আমার_বোবাফুল(৬২•২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্

0
56

#আমার_বোবাফুল(৬২•২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্

নিস্তব্ধ কক্ষে কাঁচের ফ্লোরে পা নাড়ার টুংটাং শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে।সেই সাথে কিছু বাক্য গুচ্ছ-

“ ভার্সিটিতে পড়ছি,তোর বাবা তখন ছিল আমার বিশ্বস্ত বন্ধু।আইজা আমাদের দুই ব্যাচ জুনিয়র। তাকে ভালোবাসাতাম আমি কিন্তু প্রকাশ করার মতো সাহসী ছিলাম না।সেসময় প্রেম আদান প্রদানের অন্যতম মাধ্যম চিঠি। ব্যর্থতা আমার সেখানেই।অতো আবেগ দিয়ে আমি চিঠি লিখতে জানি না, হাতের লেখাও চরম বাজে।আইজা খুঁতখুঁতে স্বভাবের মেয়ে, হাতের লেখা দেখেই হয়তো আমায় রিজেক্ট করে দিত।তোর বাবাকে চিঠি লিখে দিতে বললাম।এটা আমার প্রথম ভুল।আইজাকে ভেবে ভেবে আমার হয়ে চিঠি লিখতে গিয়ে আযাদ নিজেই ওর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়বে আমার ভাবনার বাইরে। দ্বিতীয় ভুলটা কোথায় করেছি জানিস?”

রিকাজ ফরাজী চোখ তুলে বর্ণ’কে প্রশ্ন করল।পায়ের আঘাতে তখনো ফ্লোরে টুংটাং শব্দ ভাসমান।বর্ণটা প্রত্যুত্তর করেনি, সরু চোখে চেয়ে থেকেছিল শুধু। পরবর্তী কাহিনী শুনতে সে আগ্রহী নয় ভেবে মনক্ষুণ্ণ হলো রিকাজ ফরাজী’র।তবু বলল, “ চিঠি তো আযাদ লিখে দিয়েছে, এরপর আইজার সামনে গিয়ে প্রেমের কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করছিলাম। তখন মনে হলো এই কাজটাও আযাদকে দিয়েই করাই! ভাবনা মতোই কাজ করলাম।আযাদের হাতে চিঠি পাঠিয়ে দিলাম তাকে।মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা চিঠির কথাগুলো তাকে প্রভাবিত করেছিল আর সে ভেবে নিয়েছে ওই চিঠি; প্রেম নিবেদন আমি নয়, আযাদ করেছে। দেখেছিস ভুলটা কোথায়?”

একটু থেমে সে পুণরায় বলা শুরু করে, “ চিঠির শেষে ইতিতে কারো নাম লেখা হতো না।লেখা হতো ‘ ইতি তোমার প্রেমিক’!বেশ কয়েকবার চিঠি আদান-প্রদানের মাস খানেক পর আইজা জানতে পারল চিঠিগুলো মূলত আমার। কিন্তু ততোদিনে সে চিঠির মালিক আযাদ ভেবে তাকেই ভালোবেসে মুগ্ধ।সেটা আযাদ নিজেও জানত না।এমনটাই ওই ****টা আমায় বলেছিল কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনা।ও জেনেবুঝেই এটা করেছে, আমার প্রথম ভালো লাগা,ভালোবাসাকে ছিনিয়ে নিতে।”

“ ছিনিয়ে নেওয়া একটা ফ্যাশন।আই অ্যাম ইন ফেভার অফ ইট!” —এতোক্ষণে মুখ খুলল বর্ণ।তাও অপছন্দের একটা বাক্য দিকে।রিকাজ ফরাজী দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে রইল।

“ দুই বন্ধুর মাঝে দ্বন্দ্ব লেগে যায় একজন আইজাকে ঘিরে। অন্যদিকে আইজা আযাদের প্রেমে এতোই মজে গেল যে- তার সাথে সরাসরি কথা বলতে হম্বিতম্বির শেষ নেই।ফর ইউর কাইন্ড ইনফর্মেশন- এরআগে আমরা কেউ কারো সাথে চোখাচোখি ছাড়া সরাসরি মুখ ফুটে কথা বলিনি। তখনকার প্রেমের নিয়মে এটা ছিল না।দূর থেকে চিঠিতে কথোপকথন করার মজাই অন্যরকম।পানি হবে?গলাটা শুকিয়ে আছে।তোর বেয়াদব চ্যালা’রা বাবার বয়সী একটা মানুষকে তুলে এনে দু’দিন ধরে কিছু খেতেই দেয়নি।কাড়ি কাড়ি টাকায় এতো দিন পাললি অথচ ম্যানার্স শিখাসনি?”

বর্ণ’র ইশারায় একজন এগিয়ে এসে পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে গেল। পানি পান করে রিকাজ বলে চলল, “ প্রথমবারের মতো আমরা তিনজন সামনাসামনি কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম।আযাদের জন্য আইজা এতোটাই মরিয়া হয়ে উঠেছে যে- আমি তাকে ভালোবাসি বলতে গালে হাত উঠাতেও ভাবল না।”–বা গালে হাত মেজে মৃদু হাসল সে। যেনো সেই দিনের,সেই মূহূর্তের কথাটা আজও তরতাজা।

“ চড় খেয়ে আমি কিছুই বলিনি। ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি।আযাদ সেদিন কথা দিয়েছিল- আইজা তাকে ভালোবাসলেও, যতোদিন না সেই ভালোবাসা আমার নামে ট্রান্সফার হবে ততোদিন ওর সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না অথচ… ওই বেঈমান কয়দিন পর আমার কাছ থেকে এজাযত নিতে এসেছিল- সে আইজাকে বিয়ে করলে আমি কী কষ্ট পাবো? বাহ্ খুব ভালো প্রশ্ন।আমিও সেদিন বললাম- ভীষণ কষ্ট পাবো।তুই ওকে বিয়ে করিস না। প্রয়োজনে আমরা দু’জনেই ওকে ভুলে যাই? কিন্তু না।তারা বিয়ে করে নিল। আমাকে দাওয়াতও দিয়েছে। একজন আমার ভালোবাসা, অন্যজন আমার দোস্ত।বিয়েতে উপস্থিত না থাকলে খারাপ দেখায়, তাই চলে গেলাম বিয়েতে।”

“ এরপর দুঃখ একপাশে রেখে বিয়েতে গিয়ে কোর্মা, বিরিয়ানি, বোরহানি, রোস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে পেটপুরে খেলাম, এসব কাহিনী শুনতে ইন্ট্রেস্টেড নই ইয়ার।কাম টু দ্য পয়েন্ট!”

কথার মাঝে বর্ণ’র অ-নাগ্রহ দেখে হতাশ হলো রিকাজ। বহুদিন পর পুরোনো স্মৃতি চারণ করছে।তাই পঁই পঁই করে শুরু থেকে বলতে ভালোই লাগছিল। আরেকবার পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে আসল পয়েন্টে ঢুকল সে,

“ তাদের ভালোবাসাকে পরিপূর্ণতা দিতে মা হতে চলল আইজা।আমি দেশ ছেড়ে দূরে চলে গেলাম।তখনো তার মায়া কাটিয়ে সরে আসতে পারিনি। আবার একদিন ফিরে এলাম আযাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ আর আইজার নিশান হিসেবে তাদের ছোট প্রাণ বাচ্চাকে নিয়ে যেতে!”

“ হোয়াট?”

“ হ্যাঁ, তাদের প্রথম সন্তানকে নিয়ে দেশ ছেড়ে সারাজীবনের জন্য পালিয়ে গেলাম।সেই সন্তান কে জানিস?”–পরপর ডানে ইশারা করে বললো,“ জোসেফ জোয়ার্দার!”

নির্লিপ্ত বর্ণ’র ক্ষুরধার চোখদুটো এই প্রথম থমকাল। অস্ফুট স্বরে বলল, “ এ্যাঁই রিকাজ ফরাজী, জবান সামলে!বাজে বকিস না!ও যদি মায়ের প্রথম সন্তান হয়, তবে আমি কে?”

প্রশ্নে রিকাজ ফরাজী হাসল।গা দোলানো সেই হাসি।হাসতে হাসতেই একসময় থেমে বলল, “ তুই একটা অনাথ!”

কথা শেষ হতেই বুকে থাবা পড়ল।বর্ণ থাবা বসিয়ে বুকের কলার ধরে মুখোমুখি এনে রক্তচক্ষু নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠে, “ মন খুলে হাসার সুযোগ পেয়েছিস দেখে জানের ভয় উবে গেছে, না?”

আচমকা আক্রমণে বুক ধড়ফড় করে উঠেছিল ফরাজী’র। নিজেকে সামলে বলল,“ উচ্চ- মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ইউকে গিয়ে এক প্রভাবশালীর সাথে বন্ধুত্ব পেতেছিলাম।ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বস্ত হয়ে উঠি।টাকা চাই আমার, রাজত্ব চাই।তাই মনুষ্যত্ব পায়ের তলায় পিষে একদিন কেউ না জানার মতো ওই বন্ধু ও তার স্ত্রীকে ঘুরতে পাঠিয়ে গাড়ি ব্রেকফেল করে দিয়ে এ-ক্সি-ডেন্ট করিয়ে দিলাম। বন্ধুটা স্পট ডেড আর বউ মৃ!ত্যুপথযাত্রী।ম-রার আগে তার এক মাসের বাচ্চাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল- তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি নিয়ে আমি যেভাবে খুশী ভোগ করতে পারি। বিনিময়ে তাদের বাচ্চাকে যেনো আদর ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে তুলি। সামান্য মনুষ্যত্ব হয়তো বেঁচেছিল, তাই তোকে শিকদার নিবাসে রেখে তাদের ছেলেকে অ-মানুষের মতো অ-মানুষ করতে আমার সাথে নিয়ে পালিয়ে গেলাম।”

বর্ণ’র হাত আলগা হয়ে গেল।বাবা-মার প্রতি তার বিশ্বাস, ভরসায় আঘাত হানতে রিকাজ পুণরায় বলল, “ তোদের অদল -বদল করার পর বিষয়টা কলে আযাদকে অবগত করে দিয়েছিলাম।ওই মূহুর্তে নিজের উপর কতোটা গর্ববোধ হচ্ছিল এক্সপ্লেইন করার মতো নয়।তারা জানবে- তাদের কোলে যে আছে তার সাথে র!ক্তের কোন সম্পর্ক নেই।যার সাথে র!ক্তের সম্পর্ক সে কোথায, কোন অবস্থায়, কেমন আছে কিচ্ছু জানবে না।হা হা হা… ! মনে করে দ্যাখ- তোকে নিয়ে ওরা দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াত।হাহ্, মূলত তারা তাদের সন্তানকে ফিরে পেতে আমি যখন যেই ঠিকানা দিয়েছি সেখানেই ছুটে যেতো। প্রতিবছর তোর যেই জন্মদিন পালন করা হয়- সেটাও তাদের ছেলের জন্ম তারিখ অনুসারে।”

“ ইউ ফ্রড!”—মুষ্টিবদ্ধ হাতটা রিকাজ ফরাজীর মুখ বরাবর বসিয়ে দেয় বর্ণ। গলগলিয়ে ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে।তবু ঠোঁটের হাসি কমে না। গড়গড় করে বলল, “ তারা কখনো তোকে তুই ভেবে ভালোবাসেনি রে পাগল বরং সবসময় তোর মাঝে নিজেদের হারানো ছেলের প্রতিচ্ছবি খোঁজে বেড়িয়ে এসেছে। সত্যি তো এটাই তুই একটা অনাথ।এই পৃথিবীতে তোর কেউ নেই।”

“ এই রাসকেল’কে থামতে বল।”—হুঙ্কার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো বর্ণ।আরো দুয়েক ঘা বসিয়ে দিল। শরীরের রক্ত টগবগিয়ে ফুটছে যেমন।জোসেফ দূরে টেবিলে ঢলে পড়ে আছে নিভু চোখে। কিছু কথা তার কানেও পোঁছেছে। প্রতিক্রিয়ায় অনেককিছুই বলতে চাইছে কিন্তু শক্তিতে কুল পায়না।

রিকাজের তাচ্ছিল্য স্বর এখনো ভেসে আসছে, “ তুই অনাথ,নাম-জস-ক্ষমতা সব থেকেও কিচ্ছু নেই,একটা নিঃস্ব। পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই তোর।”

জিসান কিছু বলতে চেয়েছিল, বর্ণ শুনেনি।হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে বাইকে চড়ে চলে এলো চোখের পলকে। চোখে ভাসল শুরু থেকেই- জন্মদিন পালনের দিন মম কাঁদত। ওইদিন তার সামনে আসে না, দরজা আটকে ভেতরে বসে থাকে। ছোটবেলায় একবার তার চোখে পড়েছিল সদ্য জন্ম নেয়া শিশুকে তোলা ছবি ফ্রেমে বন্দী,সেটা বুকে চেপে কাঁদছেন ভদ্রমহিলা। দরজা ফাঁক থাকায় বর্ণ অস্থির হয়ে মাকে থামাতে গেলে তিনি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দরজা আটকে দিয়েছিলেন।পরে অবশ্য আদর করে কাছে টেনে নিয়েছিল। ওহ্, বর্ণ’র তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক বুঝে নেয়- ছবিতে জোসেফ ছিল। ওইদিন তিনি পরিমাণের চেয়ে একটু বেশিই ছেলের শোকে শোকাহত হোন, আর… ছেলেকে হারানোর পিছে অনেকটা বর্ণকেই দায়ী করে, তাই তার সামনে আসতো না জন্মদিন পালন করতে? আর এই সামনে না আসাকে সে কতো আবেগ দিয়ে কতো কী ভেবে নিত। অথচ তার সব ভাবনা কী তবে মিথ্যে?তাহলে… এই দীর্ঘ বছরের ভালোবাসা, মমতা এসবও মিথ্যে?

মস্তিষ্কের নানা স্মৃতিচারণ,মা’র প্রতি অদৃশ্য অভিমানের ভিন্ন জগতে চলে যায় বর্ণ। বাইকের স্পিড বাড়ে,ঠিক সেদিনই তার এক্সি/ডেন্ট’টা ঘটেছিল। এরপর সুখকে নিয়ে এলো নিজের কাছে।

মাথার চুল খামচে ধরলো বর্ণ।আজও কানের কাছে কেউ যেনো বলছে, “ তারা কখনো তোকে তুই ভেবে ভালোবাসেনি রে পাগল বরং সবসময় তোর মাঝে নিজেদের হারানো ছেলের প্রতিচ্ছবি খোঁজে বেড়িয়ে এসেছে।তুই অনাথ, নাম-জস -ক্ষমতা সব থেকেও কিচ্ছু নেই,একটা নিঃস্ব। পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই তোর।”

পায়ের নিকটের টেবিলে সজোরে লাথি বসাতেই কাঁচগুলো ঝরঝর করে ভেঙে পড়ে গেল। ভেতরের জেগে উঠা দানবীয় চরিত্রটা থামাতে ব্যর্থ হলো বর্ণ। নিজেকে দমাতে ভেতরে প্রবেশ করতেই মস্তিষ্ক দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে উঠে। আচানক হাতের কাছের যা পেলো সব ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করে। বিড়বিড় করে কী যেন বলছে।হাতে কাঁচ দেবে গিয়ে র-ক্ত ছুটে আসে। অথচ তার মাঝে কোন হেলদোল নেই। কাঁচ চূর্ণ বিচূর্ণ হওয়ার শব্দে ড্রয়িং স্পেসের পরিবেশটা ক্রমশ ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়ে অল্পবিস্তর।সুখ ছুটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসব প্রত্যক্ষ করে ভয়ে ঢোক গিলল। বর্ণ’র চোখের দৃষ্টি, আচরণ তাকে মনে করিয়ে দিল অভ্র’র সাথে হওয়া ঘটনাটি।চুপ করে থাকল না সে। বর্ণকে থামাতে ছুটে এলো।

চূর্ণ চূর্ণ কাঁচ ফ্লোরে লুটোপুটি খাচ্ছে।সুখ দ্রুত হাত ধরতেই ঝাড়া দিল সে, “ সরে যা ফুল।দূরে কোথাও লুকিয়ে যা।আ-আমার কেমন কেমন লাগছে।কন্ট্রোল হারিয়ে পরে তোকে আঘাত করতেও দ্বিধা হবে না। প্লীজ…”

সুখ দুদিকে মাথা ঝাঁকায়।বর্ণকে এই হালে ছেড়ে দিয়ে কোথাও লুকাবে না সে। পুণরায় এগিয়ে এবার বুকে ঝাপ্টে ধরল তাকে।এমন দৃঢ় আলিঙ্গন করল যে- বর্ণ চাইলেও ছাড়াতে পারবে না।

ঘামে জবজবে শরীর, উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দ ভারী।বর্ণ সুখকে নিজে ছাড়াচ্ছে না কেবল মুখে বলছে ছেড়ে দিত।সুখ সেসব তোয়াক্কা না করে পিঠে হাত মালিশ করে ধীরে ধীরে। একসময় বর্ণ নিজেও এমন শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরল যে- সুখের মনে হয় দম আটকে গেছে। কিন্তু সেই ভাবনাটা প্রাধান্য পেলো না যখন পাথুরে সংযমে নিজেকে সকলের সামনে উপস্থাপন করা আসফিয়ান বর্ণ হুঁ হুঁ কেঁদে উঠলো।সে চমকাল, থমকে স্তব্ধ হলো।বর্ণ কাঁদতেও জানে?সে কী ঠিক শুনছে?

ভার সামলাতে না পেরে সুখ সোফায় বসে পড়েছে।বর্ণ ছাড়েনি তাকে। ফ্লোরে লেপ্টে বসে সুখের কোলে মাথা রেখে কোমর ঝাপ্টে ধরে বাচ্চাদের মতো কেঁদে বলল, “ থেকে যা ফুল।তুই ছাড়া আমার কেউ নেই,কেউ নেই”—বিড়বিড় করে, “ ওরা সবাই সেলফিস। নিজেদের স্বার্থে আমায় ভালোবাসা দেখিয়েছে, সব মিথ্যে,সব মিথ্যে।”

হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় হয়।বর্ণ অদ্ভুত করুণ গলায় বলল, “ বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে, ভালোবেসে ভুলিয়ে দে না!”

সুখ নিজেও কেঁদে উঠলো ফুঁপিয়ে।কেন মানুষটা এমন করছে এখনো জানে না। কিন্তু নির্দয় এই পুরুষটির চোখের অশ্রুকণাগুলো তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করছে। বর্ণ থেমে গেল হঠাৎ।একদম স্বাভাবিক অথচ রক্তিম চোখ নিয়ে মাথা তুলল। এরপর উম্মাদের মতো সুখের মুখটা হাতের আঁজলায় পুরে অস্থির গলায় বলল, “ শোন, আমি তোকে কোথাও যেতে দিচ্ছি না আর। প্রয়োজনে নিজের কাছে বন্দী বানিয়ে রেখে দেবো।তোর পৃথিবী বলতে শুধু আমিই থাকবো আজকের পর।হুম?”

অশ্রু ঝড়ে পড়ছে নিরবে,সুখ নির্বাক চোখে চেয়ে রইল কেবল। বর্ণ হেসে ফেলল ঠোঁট একপেশে।

“ আমার জন্য কাঁদছিস?যে তোকে সামান্য ভুলে এই দু’চোখে অযথাই অশ্রু ঝরিয়েছে,তার জন্য?–বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সুখের চোখ মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিল যেন, “ কাঁদে না ফুল! অন্যের দুঃখে কাঁদা ব্যাড হ্যাভিট।আমার দিকে তাকা। কখনো দেখেছিস কারো দুঃখ আমায় ব্যতীত করেছে?আমি তো কাঁদাই যাকে ইচ্ছে।”


হসপিটাল থেকে ফিরলে মেহরাবের আগেপিছে ঘুরঘুর করে এইওই বলে তর্ক করা মেয়েটাকে আজ দেখতে পায়নি সে। প্রথম প্রথম খুশি হলেও অবচেতন মন এখন জেসিকে খোঁজে ফিরছে মেহরাবের।নিজের চাওয়ায় নিজেই ক্ষিপ্ত হলো সে। মেয়েটা কী হাল বানিয়ে ছেড়েছে তার অবাধ্য মনের।

প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরও জেসির দেখা না পেয়ে মায়রার কাছে গেল মেহরাব।বেডে জামার স্তুপ, সেগুলো ভাঁজ করে কাভার্ডে তুলে রাখছিল মায়রা। মেহরাব গলা খাঁকারি দিয়ে অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সোফায় বসল। স্বাভাবিক কিছু কথা আদান-প্রদানের খানিক পর দোনামোনা নিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “ আপু মেয়েটা কোথায়?”

~এক নিমেষেই প্লট পাল্টে গেছে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নহে। ইতোপূর্বে কোন এক পর্বে উল্লেখ করা ছিল বর্ণকে নিয়ে বাবা-মা দেশ বিদেশে ট্রাভেল দিত।~

#চলবে🦋

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here