আমার_বোবাফুল(৪৭.২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
58

#আমার_বোবাফুল(৪৭.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

৪৭–শেষার্ধ·
‘ তোর টাকা দিয়েই তোর পোষা কু ত্তাদের হাত করেছি। ইন্ট্রেস্টিং না?’ –বর্ণ পায়ে পা তুলে বসে। আঙুলের ফাঁকে ধোঁয়া ওঠা চুরুট।

বাকরুদ্ধ জোসেফ।নির্বাক চোখে চেয়ে দেখল চোখের পলকে বর্ণ’র কপাল থেকে ঘুরিয়ে তার কপালে রি ভ ল বার তাক করা বিশ্বাসঘাতক মুখগুলো।দিন শেষে যাদের একাউন্টে মোটা অংকের ইউরো পেমেন্ট করা হয়।কতো টাকায় বস পাল্টেছে এরা? অবশ্য ভিনদেশী কুকুরগুলোকে বিশ্বাস করাটাই তার ভুল।

জোসেফ ক্ষুব্ধ চোখ দাঁতে দাঁত পিষে চাপা স্বরে বলল,
‘ হাউ মাচ ডিড হি গিভ? আই’ল গিভ ইউ থ্রি টাইমস দ্যাট অ্যামাউন্ট। বি এ স্লেইভ টু মাই কম্যান্ড রাইট নাউ! ’

কপাল কুঁচকে মুখের ভেতর ‘চুক’ ‘চুক’ শব্দ করে বর্ণ।বলল,
‘ নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি গানটা তোর জন্য সাজেস্টেড। ফার্স্টলি চেক ইয়্যুর একাউন্ট প্লিজ!’

‘ হোয়াট ডু ইয়্যু মিন?’
‘ খানিক আগে প্রমাণ হয়ে গেছে এই মূহুর্তে তুই পঙ্গু।তোর পোষা কু ত্তারা এখন আর কোন কাজে আসবে না। এই পঙ্গুত্বকে আরেকটু অবশ করে দিলে কেমন হয়?ওয়ান্না সি?’ –ইশারায় লোকেদের দূরে সরার আদেশ জারি করে জোসেফের মুখোমুখি ফিসফিসিয়ে কিছু বলল বর্ণ।পরপর ছিটকে নিজের জায়গায় এসে বসে‌।

জোসেফ উঠে দাঁড়ালো তড়িৎ। হম্বিতম্বি করে ছুটে দৌড়ে একটা কক্ষে ঢুকল। এবং বেরিয়ে এলো ল্যাপটপ হাতে।

চোখের পলক ফেলার আগে আগেই একাউন্ট থেকে কোটি ডলারের এমাউন্ট থরথর করে নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। জোসেফ চুল খামচে ধরে নিজের,

‘ এ্_এটা কীভাবে সম্ভব?কী করেছিস?’

‘ তিন..’ –একটু থেমে পুণরায় বলল, -‘ তিন বছরের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত টিম হ্যাক করছে তোর একাউন্ট।যদি আটকানোর ইচ্ছে থাকে, গিভ ইট অ্যা লাস্ট শট !’

জোসেফ কীবোর্ডে দিশেহারা হয়ে এলোমেলো প্রেস করে বোধ শক্তি ফিরে পাওয়ার মতো তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিলে কেড়ে নেওয়া হয়। অচিরেই আগ্রাসী হয়ে বর্ণ’র কলার ধরে টেনে তুলল,

‘ আই’ল কিল ইয়্যু!’

কিচ্ছুটি বলল না বর্ণ। ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসল এক ঝলক। এরপর একহাতে জোসেফের বাহুতে ধাক্কা বসাতেই সে গিয়ে তার প্রথমের আসনে বসে পড়ল। একেবারে নিস্তেজ।হতবিহম্বল দৃষ্টি।তার কোটি কোটি ডলার.. কোথায় ট্রান্সফার হচ্ছে কে জানে!

‘ মানি লস, দ্যাট ইজ টু সে সামথিং লস বাট.. ক্যারেক্টার লস.. এভরিথিং লস!’ – বলার ফাঁকে জিসানের বাড়িয়ে দেওয়া ল্যাপটপ সামনে স্থাপিত কাঁচের টেবিলে রেখে জোসেফের দিকে ঠেলে দেয় বর্ণ।

স্ক্রিনে আলাদা আলাদা ছয়টি ফুটেজ।তাতে ছয়টি নারী চিত্র। প্রত্যেকে জোসেফের বিবাহিত স্ত্রী। সকলে ভিন্ন ভিন্ন দেশের, এবং পরষ্পর পরষ্পর সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল কদিন আগেও।

এক দেশে বেশিদিন অবস্থান করা তার অভ্যাস কিংবা পেশা নয়।মাস খানেক পরপরই ব্যবসার খাতিরে হোক বা স্বেচ্ছায় এদেশ থেকে ওদেশ, ওদেশ থেকে সেদেশ পাড়ি দেয় জোসেফ।এই পৌরুষত্ব ভরা যৌবন নারী ছাড়া একা পার করা যায়? উপরন্তু, হারাম নারী সে গ্রহণ করবে না।তাই ছয় দেশের ছয় নারীকে জীবনসঙ্গীনী করেছে। ভবিষ্যতে আরোও পরিকল্পনা ছিল।গত কিছুদিন আগেও প্রতি নারীরই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল জোসেফের জীবনে তারা প্রত্যেকে প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা। এমনিই নিখুঁত অভিনয়ের সংসার ধর্ম পালন করে এসেছে বিগত সাতটি বছর।অথচ, কীভাবে কীভাবে তাদের কাছে আসল তথ্য পৌঁছে গেছে কদিন আগে।তারা প্রামাণসহ জেনে গেছে জোসেফ এতো বছর সকলকে অন্ধত্বে ডুবিয়ে রেখেছে। তাদের বিশ্বাস, ভরসার মর্যাদা জোসেফের নিকট কোন কালেই ছিল না!যা ছিল সব লোক দেখানো, মিথ্যে আর অভিনয়। এবং নিজের দৈহিক চাহিদা মেটানোর একটা মাধ্যম কেবলি…

বর্তমানে সকলের সাথেই যোগাযোগ বিছিন্ন। অভীমানে এতোটাই সিক্ত হয়েছে যে তাকে ব্যাখ্যা করার সুযোগই দেয়নি কেউ।

‘ ওওহ্! তাহলে এর পেছনে তুই ছিলি!’

‘ স্যরি বস.. কোমল নারী হৃদয়গুলোকে আঘাত করা আমার ইনটেনশন ছিল না;ট্রাস্ট মি।’ – মিছেমিছি অপরাধী মুখাবয়ব করে কন্ঠমণি ছুঁলো বর্ণ।ফের বলল শীতল স্বরে,

‘ বাট ওদের ছাড়ানোর ছিল তোর সঙ্গ। ইট ওয়াজ নিডেড। একবার ভাব জো.. সে..ফ জোয়ার্দার তোর এই দুঃসময়ে না তোর একাধিক জীবনসঙ্গীদের কেউ আছে, না আছে তোর পোষা কু ত্তারা, আর না টাকা কড়ি? কেমন ফিল হচ্ছে?মনে হচ্ছে না পৃথিবীর সব অসহায়ত্বগুলো কেবল তোকেই ঘিরে ধরেছে?’

‘ ট্রায়িং টু ইন্সটিল ফেয়ার? আমার এতোটাও দুর্দিন আসেনি রে আসফিয়ান বর্ণ। তোকে ভয় পাই না আমি। পাচ্ছি না।মারবি আমায়?মার! জীবনের প্রতি যাদের মায়া আছে, মৃ ত্যুকে যারা ভয় পায় তাদের সাথেই এই ম-র-ণ ম-র-ণ খেল খেলে মজা পাওয়া যায়।আমি মৃ ত্যুর ভয় পাই না।’

বর্ণ মুখোশের অন্তরালে ঠোঁট বাঁকাল হঠাৎ, ঠোঁট না দেখা গেলেও ধূর্ত চোখের চঞ্চলতা এটিই প্রমাণ করছে,

‘ রিয়্যালি? অথচ তোর চোখে আমি স্পষ্ট ভয় দেখতে পাচ্ছি।’

জোসেফ হেসে উঠল,
‘ ভয় আর জোসেফ জোয়ার্দার?হাহ্.. এটা তোর দেখার ভুল!’

‘ আই সি..’ –ঠোঁট চোকা করে ওয়াইনের গ্লাসের পাশে,ঝুড়ি থেকে ফল কাঁটার চুড়িটা হাতের ভাঁজে নিয়ে ঘুরেফিরে দেখার মাঝে বর্ণ আচমকা জোসেফের দিকে ঢিল মারার মতো ছুঁড়ে দেয়।

বুক ধুকপুক করে উঠলো নিমেষেই। ঈষৎ ঘাড় পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে বিষ্ফোরিত চোখে জোসেফ ওলের চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দেয়ার স্থানে দেখল।ছুড়ি গেঁথে গেছে সেখানে।

হঠাৎ চিনচিনে ব্যথায় কাতর হয়ে আপন গলায় হাত ছুঁয়াল বিষ্ময় সমেত। রক্ত ছুটছে পিনকি।গলায় হালকা পুচ লেগে ছুঁয়ে গেছে।সরে না গেলে নির্ঘাত অন্যকিছু ঘটে যেতো।

‘ ই-মেইল চেক কর।কোটি টাকা ইনভেস্ট করা ডিল ক্যান্সেল।শেয়ার্স, পার্টনারশিপ এটসেট্রা এটসেট্রা উনিশ-বিশ হওয়ার নোটিফিকেশন আসছে। দ্যাখ, দ্যাখ!’

জোসেফ ঢোক গিলল। ভীতি জেঁকে বসেছে মনে।তবু, মুখ কঠিন রাখে। দুর্বলতা দেখানো উচিত নয়।বুড়ো আঙুল দিয়ে গলার রক্ত মুছে ফিসফিস স্বরে বলল,

‘এতো পাওয়ারফুল?আন-বিলিভেবল!কে তুই?’

বর্ণ ধীরে উঠে দাঁড়ায়। লুকানো পরিচয়ের কিছুটা আজ উপস্থাপন করাই যায়!গম্ভীর গলায় দম্ভ মিশ্রিত কন্ঠে বেজে উঠে,

‘ চীফ.. চীফ অফ দ্য আই(eye ) গ্যাং।’ –দু আঙুলে নিজের চোখর দিকে ইঙ্গিত করে, -‘আই মিন্স আঁখি।এমন এক আঁখি যা শিকারকে, শিকারের প্রতিটি পদোচ্ছাপ,তার শ্বাসনালী থেকে নির্গত প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসের হিসেবও নজরে নজরে রাখে!’

‘আই গ্যাং’! –জোসেফ অস্ফুট উচ্চারণ করে। নামটা শুনেছিল কোথাও। হ্যাঁ, একবার তুলপাড় উঠেছিল দেশে।এই গ্যাংয়ের উৎপত্তি,এর লিডার সম্পর্কে কারো কোন ধারণা নেই।এর অন্যতম কাজ সমাজের পীড়িত,দুর্বলদের শক্তি জোগানো। তাদের বিপদে ডাল হয়ে আড়াল থেকে সাহায্য করা।এর একটা কমন বৈশিষ্ট্য।তারা একেকজন বাইক রাইডার। ঘটনাস্থলে ঝড়ের বেগে উপস্থিত হয়ে বিজলীর মতো এক ঝলক দেখা দিয়ে হুটহাট উধাও হয়ে যাওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন যেমন।এই গ্যাং লিডার আসফিয়ান বর্ণ?


সবে রুমে এসে বসেছে সুখ।তুহফা নিজের ফোন ধরিয়ে দিল গম্ভীর মুখে। ডক্টর মেসেজ দিচ্ছে।সুখ নাকি ব্লক দিয়েছে তাকে।কতো কী মেসেজ।

‘ তোমায় খুব বেশিই বিরক্ত করে ফেললাম?’
‘ আমার কোন ব্যবহারে মনে আঘাত পেয়েছো?’
‘ এটা অব্যক্ত অভিমানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরে নিলে কী আমি ভুল হবো? জানতে পারি অভিমানের কারণটা কী? নতুবা, মান ভাঙাবো কীভাবে?’

অস্বস্তিতে কুঁকড়ে বসে রয় সুখ। নড়েচড়ে বসে মুখ কুঁচকে তুহফাকে দেখলো।চুলে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। এদিকে তার ধ্যান নেই।

সুখের শান্ত মেজাজ যতোততো বিগড়ে যাচ্ছে।গত সাতটা মিনিট ধরে মেহরাবের নাম্বার আনব্লক করার চেষ্টায় আছে। অথচ…

যতোবার আনব্লক করছে সেকেন্ডের ব্যবধানে পুণরায় ততোবারই ব্লকড হয়ে যাচ্ছে।সুখ সন্দিহান। কোথাও ফোন নষ্ট হয়ে যায়নি তো? রিস্টার্ট করে পুণরায় করতে গেলে সেই একই কাণ্ড ঘটছে বারবার। দাঁতে দাঁত খিচে মেহরাবের নাম্বার আনব্লক করার মিশনে নামল সুখ।জেদ চেপেছে আজ ফোন আপনাআপনি যতোবার নম্বরটা ব্লক করবে সে ততোবারই আনব্লক করবে।হাত ব্যাথা হোক বা মেজাজ মূর্ছা যাক।

হুটহাট কল এলো এক অদ্ভুত নাম্বার থেকে। কৌতুহল বশত রিসিভ করে কানে তুলতেই চেনা পরিচিত পুরুষালী ভরাট কন্ঠের ধমক ভেসে আসে,

‘ হোয়াটস রং উইথ ইউ্যু ফুল? দেখছিস নাম্বারটা ব্লক লিস্ট থেকে সরাতে পারছিস না। তারপরও বারবার ব্লক-আনব্লকের খেলায় কী মজা পাচ্ছিস?ইম্পর্ট্যান্ট কাজে আছি আমি.. খেলাটা পরেও খেলতে পারবি।রাখছি, খবরদার নাম্বার আনব্লক করার চেষ্টা করেছিস তো। অবশ্য চেষ্টায় সফল হবি না….

হুটহাট যেভাবে কল এসেছিল সেভাবেই কেটে গেল।সুখ কানে ফোন চেপে থম মেরে থাকল।হতবুদ্ধির মতো চোখ মুখ কুঁচকে নির্বোধ চিত্তে। হিসেব মিলছে না।তুহফা মুখ জুড়ে ফেসমাস্ক; রূপচর্চার জন্য। ড্রেসিং আয়নায় নিজের মুখশ্রী দর্শনের ফাঁকে সুখের দিকে নজর গেলে কোমরে হাত চেপে পিছু ঘুরল।

‘ কারেন্ট শক লাগার মতো থম মেরে আছিস যে? হয়েছেটা কী? ডক্টর কিছু বলেছে?’

‘ ও..’ – দুদিক মাথা ঝাঁকিয়ে পেছনে তর্জনী ইঙ্গিত করে কারো উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাইল সুখ।তবু, বলা হয় না। তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। ভাষায় তাল হারিয়েছে।কী বলল লোকটা? আনব্লক করতে সে অসফল হবে? অন্তরাত্মা ফুঁসে উঠে সুখের।চোখ খিচে হাত কিড়মিড় করে বসে রইল। রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে!


কান থেকে ফোন সরিয়ে বর্ণ বলল আচমকা,

‘ আমার বোবাফুলকে কিডন্যাপ করে কী কামাল করেছিস ইয়ার?আমার দেওয়ানি ইনোসেন্স ফুলটা এখন আর আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। ভালোবাসার কথা বলা তো দূর!’

রাগ, দুঃখ, অসহায়ত্ব, হতাশা সব মিলিয়ে জোসেফের মেজাজ তুঙ্গে। উপরন্তু, বর্ণ’র এই হেঁয়ালি শিরায় শিরায় র-ক্ত টগবগিয়ে উঠার অনূভুতি দিচ্ছে।দাঁতের নিচে দাঁত পিষ্ট করে বলল,

‘ একটু আগেই বললি তোর ফুলের এই ব্যবহারের জন্য আসল কালপ্রিট তুই নিজেই!’

ছদ্ম ধমকে উঠে বর্ণ,
‘ হোপ, বুদ্ধু!মুখ ফস্কে বলে ফেলেছি! নিজের ভুল নিজে দেখে?’

‘ আজ থেকে তোর পিছু ছেড়ে দিলাম।যেতে দে আমায়!’

ঠোঁটে আঙুল চাপড়ে অল্পক্ষণ চেয়ে থাকার মাঝে হেসে ফেলল বর্ণ,

‘ তোকে ভঙ্গুর করে,তোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্ল্যান একদিনের নারে দোস্ত। আমার সাড়ে তিন বছরের সংযম, ধৈর্য ,অপেক্ষা, প্রতিক্ষার পারিতোষিক তুই! আজকের নিঃসঙ্গ, নিঃস্ব জোসেফ জোয়ার্দার!সাড়ে তিন বছরে কতো দিন,কতো ঘন্টা, কতো মিনিট হয় জানিস?এতো সহজে কীভাবে যেতে দিই বল? তোকে প্রয়োজন বলেই তোর বিশ্বস্ত লোকেদের তোর টাকা.. ওয়ান সেকেন্ড..’–বর্ণ থামল।গলা খাঁকারি দিয়ে কলারে হাত রেখে বলল,

‘ তোর টাকা বলছি ক্বজ.. ইতোপূর্বে যেই সিক্সটিন ক্রোর টাকা তোর একাউন্ট থেকে উধাও হয়েছে সেটাও আমার টিমই করেছে। ডোন্ট মাইন্ড ব্রো, ওখেই?টাকার হিসাব ছাড়.. কেমন লাগল আজ সকালেও যারা তোর আশেপাশে দাঁড়িয়ে গার্ড দিচ্ছিল, নিমেষেই তাদের বিশ্বাসঘাতকতা? হাত-পা বন্দী মনে হচ্ছে নিজেকে?দুঃখ হচ্ছে খুব? আমারো একদিন এখানে লেগেছিল ভীষণ ’ – বুকের উপরে আঙুল তাক করে কলিজার দিকে ইঙ্গিত করে,পরপর মস্তিষ্কে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল হিসহিসিয়ে,

‘ তারপর এখানে!’

জোসেফ শক্ত চোয়ালে তাকিয়েই থাকল।হাত মুষ্টিবদ্ধ। সত্যিই এক মূহুর্তের জন্য অসহায় লাগছে নিজেকে। এরআগে কখনো এমন অনূভুতি হয়নি। বর্ণ’র এই নির্লিপ্ত, হেঁয়ালি আচরণ অন্তরে অল্পবিস্তর ভয় সৃষ্টি করছে। আড়চোখে সাদা চামড়ার গার্ডদের দেখলো।

‘ এখান থেকে কীভাবে তোকে নিয়ে যাবো দেখতে চাইবি না?

‘ কিছুই করতে পারবি না তুই!’
‘ দেখা যাক। আরিয়ান..’– বাঁয়ে হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বর্ণ। আরিয়ান পিছু থেকেই জবাব করে,

‘ চীফ!’
‘ হিপনোটাইজ হিম!’

‘ শিওর!’ –মাথা দুলিয়ে সে এগিয়ে এলো। জোসেফ অন্যমনস্ক হলো।হিপনোটাইজ?মন/চেতনা যখন অন্যকেউ নিয়ন্ত্রণ করে ।অর্থাৎ, ইশারায় নাচানোর চাবিকাঠি।

‘ ডোন্ট মুভ!’ – জোসেফ উঠে গেল সোফা ছেড়ে।তবে আরিয়ানের ইশারায় গার্ডরা ঘিরে ধরল।

ছন্দ নামে ইতালিতে পা রেখেছে বর্ণ। পরিচয় গোপন রেখে। তদ্রূপ জোসেফকে হিপনোটাইজ করে ছন্দ নামে এই দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হবে। বন্দোবস্ত করা শেষ। কেবল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষা।

‘ ও আমার আমার হাত ফস্কে বেরিয়ে গেছে জিসান।আমি..’

রাগের তোড়ে বুটে সর্বস্ব দিয়ে ঘুষি বসায় বর্ণ। জোসেফকে নিয়ে পালিয়েছে গার্ডদেরই একজন।অর্ধ হিপনোটাইজ অবস্থায় কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে।

‘ যারা নিজের বসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দুবার ভাবেনি তাদের বিশ্বাস করাই ফাতরামি ছিল’ –জিসান বলল।

একজন গার্ড রেপিং পেপার মুড়ানো গিফট বক্স এনে দিল। জিসান তড়িঘড়ি করে সেটা খুলল।একটা স্মাইলি বল।তাতে লেখা,

‘ নিজেকে খুব চালাক দাবি করিস রকস্টার?এতোই যদি চালাক হবি, সেদিন আমার খুড়া গর্তে পা দিতি না!’


সুখের হাতে দুটো বালা পরিয়ে দিয়েছে সেদিন মায়রা। স্বর্ণের বালা জোড়া মেহরাবের মায়ের। পুত্রবধূর জন্য তৈরি করে রেখেছিলেন। কিন্তু আফসোস.. নিজ হাতে পড়িয়ে দেওয়ার সৌভাগ্য ওনার হয়নি।

হাতের মুঠোয় চেপে নড়াচড়া করছে সুখ। এগুলো ছোট হয়েছে হাতে। ঢুকে না। অনূভুতি শূন্যের মতো করিডোরে অন্যমনস্কে বালা জোড়া পরখ করে হাঁটার মাঝে পা স্লিপ খেল হঠাৎ।

‘ আঃ’ –অস্ফুট স্বর।সর্বশেষে পড়ে যাওয়া থেকে নিজে বাঁচলেও একটি বালা পড়ে গেল হাত ফস্কে।

ফুঁ দিয়ে বুকে হাত চেপে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুখ। ভাগ্যিস সময়মতো রেলিং আঁকড়ে ধরেছিল।বালাখানা অনেক দূরে ছিটকে পড়েছে । এগিয়ে গিয়ে তুলে নেওয়ার আগে অন্য একটি হাত এসে ছো মেরে নিয়ে নিল।সুখ মাথা তুলে চায়।

বর্ণ সামনে দাঁড়িয়ে । ভ্রু ট্রু অসম্ভব কুঁচকে হুট করে সুখকে বলল,

‘ হবু শশুর বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছে বুঝি?নাইস!’

‘ দিয়ে দিন এটা!’

বর্ণ ভাবখানা এমন দেখালো যেনো কিছুই বুঝলো না। আঙুলের ডগায় তুলে নাচাতে নাচাতে নিজ কক্ষের অভিমুখে পা চালাল। ফাঁকে বলল ক্লান্ত স্বরে,

‘ কাল অনেক রাত করে ফিরেছি। প্রচন্ড মাথা ধরেছে। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!’

কিছুক্ষণ এক জায়গায় স্থির থেকে সুখ পিছু নিল ক্ষিপ্র মস্তিষ্কে।ইশারায় বলল,

‘ আপনাকে ডিস্টার্ব করতে তড়পাচ্ছি আমি। খেয়ে দেয়ে কোন কাজ তো নেই।আমার জিনিস এখনি আমায় ফেরত দিন।’

গায়ে মাখালো বলে মনে হয়না বর্ণ সেসব ইশারা ইঙ্গিত। পাশাপাশি দুজন হাঁটছে। সুখের মুখশ্রীতে অসন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। বর্ণ’র এই ব্যবহার তার সহ্য হচ্ছে না একবিন্দুও।

পিছু হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বর্ণ’র কক্ষে চলে এসেছে সুখের ধ্যানেই ছিল না। বর্ণ’র এক বাক্যে থমকে গেল দরজার নিকটেই,

‘ ভালোবাসি বল আগে!’ –ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। ভেজা শরীর।জিম হাউজ’থেকে ফিরছে।

সুখের স্তব্ধ চোখে মুখে ধীরে ধীরে বিরক্তির ছায়া নামে।

‘ আপনি যে দিনে দিনে বদ্ধ, উম্মাদ হচ্ছেন সেটা টের পাচ্ছেন?’ – `ঠোঁট এবং হাত` দুটোর ব্যবহার করেই বলল। ঠোঁট নেড়ে বলার পর বর্ণ যখন বুঝে নেয়, একটা স্বস্তি খুঁজে পায় হৃদয়ে। অদ্ভুত এক সুখানুভূতি হয়।

বর্ণ বুকে হাত চেপে বশ্যতা স্বীকার করার মতো বলল অকপটে,

‘ নিজের সম্পর্কে সেটা বেশ ভালো করেই জানি আমি।তুই মাত্র জেনে অনেক কিছুই মিস করে গেছিস।বিগ আফসোস ফর ইয়্যু!’

সেদিনও যেই মানুষটা মেপে মেপে কথা বলতো তার কন্ঠে এতো হেঁয়ালি সত্যিই বেমানান।সুখ ঠোঁট ঠোঁট চেপে সজোরে মাথা নাড়ায়। লাগবে না ওই বালা।

পা উল্টো চালিয়ে চলে আসতে নিলে বর্ণ পিছু থেকে ডাকে,

‘ এটা বিক্রি করে ক্রোরপতি হতে পারবো না।নিয়ে যা!’

ক্ষিপ্র মেজাজের উপর লাটিম ছড়ালো যেন।সুখ থেমে গেল।হুট করে পিছু ফিরল।বর্ণ বাড়িয়ে দিল বালা টি।

উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে ছোঁ মেরে কেড়ে নিতে হাত বাড়ালেই আচানক বর্ণ নিজের হাত গুটিয়ে নেয়। ফলস্বরূপ…
সুখ বুঝে উঠার আগেই ভারসাম্য হারিয়ে থুবড়ে পড়লো সামনে।সাহসাই.. এক হাত বর্ণ’র বুকে এবং অপর হাত তার ঘাড়ে গিয়ে ঠেকলো।

শরীর অসাড়। হতভম্বে নির্বাক তাকিয়ে রয় সুখ। ছুটে চলে আসার মনোবাসনা অথচ শরীর নিস্ক্রিয়।বর্ণ চোখে চোখ রাখে নিরবে। অদ্ভুত মোহময় চোখে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলো অপলক। একসময় কন্ঠে খাদে নামিয়ে আবেশ মাখা গলায় ফিসফিসিয়ে উঠে,

‘ ধ্রিম.. ধ্রিম.. আওয়াজটা মেবি তোর হৃদয়ে বাজছে ফুল! শুনতে ইন্ট্রেস্টিং ..’

#চলবে🥀

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here