#আমার_বোবাফুল(৩৪)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
শরীর জুড়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেলো যেন।থরথর কেঁপে উঠে আমিন সরদার। অত্যাধিক ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রয় বোবাচোখে।একটু আগে কন্ঠ ফেড়ে যেই চিৎকার ভেসে উঠেছিল এখন তা পুরোপুরিই গায়েব।অনড় শরীরে থম মেরে দম আটকে চোখ কিঞ্চিৎ গলার দিকে নামালো সে।একটা ধারালো চাকু গলার ডান দিকে এসে ঠেকেছে। চেঁচিয়ে উঠার অপরাধে খানিক বিঁধে গেছে সেথায়।ফলে র/ক্ত বেরিয়ে গড়িয়ে শার্টের কলারের সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে।
আমিন ঢোক গিলে চোখ তুলে শঙ্কিত দৃষ্টিতে। লোকটার চেহারা রুমালে ঢাকা।চোখ দু’টোই শুধু দৃশ্যমান।সেই চোখের শান্ত অথচ দৃঢ় চাহনি কেমন যেন ভয়ঙ্কর ঠেকলো।এ যেনো ঝড় আসার পূর্বাভাস।ভীত গলায় আমিন বললো,
“ ক্_কে তুমি?”
বাক্যটা শব্দ হয়ে ঝরার পরপরই সম্মুখে বসে থাকা পুরুষালী দানবীয় হাতের থাবা এসে গালের একপাশে লাগলো খুবই নিষ্ঠুর ভাবে। ঠাস..মতোন শব্দ হয়।কানের ভেতর ভং ভং করে উঠে লাগাতার,আমিন হাতে গাল ছোঁয়ার সাহস করে না। অজ্ঞাত ব্যক্তি দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
“ গিভ রেসপেক্ট →টেইক রেসপেক্ট!”
চাচার বয়সী মানুষের গালে তীব্র আঘাত হেনে ‘টেইক রেসপেক্ট’ কথা খানা বড্ড বেমানান শুনালো। ড্রাইভিং সিটে বসে স্ট্রেয়ারিং-য়ে হাত চেপে রাখা মুখোশধারী লোকটা চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা আয়নায় স্বচক্ষে অবলোকন করে মুখ কুঁচকায়। ছলনাময়ী বস তার। পরপরই মনে পড়ে ‘ছলনাময়ী’ একটি স্ত্রী বাচক শব্দ!
“ আপনি ক্ _কে বাবা?”
“ ভেবে নে তোর যমদূত!”
কন্ঠ রোধ হয়ে আসে,আড়চোখে জানালার বাহিরে দৃষ্টিপাত করার চেষ্টা করে আমিন। ভেতরে হাজার চিৎকার করলেও বাইরে আওয়াজ ভেসে যাবে না। উপরন্তু গাড়ি ছুটে চলছে নির্জন রাস্তা ধরে।জানের মায়া জেঁকে বসে মনে। আমিন বলে উঠে,
“ জেনে, না জেনে আ্_আমি আপনার কোন ক্ষতি করিনি কখনো।দয়া করে আমায় ছেড়ে দিন”
অজ্ঞাত ব্যক্তি সামনের সিটের মাথায় উঠে তার দিকে মুখ করে বসেছে।হাতের চাকু এখনো তার গলায় ঠেকিয়ে রাখা।সেটা গলার এপাশ থেকে ওপাশ স্লাইড করার ফাঁকে ছোট ছোট দৃষ্টি ফেলে যেনো ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো ,
“ জেনে, না জেনে কোন ক্ষতি করিসনি কখনো?এতো প্রবল কনফিডেন্স?”
কথা শেষেই চাকুর আগা’য় চোয়াল ঠেলে উপরে তুললো মধ্যবয়সী লোকটার শ্যামবর্ণ মুখখানা।যেটায় এখনো ভীতির ছাপ লেগে আছে। আমিন মিনমিন কন্ঠে বলে,
“ সত্যি বলছি বিশ্বাস…
“ এই মুখে ফুলকে টোকা দেওয়ার কথা বলেছিলি?এই কানেই পা-চাটা বা/স্টার্ড গুলোর ‘ইয়েস বস’ শুনে তৃপ্ত হয়েছিলি? কেমন হয় যদি এই মুখ, এই কানই না থাকে?”
নিস্তব্ধ পরিবেশে ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলো অদ্ভুত ভয়ানক শুনায়। অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল তখন।থরথর কেঁপে উঠে আমিন সরদার।কথা জড়িয়ে যায়,
“ ফ্_ফুল কে?”
“ ডটার অব তামিজ শিকদার!মনে পড়ে?”
হতভম্বে মুখে একবার ডানে বাঁয়ে তো একবার উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে গড়গড় করে বললো আমিন,
“ ওকে আমি কিছু করিনি! বিশ্বাস করুন।আমি সেদিন দূর থেকে লোকদের ছবি তুলতে বলেছিলাম যাতে মিস্টার শিকদারকে ভয় দেখাতে পারি। এরচেয়ে বেশি কিছু করিনি।আমায় বিশ্বাস করুন স্যার।ওর কাছাকাছিও কেউ ঘেঁষেনি!”
বর্ণ’ কপাল মুখ গাঢ় রকমের কুঁচকে আমিন সরদারের মুখের উপর ঝুঁকে গেলো আচমকা। দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে বলে,
“ সারাজীবন মিথ্যে বলে হায়াত পার করে দেয়া মানুষও মৃত্যুর আগ মূহুর্তে সত্যি স্বীকার করে নেয়।আর তুই শালা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় মুখে মিথ্যে বলে যাচ্ছিস? প্রাণের মায়া নেই?”
“ আমি সত্যিই বলছি। সেদিন আমার দুটো লোক ওই মেয়ের…
ঠাস করে দ্বিতীয় দফায় চড় পড়ল গালে।বর্ণ বললো নির্বিকারে,
“ সুখ ওর নাম!”
আমিন মেনে নেয়।
“ সুখ.. সুখ মায়ের পিছু নিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু কিছুপথ গিয়ে দূর থেকে তারা দেখতে পেলো একটা গাড়ি থেকে তিনটি ছেলেপুলে নেমে ওকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে!”
বর্ণ চোখ তুললো ফট করে,
“ তারপর?”
“ সুখ মাকে নিয়ে গাড়িটি চলে যেতেই আমার লোক ফিরে আসে!”
অল্পক্ষণ চুপ করে রয় বর্ণ। আমিন সরদারের কানের গোড়ায়,গলায় থুতনিতে চাকু দিয়ে আলতো চাপে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো,
“ সেদিন ওই তিন **রের সাথে সুখের হাতাহাতি ধস্তাধস্তি হয়েছিল?”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ!”
“ সাহায্যের জন্য সুখ আশেপাশের তাকিয়েছিল?”
“ ছিল!”
“ কেউ এগিয়ে গিয়েছে?”
“ আশেপাশে হাতে গুনা দুয়েক জন মানুষ ছিল।কেউ যায়নি!”
“ তুই বা তোরা পুরো দৃশ্য নিজ চোখে দেখেছিলি!”
“ আমি নয় আমার লোকেরা!”
“ ওরা প্রতি মূহুর্তের আপডেট দিয়েছিল নিশ্চয়ই?”
“ জ্বী…
“ তোর মেয়ের বয়সী একটি মেয়েকে তিনটি জ/ন্তু জোরজবরদস্তি করছে।সে সাহায্য চেয়ে কোন আওয়াজ বের করতে পারছে না মুখ দিয়ে। কিন্তু কাতর চোখে আশেপাশে তাকাচ্ছে হয়তো কেউ এগিয়ে এসে তাকে প্রোটেক্ট করবে!তোর কী একবারও মনে হয়নি ওই হায়নাদের নাগাল থেকে মেয়েটাকে উদ্ধার করি?”
ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইলো আমিন।মুখে জবাব নেই।সেতো খুশিই হয়েছিল –তার কাজটা অন্যকেউ করে দিচ্ছিলো দেখে।এবার শিকদার ব্যাটা বুঝবে মজা।
“ হ্যাল্পলেস মেয়েটা নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে একটু সহানুভূতি একটু সাহায্যের আশায় আশেপাশে তাকিয়ে যখন দেখলো কেউ এগিয়ে আসবে না। তখন পৃথিবীর মানুষের উপর কতোটা অনিহা,অভিমান জমেছিলো ফুলের। অনুমান করতে পারিস?
বর্ণ’র কথাবার্তা গুলো ফিসফিস আওয়াজে অথচ অঙ্গি ভঙ্গি অপ্রকৃতস্থ’র মতো দেখাচ্ছিল।
ঝুলে পড়ার মতো আমিনের পাশে ধপ করে বসে কেমন কেমন যেনো করছিলো।মাহির দ্রুত পিছু ফিরে।আমিন কিছু বলতে নেওয়ার আগেই কালো কাপড় পেঁচানো হাতে সর্বস্ব দিয়ে ঘুষি বসাল মুখ বরাবর।গলগলিয়ে র-ক্ত ছুটে আসে মুখ বেয়ে। দু’টো দাঁত গোড়া থেকে উঠে মুখের অভ্যন্তরে, কিছু দাঁত নড়বড়ে হয়ে যায়।
_
জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে মাহির আয়নায় বর্ণর মুখশ্রী দেখার চেষ্টা করে। পেছনের সিটে আছেন মহাশয়।মুখের রুমাল খুলে এক হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে অপর হাতে সিগারেট ফুঁকছে। ধোঁয়া গুলো কিছু খোলা জানালা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, কিছু গাড়ির ভেতরে মিলেমিশে একাকার।গড়িতে বর্তমানে তারা দুজন ব্যতীত অন্য কেউ নেই।
“ শোন তো?”
মাহির চট করে তাকালো।বর্ণ কিছু বলতে চাইছে কিন্তু নজর বাঁচিয়ে এদিক ওদিক দেখছে। সন্দেহ ডানা বাঁধে মাহিরের চোখে।বস কী ইতস্তত করছে কোন বিষয়ে।বাপরে.. এতো তবে ভূতের মুখে রাম নাম!
“ কিছু বলতে চান ভাই?”
এই একটা অভ্যাস তার। সময়সাপেক্ষে সম্বোধন পাল্টায়।কখনো বস,কখনো স্যার, কখনো বা ভাই। কাঁধ দুলিয়ে বর্ণ মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত বিচিয়ে বলে,
“ হ্_হ্যাঁ!”
জীবনের এই প্রথম কোন কথা বলতে বর্ণকে ইতস্তত করতে দেখছে।আর সেটা শুনতে মাহির উদগ্রীব হবে না –এমন হয় নাকি আবার? উৎসুক দৃষ্টি মেলে বললো প্রচ্ছল স্বরে,
“ বলুন ভাই!”
বর্ণ আধ খাওয়া সিগারেট বাইরে ছুঁড়ে ফেলে গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যত্র নজর রেখে বললো হঠাৎ,
“ তুই শিওর আমি ফুলের প্রেমে পড়েছি?”
জোরে সুরে ব্রেক কষে গাড়ি।বলতে ভুলে গেলো মাহির। কেবল বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ চোখে চেয়ে রয় পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে।সেকী সত্যিই শুনলো?
“ মুখ অফ কর ইয়ার।মশা মাছি নিজেদের বাপ দাদার সম্পত্তি মনে করে স্যাল্টার নেবে।”
বাধ্যের মতো হুট করে মুখ বন্ধ করলো সে। ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে। প্রফুল্লে চোখের দৃষ্টি দ্যুতি ছড়ায়। বর্ণ’র কমবেশি রূপ অল্পবিস্তর দেখা হয়েছে ইতোপূর্বে। এবার প্রেমিক রূপ দেখার পালা এলো বলে। এখন তো ছুঁতো একটা পেয়েই গেছে।বস যদি প্রেমে নাই বা পড়ে,সেতো উস্কে দেওয়ার জন্য আছেই।
“ ফুল..
মাহির থেমে যায় পরপর।এই নামে বর্ণ ব্যাতীত দ্বিতীয় কারো তার সামনে ডাকা বারণ। অভ্র’র মুখে একবার শুনেছিল,কথার কথায় তাকেও নাকি বিষয়টি অবগত করেছে তুহফা। অনেক বছর আগে সমবয়সী খালাতো ভাই বর্ণ’র দেখাদেখি সুখকে “ফুল” বলে সম্বোধন করায় এক ঘুষিতে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল।আর বলেছিল,
“ ও শুধু আমার ফুল। অন্যকেউ এই নামে ডাকলে তার শাস্তি এমনই হবে!”
সেসব অনেক আগের কথা।বর্ণ তখন নয়/দশ বছরের হবে হয়তো।ওই বয়সের অনেকেই খানিকটা হিংসুটে ধাঁচের হয়।যা তারা নিজের ভাবে,তার ভাগ সহজে অন্য কাউকে দিতে চায়না। উপরন্তু,ফুল নামটা বর্ণ’র দেওয়া।তাহলে অন্যকেউ কেনো ডাকবে?তুহফার মুখে শুনে ঘটনার স্মৃতি চারণ করতে বর্ণ’কে হেসে হেসে সেবার খুঁচাতে গিয়েছিল অভ্র।অথচ কথা সম্পূর্ণ করতে পারেনি ছেলেটা। ভাইয়ার চোখ রাঙানি সমেত ধাওয়া খেয়ে পিঠ বাঁচিয়ে সুড়সুড় করে পালিয়ে আসে।আসল মালিককে খুঁচাতে না পেরে পেট গুড়গুড় করছিল অভ্র’র, অতঃপর কথা খানা মাহিরকে বলে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে।
↓
মাহির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শুধরে সহাস্যে বললো,
“ প্রেমে পড়েছেন এতে কোন ডাউট নেই!সুখের জন্য আপনার কেমন ফিলিংস হয় ভাই?না মানে…
“ এক্সপ্লেইন করতে পারছি না। শুধু এইটুকু জেনে রাখ –ওকে না জ্বালাতে পারলে লাইফটা ঠু মাচ বোরিং লাগে।আগে এমন ফিল হয়নি বাট যেদিন থেকে সে ইগনোর করছে…
আনমনে বলতে গিয়ে সম্বিত ফিরতেই বর্ণ চুপে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মাহির চোখ পাকিয়ে তাকায়।“ওকে না জ্বালাতে পারলে লাইফটা ঠু মাচ বোরিং লাগে” –প্রেম ভালোবাসার সংজ্ঞা এমন হয়?স্তম্ভিত গলায় জানতে চাইলো ফট করে,
“ সুখ আপনাকে ইগনোর করে!আপনাকে? কিন্তু কেনো?”
“ তোকে বলবো কেনো?যা শুনেছিস ওভার হয়েছে ভেবে শুকরিয়া আদায় কর!”
.
রাতে একবার তামিজ শিকদারকে কল করে ওদিকের খবর জেনে নিলো বর্ণ।সুখের অবস্থার উন্নতি হয়নি।আজো শান্তির ঘুমে তলিয়ে আছে মেয়েটা।আম্মুর মমতা মাখা ডাক,আব্বুর স্নেহ সব অগ্রাহ্য করে চোখ বুজে আছে নির্বিকারে।
তুহফা এবং অভ্র কাল ফিরে আসবে আযাদ শিকদারের সাথে।আইজা যাবে তারপর।হানিফা বেগমও দেখতে চান সুখকে। বৃদ্ধার হঠাৎ পরিবর্তনে সকলে চোখ ফেটে তাকালেও,মুখে কেউ কিছু বলেনি।
একদিন পরের কথা।বর্ণ সারাদিন বাহিরে ছিল, ফিরেছে খুব রাতে।রামসা দরজা খুলে দেয়।বাড়িতে আইজা নেই।আজই আযাদ শিকদার অভ্র,তুহফাকে পৌঁছে দিয়ে উনাকে সঙ্গে করে পুণরায় ঢাকা মুখী হয়েছেন।নূরাকে রেখে যাওয়ার কথা থাকলেও তাকে মানানো গেলো না। ফ্লোরে গড়াগড়ি কেঁদে দেওয়ার অবস্থা হয়েছিল তার। অগত্যা তাকেও সঙ্গে নিতে হলো।
ড্রয়িং রুম ভিড়িয়ে লিফটের অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার মাঝ পথে থেমে গেলো বর্ণ। সোফায় হানিফা বেগম।বসা অবস্থায় ঝিমিয়ে ঝুঁকে পড়তে চাইছে ক্ষণে ক্ষণে।বর্ণ ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে থাকা রামসার দিকে তাকিয়ে পিছু হটে দাদুর কাছাকাছি এসে থামে,
“ ঘুমাওনি এখনো?”
বৃদ্ধা ঘুম ভাব আড়াল করে গলার স্বর যথাসাধ্য গম্ভীর রাশভারী করেন,
“ বৌমাদের অবর্তমানে বাড়ি দেখে রাখার দায়িত্ব আমার। এখন যদি বাড়ির ছেলে রাত বিরেতে ফিরে তখন না ঘুমাইয়া এভাবেই বসে থাকতে হবে!”
রুমে এসে বর্ণ গায়ের শার্ট খুলে ছুঁড়ে মারে ফ্লোরে। বাথরুমে ঢুকে এই গভীর রাতে আধঘন্টা যাবৎ ঝর্নার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে।চুল ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, নিজস্ব ধারায় বয়ে যায় নামহীন গন্তব্যে।পানির দাপটে হার মেনে মাথার চুলগুলো নিস্তেজ শুয়ে থাকে।চোখ পর্যন্ত ঢেকে যায় তাতে।
শক্তপোক্ত পেটানো শরীরের নিম্নাংশে ট্রাউজার।আর উপরিভাগ উদম। শুভ্র তাওয়াল গলায় ঝুলিয়ে একপ্রান্তে গাল মুছে মাহিরের নম্বরে ডায়াল করে।
আজ বাড়ি গিয়েছে মাহির,গত কাল বর্ণ’র সঙ্গ দিতে চোখের পলকে রাত গভীর থেকে গভীর হয়ে যাওয়ায় নিজ গৃহে ফেরা সম্ভব হয়নি আর। শিকদার নিবাসে এসে উঠেছিল ভদ্রলোকের সাথে।
আরামের ঘুমের ইজ্জত লুটতে ফোনের সাইরেন বেজে উঠল সশব্দে।মাহির ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে পুণরায় ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে।ফের বেজে উঠলো ফোন খানা।এবারে ঘুমের ঘোরে রিসিভ জড়ানো গলায় বলে,
“ কে বে?”
বর্ণ দাঁতে দাঁত খিচলো,
“ তোর শশুর বাবা বে!জামাই আদর করবো তোকে!ঘুম ছেড়ে উঠ!”
চোখ বুজে ঘুমের মাঝে শুষ্ক ঠোঁটে হাসলো মাহির,
“ শশুর বাবা?তার মানে আপনি জানেন আমার বউ কোথায়!” অভিযোগের ঝুলি খুলতে চাইলো সে,
“কতো নিষ্ঠুর আপনি…”
“ মাহির কী বাচ্চে.. লাত্থি খাস না বহুদিন!আজ শখ জেগেছে?”
ধমক মিশ্রিত হুঙ্কারে টেনেটুনে চোখ খুলে স্ক্রিনে বুলিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে উঠে বসে মাহির,
“বস আপনি!”
“ সিসিটিভির যে ছবিটা কালেক্ট করতে বলেছিলাম।করেছিস?”
“ জ্বী বস!”
“ আমায় পাঠাসনি কেনো?”
পুণরায় গর্জে উঠলো বর্ণ।মুখ কুঁচকে কান থেকে ফোন দূরে সরিয়ে আবার কানে ধরে মাহির মৃদুগলায় বলে,
“ মনে ছিল না বস!”
.
কক্ষ তখন আঁধারকে আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গনে লিপ্ত।বর্ণ প্রবেশ করে প্রথমে আলো জ্বালিয়ে দেয়।এটা সুখের রুম। এখানে শেষবার কখন পদচ্ছাপ পড়েছিল ইয়াত্তা নেই; কোন এক অচেনা টান যেনো এই অব্দি খিচে এনেছে তাকে। বর্ণ’র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’রা সবে জানে সে সুখকে অনুভব করতে মনের অজান্তেই আপনা আপনি এখানে ছুটে এসেছে ধীর লয়ে। আশ্চর্য জনক ব্যাপার হলো সে নিজেকে দমিয়ে রাখার কোন প্রচেষ্টায় করেনি। বরং তার মনে হচ্ছিল এই রুমে এই মূহুর্তে না এলে হৃদয় থেকে খুব দামী কিছু একটা ক্ষয়ে যাবে।
বেডে তাওয়াল পড়ে আছে।এটা সেদিন কলেজ যাওয়ার আগে শাওয়ার নিয়ে তাড়াহুড়োয় ব্যালকনিতে মেলে দিতে ভুলে গিয়েছিল সুখ। স্টাডি টেবিলে বই খাতা বড্ড অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ড্রেসিং টেবিলে পাশের ফুলদানিতে ঝাপসা ধুলো পড়ে গেছে ইতোমধ্যে।ঘরের মালিক উপস্থিত নেই।ধুলো জমার ব্যাপারটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কক্ষ জুড়ে নজর ঘুরিয়ে নিলো বর্ণ’।মনে হলো সেদিন কালো শাড়িতে স্বপ্নে আসা ফুল লাজুক হেসে তার দিকে চেয়ে আছে।চোখের ইশারায় জানতে চাইছে,
“ খুব বেশিই কী মনে পড়ছে আমায়?এতো নারাজ কেনো? আপনার তো খুশি হওয়ার কথা!ধীরে ধীরে চলেই যাচ্ছি আপনার চেয়ে দূর থেকে বহুদূরে।আর কেউ আপনার সামনে হাত জোড় করে বলবে না –আমায় একটু ভালো বাসুন না বর্ণ ভাই”
অথচ রুমের আশেপাশেও সুখের কোন অস্তিত্বই নেই।চুলে হাত চালিয়ে স্টাডি টেবিলে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে বর্ণ। ঘড়ির কাঁটা আনুমানিক চারটে পার করে গেছে। গভীর রাত।শান্ত শহর। টেবিলে থাকা একেকটা বই এপিঠ ওপিঠ দেখে পাশে ফেলে রাখে। হঠাৎ ভাঁজ করে রাখা বইয়ের মাঝামাঝিতে চোখ আটকে যায়।খুব যত্নে সামলে রেখেছে বুঝতে পেরে বর্ণ আগেপিছে না ভেবে সেটাতে হাত বসালো।
ধূসর মেঘ রঙা ডায়রি।কাভারে সাদা কালিতে আর্ট করে ইংরেজি অক্ষরে লেখা,
“ ইট’জ ফরবিডেন টু টাচ উইদাউট দ্যা ফ্লাওয়ার’স পার্মিশন ”
বর্ণ দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়। সৃষ্টির শুরু থেকে নিষেধের প্রতি আদম জাতির অদ্ভুত এক আকর্ষণ।কেউ নিষেধ মানে,কেউ তা গ্রাহ্যই করে না।বর্ণ বোধহয় দ্বিতীয় দলের। ফুল কী সেটা জানে না? তারউপর তার দেওয়া ডাকনাম ব্যবহার করেছে।আর বর্ণ ফুলের পার্মিশন নেওয়ার অপেক্ষা করবে –এমন হয় নাকি?এটা ঠিক বিড়ালের সামনে শুকনো মাছ রেখে ‘এটার দিকে চোখ তুলেও তাকাবেনা’ নিষেধাজ্ঞার মতো হয়ে গেল না?
অথচ বর্ণকে এটা কে বুঝাবে যে –এই রুমটা সুখের।সে তার জিনিস যেখানে ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে রাখতে পারে।
যদিও শুরুতে তার মাঝে তেমন কোন কৌতুহল চোখে পড়েনি না।তবু সে প্রথম পাতা উল্টালো সন্তর্পণে।নীল, লাল,কালো কালিতে খচিত জ্বলজ্বল করতে থাকা লেখাগুলো দেখেই দৃষ্টি আচমকা প্রখর হয়ে উঠে।চাহনিতে বিষ্ময়ের বদলে কিছু একটা ছিল –যা অবর্ণনীয়।অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসলো বর্ণ।
#চলবে🥀
[যে দৃশ্যর জন্য প্রতি পর্বের চেয়ে আজ দ্বিগুণ শব্দ লিখে ফেললাম।তাও সিনটা লেখা হলো না। পরবর্তী পর্বে আপনাদের কাঙ্ক্ষিত কিছু থাকতে পারে রিডার্স 🦋
ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন।রেসপন্স করার অনুরোধ]

