#Tell_me_who_I_am
(#বলোতো_আমি_কে?)
#পর্ব_১৬
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
________________________________________☞
কিছুক্ষণ পর মিরা পাশের ঘর থেকে ফিরে এসে দেখে, কারান নিজের বুকের কাছে মলম মেখে নিচ্ছে।
মিরা কিছু না বলে কারানের পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর একটা বালিশ হাতে নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে, কারান হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে শঙ্কিত স্বরে বলে ওঠে, “কোথায় যাচ্ছো?”
“কোথায় আবার, ঘুমাতে।”
কারান কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “গিব মি আ মোমেন্ট। ঘুমাতে মানে?”
“আমি এখন থেকে এ্যাটাচড রুমেই ঘুমাবো।”
কারান ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলে, “এটাই বুঝি আমাকে শাস্তি দেওয়ার উপায়?”
“শাস্তি? মানে?”
কারানের নিষ্প্রভ চোখ আর পাংশুটে মুখে বিষণ্নতার ছায়া ফুটে ওঠে। ভারি কণ্ঠে বলল, “মানে.. যদি রিভেঞ্জ নিতে চাও, অন্যভাবে নাও মিরা। কিন্তু আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে নয়।”
“আমি তো কখনো রিভেঞ্জের কথা বলিনি।”
“মুখে বলার দরকার নেই। তোমার চোখই সব বলে দেয়।”
কথা শেষ করেই কারান অকস্মাৎ মিরাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তার কণ্ঠে অসহায়তার ছাপ, “মিরা, আমার প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। কিছু একটা করো।”
মিরা ঝটকা দিয়ে তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে, “আমি কী করতে পারি? আর আমাকে ছাড়ুন তো। আপনার স্পর্শ একদম সহ্য হয় না আমার।”
কিন্তু কারান আরও শক্ত করে মিরাকে জড়িয়ে ধরে, মিহি কণ্ঠে বলল, “তাহলে আমার প্রতি এত মায়া দেখাচ্ছ কেন?”
“মায়া? কখন মায়া দেখালাম আমি? আগেই তো বলেছি, আপনার প্রতি আমার কোনো মায়া-মমতা কাজ করে না।”
কারান মৃদু হেসে মিরার গালের সাথে নিজের গাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তাই? তাহলে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া, ঠান্ডা পানিতে হাত ভিজিয়ে রাখা; এগুলো কে করল?”
“সেসব অন্য কারো জন্য হলেও করতাম।”
“অন্য কেউ আর আমি এক নই, বেগম,” বলেই মিরাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়, তার গভীর চোখের সামনে মিরার অনিচ্ছুক মুখ থেমে যায়।
পরে সে মিরার নরম ডান হাতটি তুলে এনে নিজের নগ্ন, রক্তাক্ত বাম বক্ষে চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে মিরার বুক কেঁপে উঠল। কী ভয়ংকর দাগ! যে কারো রক্ত হিম হয়ে যাবে। গলায় শুকনো ঢোক গিলে এক দৃষ্টিতে কারানের বুকের ক্ষতগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল মিরা। কয়েক মুহূর্ত আগেও আয়াশকে পড়ানোর সময় এই শরীরটিকে কতটা আকর্ষণীয় লেগেছিল! অথচ এখন চোখ ফেরাতেও গা শিউরে উঠছে।
মিরার চোখ পানিতে টলমল, কান্না বারবার গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে। তবুও সে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে, নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে দমন করার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আত্মসম্মান— এটাকে দ্বিতীয়বার ভেঙে পড়তে দেওয়া যায় না।
কিন্তু পারল না। স্বামীর ক্ষতবিক্ষত শরীরে হাত রেখে সে অনুভব করল দুর্বলতার প্রবল স্রোত তাকে গ্রাস করছে। বিষাদে মুখ ছেয়ে গেল তার। নিজেকে আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না। সহসা এক হাতে কারানের গলা জড়িয়ে ধরল, আরেক হাত তার পিঠে রাখল। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে চোখ বন্ধ করল সে। নিঃশব্দে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে লাগল।
হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত আলিঙ্গনে কারান বিস্মিত হলেও, তার ভেতরে প্রশান্তির উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। তার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি। সে আর দেরি না করে মিরাকে শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিল।
কারান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বলল, “কি হয়েছে, সোনা?”
মিরা কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু কারানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল। বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় মুষড়ে পড়ছে। কারানের এমন বিধ্বস্ত শরীর দেখলেই তো সব অভিমান ভুলে তাকে আপন করে নিতে ইচ্ছে হয়। হয়ত ভুলেও যেত, যদি না সেই অন্য নারীর প্রসঙ্গ থাকত। সব কিছু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে আরেকজন নারী রাত কাটিয়েছে—এ সত্য কোনো স্ত্রীই মেনে নিতে পারে না।
কারান আবারও নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “খারাপ লাগছে তোমার?”
মিরা অস্পষ্ট স্বরে বলল, “নাহ।”
“তাহলে কাঁদছো কেন?”
“কই?”
কারান হালকা হাসল, “আপনার চোখের এক ফোঁটা মহামূল্যবান পানি আমার পিঠে পড়েছে। ঐ অংশের সব ব্যথা সেরে গেছে, মিরা।”
মিরা চোখ খুলে দেখল, সত্যিই পানির কণা কারানের পিঠ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু কারানের নীলাভ রক্তাক্ত শরীর দেখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। এ দৃশ্য সহ্য করা সম্ভব না। মনের যুক্তি যাই বলুক, হৃদয় যে কবে থেকে এই পুরুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
কারান মিরার পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “তোমার চোখের পানি আমার সহ্যের বাইরে, মিরা। একটু বোঝার চেষ্টা করো। কান্না বন্ধ করো। তেমন কিছুই হয়নি।”
মিরা দ্রুত চোখ মুছে নিল, নিজেকে কিছুটা সামলে কারানকে আলিঙ্গনমুক্ত করে বলল, “তিনটা বাজে। ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে অফিসে যেতে হবে তো।”
কারান মিরার দিকে তাকিয়ে হাসল, “কিছুক্ষণ আগেই তো একেবারে বোম্ব হয়ে গিয়েছিলে। পারলে না তো রাগ ধরে রাখতে! (মনে মনে) তুমি আমাকে ভালোবাসো, মিরা। মুখে যতই অস্বীকার করো না কেন, তোমার চোখে আমি কারান চৌধুরীর জন্য অগাধ ভালোবাসা স্পষ্ট দেখতে পাই।”
কারানের কথা শুনে মিরা চোখ নামিয়ে আপনমনে বলল, “আমার রাগ এখনো কমেনি, কারান। কমবেও না। প্রতিশোধ নেওয়ার অনেক সময় পাবো। কিন্তু এখন সে সময় না।”
তারপর কারানের ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আপনার এই দাগগুলো… উফফ!”
কারানের কঠোর অথচ ক্লান্ত দৃষ্টি, মিরার বিরক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগ লক্ষ্য করলো। মিরা বলল, “রাগ আছে কিনা সে না হয় পরে দেখা যাবে। আপাতত তাকিয়ে না থেকে ঘুমিয়ে যান।”
“তোমাকে ছাড়া কোনোভাবেই আমার ঘুম আসবে না, মিরা।”
মিরা বিরক্ত স্বরে বলল, “নেকামি বন্ধ করুন। না ঘুমালে না ঘুমান। আমি আপনার সাথে ঘুমাচ্ছি না।”
“সিরিয়াসলি ঘুম আসবে না। তুমি আমার হ্যাবিট হয়ে গেছো।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝলাম। একটা কাজ করুন, শার্টটা পরে নিন। তাকানো যাচ্ছে না আপনার দিকে।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “না, থাক। তাহলে গায়ে লেগে আরও পেইন হবে। আবার হাতটাকে কী করেছেন? অমানুষ নাকি আপনি?”
কারান মৃদু হেসে মিরার উদ্বিগ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মিরা বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। যান, ঘুমাতে যান।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কারান মিরাকে হঠাৎ কোলে তুলে নিল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মিরার বুকের ওপর মাথা রেখে, দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে। গভীর স্বরে বলল, “গুড নাইট, অর্ধাঙ্গিনী।”
চোখ বন্ধ করল কারান। কিন্তু মিরার মনের গভীরে জমে থাকা কষ্ট, ঘৃণা, রাগ, অভিমান; সব মিলিয়ে তার অস্তিত্ব এখন দগদগে ক্ষত।
মিরা স্তব্ধ হয়ে রইল। এই মানুষটা কতটা কঠিন হতে পারে, আবার কতটা অবিশ্বাস্যরকম কোমল! মিরার বুকের ভেতর নিঃশব্দ ঝড় বয়ে গেল। থমথমে চোখে কারানের নগ্ন পিঠের দিকে তাকিয়ে সে আপনমনে বলল, “থাক, আজকের রাতটা শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে নিন।”
তার বুক চিরে এক চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
______
পরপর কয়েকদিন মিরা কারানের সঙ্গে কথার গণ্ডি সীমাবদ্ধ রাখল নিতান্ত প্রয়োজনীয় কিছু শব্দে। কারান দিনের আলো ফুরানোর আগেই অফিসের চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে আবদ্ধ রাখে, রাতের অন্ধকার গাঢ় হলে ক্লান্ত শরীরে ফিরে আসে বাসায়। কিন্তু এই ফেরা কেবলই ছকে বাঁধা কর্তব্যপালন, যার শেষে প্রিয়তমার সান্নিধ্য নেই, নেই কোনো উষ্ণ মুহূর্তের প্রতীক্ষা।
বিছানা ভাগ করলেও, মিরাকে ছোঁয়ার আগেই সে চোখ বুঝে নেয়। কিন্তু কারান তাকে বিরক্ত করে না, শুধু তাকিয়ে থাকে তার স্ত্রীর প্রশান্ত অথচ দূরবর্তী মুখশ্রীর দিকে। অর্থাৎ কাছাকাছি থেকেও, তারা একে অপরের থেকে অনেক দূরে।
______
মিরা আয়নার সামনে বসে ধীরস্থিরভাবে চুল আঁচড়াচ্ছে। গোধূলির শেষ আলো আয়নার কাঁচে প্রতিফলিত হয়ে তার মুখে মায়াবী ছায়া ফেলেছে। কিন্তু কারানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে দেরি হলো না। কয়েকদিন ধরে স্ত্রীর এই নীরব শাস্তি সহ্য করে সে একেবারে বিরক্ত। রাগ চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠল, “এটা কেমন বিহেভিয়ার, মিরা? এমন নীরব প্রতিশোধের চেয়ে তুমি আমাকে মারধর করলেই ভালো হতো।”
কিন্তু মিরার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে, তার ক্ষুব্ধতা আরও তীব্র হয়ে উঠল। কণ্ঠে হুঁশিয়ারির সুর এনে বলল, “মিরা, আমি তোমার সাথে কথা বলছি। আমি যদি একবার রেগে যাই, তাহলে কিন্তু…”
কথাটা শেষ করার আগেই মিরা দ্রুত গতিতে পিছনে ফিরে তাকাল। তার দৃষ্টিতে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। মিরা ভ্রূ কুঁচকে বলল, “তাহলে কী শুনি?”
শব্দগুলো ছুরির মতো কারানের গর্বে বিদ্ধ হলো। সেই ভয়ংকর দৃষ্টি দোর্দণ্ডপ্রতাপ কারানকে মুহূর্তে ভিজাবিড়ালে বিড়ালে পরিণত করলো। সে গলা খাঁকারি দিয়ে নিতিবিতি করে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “তা… তাহলে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব। আর আমি আবার রেগে যাব কেন! আচ্ছা, তুমি চুল আঁচড়াও, জান। কাম ডাউন…”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে সে দ্রুত অন্য কক্ষে চলে গেল। অর্থাৎ বিপদের হাত থেকে কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচল।
মিরা দাঁড়িয়ে আয়নার প্রতিবিম্বে নিজেকে দেখল। তারপর ক্ষণিকের জন্য ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ হাসি ফুটিয়ে তুলল।
______
আজ কারানের অফিস নেই। সকাল থেকেই কফির কাপে আঙুল ঘুরিয়ে ভাবছিল, কতবার মিরার কাছে যেতে চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সে। মিরার মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারা দুরূহ এক ধাঁধা। হালকা শ্বাস ছেড়ে নিজেকেই বলে, “এভাবে চলতে থাকলে এ জীবনে বউকে আর পাওয়া হবে না। দেন হোয়াট ক্যান আই ডু?”
এক মুহূর্ত থেমে বলল, “নাহ, এ বাড়িতে থাকলে কিছুই করা যাবে না।”
বিকেলের দিকে মিরা আয়াশের সাথে ছেলেমানুষি দুষ্টুমিতে পুরোপুরি বুঁদ হয়ে আছে। লাফালাফি, গাল টিপে দেওয়া, ভিডিও গেম খেলা, হাসাহাসি এসব করে নিজের বয়সের ভারটাই ভুলে গেছে সে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কারান স্থির চোখে তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখে ম্লান হাসে। স্নেহমাখা বিরক্তিতে বলে ওঠে, “এর নাকি আবার ২৩ বছর! বাচ্চা একটা বউ আমার। তবে কিউট আছে।”
তার স্বচ্ছ হাসি ঘরটায় ছড়িয়ে পড়তেই মিরা চমকে পেছনে তাকায়। কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ির আঁচল আলগোছে ছেড়ে দেয়। চুল সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে নিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে বলে, “কিছু বলবেন?”
“জি।”
“তো বলুন।”
কারান চোখে-মুখে দুষ্টু দীপ্তি নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “আই ওয়ানা বাইট ইউ, সুইটি।”
শব্দগুলো মিরার কানে পৌঁছাতেই তার রক্ত টগবগ করে উঠল। সে কঠিন চোখে কারানের পানে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাকে এখন সহ্যই করতে পারে না সে। উপরন্তু, চৌধুরি বাড়ির পরিবেশে তাকে শায়েস্তা করারও সুযোগ নেই। অথচ কারান অনায়াসে রোমান্টিক উক্তি ছুড়ে যাচ্ছে! চোয়াল শক্ত করে গলার স্বর কঠিন করে মিরা বলল, “কি বললেন?”
কারান হাই তুলে অলসভাবে ঘাড় চুলকায়। স্বাভাবিক স্বরে বলে, “কিছু না। রেডি হয়ে নিন, আমরা কে.ছি হাউজে ফিরবো।”
তারপর একপলক মিরার কঠিন মুখশ্রী দেখে নিয়ে দরজার চৌকাঠ পার হয়ে চলে গেল। মিরা বুকের ভেতর চেপে রাখা দুর্বোধ্য ক্ষোভ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সে চেহারায় হাত বুলিয়ে, পাশের দিকে তাকাতেই দেখল আয়াশের মুখে মিটিমিটি হাসি। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলে গালে হাত রেখে মনে মনে বলল, “আমি শুধু একবার ওর মনটা পড়ে দেখতে চাই যে একটা মানুষ কীভাবে এমন বেহায়া হতে পারে! যতই বলি, সবকিছুই যেন ওর কাছে অর্থহীন।”
মিরার মাথায় রক্ত গরম হয়ে উঠল। কারান যেন প্রতিটি ব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মিরার ক্ষোভ স্পষ্ট বুঝেও সে না বোঝার ঝিম ধরে আছে। মিরা নিস্তেজ অভিব্যক্তি নিয়ে নিজের কক্ষে চলে গেল। কক্ষে গিয়ে দেখল, কারান ইতোমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে।
মিরা মুখে কঠোর অভিব্যক্তি নিয়ে বলল, “বের হন। আমি শাড়ি চেঞ্জ করবো।”
কারান ফোনে চোখ রেখেই, গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল, “তো করো না।”
মিরা কপাল কুঁচকে বিরক্তির ছাপ নিয়ে বলল, “আপনার সামনে চেঞ্জ করবো আমি?”
কারান মুখের ভিতরে জিভ দিয়ে গাল ঠেলে, ঠান্ডা হেসে বলল, “সমস্যা কোথায়? আমিই তো! ইয়োর ওয়ান এন্ড অনলি সিজলিং হাজব্যান্ড। চেঞ্জ করো, চেঞ্জ করো। ওয়েট, আমি একটা কাজ করি; পপকর্ন নিয়ে আসি। আজকে লাইভ দেখবো।”
মিরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, “মেজাজটা কিন্তু খারাপ হচ্ছে, কারান। ফাজলামো বন্ধ করে বের হন।”
কারান সোফা থেকে উঠে, মিরার কাছে এসে মাথা নীচু করে নেশালো গলায় বলল, “আমি আমার বউয়ের ফি’গার দেখতে চাই।”
কারান ব্যঙ্গাত্মক উক্তি দিয়ে মিরাকে আরো উত্তেজিত করে তোলে। মিরা চোখের উপরে হাত রেখে কিয়ৎকাল স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর শরীরটি ঘুরিয়ে হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে রাগকে অন্তরে চেপে রেখে, আবার কারানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “ঠিকাছে। ভালোভাবে বলেছি, শুনলেন না তো। এবার কিছুই চেঞ্জ না, আর কোথাও যাবোও না।”
“আপনাকে আর কিছু চেঞ্জ হবে না,” বলে তৎক্ষণাৎ মিরাকে কোলে তুলে নিল।
“আরে, কী করছেন? নামান বলছি!”
“চুপ থাকো, আদারওয়াইজ চুম্বন শুরু করে দেব,” বলেই কারান বেয়াল্লিশে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।
বৈঠকখানায় বসে থাকা রোমানা এসব দেখে হতবাক হয়ে আফসোসের সুরে বলল, “কি রোমান্টিক! ইশ, আমার জিরাফটাও যদি এমন হতো!”
এদিকে কারান বাড়ি থেকে বেরিয়ে মিরাকে কোল থেকে নামিয়ে বিএমডব্লিউ গাড়িতে বসিয়ে দিল। নিজে ড্রাইভারের সিটে বসে ড্রাইভিং শুরু করতেই, মিরা উঠে বলে উঠলো,
“আপনি এতো ছ্যাঁচড়া কেন?”
কারান হাসির সাথে কানে ঝাড়া দিয়ে জানিয়ে দিল, মিরার কথা এখন তার কাছে কোনো অঙ্গীকারের মতো গায়ে লাগছে না। কারান বলল, “মিরা, আমি কিন্তু ব্রেক কষে তোমাকে আমার কোলের মধ্যে শুইয়ে দেব। তার আগে সিট বেল্টটা লাগিয়ে নাও।”
সে রসাত্মক হাসির সাথে গাড়ির গতি বজায় রাখলো। মিরা কারানের কথায় বিরক্ত হয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কারান তার মতামতের তোয়াক্কা করল না। সে গাড়ি থামিয়ে, মিরার দিকে ঝুঁকে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল। তারপর লোভী দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জান, ড্রাইভ করার শক্তি পাচ্ছি না। ওয়েট, এনার্জি বাড়িয়ে নেই।”
কথাটা শেষ করেই মিরার ঠোঁটে গভীর চুম্বন দিতে শুরু করলো। মিরা হতচকিত হয়ে গেল। কিন্তু কারান তো কারানই। সে মুহূর্তটাকে দীর্ঘ করে, গভীরভাবে নিজের মতো করে উপভোগ করল। সময় ঠিক কতটা কেটেছে, মিরার জানা নেই। কারান যখন ঠোঁট সরাল, তখন সে বিস্মিত দৃষ্টিতে কারানের পানে তাকিয়ে থাকে।
অথচ কারান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ঠোঁট আঙুল দিয়ে মুছে নিয়ে সম্মোহনী কণ্ঠে বলল, “শরীর একদম চাঙ্গা হয়ে গেছে, বেবি। এবার তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাব।”
সে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে এক বোতল পানি মিরার দিকে এগিয়ে দিল। মিরা বোতল হাতে নিয়ে দ্রুত কয়েক ঢোক পানি গলাধঃকরণ করল। কিন্তু বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপুনি থামছে না। লজ্জার তাপে মুখের ত্বক গরম হয়ে উঠেছে, চোখ দুটো বুজে আসতে চাইছে। অবশ্য মনে মনে কারানকে এমন অকথ্য গালি দিয়েছে, যা মুখে আনার উপায় নেই।
কিন্তু কারান ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে গাড়ি চালাতে থাকল।
মিরা তার দিকে খুন করার মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “কীসব সিনেমা বানায় লোকে! আসল রোমান্স তো এই ব্যক্তির থেকে শেখা উচিত। বউ রেগে থাকলেও কীভাবে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে নেওয়া যায়, তা এই লোকের ভালোই জানা আছে। আমার আর কিছু বলার নেই একে। শুধু শুধু মুখ ব্যথা করবে, এর গন্ডারের চামড়ার ওপর কোনো শব্দই কাজ করবে না। একবার বাসায় পৌঁছাই, তারপর তোমাকে মজা দেখাব, বান্দা।”
তারপর মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। এদিকে কারানের মুখে প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠেছে। শব্দাতিরেক, মিরার প্রতিক্রিয়া সে আগেই অনুমান করেছিল।
কে.ছি. হাউজে পৌঁছে কারান পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলল। কিন্তু মিরা তার অপেক্ষা না করেই হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। মিরার পলায়ন ভাব দেখে, কারান দরজা বন্ধ করে ক্ষণকাল দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ হাসলো।
কারণ মিরা খুব ভালো করেই জানে, কারানের কাছে থাকা বিপজ্জনক।
_________
পরের দিন কারান নিঃশব্দে পুরো ঘরে হিডেন ক্যামেরা বসিয়ে দিল। শোবার ঘর থেকে রান্নাঘর—সবখানেই নজরদারি নিশ্চিত করল, শুধু ওয়াশরুমটা বাদ রাখল। বাইরের সিসিটিভিগুলো তো আগেই ছিল, এবার ভেতরটাও তার চোখের দখলে থাকবে।
মিরা তখন গোসলে ব্যস্ত।
কারান সুযোগ বুঝে নিজের রুমের এক কোণে রাখা ফুলদানির ভেতর ছোট্ট এক ক্যামেরা সেট করতে করতে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও আমার চোখের আড়াল হতে দেব না, সুইটহার্ট। তুমি বন্দি থাকবে আমার দৃষ্টির কারাগারে, যেমন পছন্দের পাখিদের খাঁচায় আটকে রাখা হয়।”
তার ঠোঁটে উদ্ভট শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
অল্পক্ষণ পর কারান প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত এক নম্বরে কল দিল।
“হোয়াট’স আপ, ইয়ার?”
ওপাশ থেকে ফারহানের পরিচিত স্বর ভেসে এল, “আমি আছি এই তো, বিন্দাস। কিন্তু তোর তো এখন খবরই নেই।”
“আচ্ছা শোন, আমি তোর সঙ্গে সময় পেলে দেখা করব, কিন্তু এখন একটা হেল্প চাই।”
“হ্যাঁ বল।”
“একটা ফোন পুরোপুরি মনিটর করতে চাই। হ্যাকিং-এর ডিটেইলড প্রসেস আর সফটওয়্যার লিংক আমাকে ই-মেইল করে দে।”
এক মুহূর্ত চুপ থেকে ফারহান বলল, “শোন, আমি তোকে সাহায্য করতে পারি, কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছি, আমি ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার না, আমি হোয়াইট হ্যাট। মানে সরকারের হয়ে কাজ করি। এখন তুই যদি অন্য কারো…”
কারান বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “রেডিওটা বন্ধ কর। যা বলছি, তাই কর। আমি কেন অন্য কারোর ফোন হ্যাক করতে যাব? এটা পার্সোনাল।”
“ওকে ওকে, তাহলে ডান। আমি তোকে লিংক পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
কল শেষ হতেই কারানের চোখে নিখুঁত শিকারির মতো স্থির দৃষ্টি খেলে গেল। সে মিরার ফোনের দিকে তাকাল, তার দৃষ্টি ক্রমশ সূক্ষ্ম ও সূচাগ্র হয়ে উঠল।
মিরা যখন স্নান সেরে বের হলো, তখন কারান স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “মিরা, তোমার ফোনটা দাও তো, একটা কল করতে হবে।”
চুলের জল মুছতে মুছতে মিরা কপাল কুঁচকে বলল, “কেন, আপনার ফোনের কী হলো?”
“ব্যালেন্স নেই, আর কলটা জরুরি।”
মিরা হেসে ফেলে বলল, “বাব্বাহ! সিইও কারান চৌধুরীর ফোনে ব্যালেন্স নেই?”
কারান দাঁত চেপে বলল, “আ’ম সিরিয়াস, মিরা।”
মিরা টেবিল থেকে ফোনটা তুলে পাসওয়ার্ড খুলে কারানের হাতে দিল।
কারান ফোন হাতে নিয়েই পাশের রুমে চলে গেল। দ্রুততার সঙ্গে সে ফারহানের দেওয়া লিংক থেকে সফটওয়্যার নামালো, আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে রিমোট অ্যাক্সেস সেট করল, এবং ম্যালওয়্যার ইনস্টল করল। এখন থেকে মিরার ফোনের প্রতিটি কল, মেসেজ, ছবি, এমনকি লোকেশনও সরাসরি তার কাছে চলে আসবে।
ফোনটা ফেরত দেওয়ার সময় কারানের চোখের কোণে অদ্ভুত ঝলক খেলে গেল। মিরা জানতেও পারল না, তার ব্যক্তিগত জগৎ এখন কারানের দখলে।
_________
দ্বিপ্রাহরিক রোদের কোমল উষ্ণতা ঘিরে আছে চারপাশ। এমন সময়ে ইলিজা নিজেকে পরিপাটি করে তুলল—সফেদ চেরি ফুলের ছাপা টপস, নীল জিন্স, আর গলায় এলিয়ে দেওয়া শুভ্র হিজাবে। ইউ কাট দেওয়া ছাঁটে রেশমের মতো নরম চুলগুলো তার ঘাড় ছুঁয়ে আরও দশ ইঞ্চি নিচে গড়িয়ে পড়েছে। হাতে নিয়েছে একখানা ব্র্যান্ডের হ্যান্ডপার্স।
সে দরজা পেরিয়ে বাইরে পা বাড়ানোর আগেই পেছন থেকে মায়ের কড়া স্বর ভেসে এলো, “কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”
ইলিজা বিরক্ত হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “মাআআ, কাল রাতেই তো বললাম, আদিবা আর নিশাদের সঙ্গে একটু বের হবো।”
মমতাজ চোখ সরু করে বললেন, “হুম, মনে পড়েছে। কিন্তু হিজাবটা এমন গলায় ঝুলিয়ে না রেখে মাথায় সুন্দর করে পেঁচিয়ে তারপরে যাবি।”
ইলিজা মুখ বিকৃত করে বলল, “মা, এত সুন্দর করে চুল আঁচড়ে এলাম, এখন হিজাব দিলেই সব নষ্ট হয়ে যাবে।”
“যা বলেছি তাই কর। তার আগে দরজার বাইরে এক পা-ও ফেলা যাবে না। আর সন্ধ্যার আগে যেন বাসায় ফেরা হয়।”
গভীর শ্বাস টেনে ইলিজা অনিচ্ছাসত্ত্বেও হালকা করে হিজাবটা মাথায় জড়িয়ে নিল। গলায় অভ্যস্ত ক্লান্তি টেনে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে আসছি। প্রতিবারই একই কথা।”
তারপর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল।
রাস্তার খানিকটা দূর যেতেই সে একপাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে হিজাবটা খুলে আবার গলায় ঝুলিয়ে নিল। তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসির রেখা নিয়ে বলল, “লে! মাহিমা আগের রূপে ফিরে এলো।” বলে চুলে একটা ঝটকা দিল।
আজকের দিনটা বিশেষ, যে কারণে তার অন্তর খুশিতে টলমল। বহুদিন পর নির্ভার হয়ে ঘুরতে বেরোচ্ছে সে। মা নিজের ফোনটা দিয়ে দিয়েছেন, যেন প্রয়োজনে বাড়িতে কল করতে পারে।
স্থানটা শহরতলির একটু বাইরে, প্রকৃতি এখানে মুক্ত, খোলামেলা। রাস্তার পাশে বিশাল খরস্রোতা নদী, সূর্যের আলোতে তার জলরাশি রুপোলি আভা ছড়াচ্ছে। দিগন্ত থেকে গড়িয়ে আসা ঢেউয়ের বেগে মাঝে মাঝে কিছু ফোঁটা ছিটকে এসে পথের ধূলি ভিজিয়ে দিচ্ছে। নদীর ধারে একখানা ক্যাফেটেরিয়া, তার পাশেই খানিকটা জায়গা কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে। ক্যাফেটেরিয়ার পাশেই দাঁড়িয়ে ইলিজা আদিবাকে কল দিল।
“হ্যাঁ বেবি, কোথায় তোমরা?”
কথা বলতে বলতে সে সামনের দিকে এগোলো।
ওপাশ থেকে আদিবা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “আমরা প্রায় চলে এসেছি রেস্তোরাঁর সামনে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।”
“হুম হুম, জাস্ট ফাইভ মিনিটস, মামা।” বলে সে ফোন কাটতে গেল, তখনই আচমকা অন্য দিক থেকে এক দানবীয় ট্রাক ভয়ংকর গতিতে ছুটে আসছিল। অথচ ইলিজার সেদিকে একটুও খেয়াল নেই।
ফোন কেটে পাশে তাকাতেই তার চোখ বিস্ময়ে রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেল। রাস্তার ধুলোকণা বাতাসে উড়ছে, গর্জন তুলে ছুটে আসা ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হতে যাচ্ছে তার জীবন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা ইলিজাকে ধাক্কা দিবে, এরই মধ্যে পরিপক্ব পুরুষালি বিরাট একটা চিৎকার ভেসে আসে, “ঐ সজনে ডাঁটা, সরুন!”
কিছু বোঝার আগেই শক্ত এক হাত কব্জি আঁকড়ে ধরল ইলিজার, হেঁচকা টানে তাকে ছিটকে নিয়ে এলো রাস্তার একপ্রান্তে। তারপরই প্রচণ্ড শব্দ তুলে ট্রাকটা সরে গেল সামনে থেকে, ধুলোয় ভরে গেল চারপাশ।
ইলিজা স্তব্ধ। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ কমার নাম নেই।
চোখ কচলে সামনে তাকাতেই স্পষ্ট হলো লোকটা।
বেশ লম্বা জোয়ান মর্দ একটি ছেলে। গায়ে আকাশরঙা একখানা চেক শার্ট, সাথে কালো প্যান্ট। পিঠে ঝুলছে সাধারণ একটা ল্যাপটপের ব্যাগ; হাতে ম্যাকবুক। গায়ের গড়ন উজ্জ্বল শ্যাম। চক্ষুদ্বয় ভাসা ভাসা, বাদামি বর্ণের। সাধারণ ছেলেদের চুলের মতোই চুলগুলো অগোছালো, কুচকুচে কালো, সাথে কিছুটা রুক্ষ। তবে চোখে-মুখে শ্রান্ত ও ক্লান্তভাব স্পষ্ট। যদিও সবমিলিয়ে পরিপাটি চেহারায় খুব একটা মন্দ লাগছে না তাকে।
লোকটা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ঘাড় ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, “হায়রে, আরেকটু হলেই তো আপনি টপকে যেতেন।”
তারপর পিছনে ফিরে তাকাতেই, চোখে পড়ল ইলিজা রাস্তার ওপর বসে আছে। কাদামাখা মুখে ক্রোধে পুড়ে আগুন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে ইলিজার এই অবস্থা দেখে ছেলেটা লজ্জিত হয়ে দাঁত চেপে জিভ কামড়ে বলল, “আরে, উঠুন উঠুন!”
এরপর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ইলিজা তার হাত ধরল না। নিজেই ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে, কাদামাখা শরীরের দিকে এক নজর তাকিয়ে ক্রোধের সুরে বলল, “কে বলেছিল উপকার করতে, হ্যাঁ?”
লোকটা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল, “আরেহ! কি বলেন? আরেকটু হলেই তো আপনি মৃত্যুর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমি তো আপনাকে বাঁচালাম, বলুন।” বলেই কলার ধরে সামান্য উপরে তুলল।
ইলিজা রেগে গিয়ে বজ্রগর্জনের মতো বলে উঠল, “হ্যাঁ, খুব! পুরো ড্রেসটা নোংরা করে দিলেন। ধুর, আমার ভাগ্যটাই খারাপ। সরুন তো।”
লোকটা হাস্যরসে ভরা কণ্ঠে বলল, “আই ডিজার্ভ আ থ্যাংকস ম্যাডাম, আর আপনি কিনা চটে যাচ্ছেন।”
ইলিজা কিছু না বলে তীব্র দৃষ্টিতে নিচে তাকাল। এবার তার রাগ পাহাড় ছুঁয়ে ফেলল। নিচে পড়ে থাকা মায়ের ফোনটি তুলে, কণ্ঠে ক্রোধ ও দুঃখ মিশিয়ে বলে, “এটা কি করলেন আপনি? এ্যাআআআ!” তার কান্নার সাথে রাগ আর আক্ষেপ মিশে গেল।
লোকটা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “আবার কি করলাম?”
“আপনার ধাক্কায় মায়ের ফোনটা ভেঙে গেছে। আজকে কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম! সব হয়েছে আপনার জন্য।”
“আয়হায়, কারো উপকার করাও তো দেখছি ভুল।”
ইলিজা তীব্র রাগে বলে উঠল, “আপনি আর কারো উপকার করতে যাবেন না, বুঝলেন? একে তো ড্রেস নষ্ট করলেন, আবার ফোনটাও ভেঙে গেল। তার মধ্যে সব প্ল্যানও মাটি করে দিলেন। ধ্যাত!”
রেগে চলে যেতে শুরু করল সে। তখনই ছেলেটি পিছন থেকে হাঁক দিয়ে বলল, “এই যে, করলানী! আপনার পার্স ব্যাগটা কে নিবে?”
ইলিজা তেড়ে এসে তীব্র গলায় বলল, “কি বললেন, হ্যাঁ? করলানী কারো নাম হয় নাকি?”
লোকটা হাসতে হাসতে বলল, “তো আপনার নাম কি?”
“খুব না? এখন নাম, পরে নাম্বার, তারপর ঠিকানা। আসছে!” ভেংচি কেটে ব্যাগটা তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
লোকটা গলা উঁচিয়ে বলল, “নাম বললে সুবিধা হতো। তাহলে পরের বার আপনাকে বাঁচাতে নিজের দেওয়া নামে ডাকতে হতো না।”
ইলিজা রুষ্ট স্বরে আওয়াজ তুলে বলল, “আপনাকে বাঁচাতে হবে না।”
“তাহলে কে বাঁচাবে?”
ইলিজা মাথা না ঘুরিয়ে চলে যেতে যেতে বলল, “সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনার মতোই কেউ একজন বাঁচিয়ে নিবে। হায়াত লিখিত আছে, তার আগে মরছি না।”
ছেলেটি নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে বিড়বিড় করল, “বাবা, কথার কি তেজ! পুরোটা আমার বিপরীত। এমন কেউ আমার জীবনে এলে মন্দ হতো না। পুরাই মাখোমাখো, জমে ক্ষীর।”
সশব্দে হেসে উঠল সে। ইলিজা যেতে যেতে আগুন হয়ে বলে, “বেটা বাঁচাতে আসছে না আমাকে ফাঁসাতে আসছে? আল্লাহ! মা আজকে মেরেই ফেলবে। শেষ আমি।”
______
এরপরের দু’দিন মিরা কারানের সঙ্গে বিশেষ কোনো কথা বলল না। সংক্ষিপ্ত ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘হুম’-এর গণ্ডিতেই তার প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকল। একরকম কারানকে উপেক্ষা করেই চলল। কারানও বুঝে নিয়েছে—এটা কেবল উপেক্ষা নয়, বরং এক সূক্ষ্ম শাস্তি, যা মিরা সচেতনভাবেই প্রয়োগ করছে। কারণ মিরা জানে, কারান তার অনুপস্থিতি সহ্য করতে পারে না; সেখানে একই ছাদের নিচে থেকেও নৈঃশব্দ্যের দেয়াল তুলে দেওয়া তার জন্য নিদারুণ যন্ত্রণা। বহুবার কারান কাছে আসার চেষ্টা করেছে, কথোপকথনের পথ খুলতে চেয়েছে, কিন্তু মিরার তেমন প্রতিক্রিয়া পায়নি।
_______
আজ ১২ই এপ্রিল। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ১১টা ৪২। মিরা বিছানায় বসে মনোযোগ দিয়ে ‘শেষের কবিতা’ বইটি পড়ছে। আর ক’টি পাতা, শেষ হলেই ঘুম।
মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ইশ, লাবণ্য আর অমিত যদি মিলত! এত প্রেমের পরও সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না কেন?”
ক্ষণিক পর ঘড়ির কাঁটা ১২ ছুঁতেই টং করে শব্দ হলো। ঠিক তখনই পিছন থেকে গভীর মধুর স্বর ভেসে এল, “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, বেগম সাহেবা।”
চলবে?

