শার্ট খুলে বলে,
“শাড়ি পাল্টে এসো যাও।”
পুনম বসে থাকে। আচ্ছা মানছে ভুল করেছে! এইজন্য এভাবে বকতে হবে? নওশাদ শার্ট খুলে রেখে ওয়ারড্রব থেকে টাউজার বের করে পুনমের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।
“পুনম শাড়ি পাল্টে নিতে বলেছি আমি।”
পুনম নওশাদের দিকে তাকালো। আশেপাশে কেউ না থাকলে নওশাদ পুনমকে নাম ধরে ডেকেছে কয়বার? পুনম তো মনে করতে পারছে না। ভ্রু কুচকে ওয়ারড্রবে নিজের ড্রয়ার থেকে পায়জামা বের করে। নওশাদের ড্রয়ার খুলে নওশাদের আকাশী রঙের একটা টিশার্ট নেয়। নওশাদ কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে।
“আমার টিশার্ট নিয়েছো কেনো?”
“পড়বো তাই নিয়েছি।”
নওশাদকে পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। নওশাদ পুনমের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
“দুনিয়ার সব পাগল আমার আশেপাশে।”
ড্রেসিংটেবিলের উপরে পুনমের গহনা, সাজার জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নওশাদ ওগুলো গুছিয়ে রাখলো। গ্রাইগ্লাস খুলে দিয়ে নেট দিয়ে রাখে। মশা আসবে না তাহলে।
পুনম বের হয় পাঁচ মিনিট পর। পুনম বের হতেই নওশাদ ওয়াশরুমে ঢোকে। পুনম মনে মনে ভেংচি কাটে। বেশি বেশি করে এই লোক। বাড়াবাড়ি। বেশি ভদ্রতা দেখায়।
পুনম মুখে মশ্চারাইজার মাখে। হাতে পায়ে লোশন মাখে। চুলে আঁচড়ে বেণী করে যেই বিছানায় গিয়ে বসলো তখন নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। পুনম তাকালোই না। নওশাদ গুড লাইট মশা মারার মেশিন চালু করে লাইট অফ করে ফেলে। পুনম বা দিকে চেপে যায়। নওশাদ শুয়ে পড়ে।
পুনম বসে থাকে। নওশাদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“প্ল্যানটা কি বলো তো?”
“কিসের প্ল্যান?”
“তোমাকে ওভাবে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করতে কেনো বলেছে?”
“জানি না।”
“না জেনেশুনেই কাজ করেছো?”
“হ্যাঁ।”
“কারণ তুমি তো গাধা।”
“আরিফ, মাহতাব আপনাকে বলতে নিষেধ করেছিল। আমি তাও আপনাকে বলেছি। কেনো নিষেধ করেছে বুঝেছি তো আমি। আগে জানলে বলতামই না।”
নওশাদ অন্ধকারেই পুনমের হাত ধরে টান মারে। ফলশ্রুতিতে পুনম নওশাদের বুকে গিয়ে পড়ে। নওশাদ পুনমকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে।
“ওরা নিষেধ করবে আর তুমি আমাকে বলবে না? আমি বেশি ইম্পর্টেন্ট নাকি ওরা?”
“কার ইম্পর্টেন্স বেশি জানি দেখেই তো বলেছি।”
“এই নাটকের কথা সবাই জানতো?”
“না। শুধু আমি আরিফ, মাহতাব জানতাম।”
“এখন বলো প্ল্যান কি?”
“আরিফ তৌহিদাকে আংটি পড়াতে চায়নি এটাই।”
“তাহলে অনুষ্ঠান পর্যন্ত গিয়েছে কেনো?”
“সব কি বলেছে নাকি? অর্ধেক অর্ধেক বলেছে।”
“আমার মনে হচ্ছে তুমি অনেক কিছুই জানো। আমাকে বলছো না।”
“যা জানি তা বলে দিয়েছি। আর কিছু জানা নেই।”
“সবসময় সব বিষয় নিয়ে মজা করবে না। বিশেষ করে অসুস্থতা নিয়ে। বাঘ, রাখালের কাহিনি তো জানোই? এমন মজা করতে করতে একসময় সত্যি হলেও বিশ্বাস করবো না। আর ওদের বিষয়টাও দেখছি। ছেলেখেলা পেয়েছে না?”
“বেশি বেশি রুড।”
নওশাদ পুনমের গালে শক্তপোক্ত চুমু খায়। পুনমের গালে গাল লাগিয়ে রাখে। পুনম নওশাদের উন্মুক্ত বুকে হাত রেখে ক্ষীণ গলায় বলে,
“হয়েছে, আর রেগে নেই আমি।”
“এইসব কাজ আর করবে না। আমি পছন্দ করি না।”
“আচ্ছা।”
নওশাদ পুনমের চুলে হাত দেয়। পুনম মেকি তেজ দেখিয়ে বলে,
“অনেক কষ্টে বেণী করেছি কিন্তু! বেণী খুলেছেন তো খবর আছে।”
নওশাদ বেণী খুলে দেয়। “করে দিবো আবার।”
“আপনি পারেন না।”
“সেদিন না করে দিলাম?”
“এলোমেলো হয়েছে।”
“একদিন এলোমেলো হলে পরের দিন সুন্দর হবে। প্র্যাকটিস মেইকস অ্যা ম্যান পারফেক্ট।”
“এখন এত ঠান্ডা, ঠান্ডা হাবভাব? আপনি তো প্রথম প্রথম খুব রেগে রেগে থাকতেন।”
“প্রথম প্রথম মানে?”
“বিয়ের প্রথম দু-তিন দিন।”
“নিজের জমানো টাকা, দেশের বাড়ির জমির শেষ অংশ কত কষ্ট করে বেঁচে বিয়ে করলাম! বউ এসে বলে সে বিয়ে মানে না। তাকে জোর করে দেওয়া হয়েছে। রেগে থাকবো না তো কি খুশিতে আত্মহারা হয়ে লাফাবো? গাধা।”
পুনম ছটফট করলো। “গাধা গাধা করেন যে ভালো লাগে না।”
“গাধা বলবো না তো কি বলবো? যেসব কাজ আগে করেছো, এখনও করে বেড়াচ্ছো গাধা না নলে বলবোটা কি? সেন্টারের নাইন্টি নাইন মানুষ তো আমাকে বাপ বানিয়ে দিয়েছে। একজন বিবাহিত মহিলার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া বা বমি হওয়ার মানে হলো সে প্রেগনেন্ট। লেইম লজিক।”
“ছিহ আমাদের বিয়ের দুমাস হলো সবে।”
“ছিহ বলার মতো কিছু হয়নি। বিয়ের দুমাসে প্রেগনেন্ট হয় অনেকে। ইট’স টোটালি ওকে। তুমি প্রিপায়ার্ড না সেটা অন্য কথা।”
“তাও মানুষ কি বলবে?”
“অবৈধ তো না।”
“তাও ঠিক।”
নওশাদ যত্ন সহকারে পুনমের বেণী খুলে দিলো। পুনম বলে,
“আরিফ, রুমঝুম ওরা পাগল। বিয়ে নিয়ে ছেলেখেলা করছে। এটা কি ঠিক?”
“উহু।”
“আরিফ হুটহাট রুমঝুমকে মারে, রুমঝুমও এগুলোকে নরমালভাবে দেখে। এটাও কি ঠিক?”
“না।”
“পার্টনারের গায়ে মানুষ হাত তুলে? এগুলো সেনসিটিভ ইস্যু না? রুমঝুম কি পাগল নাকি ডার্ক রোমান্স লাভার? এগুলো নরমালাইজ করে কিভাবে? এটা কি ঠিক?”
“ঠিক না। কিন্তু তুমি যে আমাকে ডিস্টার্ব করে আমার মুড স্পয়েল করে দিচ্ছো, সেটা কি ঠিক?”
পুনম চুপ করে থাকে। নওশাদ পুনমের গালে, কানের নিচে চুমু খায়। “হ্যাঁ ঠিক?”
পুনম দমে গেল। মাথা নাড়িয়ে বলে, “না।”
“সো ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। সবার কথা কালকে বলা যাবে আবার।”
পুনম মনে মনে রুমঝুমকে ভেংচি কাটে। ওর ফেনীর মধুর মতো মধু কেউ পাবে? খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি দিয়ে যদিও গাল টাল জ্বালিয়ে ফেলে, এখনও গাল, গলা জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তাও ভালো। পুনমকে যত্ন করে ভীষণ। পুনম নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। আসলেই মধু। মৌচাকের চারদিকে যেন মৌমাছি ভনভন করে, তেমন নওশাদের মাথায়ও রাগ ভনভন করে। মৌমাছি তাড়িয়ে ফেললে যেমন মিষ্টি মধু পাওয়া যায়? নওশাদের রাগ পড়ে ফেলেও ফেনীর মধুর ভণ্ডামি দেখা যায়।
চলমান….
(হ্যাপি রিডিং)

