#আমার_বোবাফুল(৩৬)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
.
ভোর পাঁচটার দিকে স্লিপিং পিল নিয়ে শুয়েছিল বর্ণ।ঘুমের প্রয়োজনে রোজ এটা সেবন করতে হয় তাকে।নচেৎ,সহজে চোখে ঘুম আসেনা। ইচ্ছাকৃত চোখ বুজতেই কিছু ভেসে উঠে নয়নতারায়। অদৃশ্য ক্ষোভ উপচে পড়ে তখন তার মানসিকতায়। যেনো আগ্রাসী হিংস্র জন্তুর প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে চোখে মুখে। তখন আবার নিজেকে নিজে শান্ত করতে ইনজেকশন পুশ করতে হয়।তাতে ঘুমের মেডিসিন ও মিশ্রিত আছে।
আমিন সরদার হসপিটালে এডমিটেড। দুটো কানেই অপারেশন হয়েছে, দাঁতের পাটিতেও তেমন।কথা বলতে পারেন না।শুনতেও পান না আপাতত।দু রাত আগে বাড়ির সামনে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিল আমিনের বড় ছেলে ফয়েজ। সম্পূর্ণ শরীর অক্ষত অথচ কানে থেকে র/ক্ত পড়ছিল গলগলিয়ে। র/ক্তাক্ত মুখশ্রী। দাঁত ঝরে পড়েছে কতোগুলো।কাল বিকেলে বর্ণ পুলিশ সমেত হসপিটাল উপস্থিত হয়েছিল। ভদ্রলোককে গভীর চোখে পর্যবেক্ষণও করেছে খুব মনোযোগ প্রয়োগে।মাস্কের আড়ালে তার অধর বাঁকানো হাসি সকলের অগোচরেই রয়ে যায়।
তামিজ শিকদারের ফোনে আননোন নাম্বার থেকে আসা হুমকি স্বরূপ ফোন কল, এবং এমএমএস, ম্যাসাজ বার্তা সুখের কিডন্যাপিংয়ের পেছনে ৭০% দায়ী করেছে পুলিশ।বাকিটা আমিন মুখ খুলার পর জানা যাবে।বর্ণ চুপ ছিল পুরোটা সময়।মাহির ওই নাম্বারের ফুল ডিটেইলস,কল রেকর্ড এবং বাকি সব বর্ণ’র আদেশে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।যা বর্তমানে আমিন সরদারের বিপক্ষে কথা বলছে।তামিজ শিকদারের কানেও পৌঁছে গেছে কথাটি। তিনি ফিরবেন দিন দুয়েকের মধ্যে।তার কলিজায় যে হাত রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছে তাকে তো একেবারের জন্য হলেও স্বচক্ষে দেখা দরকার।
কিডন্যাপ করেনি স্বীকার করার পরেও বর্ণ তাকে ইচ্ছাকৃত অপরাধী প্রমাণ করার চেষ্টা করছে কেনো?এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?মাহির সব বুঝতে না পারলেও বর্ণ’র মস্তিষ্কে কী চলছে তা অল্পবিস্তর ধারনা করতে পেরেছে।
বর্ণ’র ঘুম ভাঙলো সকাল দশটায়।মাহির ফোন করেছিল –সাড়ে দশটায় শুট স্পটে যাওয়ার কথাটি মনে করিয়ে দিতে।গাড়ি নিয়ে এখন গেইটেই দাঁড়িয়ে আছে সে। ইংলিশ বাংলার মিশ্রণে দুটো গালি ছুঁড়ে ফ্রেশ হয়ে বর্ণ অল্পক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বডি স্প্রে করতে করতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল সূক্ষ্ম চোখে।শূণ্য হাওয়ায় মিশে মিষ্টি একটা মন মাতানো ঘ্রাণ আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
নতুন গানে কাজ করছে বর্ণ।এর শুট-ই সেদিন স্থগিত রেখেছিল। আজ সেটা সম্পন্ন করবে।
তুহফা শঙ্কায় ভার্সিটি যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সুখের সাথে কী ঘটে গেলো এখনো তার কাছে অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নের মতো লাগে।একটা নিষ্পাপ কোমল প্রাণ ক্ষণিকের ব্যবধানে কিছু জা/নোয়ারের কবলে পড়ে হসপিটালের বেডে স্তব্ধ হয়ে আছে।সে হাসে না বহুদিন।হাত নেড়ে ইশারায় কথাও বলেনা। তুহফা প্রতি মূহুর্তে দোয়া করছে এর পেছনে যারা যারা দায়ী তারা প্রত্যেকে যেনো কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি আর যন্ত্রণা ভোগ করে।
বাড়িতে মামিরা নেই,সুখ নেই,নূরা নেই। নিষ্প্রাণ ঠেকছে সবকিছু।চারপাশের দেয়ালগুলোও যেনো অদৃশ্য হাহাকারে মত্ত। ভার্সিটি গেলে হয়তো মনটা খানিক হালকা হতে পারে।সকালের ব্রেকফাস্ট নানুর রুমে পৌঁছে দিয়ে অভ্রকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো তুহফা।একা বের হতেও এখন ভয় করতে শুরু করেছে।
গাড়িতে হেলান দিয়ে মাহির গেইটের বাহিরে দাঁড়িয়েছিল ।চোখ ডুবিয়েছে ফোনে।গেইট পেরোতেই তাকে নজরে পড়ে তুহফার। রমণী ঢোক গিলে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। অভিমান জড়ানো দৃষ্টিতে ধীরস্থির চোখ নামিয়ে নেয়।অভ্র গাড়ি আনতে গেছে। ছেলেটা অল্পস্বল্প ড্রাইভ করতে পারে অপটু হাতে।তুহফার যদিও ভয় কাজ করে, কিন্তু মানুষ রূপি জন্তুর কু নজর থেকে অভ্র’র অপটু হাতের ভুলভাল ড্রাইভিংয়ে মৃ!ত্যু সাধ গ্রহণ করাও সই।সুখের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করেই -গা শিউরে ওঠে তুহফার।সুখ তখন নিজেকে কতোটা অসহায় বোধ করছিল কে জানে!!
তুহফা হাঁসফাঁস করে মণিদ্বয় এদিক ওদিক লুকানোর মাঝে হঠাৎ চেনা পরিচিত পুরুষালী ভরাট স্বর কানে এলো,
“ ভার্সিটি যাওয়া হচ্ছে?”
_
আজকের ব্রেকিং নিউজ! শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তামিজ শিকদারের একমাত্র মেয়ে ফারিস্তা সুবহান সুখ কলেজ থেকে ফেরার পথে দুষ্কৃতকারীদের হাতে কিডন্যাপ হয়। পরবর্তীতে তাদের ধারা রে*প। বিধ্বস্ত মৃ/তপ্রায় সুখ এখন হসপিটালের বেডে শায়িত। তদন্তে আরো একটি বিষয় সামনে এসেছে।সুখের অন্য একটি পরিচয় হলো সে সম্পর্কে –আমাদের দেশের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র আদরের ছোট বোন হয়। আমরা তার পরিবারের জন্য গভীর শোকাহত। সৃষ্টিকর্তা তাদের এই সংকট ময় মূহুর্ত কাটিয়ে উঠার তৌফিক দিক।
নিষ্প্রভ দৃষ্টি মেলে বর্ণ ল্যাপটপ স্ক্রিনে চেয়ে রয়।ওইতো নির্জন জায়গার সেই আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিংয়ে সুখের সাথে হাতাহাতি হচ্ছে চারজন ব্যাক্তির। চেহারা অস্পষ্ট।তারপর মাটিতে সুখের র-ক্তাক্ত দেহ।এই ছবি আর ঠিকানা -ই একটা অচেনা নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কেউ পাঠিয়েছিল সেদিন। নাম্বারটা কারো নামে রেজিস্ট্রার্ড নয়। ফলস্বরূপ ,ট্রেক করার উপায় নেই।
ভিডিও পুণরায় অন করলো বর্ণ। কপালে সুদৃঢ় ভাঁজ পড়ে। দৃষ্টি ক্ষুরধার,দুহাত মুঠো বদ্ধ। মুখশ্রী অত্যাধিক গম্ভীর।পরিপাটি হয়ে রুম ছাড়তেই যাচ্ছিল সে খানিক আগে,তখনি ই-মেইল আসে।তাতে এই ভিডিওটা।
ভিডিওর শেষের দিকে স্ক্রিন আঁধার কালো হয়ে ঝিনঝিন করে উঠে — ঠিক বিটিভি’র পর্দার মতো।আর কোন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না।ওই আঁধার স্ক্রিন হতে একটি মেয়েলি চিরচিরে উপহাস মিশ্রিত স্বর ভেসে আসে হঠাৎ,
“ দ্যা গ্রেট আসফিয়ান বর্ণ! কেমন দিলাম ব্রেকিং নিউজ?জানি খুব একটা ভালো হয়নি । ফিলিং কেমন?রাগে,ক্ষোভে সবকিছু ব্লাস্ট করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে এই মূহুর্তে?হয়,আমাদের ভাবনার বাইরে গিয়ে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে এমনই অনুভূতি হয়!নিশ্চয়ই জেনে গেছো তোমাদের সুখ পাখি আসলে রে!প টেপ কিচ্ছু হয়নি। বেচারি.. লোকগুলো শুধু একটু ভয়-ই দেখাতে চেয়েছিল।আর অযথাই কিউট মেয়েটা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে জীবন দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতেও দুবার ভাবলো না। মানতেই হবে দেখতে নিশ্চুপ হলেও তোমার মতো দুঃসাহস নিয়ে ঘুরে।
সেসব আলোচনা এখন নাহয় থাক। এবার পয়েন্টে আসি…
একটু নিরবতা। দুহাত প্রসারিত করে বর্ণ কানে হেডফোন চেপে কাউচে মাথা এলিয়ে চোখ খিচলো। মেয়েটার কন্ঠ পুণরায় বাজে,
“ সাতদিন.. তোমার হাতে সাতদিন সময় আছে। এরমধ্যে যদি পৃথিবীর হাজার কোটি মানুষের ভিড়ে আমাকে খুঁজে বার না করতে পারো তবে.. এই ব্রেকিং নিউজটা পরদিন পুরো দেশবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে, আই সয়্যার।আর যদি ফরচ্যুনেটলি খুঁজে পাও তো কথা দিলাম ভিডিওটা একটা সহজ শর্তে তোমার হাতে তুলে দেবো! নিজের এবং পরিবারের সম্মান এখন তোমার হাতে নির্ভর করছে মিস্টার।জানো তো দেশের মানুষের মানসিকতা সম্পর্কে?একজন দুঃখ প্রকাশ করলে দশজন হেও করবে, পারিবারিক শিক্ষাতে খামতি ছিল বলে গুঞ্জন তুলবে, পোশকের দিকে আঙুল তুলবে ইত্যাদি ইত্যাদি।রাগ সংযত করো।ওকে বায়..সময়টা মনে রেখো মাত্র সাত দিন।”
শুরুতে ক্ষিপ্র সিংহের মতো ফুঁসে উঠলেও বর্ণ এখন নিষ্প্রভ। শান্ত দীঘির মতো স্থির।গম্ভীর মুখো, অনূভুতি শূন্যর মতো মানুষের অভিব্যক্তি বুঝা যেমন তেমন ব্যাপার নয়। বর্ণ’র মনোভাবও খেয়াল করা যাচ্ছে না সঠিক।ল্যাপটপ ফোল্ট করে উঠে ব্যালকনির মুখোমুখি হয়ে –পকেটে দুহাতে পুরে সটান বুকে দাঁড়ালো সে। স্বচ্ছ গ্লাস ভেদ করে দূরের গাছপালা চোখে পড়ে। সবুজ শ্যামল মনোরম পরিবেশ। মৃদু বাতাসে পাতারা নড়েচড়ে উঠছে বোধহয়। বর্ণ আচমকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো।ভয়ানক আকর্ষণীয় দেখতে অদ্ভুত রহস্যময় চোখের চাহনি।
—
গত হয়ে গেলো আরো একটি দিন।সময় এখান বিকেলের। সূর্যের রশ্মি ক্ষীণ,নম্র।ফাইলে নজর বুলিয়ে হঠাৎ খানিক দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেহরাব। সোফায় একটি ছোট মেয়ে মানুষ ঘুমিয়ে আছে আরামে।মাথার দুকুলে দুটো ঝুঁটি বাঁধা।বুকের খাঁচায় দুহাতে জাপটে ধরে আছে একটি ধবধবে সাদা রকমের আদুরে খরগোশ।প্রাণীটিও নিশ্চিতে চোখ বুজে আছে আপন আশ্রয়স্থলে। মেহরাব অজান্তেই হাসলো।ফাইল টেবিলে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।মেয়েটির নিকটে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো সোফার কিনার ঘেঁষে।কাত হয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ায় একটি ঝুঁটির এলোমেলো চুলে মুখ ঢেকে গেছে প্রায়।ধীর হাতে মেহরাব চুলগুলো সরিয়ে দিলো।তবু রয়ে যায় গুটিকয়েক।দেখতে ভালো লাগলো না তার। পুণরায় হাত বাড়িয়ে কপাল স্পর্শ করার আগেই ফট করে চোখ খুললো মেয়েটি।বলে উঠলো পরপর,
“ ওই হিরো… এভাবে দেখো না।নজর লেগে যাবে!”
হাত গুটিয়ে খুক খুক কেশে উঠে মেহরাব।প্রথম সাক্ষাতেই মেয়েটা ইঁচড়ে পাকা সেটা আন্দাজ করেছিল।বলল,
“ এতো সুইট দেখতে একটা মেয়ে!বলা যায় না কখন সত্যি সত্যিই নজর লেগে যায়!”
“ নো নো প্লিজ!এমন হলে আমার স্কিন ডেমেজ হয়ে যাবে।চুল পড়ে বুড়ি হয়ে যাবো দাদুর মতো।তুমি আমার এতো বড় সর্বনাশ করতে পারো না।এটা অন্যায়!”
বিষ্ময়ী স্বরে হাঁপিয়ে যাওয়া ভঙিমায় বলা কথাগুলোর ধরণ দেখে ঠোঁট টিপে হেসে ফেলে মেহরাব,
“ অন্যায়-ই তো!
ওকে.. তোমার স্কিনের কথা মাথায় রেখে দিলাম না নজর। এবার হ্যাপি?”
মেয়েটা উঠে বসে।খরগোশের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সেদিকে নজর রেখেই বললো,
“ টমি মাথা দুলিয়েছে তোমার কথায়!সো,আ’ম ওভার দ্যা মুন!এবার আম্মুর কাছে দিয়ে এসো আমায়। বেশিক্ষণ এখানে থাকলে কিন্তু বকবে!”
সাঁয় দেয় মেহরাব। ছোট্ট মেয়েটার হাত আঁকড়ে দ্বারের অভিমুখে পা চালায়।আজ সকালেই দোস্তি হয়েছে তাদের। চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মেহরাব একবার পিছু ফিরলো ।জারিফ হতভম্বে তাকিয়ে আছে।মেহরাবের এ্যাসিস্ট্যান্ট সে। ইশারায় তাকে কিছু একটা বুঝিয়ে চলে গেলো মেহরাব।
লিফট ব্যবহার করে ফোর্থ ফ্লোরে এসে থামলো তারা। মেয়েটার এক হাত মেহরাবের কষকষে হাতের মুঠোয়।অপর হাতে খরগোশ বুকে চেপে ধরা। হাঁটার ফাঁকে বলতে লাগে,
“ এই টমিটা না কখনো কখনো খুব দুষ…
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই খরগোশ ঝাঁপ মেরে নেমে গেলো নিচে। পরপরই ছুট লাগায় সামনে।
“ ট্_টমি!”
সেও ছুটে গেলো পিছু পিছু। খরগোশ থামে না।পায়ে ভর করে খুটখুট লাফিয়ে চলতে থাকে ইচ্ছে মতো।একসময় থেমে গেলো একজোড়া পায়ের সামনে গিয়ে। মেয়েটাও কাছাকাছি গিয়ে থেমে গিয়ে আচমকাই প্রফুল্ল মনে পা জোড়ার মালিকের কোমর জাপটে ধরলো,
“ বর্ণ..
উর্ধ্বে মুখ তুলে ফ্যালফ্যাল চেয়ে গাল ফুলিয়ে বলে, “ তোমায় দেখিনা কতোদিন!আই মিসড্ ইউ্যু ব্রো”
#চলবে🥀
[ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করার অনুরোধ]

