#আমার_বোবাফুল(৬৬•১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
বাতাসের সাথে মিলেমিশে মিউজিকের মৃদু শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে কানের আশেপাশে। সঙ্গীতের তালে তালে অনুভূতির জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একাধিক মানবমন। কেউ কেউ আবার বিরক্ত বোধও করছে বটে। বর্ণ গালের দেয়ালে জিভ ঠেলে চুপ রয় সেকেন্ড কয়েক। এরপর নামটা উচ্চারণ করল, “ রিকাজ ফরাজী!”
আইজা থমকে গেলেন। বুকের ভেতরেটা বোধকরি ধ্বক করে উঠে তার। স্তব্ধ হয়ে নির্বাক চেয়ে থেকে ঢোক গিললেন তিনি।বর্ণ এতোক্ষণে সন্তর্পণে তার দিকে তাকায়। সেসময় ভীষণ নিস্প্রভ ছিল ধূসর কালো মণি চোখ জোড়ার চাহনি।আইজা বিচলিত হলেন। ছেলের বাহু ঝাঁকিয়ে অস্থির হয়ে বললেন, “ ক-কী বলেছে ওই লোক?বলো বর্ণ?চুপ থেকো না।”
“ এটাই যে, আপনি আমাকে নিজ গর্ভে ধারণ করেননি মিসেস শিকদার!”
বর্ণ’র মুখনিঃসৃত বাণী কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই ভদ্রমহিলা স্থির হয়ে গেলেন।তার বাকহারা মুখের দিকে দৃষ্টি রেখে বর্ণ আরও বললো, “ আজ থেকে বহুবছর আগে যেই ছেলেকে হারিয়েছেন, তার প্রতিচ্ছবি আমার মাঝে খোঁজে নিয়ে আমাকে ভালোবাসা দেখিয়েছেন এতো বছর!”
“ ওহ্!এসবই বলেছে সে?”
বর্ণ নিশ্চুপ। আইজা বিচক্ষণ। তিনি বুঝে নিলেন রিকাজ ফরাজী, আযাদ শিকদার এবং তার মাঝে তৈরি ত্রিকোণ প্রেমের কথাও বর্ণ’র জানা হয়ে গেছে।এই নিয়ে তিনি কোন প্রশ্ন করলেন না। শুধু কম্পিত গলায় জানতে চাইলেন, “ বাহিরের কেউ একজন এসব বলল আর তুমি বিশ্বাস করে নিলে? একবার উচিৎ ছিল না মাকে প্রশ্ন করা?”
বর্ণ বলল, “ দেশে-বিদেশে টুরের নাম করে ছেলের খোঁজে যেতে। অথচ আমি ভাবতাম মস্ত বড় পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখাতে, নতুন অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাকে ঘুরিয়ে দেখানো হতো। প্রতি জন্মদিনে সবাই উইশ করতে উপস্থিত থাকতো, শুধু তুমি ছাড়া। আমার ত্রিসীমা থেকে দূরে সরে নিজেকে রুম বন্দী রাখতে। ছেলের ছবি আকড়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে। নিঃসন্দেহে ছবিতে আমি ছিলাম না! ওইদিন আমার চেহারা দেখতে চাইতে না, নিশ্চয়ই ছেলেকে হারানোর পেছনে কোথাও না কোথাও আমিই ছিলাম এবং আছি এমন কিছুই ভাবতে?”
আইজা কাঁদছেন। টুপটাপ চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অশ্রুসিক্ত চোখে পলক ফেলে আচমকা চড় বসালেন ছেলের গালে।বর্ণ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না এতে, কেবল তাকিয়েই থাকল। ক্রন্দনরত গলায় তিনি বললেন, “ বছরের তিনশো চৌষট্টি দিন তোমাকে দিয়ে,বাকি একটা দিন ছবির ছেলেকে দিয়েছি বলে তোমার বিশ্বাস হয়ে গেল ওই লোকটার কথা?আর কিচ্ছু যাচাই করার প্রয়োজন মনে করলে না? ছোট বাচ্চার মতো অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে, পরিবার ছেড়ে দূরে চলে গেলে?”
বর্ণ যেনো আশার আলো দেখতে পেলো। চেহারার গম্ভীর, নির্বিকার ভাব ছেড়ে বাচ্চা বর্ণটির মতো মা’র হাত ধরে আচমকা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উম্মাদের মতো বলল, “ মম… মম! একবার বলে দাও ‘ও যা বলেছে আর আমি যা শুনেছি’ সব মিথ্যে ছিল।মম?”
চোখের পানি মুছে আইজা গম্ভীর মুখে বললেন, “ সব সত্যি!”
ব্যাস, এই একটা শব্দ বর্ণ’কে শান্ত, নিস্তেজ করে দিল পুণরায়। মা’কে ছেড়ে দিল নিমেষেই। হাঁটু গেড়ে বসে পরপর মা’র হাঁটু জড়িয়ে ব্যথাতুর গলায় বলল, “ এই জন্যই তোমার কাছে আসিনি!প্রশ্ন করিনি কোন! তোমার মুখে এই নিষ্ঠুর কথাটা শুনার সামর্থ্য ছিল না আমার।মম… সময় সময় যখন আমি ভাবি, ‘এই টাকা-কড়ি, গাড়ি-বাড়ি, নাম-জস-ক্ষমতা সব মূল্যহীন।এর বাইরে আর কী আছে আমার? যেখানে গেলে হৃদয়ের তোলপাড় সেরে গিয়ে প্রশান্তি আসবে?ঠিক সেসময় মনে পড়ে আমার মম আছে।যার কোলে মাথা রাখলে পৃথিবী জয়ের মতো শান্তি পাওয়া যায়!সেই মমের মুখে ‘আমি তার সন্তান নই’ কথাটি শুনতে কীভাবে ছুটে আসতাম বলো?”
চোখের কোণ ঘেঁষে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আইজার। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন তিনি।বর্ণ অস্থির হয়ে বলল, “ মম ও জানতো ‘প্রকাশ না করলেও আমার দূর্বলতা আমার পরিবার। আমার মম।’তাই আমাকে ভেঙে চূর্ণ করে দিতে এই চালটাই চাললো।পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল এক লহমায়।”
কান্না গুলো গলায় এসে দলা পাকিয়ে আসছিল।তবু বহু কষ্টে গিলে গিলেন আইজা।ছেলের মাথায় মমতার হাত রেখে বললেন, “ হ্যাঁ, ও আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে তার জায়গায় অন্য কাউকে রেখে গিয়েছিল,এটা সত্যি!হারানো ছেলেকে ফিরে পেতে ও যখন যেই ঠিকানা দিতো সেই ঠিকানায় ছুটে গিয়েছি। এমনকি দেশ থেকে বিদেশ পর্যন্ত; এটাও সত্যি!কিন্তু এর ভেতরে আরও একটি টুইস্ট লুকিয়ে আছে ইয়্যু নৌ মিস্টার আসফিয়ান বর্ণ?”
বর্ণ থমকায়।এই প্রথম সেটা তার মুখশ্রীতে ফুটে উঠেছে।উঠে দাঁড়ালো সে। মা’র দিকে কেমন করুন চোখে চাইল।মম অচেনা কাউকে সম্বোধনের মতো নাম ধরে ডাকছে? মূহুর্তেই পর করে দিল তাকে?সে বিরক্ত হলেও, কিংবা কল এড়িয়ে গেলেও আগের মতো বারবার করে ফোন দেবে না? ঢোক গিলল বর্ণ। চোখদুটো র-ক্তা-ভ হয়ে আছে।গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “ আবঃ আমি আসছি!”–কদম বাড়িয়েছিল কেবল।আইজা বললেন, “ সেদিন টুইন হয়েছিল আমার।”
বর্ণ থেমে গেল হঠাৎ। তড়িৎ পিছু ঘুরল, “ হুঁ?”
“ দু’টো ফুটফুটে ছেলে হয়েছিল সেদিন।”–বলতে গিয়ে আইজার ঠোঁটে মুগ্ধকর হাসির রেখা ফুটে ওঠে। তিনি বললেন এরপর,“ রিকাজ ভেবেছিল একটাই। পাল্টে দিয়ে তাদের মধ্য থেকে একজনকে নিয়ে চলে গেল সে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।অন্যজন তখন আমার কাছে নয় আম্মার কাছে ছিল। বাচ্চাটা খুব তেজি ছিল কী না সেই থেকেই, কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলতো।আদরে তার ভাগাভাগি চলবে না, পুরোটাই নিজে দখল করবে।তাই নাতির জন্য তুলে রাখা আদর সব তাকেই ঢেলে দেবে বলে আম্মা নিজের কাছেই প্রায়শই তাকে রাখত।রিকাজ কলে বারবার বলতো ‘তোমাদের একমাত্র সন্তান আমার হেফাজতে’!তখন আমরা বুঝেছি টুইন এর ব্যপারে সে অবগত নয়।ভয়ে থাকতাম এই বুঝি সে এলো আর অন্যজনকেও নিয়ে গেল।তাই একদিন আম্মার সাথে আমার সেই ছোট্ট মানিককেও দূরে পাঠিয়ে দিলাম। ভালোবেসে তার নাম রেখেছিলাম…”–থেমে বর্ণ’র দিকে চেয়ে বললেন, “ আসফিয়ান বর্ণ!”
“ ত-তারপর?সে কোথায় যাকে রেখে গিয়েছিল?”
“ রিকাজ নিজের কৃতকর্মের কথা বুক ফুলিয়ে বলেছিল কীভাবে তার বাবা মা’কে মে!রেছে, কেবল সম্পদের লোভে।আমি মা! গর্ভে ধারণ না করলেও নিষ্পাপ শিশুটিকে অযত্নে রাখতে পারিনি।সে তো নির্দোষ। কিন্তু বেশিদিন আমাদের মাঝে সে থাকেনি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাস দুয়েক পরই পৃথিবীর সাথে অভিমান করে চলে গেল না ফেরার দেশে।রিকাজের কাছে সেই সংবাদ পৌঁছাতে দেইনি আমরা। তোমাকে আবারো নিজের কাছে ফিরিয়ে আনলাম।তাই তার ধারনা ছিল তুমি সেই বাচ্চাটিই , যাকে সে রেখে গিয়েছিল!”
আইজা ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা বর্ণ’র দিকে চেয়ে বলল, “ তোমরা দু’জন একসাথে জন্মেছিলে।ওর কথা কখনো উল্লেখ করার সাহস করতাম না পাছে রিকাজ এসে আবার যদি সবটা এলোমেলো করে দিয়ে যায়?বছরের সবদিন তোমাকে দিয়ে, শুরুর একটা দিন ওর জন্য উৎসর্গ করতাম। সবার উপস্থিতিতে তোমার সামনে দাঁড়ালে সেদিন আমার ভেতরের আহাজারিগুলোর লাগাম টেনে রাখতে পারবো না বলে রুম বন্দী থাকতাম!
একই দিনে জন্ম তোমাদের। অথচ একজন আমার বুকে, অন্যজন কোথায় কে জানে! তোমাকে আগলে রাখতে আমি আছি। কিন্তু সে কেমন আছে অজানা।তোমাকে পরেও আদর করতে পারবো কিন্তু তাকে? বছরের একটা দিন তার ছবির সাথে জন্মদাত্রী মা হিসেবে কাটানোটা আমার ভুল?”
বর্ণ এসব প্রশ্ন উত্তর দেওয়া আর সময় আছে?সেতো এখনো পড়ে আছে মা’র সেই কথাতে- সেই ছোট্ট মানিককেও দূরে পাঠিয়ে দিলাম। ভালোবেসে তার নাম রেখেছিলাম “ আসফিয়ান বর্ণ!”
আচমকা ভদ্রমহিলাকে জাপ্টে ধরলো বর্ণ, “ মম… উঁহু আম্মু!আম্মু আমি তোমারই ছেলে! মাত্রই বললে না?আম্মু তুমি আমার মম!”–সে কী বলতে কী বলছে নিজেও জানে না।আইজা ঠোঁট কামড়ে হেসে পরপর শক্ত গলায় বললেন, “ নো মিস্টার আসফিয়ান বর্ণ।আমি কেউ নই আপনার!”
বর্ণ’র চক্ষু শীতল হলো হুটহাট।তার আরও কিছু জানার আছে।যার উত্তর দেবে রিকাজ ফরাজী।
•
ডান্স পারফর্ম এর জন্য আলাদা স্টেজ করা হয়েছে।তুহফাকে মাঝে দাঁড় করিয়ে ‘দুলহান’ গানে কাজিনের অধিকাংশ ডান্স করছে সেখানে।সুখ অদূর চেয়ারে বসে অনেক্ষণ ধরে বড় মা’র ব্যলকনিতে পর্যবেক্ষণ করছে।বর্ণ’কে তো সে চিনে নিয়েছে। আঁধারে যদিও কারো মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।তবুও সে চিনতে পেরেছে পাশে বড় আম্মুই আছে।কী বলছেন তারা?কী কথা হচ্ছে ওখানে?আড়ি পেতে শুনবে একবার?
সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোলাহল থেকে দূরে এসে সুখ প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়ল প্রথমে।বাড়ির অভিমুখে হতে হতেই মাঝপথে থেমে গেল আবার। বিস্মিত হয়ে চেয়ে রয়। সামনে মেহরাব দাঁড়িয়ে।তার দিকেই তাকিয়ে আছে মানুষটা। পাশেই…
#চলবে🌸

