#আমার_বোবাফুল(৪৭.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
৪৭–প্রথমার্ধ·
বর্ণ’ দেশ ছেড়েছে সেই রাতেই। কাউকে জানায়নি। এমনকি সারাক্ষণ তার আশেপাশে চিপকে থাকা মাহিরকেও না।তখন উদাস দুপুরবেলা।মাহির নিজের বাড়িতে। লাঞ্চ শেষে খোদ কামরায় এসে বেডে বসেছে কেবল। কদিন ধরে মনটা বেশ উদাসীন। ফোন বাজল হঠাৎ-ই। বিদেশীয় নম্বর।+39 দিয়ে শুরু।
এমনিতেই তপ্ত মেজাজ। উপরন্তু নাম্বারের শ্রী দেখেই মুখ কুঁচকে,উথলে ওঠে মস্তিষ্ক। রং নাম্বার ভেবে দুবার কাটতেই তৃতীয় বার এলো। এবার খেই হারিয়ে ফোন তুলে কানে চাপল টগবগে ক্ষুব্ধ মেজাজে। আত্মীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব, চৌদ্দ গুষ্টির মাঝেও এমন দেশীয় নম্বরের অধিকারি কেউ নেই। অতঃপর সমজে কথা বলার কোন মানেই হয় না,
‘ ডিস্টার্বেন্স!কোন ঝাঁটের মাল তু…’
‘ মাহির কী বাচ্চে.. আমার কল কাটার এই দুঃসাহস কীভাবে হয় তোর?’ — দাঁতের নিচে পিষ্ট হুঙ্কার। মাহির তড়াক করে একবার ফোনের স্ক্রিন দেখল; বিড়বিড় করে,
‘ আওয়াজটা কেমন চেনা-জানা লাগছে, ধমকটাও!’
‘ মাহিরর..’
‘ ইয়েস বস!’ –অবচেতন মনে বলেই বিস্মিত হয় মাহির। সম্বিত ফেরার মত পরপর চমকে বলল,
‘ বস এ কোথাকার নাম্বার?আর আপনি কোথায়? আজ আপনার রে_রেকর্ডিং আছে বিকেল তিন টায়’ –ঘড়িতে সময় দেখে।দুই টা বেজে গেছে এখনই। মাহির হতভম্বে বিভোর।বর্ণ বলল কর্কশ শব্দে,
‘লিসেন টু মি..’
এরপর তাকে কীসব অ-আ বুঝিয়ে দিল ওপার থেকে আসফিয়ান বর্ণ। মাহির প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সৈনিকের মতো সেসব অক্ষরে অক্ষরে মাথায় গেঁথেছে এবং পালন কর্মে নিয়োজিতও হয়েছে।
•
সুখের জ্বর তো নেমে গেল ঠিকই,তবু হৃদয় ভার।তুহফা গাঁ ঘেঁষে বহুবার অন্তর্মুখী স্বভাবের সুখের অন্তঃস্থলের গোপন রহস্য উন্মোচনের বৃথা চেষ্টা করে গেছে। অথচ সে অপারগ।মেয়েটা থম মেরে আছে।
অগত্যা উঠে গেলো।ধীরে ধীরে সুক্ষ্ম নেত্রে রুমের প্রতিটি কোণায় কোণায় পর্যবেক্ষণ করে একটা জিনিস খুঁজে পায় ড্রেসটা টেবিলের নিচে।একটি অর্ধ পোড়া লেমিনেটেড ছবি।
‘ এটা ভাইয়া না?’ –ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার ফাঁকে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল তুহফা।সুখ ঠোঁট কামড়ে চকিতে তাকায়।হুট করে ছবিখানা হস্তগত করে ইশারায় বুঝাল,
‘ একদমি না!’
‘ অবশ্যই। জ্যাকেটটা ভাইয়ার আর.. বাঁ হাতের তর্জনীতে থাকা রুপোর আংটি!এরপরো বলবি এটা ভাইয়া নয়? ’ –বলা বাহুল্য, ছবিতে মুখ পুড়ে গেছে।
‘ তুমি মাহির ভাইকে..’
প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইল সুখ।তবে তুহফা থামিয়ে দিল গম্ভীর মুখে,
‘ মাহির ভাইকে এখানে টেনে আনার কোন সঙ্গত কারণ দেখছি না। আমাদের কথা হচ্ছে ভাইয়াকে নিয়ে।এবার অন্তত স্বীকার কর তুই ভাইয়াকে পছন্দ করিস…
‘ করলেও এতে কী আসবে যাবে?’
সুখের হঠাৎ প্রশ্নে তুহফা থমকায়। সত্যিই তো!সুখ যদি বর্ণ ভাইকে পছন্দ করে ভালোও বেসে থাকে –তবে কী আসবে যাবে?যদি না ভাইয়ার মাঝে কোন অনুভূতি না থাকে।
সুখের নির্মোহ চোখের দিকে চেয়ে বলল,
‘ কোনটা মুগ্ধ ;কোনটা ভালোবাসার আর কোনটা স্বভাবিক দৃষ্টি আমি খুব ভালোই চিহ্নিত করতে পারি সুখ।তোর চোখের গভীরে ভাইয়ার জন্য অগাধ ভালোবাসা আমি দেখেছি।কখনো বুঝতে দেইনি তাই তুই জানতে পারিসনি।তবে আমি জানি তুই ভাইয়াকে ভালোবেসেছিলি!’
‘ ছিলি বলছো যে?’ –প্রশ্নাটি অবান্তর মনে হলেও সুখ করল হুটহাট।
‘ কারণ এখন বাসিস কী না আমি কনফিউজড।যদি বেসেই থাকবি তবে ডক্টর মেহরাবকে কেনো হ্যাঁ বলেছিস?আর..’ — স্বর অল্প বিভ্রান্ত হলো তুহফার, -‘ ভ.. ভাইয়াকে কখনো বলে দেখেছিস?’
‘ আপ্পি.. থাকনা এসব কথা।আমি ওসব অতীত মন থেকে মুছে ফেলেছি। সামনে আমার বিয়ে!’
‘ আগামী বিশ বছরেও এ-বাড়ি ছেড়ে যাবো না বলা মেয়েটা হঠাৎ নিজের বিয়ে নিয়ে এতোটা উম্মাদ?তোর কিছু একটা তো হয়েছে? কিন্তু কী? আচ্ছা.. ভাইয়াকে একবার বলে দেখলে..’
‘ তোমার ভাইয়াকে হাজারজন ভালোবাসে!এখন কী উনি সেই হাজারজনের ভালোবাসা এক্সেপ্ট করবে? তাদের ভালোবাসবে..
‘ বাট ইয়্যু আর স্প্যাশাল!’
‘ কে বলল?’
‘ স্বয়ং আসফিয়ান বর্ণ!’
বিব্রত বোধ করে সুখ। গম্ভীর মুখে অন্যত্র নজর সরিয়ে আনে।কীসব বলে চলেছে আপ্পি।তুহফা আড়চোখে একবার দেখে মনে মনে হাসল।‘সুখ যে স্প্যাশাল’ কথাটি বর্ণ মুখে না বললেও বিগত কদিন ধরে অবলোকন করেছে তার কার্যক্রমে। কিন্তু এর মূল কারণটা এখনো উদঘাটন করা হয়নি।
•
ভোরে উঠে আড়মোড়া ভেঙে সুখ কিঞ্চিৎ অবাক হল ফোন হাতে। ডক্টরের নাম্বার থেকে এখনো টেক্সট এলো না, আশ্চর্য তো!কাল রাতেও লোকটা টেক্সটের বন্যা ভাসিয়ে দিয়েছিল। জ্বর যেদিন উঠেছে, সেদিনের কথা নাহয় বাদই।খাবারে অনিয়ম না করতে কতো বুঝাল।আরো কতো কী ডাক্তারি টিপস্ ফ্রি।সুখ সায় দিয়েছিল সবেতে।তবে লাস্ট কথোপকথনের শেষের দিকে একটু বিরক্তি দেখিয়েছিল বটে।তাই বলে রাগ করলো নাকি?কে জানে।
শীত হালকা।গায়ে ওমের একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে নিচে নামে সুখ।খালি পায়ে সবুজ ঘাসের উপর হাঁটবে। সাইকেল নিয়ে কোত্থেকে সামনে এলো অভ্র।
‘ আপি চলো তোমায় ক্যারি করি!’
প্রায়শই অভ্র’র সাইকেলে ক্যারি করে তাকে।এমনই কোন কোন ভোরে।আজ ইচ্ছে হলো না। গোমড়া মুখে নাকচ করে,
‘ ইচ্ছে করছে না!’
‘ আরে কিচ্ছু হবে না।চলো তো। ফাঁকা রাস্তায় চক্কর দিয়ে আসি দুজন।’
অগত্যা পিছু চড়ে বসে সুখ। পথিমধ্যে তামিজ সাহেবের সাথে দেখা হয়ে যায়। ভদ্রলোক জগিং করছেন।
‘ আপ্পি?’
‘ উঃ?’ –মুখের ভেতর ছোট এক শব্দ। এঁকে বেঁকে ছুটে চলার পথে সাইকেলে শিষ বাজাতে বাজাতে অভ্র বলল,
‘ এখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তুমি আমার কী। তখন কী জবাব দেবো জানো?’ –কন্ঠে একরাশ উচ্ছ্বাস ছিল।সুখ ইশারায় জানতে চায়,
‘ কী?’
‘ তুমি আমার জি…’
সশব্দে ফোনে বাজল পকেটে।অভ্র থামল।বলল,
‘ আপ্পি.. ফোনটা তুলো।তবে সাবধান, হ্যাঁ? সিক্রেট আছে।’ –তার ইঙ্গিত ছিল কলে থাকা নামের দিকে।উমামাও হতে পারে।নামের পাশে ‘লাভ’ শব্দটা দেখলে আপির কাছে কট।
একহাতে অভ্র’র কাঁধ জড়িয়ে অপর হাতে পকেট হাতড়ে ফোন বের করল সুখ।নামটা দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে অভ্র’র চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরল।
‘ ওহ্ গড!ব্রো!’ –কন্ঠে যত বিষ্ময়!শেষ কখন বর্ণ’র কল তার ফোনে ঢুকেছিল জানা নেই।সুরে আশ্চর্য ভাব তখনো কাটেনি,
‘ আমি যা দেখছি তুমিও কী তাই দেখছো আপি? সূর্য তো আজও পূর্ব আকাশেই উঠেছে।তবে হঠাৎ দিনের বেলায় চাঁদের উঁকি দেয়ার মতো ব্রোর কল কীভাবে আমার কাছে এসে পৌঁছালো? নির্ঘাত ভুলে প্রেস লেগেছে। রিসিভ করো আপ্পি!’
‘ নো.. আমি পারবো না!’
‘ আরে আরে.. একটু করেই দাও না।দেখতেই পাচ্ছো আমার দু হাতই বিজি।’
ভিডিও কল এসেছে। হোয়াটসঅ্যাপে।সুখ রিসিভ করে অভ্র’র সামনে ধরতে গেলে সে বলল,
‘ এক্সিডেন্ট ঘটাতে ইচ্ছে আছে ? চোখের সামনে এমন করে ফোন ধরলে পথ দেখা যায়?’
‘ সাইকেল থামিয়ে কথা শেষ কর অভ্র!’
সুখ বলল কথাটি। তবে শুনল না অভ্র।কলের বিপরীতে থাকা বর্ণ’র উদ্দেশ্য বলল,
‘ ব্রো তুমি সত্যিই আসফিয়ান বর্ণ নাকি তার ডুপ্লিকেট?’ –কথার ফাঁকে অজান্তেই ক্যামেরা সুখের দিকে ঠেলে দেয়।তার মনোযোগ সামনে।
সুখ আহাম্মাকের মতো ফোন ধরে রইল।বর্ণ কথা বলছে না। একদৃষ্টে স্ক্রিনে ভাসমান সুখের গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে, ভীষণ মনোযোগে।কানের দু’পাশে কেশরাজি এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে সুখের। শুষ্ক ঠোঁটে স্ট্রবেরি লিপজেল। মসৃন ত্বক।ঠিক যেমন তুলো।কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে অসম্ভব ভ্রু কুটি করে বর্ণ বিড়বিড় করে,
‘ সো বিউটিফুল, সো এলিগেন্স, লুকিং লাইক অ্যা..’ – কীসের উপমা দেওয়া যায় বর্ণ বিভ্রান্তিতে পড়ল।তবে, মস্তিষ্কে টমেটো,স্ট্রেবেরি, চেরী নামই আসছিল।এসব ফ্রুটসের সাথে নিজের তুলনা শুনলে ফুল নির্ঘাত নাকের পাটাতন ফুলাতে পারে।
অভ্র বলল,
‘ বিউটিফুল, এলিগেন্স?এসব কাকে বলছো ব্রো? আমাকে নাকি আপিকে?’
সুখ শ্বাস আটকে থম মেরে মুখ শক্ত করে অভ্র’র দিকে তাকায়।ফোন ফিরিয়ে দেয় জোরপূর্বক।বর্ণ বলল চুলে হাত বুলিয়ে কর্কশ শব্দে,
‘ নিজেদের এতো এক্সপেনসিভ ভাবিস না। আজকের ওয়েদারটা সুন্দর।তারই প্রসংশা করছিলাম!’
কল হোল্ডে রেখে লাস্ট কল দেখে অভ্র আশ্চর্যের শীর্ষে পৌঁছে বলল,
‘ দীর্ঘ ছয় মাস পর ছোট ভাইকে কল করেছো আজকের ওয়েদারের গুণগান গাইতে?কীয়া বাত হ্যায়!ওয়ান্ডরফুল ব্রো, ওয়ান্ডরফুল!’
‘ থ্যাঙ্কস.. ফোনটা এবার পাশের জনকে দে। সামথিং টু স্যে!’
মুখ থমথমে অবস্থা হয় সুখের। সজোরে ঘাড় বাঁকিয়ে তার দিকে চেয়ে হাতে ফোন ট্রান্সফার করার সময় অভ্র’র নজর আচমকা বর্ণ’র আশেপাশে গেল।ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠে,
‘ পেছনে স্নো পড়ছে।ব্রো তুমি কোন দেশে আছো?’
•
মীরাভ অসুস্থ হয়ে পড়েছে আচমকা।বিয়ের ডেট ফিক্সড করতে শিকদার বাড়ি যাওয়া হয়নি তাই।ছোট বাচ্চা মেয়েটা বুকে জড়িয়ে স্তব্ধ চোখে বাহিরে দৃষ্টিপাত করে মায়রা বসা। হুটহাট ঠোঁট কম্পিত হয় থরথর।বুক ভেঙে কান্নারা দলা পাকিয়ে আসে।টুপ করে চোখের কৌটর ফেড়ে অশ্রু নামে।
‘ আপু!’
চকিত হয় ঈষৎ। তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে হাসিমুখে পিছু ফিরে।মেহরাব দুহাতে ধোঁয়া ওঠা দুকাপ চা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
‘ আয়!’ –ঠোঁটে মেকি হাসি টানল।
ব্যালকনিতে পাশাপাশি দুটো মোড়া।ছোট টেবিলে মায়রার জন্য আনা কাপ রেখে খালি মোড়া টেনে বসল মেহরাব। গম্ভীর মুখে বোনকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে প্রশ্ন করল,
‘ বেশ ক’দিন ধরে লক্ষ্য করছি তোর আচরণ এমনকি সব কাজে কেমন উদাসীন ভাব।কী হচ্ছে আমার আড়ালে, কী ঘটেছে তোর ভাইকে বল আপু।আমি আছি তো!’
বুকের ভেতরটা হুঁ হুঁ করে উঠল মায়রার।ভাইয়ের বুকে হামলে পড়ে খুব চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।বুকে আগলে নেওয়ার মা তো নেই। মাথায় হাত রেখে সন্তানের ছায়া দানকারী বাবাও নেই। পৃথিবীতে আপনজন বলতে একমাত্র এই ভাই ই আছে।
মায়রা ঢোক গিলে নিজেকে সংযত করে।বিয়েটা বরং মিটে যাক।এই বিয়ের ব্যাপারে মেহবার কতোটা সন্তুষ্ট সে-ই জানে।এর আগে একটা জঘন্য সত্যি সামনে তুলে ধরে ভাইয়ের আনন্দ মাটি করবে না মায়রা।কখনোই না।হেসে বলল,
‘ তেমন সিরিয়াস কোন ব্যাপার না। কী সেটা বিয়ের পর নাহয় বললাম। এমনিতেই আমার কিন্তু একটু আধটু হিংসে হচ্ছে জানিস? কোথায় আমার ভাই সুখপাখিকে পেয়ে আমাদের না দূরে ঠেলে দেয়!’ –মজার ছলে বলা কথাটি। অথচ অবচেতন মনেই দু’জনর মনটা যেন ধ্বক করে উঠল।
মায়রা বলল,
‘ পৃথিবীতে তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই ভাই!’ —বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে থাকা কান্নাগুলো এই বাহানায় উগলে দিল মায়রা। ঠোঁট কামড়ে হুঁ হুঁ কেঁদে উঠলো। মেহরাব থমকে গেল।টেবিলে কাপ রেখে নিকটে চলে এলো দ্রুততার সাথে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল ভঙ্গুর গলায়,
‘ কী অবোধের মতো কান্না।মনে রাখিস পৃথিবী উল্টে গেলেও তোর ভাই সবসময় তোর পাশে ছায়ায় মতো দাঁড়িয়ে আছে,থাকবে আজীবন।’
মীরাভের ঘুম ভাঙে। কেঁদে উঠল ঠোঁট উল্টেপাল্টে। মেহরাব বটবৃক্ষের মতো দু’জনকে আগলে রাখে।তারই বা এরা ছাড়া কে আছে? আপনজনের সংখ্যা খুব শীঘ্রই হয়তো একজন বাড়বে।
•
মেহরাব ফিরে এলো কক্ষে। একটা ব্যাপারে কথা বলতে গেছিল আপুর সাথে। কিন্তু বলা হয়নি।
ব্যাপারটা এমন –সুখ ব্লক দিয়েছে তাকে।দুটো নাম্বারই।যদিও সুখের সাথে একটি নাম্বারেই সব সময় কথা হয়ে এসেছে। কিন্তু অন্য নাম্বারটা সুখ পেলো কীভাবে?আর ব্লকই বা করল কখন? তার স্পষ্ট মনে পড়ে অপর নাম্বার থেকে সুখের সাথে একবার কথা হয়নি। প্রয়োজন পড়েনি।
আইজা আর তামিজ সাহেবের নাম্বার আছে ফোনে। তাদের কল দিতে গিয়ে হাত থেমে যাচ্ছে বারবার। কী বলবে মোরব্বিদের? লজ্জাবোধ বলেও তো কিছু আছে।
মায়রাকে দিয়ে সুখের সাথে কথা বলাতে গিয়েও হলো না।ধফ করে চেয়ারে বসল মেহরাব।মনটা অস্থির অস্থির।সুখ এভাবে হুট করে তাকে ব্লক করার কারণ কী হতে পারে?ওই বাড়ির আরেকটা মেয়ে.. কী যেন নাম.. তুহফা।তার নাম্বারটা সংরক্ষণে রাখলে ভালো হতো আজ।
•
সার্দিনিয়া –ইতালির একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ভূমধ্যসাগরের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। দ্বীপের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল নেহায়েৎ জনমানব শূন্য বলা চলে।তার আশেপাশেই জোসেফ জোয়ার্দারের বর্তমান আস্তানা। জোসেফ জোয়ার্দার!এটি কোন সাধারণ নাম নয়।এর বাঁয়ে জুড়ে আছে আরো একটি নাম –টপ বিজনেসম্যান।তার বিজনেস বাংলাদেশ থেকে সুদূরপ্রসারী। সাফল্য,নাম, জস,খ্যাতি সব তার হাতের নাগালে।
তবে..
আড়ালে তার অন্য এক নাম মুন্না ভাই। অন্ধকার জগতের একটি অংশ।ড্রাগস, নারী পাচার সহ আরো অবৈধ কতো কী যে হয় তার আদেশে।বর্ণ সেবার নারী পাচারে বাঁধা দিয়ে বিরাট লস খাইয়ে বুকের কলিজায় টান দিল না?এই প্রথম এমন দুঃসাহসিক কাজ করল কেউ।তাও সামান্য এক সংগীতশিল্পী হয়ে? শাস্তি তো পেতেই হতো।তবু, আফসোস; বেঁচে গেল মেয়েটা!
রোম –ইতালির রাজধানী। ছন্দ নামী মুন্না ভাই সার্দিনিয়া প্রদেশে থাকলেও বিজনেসম্যান জোসেফ জোয়ার্দার রোম শহরে থাকে জনসাধারণের মাঝে। বিজনেস ঢিল করতে এসেছিল এদেশে।ফিরে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই।
•
স্পিড বুটের আপটকায় সাগরের পানি দুভাগে বিরক্ত। ঝর্ণা ধারার মতোন দুপাশে ছিটকে পড়ছে নীল রঙা জল। ইঞ্জিনের তর্জন গর্জনে কান অতিষ্ঠ প্রায়।
বুটের মধ্যখানে বর্ণ সটান দাঁড়িয়ে।গায়ে ডার্ক নেভি ব্লু ক্যাশমেরি ওভারকোট।নিচে ক্রিম কালারের টার্টলনেক সুইটার, যেটা তার গলাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঢেকে রেখেছে।বুট জুতার সাথে মানানসই ডার্ক ওয়াশ জিন্স।হাতে ব্ল্যাক লেইদার গ্লাভস।গলায় একটি স্কার্ফ, যেটায় মুখশ্রী অর্ধেক আবৃত। কেবল ধূসর কালো মণি চোখ দুটোই দৃশ্যমান।
বর্ণ’র বুক কাঁপছে না। দৃষ্টিতে বিচলিত ভাবের ছিটেফোঁটা নেই।নিশ্চল, নির্ভীক। একদৃষ্টে সমুদ্রের বুকে থৈ থৈ পানির দিকে চেয়ে আছে।তার পিছু আরিয়ান আর জিসান দাঁড়িয়ে। প্রায় একই পোশাকে তারাও আবৃত। জিসানের হাতে ল্যাপটপ। লোকেশন ট্রেকিং চলছে।
‘ আর কতোদূর!’ –প্রশ্নটি করল আরিয়ান। জবাব এলো,
‘ আর কিছুদূর!’
→
‘ ওয়েল কাম.. ওয়েল কাম.. ওয়েল কাম। দ্য গ্রেট আসফিয়ান বর্ণ!’
সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিশাধিক বন্দুকধারী লোকেদের মিছে ভীতু চোখে পরখ করে বর্ণ হুট করে সামনে চাইল। জোসেফ তাকে ওয়েল কাম করছে।চুপ থাকলে হবে?
বুকে হাত চেপে ইষৎ ঘাড় ঝুঁকিয়ে কৃতজ্ঞা জানায় বর্ণ,
‘ মাচ এপ্রিশিয়েটেড!’
জোসেফ ক্ষিপ্র হলো তা’র এই নির্বিকার ভঙ্গি অবলোকন করে।তার ধারণা ছিল বর্ণ’র পদধূলি এখানে পড়লে সে যখন অবাক হওয়ার বদলে ওয়েল কাম করবে, তখন বর্ণ’র তব্দা খাওয়া সুদর্শন শ্রী দেখতে কেমন হবে!কতো কল্পনা যল্পনা করলো।শেগুড়ে বালি।তাকে এখন কে বুঝাবে –বর্ণ আসার ব্যাপারটা যে জোসেফ জানে সেটাও আসফিয়ান বর্ণ’র কাছে ইনফরমেশন আছে!
‘ সম্পূর্ণ খালি হাতে,কোন প্রকার প্রোটেকশন ছাড়াই বাঘের গুহায় এসে বুক কাঁপছে না?অবশ্য এমনটা ..’ —আধভাঙা বাংলায় কথাগুলো বলল জোসেফ। সম্পূর্ণ বাঙালি সে নয়।মা বাংলাদেশি হওয়ার সুবাদে আজ এতো দূর।
বর্ণ অত্যাধিক ভয় পেলো এমনভাবে চমকে তাকাল জিসানের দিকে।বলল মেকি স্বরে,
‘ বিড়াল ভেবে ভুল করলাম তবে?ছ্যাহ্..’ —এগিয়ে জোসেফের মুখোমুখি আসনে বসল।
বিড়াল উপাধি পেয়ে গর্জে উঠে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো জোসেফ।
‘ এই রকস্টার..!’
‘ রিল্যাক্স ইয়ার।এতো হাইপার হওয়ার প্রয়োজন নেই।ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যা জোক!’ –কাচের টেবিলে সাজানো গ্লাস থেকে এক প্যাক মুখে পুরলো অনুমতি বিহীন।
‘ নানু বাড়ির অতিথি আমরা। আপ্যায়ন করবি না জো..সেফ থুড়ি এক কালের দোস্ত?’
‘ আমায় ফিরতে হবে দেশে।লেটস গেট ডাউন টু অ্যা ডিল!’
চড়া ভ্রু কুঁচকে আসে জোসেফের।নীল মণি চোখ জোড়া তীক্ষ্ণ হয়।স্যুটের একটা বোতাল খুলে খানিক ঝুঁকে এলো বর্ণ’র মুখোমুখি। হিসহিসিয়ে বলল তাচ্ছিল্য হেসে,
‘ ডিল ? উইথ মি?হোয়াটস দ্যাট লাইক?’
বর্ণ হুট করে উঠে পকেটে হাত পুরে চারদিকে নজর বুলিয়ে নিলো।তেজি চোখের চাহনি চিহ্ন বিন্ন করে দেবে সংযম। তর্জনী তুলে বলল,
‘ ,আমি তোকে এই জায়গা, এই দেশ থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবো। জোসেফ জোয়ার্দার নামটা আজকের কিছু মূহুর্তের মধ্যে পৃথিবী থেকে গায়েব করে তোকে এমন এক যন্ত্রনা দায়ক মৃত্যু উপহার দেবো যে…
হাতি দিতে দিতে জোসেফ হেসে উঠলো হুঁ হুঁ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি যুক্ত মুখশ্রীতে হাসিটা বেশ আকর্ষণীয় সুন্দর।তবে শব্দগুলো গায়ে কাঁটা ধরিয়ে দেয়ার মত।
বর্ণ’র দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
‘ নেশা চড়ে গেছে ওর।বয়েজ স্ন্যাপ হিম আউট অব ইট!’
আদেশের অপেক্ষায় ছিল বন্দুকধারী লোকগুলো। জোসেফের কথা শেষ হতেই একে একে চতুর্দিক থেকে বর্ণ’র কপালে রি ম ল বার ঠেকিয়ে ঘিরে ধরলো নিমেষেই।
বর্ণ ভয় পাওয়ার মুখাবয়ব করে স্যারেন্ডার করার ভঙিতে হাত তুলল। এরপর বলল বিস্মিত সুরে,
‘ এতো গুলো গান?ভয় পেয়ে গেলাম।একটা আমেজিং দেখাই,ওখেই?–হেয়ালি স্বরে বলল বর্ণ।
‘ কাউন্ট ডাউন করি আগে ’ এরপর তুড়ি বাজাতে বাজাতে সানন্দে গুনল,
‘ 1.. 2.. 3…
#চলবে🥀

