#আমার_বোবাফুল(৪৯.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
৪৯–প্রথমার্ধ·
বিয়ের শপিং চলছে পুরোদমে।মেহরাব-রা উঠেছে রংপুর জেলার আশেপাশেরই এক রিসোর্টে।আযাদ সাহেব অবশ্য সৌজন্যতার খাতিরে বলেছিলেন শিকদার নিবাসেই বিয়ের আগ পর্যন্ত থাকতে।মায়রা রাজি হয়নি।এটা দৃষ্টিকটু যেমন দেখায়, তেমনি আনন্দেও ঘাটতি পড়বে।বর-কনে কবুল পড়ার আগ মুহূর্ত অবধি দূরত্বে থাকায় সুন্দর।
মলে এসেছে ক্ষুদে সদস্যরা। অর্থাৎ, তুহফা,অভ্র,সুখ। তাদের নিয়ে এসেছে বর্ণ। তার সম্মতিক্রমে দায়িত্বটা তামিজ সাহেব দিয়েছেন।যদিও ড্রাইভ মাহির করেছে। অন্যদিক থেকে মেহরাব এবং মায়রা এসে যোগ দেয়।সাথে তাদের দূরসম্পর্কের কাজিন রিদি।
রুবাইয়্যাত ও আইজাকেও আহ্বান করা হয়েছিল। আসেননি তারা।বয়স তো এক রকম পার হয়েই গেল।বিয়ের কেনাকাটা তাদের কাজ নয়। যাদের বিয়ে তারাই বরং নিজের পছন্দ মতো নিক!
‘ সুখ এটা দেখো কেমন লাগে?’ – কাঁচা হলুদ এবং সবুজের মিশেল একটা লেহেঙ্গা। হলুদ সন্ধ্যা উপলক্ষে দেখাল মায়রা। সুখের গায়ে আলতো জড়িয়ে সরু চক্ষে পরখ করে ঠোঁট কামড়ে চোখ উল্টে মেহরাবকে বলল,
‘ ভাই তুইই বল? সুন্দর না?’
সুখের মুখশ্রী ফ্যাকাশে। ঢোক গিলে আড়চোখে খানিক দূরে দেখার চেষ্টা করে। পিলারে হেলে দাঁড়িয়ে বর্ণ। দুহাত বুকে ভাঁজ করে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ঠোঁটে স্লাইড করছে। বহমান কলতান-মুক্ত নদীর মতো শান্ত।চোখের গগলস এর জন্য নজর কোন দিকে –বুঝে উঠা দুষ্কর। তবু, সুখ নিঃসন্দেহে বলে দিতে পারবে পুরুষটি তাকেই পর্যবেক্ষণ করছে তীক্ষ্ণ খেয়ালে। শুধু এই মূহুর্তে নয়।সেই সকাল থেকে। এখানে আসার পূর্বে গাড়ি উঠার সময় গম্ভীর গলায় সতর্ক করেছে,
‘ ডক্টরকে বিয়ে করতে চাস? গ্রেট চয়েস! আই এপ্রিশিয়েট ইয়্যু।বাট ওর আশেপাশে যেনো তোর ছায়াটাও না দেখতে পাই!’ —আজব! মানুষটা এতো বেহায়া কবে থেকে হতে শুরু করল?সুখ দ্বিধান্বিত।কোন প্রতিক্রিয়া সে দেখায়নি তখন, তাকিয়েছিল একদৃষ্টে প্রায় কিয়ৎক্ষণ।সুপ্ত শ্বাস ছাড়ে সুখ।ভারাক্রান্ত মনে মৃদু হাসল।বুঝাল,
‘ আপনাদের পছন্দই আমার পছন্দ!’
‘ এমন বললে তো হচ্ছে না। তোমাদের বর-কনে দুজনের নির্লিপ্ততা আর আমাদের তোড়জোড় দেখে ‘যার বিয়ে তার হুঁশ নেই পাড়া পড়শীর ঘুম নেই’ প্রবাদের সাথে মিলে যাচ্ছে না?কী বলো
তুহফা?’ — শেষের কথাটির সাথে একমত পোষণ করল তুহফা। সজোরে মাথা দুলিয়ে বলল,
‘ একদম!’
মায়রা ধীরে মেহরাবের দিকে চায়। পরপরই ঠোঁট থেকে নিরবে হাসি সরে আসতে নিল। মনটা যেন অচিরেই ধ্বক করে উঠে। মেহরাবের চোখে পূর্বের সেই উচ্ছাস দেখতে পাচ্ছে না মায়রা।সেই রাত থেকেই,যেই রাতে সে ভাইয়ের বুকে হামলে পড়ে হুঁ হুঁ ডুকরে উঠে ঠকে যাওয়ার গল্প শুনিয়েছিল। ভাইটা তার প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। জোসেফের কাছে বদলা নিতে চায়। কিন্তু….
মায়রা চিন্তিত অল্পবিস্তর। জোসেফ জোয়ার্দার সত্যিটা স্বীকার করে মাফ চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন নাম্বার থেকে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছিল গত কয়েকদিন আগেও।অথচ,আজ প্রায় সাত দিন হতে চলল। তার পক্ষ থেকে আর কোন কল কিংবা টেক্সট আসেনি।মানাতে না পেরে হাল ছেড়ে দিল কী?নাকি অন্য কোন ব্যপার?মায়রা গভীরে ভাবল না।যা হয় হোক।সে এই জীবনে কক্ষনো জোসেফকে ক্ষমা দেবে।আর না তার দিকে দ্বিতীয় বার ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে ফিরে চাইবে।প্রতারক-চরিত্রহীনদের সাথে আর যাই হোক সংসার করা যায় না!
‘ ওয়াও আপু এটা কিন্তু জোশ!’ –তুহফার ডাকে মায়রা ফিরে দেখল।নেভী ব্লু কালারের একটা শাড়ি।তাতে মুক্তর পাথরের মতো ছোট ছোট স্টোন।এই রং তুহফার ইমোশন।
সুখ শাড়িটা হাত নিল। নেড়েচেড়ে দেখে মাথা কাত করে বুঝাল,
‘ এটা পছন্দ হয়েছে।’
যে যার মতো ঘুরেফিরে শাড়ি কাপড় দেখছে।তুহফা উঠে দাঁড়ালো বসা থেকে।একটা শাড়িতে চোখ আটকেছে।ধীর পায়ে তার নিকটবর্তী হলো।শাড়িটা টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। গোল্ড আর ল্যাভেন্ডার কালারের মিশেলে।রঙ এবং ডিজাইন দুটোই খুব মনে ধরে তুহফার। কাঁধে জড়িয়ে পিলারের আয়নায় নিজেকে দেখলো কতোক্ষণ।একসময় ছেড়ে সরে আসে।
‘ম্যাম শাড়িটা কিন্তু আপনাকে ভীষণ মানিয়েছে। চাইলে নিতে পারেন। আপনার জন্য ডিসকাউন্ট.. ’ — দোকানি বলল। যেটা প্রায় কাস্টমারকে তারা বলে থাকে। মিথ্যে হলেও।
‘ থ্যাঙ্কস!বাট এখন নয়!’ —তুহফা হাসল শুষ্ক।শাড়ি পড়ার অভ্যাস নেই তার। কিন্তু শখ আছে। প্রায়শই সুখকে উষ্কে রাত বিরেতে দু’জন চুপিচুপি শাড়ি পড়ে অনেক রঙ তামাশা করতো বদ্ধ দরজার ওপারে।রুম থেকে বের হওয়া হয়নি কখনো। লজ্জা লাগে মামিদের সামনে পড়লে। এরও যথেষ্ট কারণ আছে,তা হলো— প্রথমবার যেদিন সকলের সামনে শাড়ি পড়ে হাজির হয়েছিল সেদিন আইজা মজার ছলে বলেছিল,
‘ হে রে তুফ! তোকে তো একেবারে কনে বউ লাগছে।যোগ্য পাত্র খুঁজতে হবে দেখছি।’
তখন তুহফার বয়স ছিল অল্প।পনেরো কী ষোল। মামির কথা আর বাকিদের সহমত দেখে কী যে লজ্জা পেয়েছিল সেদিন। তাছাড়া বিয়ে শব্দটাতেই একটা লজ্জা জনিত ব্যাপার লুকিয়ে থাকে। এরপর আর কখনো শাড়ি পড়ে লোক সম্মুখে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেনি।তার হাজারো স্বপ্নের অন্যতম একটি হলো— সবার সামনে দ্বিতীয় বার যেদিন শাড়ি পড়ে নিজেকে উপস্থাপন করবে, সেদিন সে একা নয়।পাশে থাকবে তার স্বপ্ন পুরুষ।
পিছু ঘুরতেই খানিক থমকাল তুহফা। কিছুটা দূরে মাহির।তার দিকেই অদ্ভুত শীতল চোখে চেয়ে।তুহফা দৃষ্টি সরিয়ে আশেপাশে তাকালো। বাকিদের দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল সব? উত্তরটা মাহির দিল শান্ত গলায়,
‘ ওরা সামনের শপে গেছে!’
‘ আপনি যাননি যে?’ — কথাটি মুখ ফস্কে বেরিয়েই এলো। অথচ সে পণ করেছিল মাহির ভাইয়ের সাথে কথাই বলবে না আমরণ। অভিমান জমেছে। আকাশচুম্বী অভিমান। তাছাড়াও..
মাহির মৃদু হেসে কাঁধ দুলাল,
‘ যাইনি!’
দুজন দূরত্ব বজায় রেখে সামনে এগিয়ে চলে। এভাবে চলতে অস্বস্তি হচ্ছে তুহফার।মাহির তা খেয়াল করে।তবে কিছু বলে না। অগোচরে ঠোঁট কামড়ে হাসল অল্প।
‘ আর কিছু বলার নেই?’
‘ উুঁ?’ —চমকানোর মতো তাকায় সে। বলার মতো অনেক কিছুই আছে, আবার কোন কিছুই নেই।চাপা শ্বাস ছেড়ে হুট করে জানতে চাইল,
‘ কিছু শুনতে চান?’
‘ বললেই না শুনবো!’
কোমল পুরুষালী সেই স্বরে কী যেন যাদু ছিল।তুহফার বুক ধড়ফড় করে উঠে। হৃদ স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ হারায়।ঢোক গিলে সজোরে।
•
ভাইয়ার পকেট আজ খালি করবে অভ্র।তাকে এক স্থানে বেশিক্ষণ চোখে পড়ছে না।শৈল মাছের মতো ধরতে নিলেই ছুটে যাবে এমন মনোভাব।ক্ষণে ক্ষণে এ-শপ ও-শপ ঘুরেফিরে দুহাত ভর্তি করেছে শপিং ব্যাগে। সব তার নিজের জন্য। এতে তুহফা অথবা সুখ কারো ভাগ নেই।নূরাটার কথা মনে পড়ে হঠাৎ। বেচারি তাদের সাথে আসতে খুব জেদ ধরেছিল।বর্ণ সাথে নেয়নি। ধমকে ক্রন্দনরত মেয়েটাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে যেমন,সাথে একঝুড়ি অভিমান। তখন ছুটে বাড়ি ঢুকার আগে অশ্রুসিক্ত চোখে আঙুল তুলে ঠোঁট উল্টেপাল্টে বর্ণকে শাসিয়ে দিয়েছে সে,
‘ ধমকেছো না?আরেকবার আমার সাথে ‘এই পাকনি’ ‘এই পাকনি’ বলে আলগা দরদ দেখাতে এসো শুধু।ঘুষি মেরে মুখ ভেঙে দেবো!’
কতো অভিমান,অভিযোগ, প্রতিশোধ পরায়ণ ছিল তার কন্ঠে। অথচ বর্ণ’র কিছু এলো গেলো বলে মনে হয়না।কপাল গুটিয়ে চেয়ে থেকেছিল কেবল। ইশশ্ সুখ যদি জানতো। ভ্রু গুটিয়ে চেয়ে থাকার মাঝে বর্ণ’র মস্তিষ্কে একটা কথাই উঁকি দিচ্ছিল বারংবার,
‘ ফুল.. ফুল.. আমার বোবাফুল! ছোট বাচ্চাটাকেও নিজের মতো বানিয়ে নিলি? অন্যায় করেছিস জানেমান!খুব খুব অন্যায়! শাস্তিটাও পেয়ে যাবি সময়মতো!তবে ধরনটা ভিন্ন হবে! আমার নিজের মতো!’
•
ডিকিতে নিজের ব্যাগ সামগ্রী আলাদা সরিয়ে রেখে পুণরায় মলে ফিরে অভ্র।ভাইয়া আজ ক্রেডিট কার্ড ফ্রি করে দিয়েছে।দু হাত মেলে খরচ করতে কোন বাঁধা নেই।
মেয়েদের লেজ ভারী অভ্র কথাটির আজ সত্যতা প্রমাণ পেলো ।এখনো নাকি সুখ আপি বিয়ের কাপড় চ্যুজ করতে পারেনি। বৈঠকে বসেছে চার রমণী। গর্জিয়াস গাউন, নাকি লেহেঙ্গা, নাকি শাড়ি?বিয়ের ড্রেস হিসেবে কোনটা আকর্ষণীয় দেখাবে ? সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সকলে। একেকজনের একেক মতামত। অথচ সুখের একটাই বাক্য,
‘ তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ!’
এখন কাকে ছেড়ে কার পছন্দকে সমর্থন করবে সুখ?জড়তা কাজ করছে। অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়ায় সহজে কারো সাথে মিশে যেতে না পারার জটিল রোগ আছে তার।মায়রার সাথে এই নিয়ে দুবার সরাসরি দেখা,কথা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে মায়রা ব্যবহারে অত্যন্ত অমায়িক।তবু, সে সহজ হতে পারছে না।তার উপর ডক্টর! খানিক আগে শপ থেকে বেরিয়ে অন্য শপে যাওয়ার পথে পাশাপাশি এসে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
‘ ফোন এখনো ডিস্টার্ব করে? নাম্বার আনব্লক করোনি যে?’
মূলত সেদিন আনব্লক করতে ব্যর্থ হয়েই সুখ বলেছিল ফোন ডিস্টার্ব করছে। লিস্টের কিছু নাম্বার অটোমেটিকলি ব্লকড। মেহরাব বিশ্বাস করল কী না কে জানে।তবে এই নিয়ে আর কোন প্রশ্ন করেনি। এরপর তেমন একটা সংযোগ ও স্থাপিত হয়নি দু’জনের মাঝে।তুহফার ফোনে এক-দুবার দু-চারটে মেসেজ আদান-প্রদান হয়েছিল এই যা।সেটাও তুহফার জোরাজুরিতে।
সুখ কীবোর্ড চেপে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে আগেই মেহরাব দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ল,
‘ তুমি কী এই বিয়েতে খুশি নও?চাইলে বলতে পারো, এখনো সময় আছে!আমি কিছু মনে করবো না!’ — মৃদু কন্ঠে হাসি ছিটকে আসা স্বর।
সুখ স্তম্ভিত হয়েছিল এক মূহুর্তের জন্য।দম আটকে হতবুদ্ধির মতো নিষ্প্রাণ তাকিয়ে তো ছিল,তবে প্রত্যুত্তর করতে পারেনি। জবাবটা ছিল না তার কাছে।
বর্ণ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দু’জনের কথা না শুনতে পেলেও পাশাপাশি হাঁটতে দেখেছে। উঁহু সুখকে এই নিয়ে কিছু বলেনি।রাগও দেখায়নি।তার মুখোমুখিও হয়নি কিন্তু.. নিজের ক্ষতি অবশ্যই করেছে।হাত থেকে র-ক্ত ঝড়ে পড়ছিল টুপটাপ।সুখ স্পষ্ট দেখেছিল তখন।
‘ এই সুখ! কোথায় হারালি?দেখ এই ড্রেসটা পছন্দ হলো কী না?’
সুখ চমকে তাকায়। ড্রেসের দিকে ভালো মতো না চেয়েই বুঝায়,
‘ পছন্দ হয়েছে ভীষণ !’
‘ ট্রায়াল রুমে গিয়ে একবার পড়ে আয়
দেখি!’ — লেহেঙ্গা হাতে ধরিয়ে দেয় তুহফা। বেখেয়ালি সুখ ঘনঘন মাথা ঝাঁকিয়ে অন্যমনস্কে খানিক দূরে অবস্থিত ট্রায়াল রুমের উদ্দেশ্যে পা চালায়। দৃষ্টি জোড়া আশেপাশে কাকে যেন খুঁজে ফিরছে।
‘ ম্যাম এটা আপনার জন্য। একবার ট্রাই করে দেখুন!’ — ফ্যালফ্যাল চোখে ভ্রু বাঁকায় সুখ।তার জন্য মানে? এদিকটায় তো সে আসেইনি। লোকটার হাতের দিকে কৌতুহল বশত নজর ঘুরায়।এ্যাশ কালার ঝকমকে পাথরের প্রিন্সেস গাউন।সুখ শপে ঢুকতেই কেবল একবার তাকিয়েছিল গাউনটার দিকে। কিন্তু কাউকে কিছুই বলেনি।তবে এটা তার হয়ে গেল কবে?
‘ এটা আমার জন্য মানে?কে বলেছে?আমি তো…’ —সুখ কথাটি বলে হাতের ইশারায়। ভাগ্যিস লোকটা বুঝেছে তার ইঙ্গিত। মৃদু হেসে তার ঠিক পিছু ইশারা করে বললো,
‘ ওই তো স্যার!’
স্যার?কে হতে পারে?মেহরাব নয়তো? মুখে অন্ধকার নামে সুখের। অদৃশ্য একটা শঙ্কা এসে খপ করে কলিজাটা মুচড়ে ধরলো যেমন।ধীর লয়ে পিছু ঘুরেই স্তব্ধ হয়ে দৃষ্টিপাত। মুখে মাস্ক। চোখে গ্লাস।হাতে ব্যান্ডেজ; তাতে র-ক্ত ভাসমান।বর্ণ ভাই!তার থেকে একটু দূরেই , বুকে হাত বেঁধে কোন কিছুতে ঠেশ দিয়ে হেলে দাঁড়িয়ে।পোশাক পাল্টে নিয়েছে। ব্ল্যাক শার্টের ভেতর থেকে বুকের দিকটায় হোয়াইট টিশার্ট উঁকি দিচ্ছে।
সে তাকাতেই চোখের গ্লাস খুলে হাত নাড়িয়ে ‘হাই’ জানালো। অসভ্যদের মতো।
বুক ছিঁড়ে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো সুখের।শ্বাসটি স্বস্তির নাকি সঠিক বুঝা গেল না।তবে নাকচ করলো লোকটাকে।বলল,
‘ এটার আর প্রয়োজন নেই।’ –হাতের লেহেঙ্গা দেখিয়ে বুঝাল,-‘ এই যে, এটা বিয়ের ড্রেস হিসেবে সিলেক্টেড!’
অদূর থেকে মাস্কের আড়ালে চোয়াল শক্ত হয় বর্ণ’র। হাতে হাত ঘঁষে ঠোঁট গোল করে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ে।গাউন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা নিরুপায় মুখে প্রশ্নাতীত চোখে তাকিয়ে রয়।যার অর্থ,
‘ এটা নিতে ম্যাম নিষেধ করে দিয়েছে।এখন কী করবো?’
‘ এই সুখ হলো তোর?’ —পরপরই সুখকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুহফা হতাশ গলায় বলল,
‘ এখনো দাঁড়িয়ে আছিস!লেইট হয়ে যাচ্ছে।আরো কতো কী কেনা বাকি!’
‘ স্যরি.. যাচ্ছি এখনি!’
মেরুন রঙা ভারি দুলহান লেহেঙ্গাটা সামলাতে বড্ড হিমশিম খাচ্ছিল সুখ।বর্ণ হুটহাট মেহরাবের পাশে এসে বসল।সকলে তখন সুখের প্রশংসা মত্ত!
মায়রা বলল,
‘ আমাদের সুখকে তো ভারী মিষ্টি লাগছে!’
‘ বউ বউ.. পুতুল বউ!’ –অভ্র বলল।সুখ ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে দৃষ্টি নামিয়ে লজ্জা মিশ্রিত হাসে। পরপরই বুকটা চিনচিনে ব্যাথায় ককিয়ে উঠে। ‘পুতুল বউ’ নামটা আব্বু বলে মাঝে মাঝে।বউ নামটা মুখে নিলেই তখন প্রচন্ড কান্না পেতো সুখের।মনে হতো এই শব্দের জোর এতোই তীব্র যে, কন্যাদের বাবার বাড়ি ছেড়ে, সকল পিছুটান ছিন্ন করে অনেক দূরে অপরিচিত কোন পরিবেশে, অচেনা মানুষের সাথে বসবাস করতে হবে আজীবন। দিনটি কী কড়া নাড়ছে তার দরজায়? বুকের ভেতর অসহনীয় ব্যাথার ঢেউ কেনো থামে না?কী করবে সে? হৃদয়টা যে বড্ড যন্ত্রণাসিক্ত!
‘ দেখতে হবে না কার চয়েস?’ —রিদির দুষ্টু মাখা স্বরে ধড়পড়িয়ে মাথা তুলল সুখ। প্রশ্নাতীত চোখে তুহফার দিকে চাইল।
‘কার পছন্দ?’
‘ তুমি জানো না সুখ?’ —মায়রা অবাক হলো কিঞ্চিৎ। পুরোটা সময় তো সুখ পাশেই বসেছিল।
সুখ লজ্জাষ্কর হেসে দুদিক মাথা দুলায়। সত্যিই খেয়ালে ছিল না।সে তো তখন অন্য জগতে বিচরণ করছিল।কী ভেবে অন্যমনস্ক ছিল নিজেরই মনে পড়ছে না।
রিদি দিল জবাবটা,
‘ কে আবার! তোমার একমাত্র হবু বর ডক্টর শাহরিয়ার মেহরাব!’ —বলার ফাঁকে দুহাতের পাতা মেহরাবের দিকে মেলে ধরল।
শিরদাঁড়া সোজা করে বসল সুখ।গলা খাঁকারি দিয়ে লেহেঙ্গার কলার টেনেটুনে দাঁড়ায়।নজর লুকোতে চায় ঘনঘন পল্লব ঝাপ্টে এদিক ওদিক দৃষ্টি ছিটিয়ে।তবু, বর্ণ’র সাথে চোখাচোখি হয়েই গেল।সাথে মেহরাবের সাথেও।তার দিকেই মৃদু হেসে লোকটা তাকিয়ে।বর্ণ কাঁধে হাত চাপড়ে তার।
‘ কী দারুণ চয়েস আপনার ডক্টর!রিয়্যালি কোমেন্ডাবল!’
‘ থ্যাঙ্কিউ!’
বর্ণ সুখের দিকে সরু চোখ তুলে দেখল।ঘাড় বাঁকিয়ে থুতনিতে হাত রেখে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল সুর টেনে,
‘ ওয়েলকাম!’
#চলবে🥀

