হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৯]

0
31

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [১৯]

আকবর সাহেব তরীর বানানো চা খেয়ে মিষ্টি হাসি দিলো। তরী হাতে ট্রে ধরে অধরে অধর চেপে বাবার দিকে উৎসুক নজরে চেয়ে আছে। চাপা অস্থিরতা তাকে চেপে ধরেছে। আকবর সাহেব বললেন,

–“আগের থেকে চা-টা উন্নত হয়েছে। সত্যি-ই ভালো হয়েছে মা। এশারের পরপর আরেক কাপ বানিয়ে খাওয়াবে কিন্তু!”

তরীর অধর প্রসারিত হলো আকবর সাহেবের মুখে প্রশংসা শুনতে পেরে। মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে বললো,
–“অবশ্যই বাবা!”

তরী খালি চায়ের কাপ নিয়ে রান্নাঘরে গেলো। রান্নাঘরের একটি চেয়ারে বসে কামরুন নাহারও তরীর বানানো চা পান করছে। সে আগেই প্রশংসা করে ফেলেছে। তরী মুচকি হেসে বললো,

–“এশারের পরপর আরেক কাপ খেও আম্মা!”

–“না, না। একবারই যথেষ্ট। নয়তো দেখা যাবে রাতে ঘুমানো মুশকিল হয়ে পরবে। তুমি যাও, গিয়ে পড়তে বসো। রান্নাঘর আমি সামলাচ্ছি।”

তরী মাথা নাড়িয়ে ভেতরে চলে গেলো। সাবিয়া পড়ার টেবিলেই অমনোযোগী হয়ে বসে আছে। তরী সাবিয়ার দিকে চেয়ে টেবিল থেকে তার নির্ধারিত বই নিলো। অতঃপর বললো,
–“কিসের এত চিন্তা করছিস পড়তে বসে?”

সাবিয়া চমকে উঠে বোনের কথা শুনে। আমতা আমতা করে বললো,
–“কিছু না তো!”
–“কিন্তু তোর অভিব্যক্তি আমাকে অন্যকিছু বলছে। সত্যি করে বল সাবিয়া। আমার থেকে কী লুকাচ্ছিস?”

সাবিয়া ঘাবড়ে গেলো। প্রথমে বলতে চাইলো না। কিন্তু তরীর চোখ রাঙানো দেখে বলতে বাধ্য হয়। বললো,
–“আব্বার সাথে আজ একজন লোক দেখা করেছে। আমার সামনেই। খুব সম্ভবত উনি রফিক চাচা। আব্বার কোনো এক বন্ধু। উনি আব্বাকে জিজ্ঞেস করে বলে বড়ো মেয়েকে বিয়ে কবে দিবেন? বয়স পেরিয়ে যেতে দিচ্ছেন কেন? এটা তো অনুচিত! আব্বা তখন তাকে হেসে জানিয়েছিলো মাবুদ যখন হুকুম করবেন তখনই বিয়ে দিবে। তবে তার আগে সুপাত্র তো পেতে হবে!”

সাবিয়া থামে। তরী ভ্রু কুচকে চেয়ে আছে সাবিয়ার পানে। এই ব্যাপারটা তো পড়ার টেবিলে বসে চিন্তা করার কথা নয়। তরী লহু কন্ঠে বললো,
–“কত মানুষ তো কত কথাই আব্বাকে বলে। তুই এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছিস কেন?”

–“এই লোক মোটেও সুবিধার নয় আপু। না জানি কবে কী বলে আমাদের আব্বার কান ভারী করে ফেলে। আমার খুব ভয় হয় আপু। আমি চাই না তোমার বিয়ে হোক।”

তরী ফিক করে হেসে দেয়। কিছুদিন পর এসএসসি পরীক্ষা অথচ এই মেয়ে তরীর বিয়ে নিয়ে পরে আছে। তাও তরী সাবিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

–“আব্বা আগেই বলেছে আমার পড়াশোনা শেষে বিয়ের চিন্তা করবে। তুই এত উতলা হোস না। তোকে ছেড়ে আপাতত কোথাও যাচ্ছি না। পাগলী বোন আমার!”

————-
সিদাত চোখ-মুখ কুচকে তার মায়ের দিকে চেয়ে আছে। সিদাতের মায়ের চোখ যেন হাসছে। এটাই সিদাত সহ্য করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে মা তাকে ব্যঙ্গ করছে, উপহাস করছে। সিদাত অভিমানী গলায় বললো,

–“এটা একদম ঠিক হচ্ছে না মা। তুমি আর অনয় মিলে আমার দুর্দিনে শুধু হেসেই যাচ্ছো। আমি কী জেনে বুঝে পরেছি নাকি? মনটা হঠাৎ খাঁচা খুলে পালালো। সেই মন পালিয়ে অন্য কোথাও না গিয়ে তরীর কাছেই কেন গেলো?”

জয়া পলক ফেললো। অর্থাৎ এটাই হওয়ার ছিলো। তার চোখ-মুখ অন্য দিনের তুলনায় চিকচিক করছে বেশি। এদিকে সিদাতের অস্থির লাগছে। মায়ের মজা নেওয়া একদম সহ্য হচ্ছে না তার। সিদাত উঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা জেদ করে বললো,
–“আমি আমার মন ঠিকই ফিরিয়ে আনবো মা। দেখে নিও! এখন আমি অফিস যাচ্ছি।”

বলেই সিদাত হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো। জয়া তখনো ছাদের দিকে শূন্য নজরে আছে। তার চোখ-মুখ জুড়ে তৃপ্তি। ছোটো ছেলেটাকে যেন উপরওয়ালা দারুণ কাউকে মিলিয়ে দিলেন। সিদাতের জন্যে চিন্তা কিছুটা কমে এলো তার। ভালো লাগছে, শান্তি লাগছে তার।

দিয়া আজ ক্লাসে যেতে ইচ্ছুক। এজন্যে একমনে টেবিলে বিচরণ করা তার বই সমূহের দিকে চেয়ে আছে সে। সাইফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। আড়চোখে স্ত্রীকেও খেয়াল করছে। এখন জরুরি এক মিটিং আছে তার। সে তাড়াহুড়ো না করে বরঞ্চ ধীরে সুস্থে রেডি হচ্ছে। সাইফ পারফিউম দিতে দিতে বললো,

–“কী ব্যাপার দিয়া? এভাবে বসে আছো যে?”

দিয়া ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
–“আমি আবার ক্লাসে যাওয়া শুরু করতে চাইছি!”

–“তো যাবে। সমস্যা নেই তো। আজকে গেলে রেডি হয়ে নাও!”

দিয়া খুব খুশি হলো সাইফের কথা শুনে। দিয়া একটি চওড়া হাসি দিয়ে বললো,
–“আচ্ছা।”

সাইফ দিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
–“এখন থেকে বাইরে গেলে তুমি বোরকা পরার অভ্যাস করবে দিয়া। আলমারিতে কয়েকটা আনিয়ে রেখেছি। যেটা ইচ্ছে পরতে পারো। আমার কথা মানতে কী কোনো অসুবিধা হবে?”

সাইফ ঘুরে তাকালো দিয়ার উত্তরের অপেক্ষায়। দিয়া কিছু না বলে আলমারি খুলে একটি বোরকা হাতে নিলো। সাইফ দিয়ার নীরব সম্মতি বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো। বিছানায় গা এলিয়ে বসে সাইফ বললো,
–“রেডি হও। আমি অপেক্ষা করছি।”

—————
আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আকাশ জুড়ে কুঞ্জ কুঞ্জ মেঘ ভাসমান। অন্যান্য দিনের চাইতে আজ গরমের উত্তাপ কিছুটা কম। মেঘের ফাঁকে সূর্য উঁকি দিয়ে তার সোনালী নরম রোদ ছড়াচ্ছে আজ। যেন বৃষ্টি নামবে ভাব। এই এত সুন্দর একটি দিনে তরীর মামা রাজিব এসে হাজির হন। হাতে তার বিয়ের কার্ড। অধর জুড়ে চওড়া হাসি।

আকবর সাহেব পত্রিকা ছেড়ে রাজিবের সাথে কথা-বার্তা বলছেন। কামরুন নাহার ব্যস্ত হাতে রান্না করছে ভাইয়ের জন্যে। অনেক জোরাজুরির পর ভাইকে অন্তত দুপুরে খাওয়ার জন্যে রাজি করিয়েছে। তরী টুকটাক সাহায্য করছে মাকে। মামার সাথে একটু আগেই তরী দেখা করে, কথা বলে এসেছে।

দুপুরে সবাই একসাথে খেতে বসলো। মামা খেতে খেতে জানালো মৌসুমীর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে ঢাকাতেই থাকে। ভালো চাকরি-বাকরি আছে। ঢাকার নারায়ণগঞ্জ এবং ওয়ারীতে নাকি একটি করে বাড়ী আছে। পরিবারও ভালো, ভদ্র। এক কাছের জনের মাধ্যমেই এই পাত্রের সন্ধান পায় সে। আকবর সাহেব সব শুনে খুশি হলেন। এ নিয়ে আরও কিছুক্ষণ আলোচনা চললো।

সাবিয়া তো ভেতরে ভেতরে খুব খুশি। মৌসুমীর বিয়ে হবে। এর মানে হচ্ছে শহুরে পরিবেশ ছেড়ে সুদূর জামালপুরের গ্রামাঞ্চলে যাবে। শান্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। তার ওপর তো বিয়ে বাড়ির মজাই আলাদা। নিজে আনন্দ করতে না পারলেও অন্যদের আনন্দ দেখে তো অন্তত শান্তি পাবে, তাই না? যা হয়েছে ভালোই হলো। রাজিব সকলকে অত্যন্ত অনুরোধ করে বললো যাতে সোমবারের মধ্যেই তারা চলে আসে জামালপুর। এতে রাজিব সহ তাদের সবার খুব ভালো লাগবে। একসাথে বিয়ের আয়োজন করবে সবাই। আকবর সাহেব হাসি-মুখে বলেছে সে চেষ্টা করবে।

——-
–“স্যার। আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে। বললো আপনার পরিচিত। আমি বললাম আপনি ব্যস্ত কিন্তু সেও নাছোড়বান্দা। কিছুতেই সেখান থেকে সরবে না। ঠিকই ঘন্টাখানেক গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তাই বাধ্য হয়ে আপনাকে কল দিলাম!”

সাইদ সাহেব নীরবে সব শুনে বললো,
–“নাম তো জিজ্ঞেস করেছ নিশ্চয়ই?”
দারোয়াম জিভে কামড় দিয়ে বললো,

–“স্যরি স্যার। এত কিছু বললাম অথচ নামটাই বলিনি। লোকটির নাম রাজিব। বললো জামালপুর থেকে এসেছে। হাতে বিয়ের কার্ডও আছে বোধহয়!”

অদ্ভুত ভাবে সাঈদ সাহেব যেন তাকে চিনতে পারলো। বললো,
–“তাকে ভেতরে আসতে দাও। এবং বাগানে বসতে বলো।”

দারোয়ান থতমত খেয়ে বললো, “জি, আচ্ছা স্যার।”
দারোয়ান বুঝতেই পারছে না সুদূর জামালপুরের লোকের সাথে সাঈদ সাহেবের কী সম্পর্ক? তাকে তো কোনোক্রমেই সাঈদ সাহেবের নিকটাত্মীয় লাগছে না। তাহলে? দারোয়ান ব্যাপারটাকে বেশি না ঘেটে গেটের দিকে পা বাড়ালো।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। চেষ্টা করবো প্রতিদিন গল্প দেওয়ার, ইন-শা-আল্লাহ্। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম প্রিয় পাঠকমহল। আর হ্যাঁ, আমার প্রকাশিতব্য দ্বিতীয় বই প্রি-অর্ডার করেছেন তো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here