#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২৬
#সমৃদ্ধি_রিধী
নওশাদ বুকে হাত গুঁজে ভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বের হচ্ছে কিন্তু পুনমকে দেখতে পাচ্ছে না ও। নওশাদ ঘড়ি দেখে, এক্সাম শেষ হয়েছে আরো আধাঘন্টা আগে কিন্তু পুনমের বের হওয়ার নাম গন্ধ নেই।
একটু পরই পুনম বড় বড় পা ফেলে আসে। নওশাদ পুনমের কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে বলে,
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”
“অনেক ভালো।”
“পাশ আসবে না?”
“আরেহ টপ মার্ক আসবে।”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
পুনম গদগদ হয়ে বলে, “আপনি অনেক ভালো পড়ান। সব আপনার জন্য হবে।”
নওশাদ পুনমের হাত ধরে। রাস্তা পার হয়। কিছুটা পথ অতিক্রম করে পুনম বলে,
“একটা কথা বলি?”
“বলো।”
“বাসায় যাই?”
“বাসায়ই তো যাবো।”
“না আমাদের বাসায়। অর্ককে দেখি না অনেকদিন।”
“তুমি এখন মানুষের বাসায় থাকো?”
“না তো!”
“তাহলে?”
নিজের মাথায় টোকা দিয়ে পুনম বলে, “মানে আমি আব্বুর বাসায় যাই?”
“এখন ঠিক আছে।”
“যাই?”
“যাও।”
“থাকবো।”
“থাকবে?”
কাচুমাচু করে বলে, “হুম! পরীক্ষা শেষ হলো যাই?”
“কয়দিন থাকবে?”
“তিনদিন।”
“ঠিক আছে। এখন যাবে নাকি পরে?”
“এখন চলুন। আপনিও এক কাজ করুন কালকে ওই বাসা থেকে ডিরেক্ট কলেজে চলে যাবেন।”
“না আমার থাকবো না। কাজ আছে আমার।”
“যাবেনও না?”
“তোমাকে দিতে যাবো। দিয়ে চলে আসবো। কালকে পরীক্ষা নিবো বলেছি না? প্রশ্ন প্রিন্ট করাতে হবে, ফটোকপি করতে হবে।”
পুনম ঘড়ির দিকে তাকালো। দুপুরের সময়। নিশাকে কল দিয়ে জানিয়ে দেওয়া উচিত। এক্সাম দিতে যাওয়ার আগে পুনম নওশাদের কাছে মোবাইল দিয়ে গিয়েছিল। পুনম নওশাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“আমার মোবাইলটা দিন।”
নওশাদ পকেট থেকে মোবাইল বের করে পুনমকে দিলো। পুনম সাইলেন্ট করে রেখেছিল। দেখলো ইসরাত কল করেছে। নওশাদ গতকাল ইসরাতকে আরিফের লেখা চিঠির মাঝখানের অংশটুকুর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। মাঝের অংশটুকু বলতে আরিফ কোথায় আছে আর কেনো পালিয়েছে সেই কারণের অংশটুকু।
পুনম নওশাদকে বলে, “ইসরাতকে কল করেছিল।”
“কেনো?”
“কে জানে! পরে কল ব্যাক করবো।”
“বুঝলাম ওরা আমার সাথে কথা বলছে না কিন্তু তোমার সাথে ঠিকই কথা বলছে?”
“কারণ আমি ভালো মানুষ।”
“আমার সাথে কথা না বললে উচিত তোমার সাথেও কথা না বলা। আফটার অল তুমি তো আমারই বউ।”
পুনম হাসে। নিশাকে কল করে। নওশাদ আর ও আসছে সে কথা জানিয়ে দেয়। ওরা যখন পৌঁছায় তখন প্রতীক, প্রিতম কেউ বাসায় ছিল না। প্রতীক অফিসে ছিল আর প্রিতম ওদের বইয়ের দোকানে। নিশা আর পাপিয়া মিলে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই চার, পাঁচ পদ বানিয়ে ফেললো। জ্যাম না থাকায় ওরা খুব তাড়াতাড়িই পৌঁছে গিয়েছে।
দুপুরে নওশাদ জামাই আদর খেয়ে ফুল হয়ে গিয়েছে। শার্ট খুলে পুনমের রুমের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। পুনম রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। নওশাদের পাশে শুয়ে পড়ে।
নওশাদ ঘাড় বাঁকিয়ে প্রশ্ন করে, “তোমার ভাইয়েরা কোথায়?”
“বড় ভাইয়া অফিসে আর ছোট ভাইয়া দোকানে।”
“তোমাদের কিসের দোকান?”
“বইয়ের। আমাদের অনেক বড় বইয়ের ব্যবসা। জানতেন না?”
“খেয়াল নেই।”
পুনম মুখ কুচকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বলে,
“তোমাদের অনেক বড় বইয়ের দোকান হলে তোমার বড় ভাই চাকরি করে কেনো?”
“ওই ভাইয়া, ভাবির লাভ ম্যারেজ।”
“তোমার ভাইয়া ভাবির লাভ ম্যারেজের সাথে চাকরির কি সম্পর্ক?”
“ধূর! মানে ভাবির বাবা গো ধরেছিলো বড় ভাইয়া চাকরি না করলে, সিকিউর জব না থাকা ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিবে না। তাই ভাইয়া অনেক কষ্টে ভালো চাকরি খুঁজে ভাবিকে বিয়ে করে। আর ভাইয়ার চাকরিটাও ভালো, বেতনও ভালো, ভাইয়ার মায়া জন্মে গিয়েছে তাই পরে ছাড়েওনি। ভাইয়া তো তারেক দুলাভাইয়ের সাথে জব করে।”
“সেটা জানি। এভাবেই তো আমাদের বিয়ের কথা উঠেছিল।”
“হুম।
“এখন তোমাদের ব্যবসা কে চালায়?”
“ছোট ভাইয়াই দেখে, বড় ভাইয়া মাঝে মাঝে অফিস শেষে রাতের দিকে দোকানে যায়। তবে প্রতি শুক্রবার, শনিবার দোকানে বসে।”
“ওহ।”
নওশাদ ঘড়ি দেখে। “একটু পর বেরিয়ে পড়বো।”
পুনম ঘড়ির দিকে তাকায়। সাড়ে তিনটা বাজে। নওশাদের বুকে মাথা রেখে নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। বলে,
“সন্ধ্যার দিকে যাইয়েন।”
পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “জ্যাম পড়বে।”
পুনম নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ বলে,
“অফিস টাইম শেষ না তখন? জ্যামে পড়লে খবর হয়ে যাবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
নওশাদ একটু পর উঠে যায়। পুনম বলে, “এখন চলে যাবেন?”
“হুম।”
নওশাদ ওয়াশরুমে যায়। ফিরে এসে শার্ট পড়ে। পুনম দাঁড়িয়ে থাকে। নওশাদ ঘড়ি পড়ে পুনমের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
“চলো। দরজা লাগিয়ে দাও।”
পুনম মাথা দোলায়। নওশাদ পুনমের পিছন পিছন আসে। পাপিয়া বেগম, নিশার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পুনম দরজা লাগিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখে নিশা দাঁড়িয়ে আছে। পুনম সোফার উপর থেকে অর্ককে কোলে নিয়ে বলে,
“কি?”
“খুব ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে মনে হয়?”
“হতেই পারে। আমার স্বামী, ভালোবাসা হবে না?”
নিশা মজা করে বলে, “মাখো মাখো প্রেম হয়েছে?”
পুনম তেজ দেখিয়ে বলে, “মাখো মাখো প্রেম হলেও ভুলবো না তোমরা যে আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছো।”
নিশা থতমত খায়। অর্ককে নিয়ে রুমের দিকে পা বাড়িয়ে পুনম বলে,
“মরার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। কখনোই ভুলবো না।”
নিশা ‘পাগল’ বলে বিড়বিড় করে।
_____________________
সন্ধা সাড়ে সাতটা বাজে। পুনমের মোবাইল উচ্চশব্দে বেজে উঠে। পুনম ঘুমে বিভোর ছিল। মোবাইল বেজে উঠায় ও বেশ বিরক্ত হলো চোখ খুলে দেখে অর্কও ওকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। পুনম চোখ কচলে মোবাইল নিয়ে দেখে নওশাদ কল করেছে। পুনম রিসিভ করে।
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ঘুমাচ্ছো?”
“হুম।”
“ভিডিও কল দিচ্ছি। রিসিভ করো।”
পুনম অর্কর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নওশাদ কল দেয়৷ পুনম রিসিভ করে। নওশাদ কিচেনে। ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“কি অবস্থা?”
“এইতো।”
“খুব খুশি মনে হয়?”
পুনম অর্ককে দেখায়৷ নওশাদ বলে, “এখন যে ঘুমাচ্ছো রাতে ঘুম হবে? কেতলাটাও দেখি ঘুমাচ্ছে।”
“ও জ্বালাবে পরে বাপ-মাকে। আমার কি? আমি তো মুভি দেখবো। কতদিন মুভি দেখি না।”
“এইসব করতেই তো বাপের বাড়ি গিয়েছো।”
“ঠিক তাই। আপনি কি করছেন?”
“চা বানাই।”
“ওহহ।”
পুনম অর্ককে ঠিক মতো শুইয়ে উঠে বসে। বালিশে মোবাইল সোজা করে রেখে চুল হাত দিয়ে পেঁচিয়ে খোঁপা করে। নওশাদ ভালো করে দেখে বলে,
“শাড়ি পড়েছো?”
“হুম।”
“কি উপলক্ষে?”
“ছবি তুলেছিলাম।”
“কখন?”
“বিকালে।”
“আমিও তো বিকালে বের হলাম?”
“আপনি বের হওয়ার পর পরই।”
“আমাকে ছবি দিলে না কেনো?”
পুনম মুখের সামনে মোবাইল নিয়ে বলে, “ভাবির ফোনে। আমার মোবাইলের ক্যামেরা তো ভালো না।”
“ভাবির ফোন থেকে নিয়ে আমাকে দিও।”
“আচ্ছা।”
নওশাদ চা ছাঁকে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রুমে আসে। কল কাটেনি। নওশাদ চেয়ার টেনে বসে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে সামনে পুনম নেই। ওয়াশরুমের দরজা দেখা যাচ্ছে। নওশাদ বুঝলো পুনম মোবাইল ওর পড়ার টেবিলে সোজা করে রেখে ওয়াশরুমে গিয়েছে। নওশাদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেই চায়ের কাপে চুমুক দেয়। নওশাদের যখন চা শেষ হয় তখন পুনম বের হয়। শাড়ি পাল্টে ফেলেছে। মোবাইল হাতে নিয়ে বলে,
“রাতে কি খাবেন?”
নওশাদ গাজী আজমল স্যারের বই নেয়। “দেখি। ডিম ভাজি করে খেয়ে ফেলবো।”
পুনম পুনরায় মোবাইল পড়ার টেবিলে বইয়ের সামনে সোজা করে ঠেক দিয়ে রেখে চিরুনি নিয়ে চেয়ার টেনে বসে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে,
“তো একা একা কেমন লাগছে? ব্যাচেলার জীবনের ফিল পাচ্ছেন?”
নওশাদের হাত থেমে যায়। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“না।”
পুনম মজা করে বলে, “ব্যাচেলার জীবনের ফিল পাচ্ছেন না?”
“আম্মা মারা যাওয়ার পর যেমন খালি বাসায় একাকিত্ব লাগতো, তেমন লাগছে। কোনো ব্যাচেলার ফিল টিল পাচ্ছি না। এইসব ব্যাচেলার ফিল বড়লোক, সুখী মানুষদের। আমি সুখী মানুষ না।”
পুনমের হাত থেমে যায়। নওশাদ বলে, “তোমাকে থাকতে হবে না তিনদিন। কালকেই চলে আসো।”
পুনম স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বলে,
“যদি মনে করো তোমার বাপের বাড়ি থাকার অধিকার কেড়ে নিচ্ছি তাহলে নিচ্ছি। আমার এখন একা থাকতে ভালো লাগে না। জীবনে অনেক থেকেছি একা।”
পুনম হাত চালায়। চুলের একপাশ আঁচড়ে বলে,
“আপনার বন্ধু-বান্ধব নেই?”
নওশাদ হাসে। “তোমার মনে হয় যে ছেলে পুরাতন জামাকাপড় পড়তো, হোটেলে কাজ করতো তার সাথে কেউ স্বেচ্ছায় বন্ধুত্ব করে?”
পুনম ছোট করে শ্বাস ফেলে। নওশাদ বইয়ের পাতা উল্টে বলে,
“রেজাল্ট ভালো ছিল আমার। নোটের জন্য, পড়া বোঝার জন্য দু-চারজন কথা বলতো। এটাই।”
“রিমির হাসবেন্ড ফারহান?”
“আমি কলেজ লাইফের কথা বলছিলাম। ফারহান নিঃসন্দেহে ভালো। আমার জীবনে হাতে গোনা সেরা কয়েকজনের মধ্যে ও একজন। কিন্তু এখন এমন এক দেশে গিয়েছে ওদের রাত তো আমার সকাল। কথা বলার সুযোগ পাইনা।”
“সকাল, রাতের বিষয় না। বিষয়টা হলো রিমির সাথে ওর আক্দ হওয়ার পর থেকে আপনি দূরত্ব মেইনটেইন করেন। মামা শ্বশুরের ভাব দেখান।”
“দুমাসে আমাকে ভালোই চিনে গিয়েছো। গুড।”
“এমন কেনো আপনি? খাপছাড়া, আলগা আলগা ভাব কেনো?”
“আমি জাস্ট নিজের লাইফ নিয়েই ভাবি এখন। আর কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই না। তাই আমাকে এমন মনে হয়।”
“এটা কি ভালো?”
“আমার কথা কে ভাবে যে আমি সবার কথা ভাববো?”
“আমি ভাবি না?”
“তো আমিও তো আর তোমার সাথে খাপছাড়া আচরণ করি না।”
“যাই হোক কি করছেন?”
“প্রশ্ন বানাই।”
“আবার কাকে বাঁশ দিবেন?”
“সেকেন্ড ইয়ারকে।”
“আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত দান করুক।”
“আমিন।”
পুনম গালে হাত দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। পুনম বলে, “মিস করছেন আমাকে?”
“না।”
“কেনো?”
“সামনেই তো আছো। সরাসরি না হোক, আছো তো!”
“টাচ তো করতে পারছেন না।”
“টাচ করা থেকে ফিল করা বেশি ইম্পর্টেন্ট নয় কি?”
পুনম গালে হাত দিয়েই বলে, “একটা কথা বলি?”
“কখন থেকে তো কথাই বলছো আবার পারমিশন নিচ্ছো কেনো?”
পুনম কপাল কুচকে বলে, “বেশি বাড়াবাড়ি।”
“আচ্ছা বলো।”
“আমরা বেশি তাড়াতাড়ি ক্লোজ হয়ে গিয়েছি না?”
নওশাদ চোখ তুলে তাকায়। “মানে?”
“আমাদের আগে থেকে পরিচয় ছিল না, আপনি আমার ছবি দেখলেও আমি কবুল বলার পর আপানকে দেখেছিলাম। একদম অপরিচিত ছিলাম আমরা। একটু বেশি তাড়াতাড়ি আমাদের মিল হয়ে গিয়েছে না?”
“এমনি হয়।”
“কোথায়? মানুষের ফ্রি হতে তো তিন থেকে চার মাস এমনকি ছয় মাসও লেগে যায়।”
“নাটক সিনেমার কথা বলছো?”
“হুম হুম।”
“বিয়ের পর দুটো বিপরীত লিঙ্গের মানুষ, দুটো বিপরীত গোছের মানুষ একসাথে, একই ছাদের নিচে, একই বদ্ধ ঘরে থাকবে আর আর্কষণবোধ করেবে না? এটা তো আর সিনেমা না যে কাট বললো আর অনুভূতি শেষ হয়ে গেল।”
“লজ্জা, সংকোচের বিষয়টা বলছি।”
“ঢং করো না গাধা। ষাট দিন তোমার কাছে কম লাগে? আরো আমরা একত্রিশ দিনের মাস পেয়েছি। সো বাষট্টি দিন। মোটেই কম না।”
“তাও!”
“আমাদের কোনো অতীতও ছিল না যে মানিয়ে নিতে প্রবলেম হবে।”
“তাও!”
“নাটক কম করো গাধা। আমি এগিয়ে না আসলে তুমি জীবনেও সহজ হয়ে পারতে না।”
“মোটেই না।”
“কি মোটেই না?”
“আমি প্রথম আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। নাহলে আপনি আপনার জেদ নিয়েই থাকতেন।”
নওশাদ ভ্রু কুচকে কেমন করে যেন তাকায়। পুনম লজ্জা পায়। ভিডিও অফ করে ফেলে। নওশাদ বলে,
“ভিডিও অফ করেছো কেনো?”
পুনম উত্তর দিলো না। নওশাদ বলে, “ভিডিও অন করো গাধা।”
“এভাবেই কথা বলুন।”
“ভিডিও অন করতে বললাম না?”
পুনম ভিডিও অন করে। নওশাদ মাথা দুলিয়ে হাসে। পুনম বলে,
“হাসছেন কেনো?”
“হাসতে মানা?”
“এত কঠিন কঠিন কথা যে বলেন, আপনি তো মোটেই কঠিন না।”
নওশাদ উত্তর দিলো না। অর্ক ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। পুনম কলে থেকেই মোবাইল নিয়ে বিছানায় যায়। মোবাইল একপাশে রেখে অর্ককে জড়িয়ে ধরে। অর্কর চুল ঠিকঠাক করে দিয়ে বলে,
“ঘুম হলো আব্বা?”
অর্ক কিছু বলে না। পুনম অর্কর দিকে মোবাইল তাক করে বলে,
“দেখো তো আব্বা চিনতে পারো কিনা?”
অর্ক স্ক্রিনে নওশাদের দিকে তাকায়। পরপরই মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। পুনমের বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকে। নওশাদ অর্ককে ডাক দেয়। অর্ক আবারও নওশাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। নওশাদ বলে,
“ওর বোধহয় আমাকে ভালো লাগে নাই।”
“কথা সত্য। আপনার জন্য ওর পুপ্পি আর ওর কাছে থাকে না। ওর পুপ্পিকে আপনি কেড়ে নিয়েছেন।”
নওশাদ হাসে। “ও কার চেহারা পেয়েছে? তোমাদের সাথে মিল নেই।”
“ওর মামার মতো চেহারা ওর।”
নওশাদ ছোট করে ‘ওওহ’ বলে। পুনমের মনে পড়তেই পুনম বলে,
“আপনাকে একটা কথা বলবো পরে। একটু মনে করিয়ে দিয়েন তো।”
“কার ব্যাপারে?”
“জেরিন।”
“কি হয়েছে?”
“সরাসরি বলবো।”
“আচ্ছা।”
“আমি এখন অর্ককে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলাম।”
“যাও, তবে ঝগড়া করো না মা, ভাবির সাথে।”
“দেখা যাক।”
“রাতে কল দিবো।”
“আল্লাহ হাফেজ।”
“আল্লাহ হাফেজ।
পুনম কল কেটে ড্রয়িংরুমে চলে গেল। নওশাদ একঘন্টা পর আবারও কল করে। রাতে খাওয়ার সময় আবারও কল করে। প্রতীক, প্রিতম সামনে থাকায় পুনম বারবার কেটে দিচ্ছিলো। আর পুনম যতক্ষণ পর্যন্ত রিসিভ করে না, নওশাদ কল করেই গিয়েছে। পুনম ভাইদের সামনে ভীষণ লজ্জায় পড়ে। প্রতীক, প্রিতম উঠে যাওয়ার পর নিশা আচ্ছা মতো পুনমকে লজ্জায় ফেলেছে। পুনম চোটপাট করলেও লাভ হয়নি। পুনমের তখন নওশাদের উপর রাগ লাগছিলো! ভাবটা এমন যেন বউ ছাড়া থাকতে পারে না, আজব!
পুনম রেগে রুমে এসে বলে, “আমার সাথে কথা না বললে এখন আপনাকে শয়তানে কুড়কুড়ায়?”
নওশাদের সহজ সরল স্বীকারোক্তি। “জ্বি।”
পুনম কেনো জানি লজ্জা পেলো। লজ্জা পেয়ে নওশাদকে ‘পরে ফ্রি হয়ে কল দিবো’ বলে কল কেটে দিলো।
___________________
রাত বারোটা বাজে। খাওয়ার সময় পুনমকে ওভাবে লজ্জায় ফেলায় পুনম রীতিমতো রাগে ফুঁসছে। নিশা কি বাজেভাবে মজা নিলো! ভাবতে ভাবতেই পুনমের হঠাৎ নওশাদের সাথে শয়তানি করতে ইচ্ছে হলো। ও মোবাইল নিয়ে মেসেঞ্জারে ঢোকে। নওশাদের আইডির পাশে সবুজ বাতি জ্বলজ্বল করছে। পুনম বেশ ভদ্রভাবেই সবটা শুরু করলো,
“ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
সাথে সাথেই সিন হলো। ফিরতি উত্তরও তাড়াতাড়িই আসে,
“না। এলার্ম সেট করছিলাম। ঘুমিয়ে পড়বো এখন।”
“একটা ঘটনা ঘটেছে। অনেক সিরিয়াস।”
“কি?”
“একটু আগে একটা মুভি দেখেছি। মুভি না অনেক….”
আর কিছু লিখলো না। নওশাদ মেসেজ পাঠিয়েছে।
“মুভিটা অনেক?”
“মুভিটা অনেক লজ্জা, লজ্জা মুভি।”
“নাম কি?”
“আপনাকে বলা যাবে না।”
“বলা না গেলে চুপচাপ ঘুমাও।”
পুনম মুখ কুচকে ফেলে। “আপনাকে আমি মেসেজ দিলাম কেনো?”
“তুমি একটা অনেক লজ্জা, লজ্জা মুভি দেখেছো সেটা বলতে মেসেজ দিয়েছো।”
পুনম দাঁত কিড়মিড় করে লিখে, “না সেইজন্য দেইনি।”
“তো?”
“মুভির ছেলেটা অনেএএএএক রোমান্টিক। এত রোমান্টিক আমি আপনাকে বোঝাতে পারবো না। আপনি তো পুরো বাংলা নিরামিষ।”
“তারপর?”
“নায়কটা এত্তো কড়া! নায়কের বডি এত্তো কড়াআআ!” সাথে একটা উল্টাপাল্টা ইমোজিও পাঠালো।
“তারপর বলো আমি তোমার কোন গালে কড়া করে একটা দিবো রাত বিরাতে এইসব ফাজলামো করার জন্য?”
“দেখেছেন! দেখেছেন! আপনি কতটা আনরোমান্টিক? আমি মেয়ে হয়েও আপনাকে কত রোমান্টিক কথা বলছি আর আপনি কেমন খ্যাকখ্যাক করছেন?”
“তো মহাশয়া অদ্বিতীয়া মাহনূর আমার ঠিক কি করা উচিত?”
“আপনাকে রোমান্টিক করার মতো কিছু ছবি আছে আমার কাছে।”
“এই গাধা তুমি কি উল্টাপাল্টা কিছু দেখো? উল্টাপাল্টা কোনো সাইটে ঢুকেছো?”
“আরেহ ধূর! আপনাকে দেই ছবি গুলো?”
“কি ছবি?”
পুনম বিকালে শাড়ি পড়ে কিছু ছবি তুলেছিল। সবগুলো ছবিই নওশাদকে পাঠালো। লিখলো,
“নিজের সুন্দর সুন্দর ছবি থাকতে আপনাকে উল্টাপাল্টা ছবি পাঠাবো কেনো? শুধু আমাকে দেখলেই আপনার হবে না?”
“হবে। শুধু তোমাকে দেখলেই আমার হবে।”
“দুটো রোমান্টিক কথাও তো বলতে পারেন নাকি?”
“রোমান্টিক অর এক্সট্রা রোমান্টিক?”
পুনম সিন করে ফেলে রাখলো। রিপ্লাই দিলো না। নওশাদ ফের লিখলো, “তোমার এইসব ছবি দেখে আমার কোন মুভির নায়ক হতে ইচ্ছে করছে জানো?”
“কোন মুভির?”
নওশাদ এমন একটা মুভির নাম বললো পুনমের মুখ সাথে সাথে কুচকে গেল।
“ছিহ আপনি কি বাজে!”
“বাজের কি হয়েছে? তোমার কথা মতো রোমান্টিক হওয়ার ট্রাই করছি।”
“আপনি কিভাবে পারলেন একটা মেয়েকে এই বিশ্রি মুভির নাম বলতে? আপনার লজ্জা লাগলো না?”
“প্রথমত মেয়েটা বউ। আর লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি।”
“ছিহ ছিহ আপনি কি খারাপ! আপনি সুন্দর সুন্দর মুভির নাম জানেন না কিন্তু আলতু ফালতু এইসব মুভির নাম জানেন?”
“যেহেতু বউ প্রায়ই বলে আমার ছুঁকছুঁক স্বভাব সেহেতু ছুঁকছুঁক স্বভাবেরই পরিচয় দিলাম।”
“ছিহ ছিহ। আমি সবসময় সুন্দর, ভালো মুভি দেখি। আপনি আসলেই বাজে।”
“সবসময় সুন্দর মুভি দেখলে তুমি এই মুভির ঘটনা জানলে কি করে?”
“আপনি একটা বাজে লোক।”
“আই নো।”
“ধূরর সব বাদ। মুভি টুভি সব বাদ। শাড়িটা পড়ে আমাকে কেমন লাগছে?”
নওশাদ আরেকটা মুভির নাম উল্লেখ করে বলে, “এই মুভির নায়কের মতো হতে ইচ্ছে করছে।”
আগের চাইতেও জঘন্য মুভির নাম বলেছে। পুনম মেসেজটা দেখেই সাথে সাথে অফলাইনে চলে গিয়েছে। পরপরই নওশাদ পুনমের নাম্বারে মেসেজ দিলো,
“মেসেঞ্জারে এসো। অফলাইনে গিয়েছো কেনো? জলদি এসো।”
পুনম নেট অন করে মেসেঞ্জারে গেলো। নওশাদ ওকে লিখেছে,
“আমার স্টকে আরো লজ্জা লজ্জা মুভি আছে। নাম শুনবে?”
পুনম শ্বাস আটকে লিখে, “না।”
“কেনো? শুনো?”
“শাড়ি পড়ে কেমন লাগছে সেটা বলুন?”
“ভদ্র ভাষায় বলবো নাকি অভদ্র ভাষায়?”
“ডেফিনিটলি ভদ্র ভাষায়।”
“বলবো?”
“হুম বলুন কেমন লাগছে?”
নওশাদ সিন করলো তবে কোনো প্রকার রিপ্লাই দিলো না। পুনম অধৈর্য হয়ে লিখে,
“বললেন না তো কেমন লাগছে?”
“জড়িয়ে ধরে ঠেসে চুমু খাওয়ার মতো সুন্দর লাগছে। গাল, গলা জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো সুন্দর লাগছে। আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে এডমায়ার করার মতো সুন্দর লাগছে। লজ্জায় ফেলে একদম লাল টমেটো বানিয়ে ফেলার মতো সুন্দর লাগছে।”
মেসেজ পড়েই পুনম সাথে সাথে অফলাইনে চলে গেল। মিনিটের মাঝেই পুনমের নাম্বারে ফের মেসেজ আসে,
“এখন লজ্জা পাচ্ছো যে বড়? খুঁচিয়েছো কেনো? আমাকে এখনও চিনে উঠো নাই গাধা? কালকে আসি আমি। ওয়েট।”
পুনম ব্লক মেরে দিলো। নওশাদও হাসতে হাসতে যেই ওয়াইফাই অফ করতে যাবে তখনই একটা আননোন নাম্বার থেকে নওশাদের মোবাইলে মেসেজ আসে,
“কেমন আছেন আমার একমাত্র বউয়ের একমাত্র মামা শ্বশুর? দিনকাল কেমন আমার একমাত্র বউয়ের নানা শ্বশুরবাড়ির একমাত্র জোনাকি বাতির? আপনার মহা মূল্যবান প্যাচ লাগানো কর্মসূচী কেমন চলছে? আপনি আমাকে দেখতে না পেলেও আমি আপনার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে মেসেজ দিলাম। কেননা আমি প্রতিদান কবিতা পড়েছি। এবং মনে প্রাণে প্রতিদান কবিতা ধারণ করে চলি।
‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর’ তারপর ‘যে মোরে দিয়েছে বিষে-ভরা বাণ,
আমি দেই তারে বুকভরা গান, কাঁটা পেয়ে তারে ফুল করি দান সারাটি জনম-ভর’
ইতি,
আপনার অনেক পছন্দের কাল্পনিক সাবজেক্ট ‘পরিবার পরিকল্পনা প্যাচ লাগানো বিষয়াবলি– কে হয়েছে কার মতো?’ তে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে বাস্তবে এক্সপেরিমেন্ট করা প্রথমজন।”
নওশাদ রেগে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে,
“বজ্জাতির একটা লিমিটেশন থাকা উচিত। সব ছাড়িয়ে ফেলেছে বেয়াদবটা। সামনে পেলাম কান বরাবর দিতাম দুটো চড়।”
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং)

