#আমার_বোবাফুল(৬০)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
সুখ চেয়েছিল নূরাসহ সেও নিবাসে ফিরে যাক! ক্যাসেলে ছিল তো অনেকদিন,পরিবার থেকে দূরে সরে।বর্ণ এযাজত দেয়নি এই প্রস্তাবে। ফলস্বরূপ, রাগ-অভিমানের সংমিশ্রণে সে নূরাকে নিয়ে অন্য রুমে চলে গেল। যাওয়ার সময় বুঝিয়ে দিল, ” আপনি খুব খারাপ,নিষ্ঠুর, পাষণ্ড! আমার আশেপাশেও ঘেঁষবেন না আজকের পর।”
সে চাইলেও এখান থেকে ছুটে চলে যেতে পারবে না।কারণ আছে,তা হলো– ডোর সিকিউরিটি সিস্টেম। ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পাসওয়ার্ড কাজ করলেও, বের হওয়ার সময় বর্ণ’র একার ফিঙ্গারপ্রিন্টই প্রয়োজন। সেদিন নিজে নিজে চলে যেতে গিয়েও এই কারণে ক্যাসেল থেকে বেরোতে পারেনি।বর্ণ বলে দিয়েছে, ” ক্যাসেলে প্রবেশ সুখের ইচ্ছায় ঘটলেও, বেরোতে হবে কেবল আসফিয়ান বর্ণ’র ইচ্ছাতে।”
নূরার এখানে আসার কথাটি আইজাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।সুখ বেডের হেডবোর্ডে আধশোয়া হয়ে বসল,কোলে টমি। বহুদিন পর আদরের প্রাণীটিকে ছুঁতে পেরে মনটা শান্ত অনুভব হচ্ছে কিছুটা। তদ্রুপ,টমিও গুটিসুটি মেরে নিসংকোচে পেটে মুখ গুঁজে আছে চুপটি করে।নূরা শুয়া থেকে উঠে বসে বলল, ” সুখ এতো দিন তুমি এই বাড়িতে ছিলে?”
সম্মতি জানালো সে।নূরা ফের বলে, ” আমাদের বাড়িতে আর ফিরবে না?”
পুণরায় উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যাঁ’ জানাল সুখ।নূরা শুধায়, ” বর্ণ যে চাচ্চুকে বলল তোমাকে ও-বাড়ি আর ফিরিয়ে নেবে না। নিজের কাছেই রেখে দেবে?”
টমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সুখ। কথাগুলো শ্রুতি পথে প্রবেশ করতেই চমকে মাথা তুলল। ইশারায় জানতে চাইল, ” আব্বুকে এসব বলেছে বর্ণ ভাই? কখন, তুমি কীভাবে শুনলে?”।
বর্ণ’র গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে যখন ডিকি’তে চড়ে বসার প্ল্যান কষে গেটের দিকে যাচ্ছিল তখনই বর্ণ আর চাচ্চুর কিছু কথোপকথন শুনে ফেলেছিল সে।কথায় কথায় চাচ্চু রেগে যাচ্ছিল।একটু পর আবার কী যেন হলো, দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরল।এর বেশি কিছু দেখতে বা শুনতে পায়নি নূরা।ডিকি খুলতে না পেরে, আসিফ জায়েন্টকে অনুরোধ করতে লেগে পড়েছিল চুপিচুপি।
সব শুনে সুখ অল্পক্ষণ চুপসে থেকে ভাবনায় পড়ল।কী চলছে তার অগোচরে?আম্মু, আব্বু তাকে ছাড়া যেখানে দু’দিনের বেশি বরদাস্ত করে না, সেখানে ক্যাসেলে বর্ণ’র সাথে এতো দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও কেনো তাকে বাড়ি ফিরতে বলছে না? ভিডিও কলেও হাসিমুখে থাকে, যদিও তখন সুরগুলো বিষন্ন শুনায়। এর কারণ বর্ণকে জিজ্ঞেস করবে?করলেও সঠিক জবাব মিলবে?
নূরাকে শুইয়ে দিল বালিশে।পাশে আধশোয়া হয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দুজন এটা ওটা বলছে।যদিও কথা নূরাই বেশি বলছে। সুখের মাথায় অন্য ভাবনা। হঠাৎ সে জানতে চাইলো, ” কাউকে কিছু না বলে এভাবে ডিকিতে লুকাতে ভয় করেনি? এমন করা উচিৎ না নূর।যদি গাড়ির নিচে বোম ফিট থাকতো?যদি মাঝ রাস্তায় ব্লাস্ট হয়ে যেতো?আমরা নূরাকে কোথায় পেতাম আবার?”
সুখের ইশারা বুঝতে মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয়।পুরো কথা আয়ত্ত করতে খানিক সময় লাগল নূরার। এরপর হতভম্ব হয়ে তাকাল। গাড়ির নিচে বোম?মাঝ রাস্তায় ব্লাস্ট? এভাবে তো ভেবে দেখা হয়নি। সিনেমায় বার কয়েক এমন ঘটতে দেখেছে নূরা। দৃশ্যগুলো স্মৃতিপটে ভাসতেই ঢোক গিলে ভয়ে তটস্থ হয়ে সুখকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ” স্যরি, কাউকে না জানিয়ে এভাবে আর ডিকিতে লুকাবো না। আচ্ছা, আমার কিছু হয়ে গেলে সিআইডি অফিসার’রা কী আসিফ জায়েন্টকে ইন্টারোগেট করতো না?ও-ই তো আমাকে ডিকিতে চুপাতে হেল্প করেছিল।” –একটু ভেবে ফের বলল, ” অযথা কেসে ফেঁসে যাবে বলে নিশ্চয়ই বলতো না।তখন কীভাবে জানতে তোমাদের আদরের নোরা বর্ণ’র গাড়ির ডিকিতে ছিল?”
সে ফের বলল, ” গাড়িতে তো বর্ণও ছিল। তারমানে আমার সাথে সাথে বর্ণও ব্লাস্ট হয়ে যেতো? ওহ্ মাই গড! একদিনে আম্মু দু’টো ছেলে মেয়ে হারিয়ে ফেলতো আর তখন আব্বুর সব সম্পত্তির মালিক হয়ে যেতো অভ্র!তাই না বলো?”
নির্বাক চোখে সুখ চেয়ে থেকে রোবটের মতো শেষোক্ট কথাটির জবাবে উপর নিচ মাথা ঝাঁকাল শুধু।মনে মনে প্রসংশা করল বোধহয়। বাচ্চাটার ভাবনা চিন্তা কতো প্রখর। সত্যিই প্রশংসনীয়!
…
তুহফাকে মাহিরের সামনে ডেকে আনা হয়েছিল।জানতে চাওয়া হয়, ” এই ছেলেকে তুমি পছন্দ করো? জীবনসঙ্গী হিসেবে তাকে পারফেক্ট মনে হয়?তার সাথে এক জীবন পাড়ি দিতে পারবে?”
আযাদ সাহেবের কন্ঠ ধারালো ছিল বেশ।তুহফার হৃদয় কেঁপে উঠে। আড়চোখে মাহিরের দিকে তাকায়। লোকটাও তার দিকে চেয়ে। কেনো, তার জবাব শুনবে বলে?তুহফা মাথা তুলল না।মামাদের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফুটে কিছু চাইতে হয়নি কখনো।আজ কীভাবে চাইবে?বলল, ” এ ব্যপারে আমার কোন মত নেই।তোমরা যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাই মাথা পেতে নেবো!”
” বর্ণ যাকে পাত্র হিসেবে সিলেক্ট করেছে, তার সাথে বিয়েতে বসতে বললে?”– তামিজ সাহেবের কথার প্রেক্ষিতে তুহফা তড়িৎ বলে, ” নির্দ্বিধায় বসব!”
” মাহির যে বলল তুমিও তাকে পছন্দ করো?”
গলা শুকিয়ে আসে তুহফার। কাঁপা গলায় মাথা নত রেখেই বলল, ” কথাটি আমি কখনো মুখ ফুটে বলিনি তো?”
দুই শিকদারের দৃষ্টি ঘুরে গেল মাহিরের দিকে।হানিফা বেগমও উপস্থিত হয়েছেন সেখানে। বললেন, ” আমার নাতনি দেখি তোরে অস্বীকার করে দিছে।এহন তুই কিছু বলবি?”
তখন মাহিরের জবাব ছিল নির্বিকার, ” সব কথা কী মুখ ফুটে স্বীকার করা জরুরী?মনের মানুষের কিছু কথা প্রিয়জনকে নিজ উদ্যোগে বুঝে নিতে হয়। নতুবা কীসের প্রেমিক পুরুষ হবো আর?”
ব্যাস, এই অব্দি ছিল তখনকার দৃশ্যপট। এরপর এখনো কোন সিদ্ধান্তে উপনিত হয়নি শিকদার’রা। মাহির চলে গেছে নিবাস থেকে, খানিকটা অপমান বয়ে নিয়ে।তুহফা ছুটে এলো নিজের ঘরে। সন্ধ্যার পর আর বের হওয়া হয়নি।হানিফা বেগম ধীর পায়ে রামসার সাহায্য নিয়ে এসেছিল তার কাছে। অনেক্ষণ কীসব বুঝিয়েছে, অন্যমনষ্ক থাকায় কথাগুলো তুহফার মনে পড়ছে না সঠিক। এরপর ছোট মামি তালাশ করল রাতের খাবার খেতে।উনাকেও ক্ষিদে নেই জানিয়ে দিয়েছে সে।মনটা উদাস হয়ে আছে। সত্যিই ক্ষিদে-টিদে মরে গেছে। রুবাইয়্যাত বেশি জোর করেননি। মেয়েটার মনের অবস্থা অল্পবিস্তর অনুধাবন করে, একা থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন।
রাত বাড়ছে। কোলাহল কমে গিয়ে শহরে নেমে আসছে শুনসান নীরবতা।তুহফা কোলে বালিশ আঁকড়ে রেখে গালে হাত চেপে বসে আছে অদৃশ্যে চেয়ে। শুয়েছিল একটু আগে কিন্তু ভেতরের অস্থিরতায় চোখের ঘুম হারিয়ে গেছে। অন্তঃস্থলের উদ্বেগ দমাতে না পেরে শেষমেশ উঠে বসে আছে। আচমকা ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল।কল এসেছে। ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে যেই নাম্বার থেকে কল এসেছিল,আজও সেই নাম্বারটাই ভেসে উঠেছে। রিসিভার তুলে কানে চাপল। দু’পাশেই নীরবতা। মুখটা প্রথমে তুহফাই খুলল , ” কে বলছেন?”
” আমি!” —ছোট একটা শব্দ। অথচ আওয়াজটা কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই কন্ঠের অধিকারী মানবকে চিনে নিতে তুহফার বেগ পেতে হলো না। চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ” হঠাৎ এতো রাতে?কোন প্রয়োজনে?”
” প্রয়োজন ছাড়া কল দেওয়া যায়না বুঝি?”
তুহফা জবাব দেয়, ” মধ্যরাতে পর নারীকে অ-প্রয়োজনে কল দেওয়ার অভ্যাস কোন কাতারে পড়ে জানেন নিশ্চয়ই? তাছাড়াও খুব শীঘ্রই কারো বউ…”
” শাট-আপ!” — দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে মাহির। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে শিকদারদের উপর উঠা অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশে মেয়েটাকে গিয়ে দু’টো চড় দিতে। তখন বলতেই পারতো,সেও মাহিরকে পছন্দ করে।এরফলে আজকের চিত্রটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো।তুহফা হতবাক হয়ে বলল, ” মাঝরাতে ধমকাবেন বলে কল দিয়েছেন আমায়?”
…
নূরাকে ঘুম পাড়িয়ে,গায়ে চাদরটা টেনেটুনে দিয়ে ধীর পায়ে কক্ষ ত্যাগ করল সুখ। উদ্দেশ্য বর্ণ’কে কয়েকটি প্রশ্ন করা।
ডোর ভিড়িয়ে রাখা ছিল। আস্তে করে খোলে অভ্যন্তরে নজর ফেলতেই সামনের দৃশ্যটিতে নজর আটকে গেল সুখের।অদূর থেকে সে দেখতে পায় ল্যাপটপ স্ক্রিনে পরিবারের সকলের এক ফ্রেমে বন্দী ছবি। ল্যাপটপের সম্মুখে বর্ণ বসা।জুম করে সূক্ষ্ম নেত্রে একেকজনকে গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে।কেউ কারো ছবি সামনে রেখে তখনই এতো মনোযোগ দিয়ে পরখ করে, যখন আমরা তাকে মিস করি।বর্ণও কী তবে পরিবারকে মিস করছে?
সুখ দাঁতে দাঁত চাপল।তাকে খাঁচায় আটকে রেখে,নিজে আজ নিবাসে ঘুরেফিরে এসে এখন এসব করছে? আচমকা কাঁচ ভাঙার আওয়াজে কেঁপে উঠলো সুখ।সেই সাথে রূহ-টাও ছলকে উঠল বোধকরি। বর্ণ’র হাতের গ্লাস তখন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ঝরঝর করে ফ্লোরে ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে।সুখ ছুটে এলো তড়িৎ, বর্ণ’র সামনে এসে দাঁড়াতেই হতচকিত হয়ে মূহুর্তেই কৌশলে ল্যাপটপ ফোল্ড করে নিল মানুষটা এবং পরক্ষণেই কপালে হাত রেখে চোখ বুজে, ঢেকে নিল।সুখ এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল এমন আচরণে।বাদলা দিনের ঝড়ো হাওয়ায় বিশাল আকাশে এক চিলতে বিজলীর মতোন সে এক ঝলক দেখেছে বর্ণ’র ওই রক্তিম চোখ জোড়ায় জল ছলছল।
সুখ অচিরেই বর্ণ’র পাশে গিয়ে বসল।খুব অধিকার খাটিয়ে তার চোখ থেকে শক্তপোক্ত হাতটা সরিয়ে একবার র/ক্তে র/ঞ্জি/ত হাতটা অবলোকন করে করুণ দৃষ্টিতে বর্ণ’র চোখে চোখ রাখে।তার শান্ত,নিথর দৃষ্টি প্রত্যক্ষ করে হৃদয় হুরমুর করে উঠল সুখের।এই দৃষ্টি তার চেনা,খুব নিকট থেকে দেখা। যখন সে নিজেকে অসহায় বোধ করে, আত্মবিশ্বাসে ভঙ্গুর ধরে,হৃদয়ে প্রচন্ড আঘাত লাগে, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তখন তার দৃষ্টিও এমন দেখায়।এই দৃষ্টির সাথে আসফিয়ান বর্ণ’র একটুও যায়না। পুরুষটিকে মানায় নির্লিপ্ত,কঠোর দৃষ্টিতে অথবা ধূর্ত, রহস্যময় চাহনিতে কিংবা দুষ্টুমি ভরা নেত্রে।
সুখের অস্থির,নির্বাক চোখ দেখে বর্ণ মৃদু হাসল। নিষ্প্রাণ সেই হাসিতে প্রতিবারের মতো হেঁয়ালিপনা, দুষ্টুমি ছিল না।বর্ণ শীতল গলায় মৃদু আওয়াজে বলল,” এখনো ঘুমাসনি? নূরকে ছেড়ে চলে এলি?আমায় মিস করছিলি নাকি বউফুল? এই পাষণ্ড পুরুষকে ছেড়ে দূরে থাকা যাচ্ছিল না?দ্যাট মিন্স,চোখে হারাচ্ছিলি আসফিয়ান বর্ণকে?’
কথাগুলোতেও আগের মতো সতেজতা কিংবা দুষ্টুমি খোঁজে পায়নি সুখ। বরং মনে হলো কিছু একটা লুকাতে সময়ের সৎ ব্যবহার করেছে মাত্র। এক বুক সাহস সঞ্চয় করে সুখ কাঁপা কাঁপা হাতটা বর্ণ’র গালে ছোঁয়াল।নির্বাক চোখে ক্ষণকাল দৃষ্টি বিনিময় করে চোখের দিকে ইশারা করে প্রশ্ন করল,” কাঁদছিলেন আপনি! কোথায়, কোন কারণে কষ্ট পাচ্ছেন বলুন আমায়?”
বর্ণ একহাতে সুখকে কাছে টেনে ঝুঁকে এসে ঘাড়ে মুখ ডুবালো সুখের।বলল স্বাভাবিক ভাবেই, ” কাঁন্না?আর আমি?হোয়াটস্ রং উইথ ইউ ফুল? চোখের অশ্রু মেয়েদের শখের পুরুষের হৃদয় গলিয়ে উদ্দেশ্যে হাসিলের প্রধান হাতিয়ার। এসব পুরুষের জন্য নয়। আসফিয়ান বর্ণ’র জন্য তো আরও নয়।” –ঘাড়ে আলতো ঠোঁটের পরশ এঁকে মুখ তুলল সে।সুখ সন্দিহান। বুঝাল, ” কিন্তু আমি যে দেখলাম আপনার চোখে অশ্রু?”
#চলবে🦋

