হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২১]

0
36

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২১]

পরেরদিন খুব ভোরে প্রচন্ড কোলাহলে সিদাতের ঘুম ভেঙে যায়। শান্তির ঘুম নষ্ট হওয়ায় সিদাতের কপালে কতশত ভাঁজ দেখা গেলো। ঘুম চোখে নিয়েই সে উঠে বসলো। পাশে মিরাজ কানে বালিশ চেপে ঘুমোচ্ছে। সিদাত আযানের ধ্বনি খুব কাছ থেকে শুনতে পেলো। যেন কাছাকাছি-ই মসজিদ।

সিদাত আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দরজায় কড়াঘাত শুনতে পেলো। হাত দিয়ে কোনো রকমে এলোমেলো চুল ঠিক করে সদাত গিয়ে দরজা খুললো। দরজা খুলতেই একজন শ্যামবর্ণ, বেশ স্বাস্থ্যবান এক মধ্যবয়সী লোককে দেখতে পেলো। লোকটার মুখ জুড়ে অল্প অল্প দাঁড়ি এবং গাম্ভীর্য ভাব।

লোকটি একপলক সিদাতকে দেখে তার পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেলো। সিদাত এতক্ষণে লক্ষ্য করলো লোকটির হাতে চিকন লাঠি।মিরাজের কাছাকাছি গিয়ে তার গায়ে এটা দিয়ে চট করে মেরে দিলো। মিরাজ উপুড় হয়ে শুয়ছিলো। এজন্য বারিটা জায়গা মতো গিয়ে লেগেছে। মিরাজ আর্তনাদ করে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। বসলোও না ঠিক। বসার জায়গাতে গিয়েই লাঠির বারি লেগেছে। তরীর খালু কপট রেগে বললো,
–“বিয়াদব ছেলে! আযান দিচ্ছে আর তুই এভাবে মরার মতো ঘুমোচ্ছিস! কতবার বলেছি নামাজের সময় এভাবে পরে পরে ঘুমাবি না। ওঠ! এক্ষুনি আমার সাথে মসজিদে যাবি!”

মিরাজ সিদাতের সামনে ভীষণ লজ্জায় জর্জরিত হলো। মুখ ভার করে গলা দিয়ে উফফ, আঃ করতে করতে বললো,
–“সেটা তো সুন্দর করে বলে ওঠালেই চলতো। তাই বলে তুমি আমাকে লাঠি দিয়ে মারবে বাবা? তাও আরেকজনের সামনে!? এত বড়ো হয়ে গেলাম অথচ প্রাপ্ত সম্মানটুকু পেলাম না!”

তরীর খালু আবার লাঠি উঠাতেই মিরাজ সিদাতের থেকে মুখ লুকিয়ে পালালো। সিদাতের পাশ কাটিয়ে মধ্যবয়সী লোকটি যাওয়ার সময় বললো,
–“তোমাকে আমি সেভাবে চিনি না। তবে উঠে যেহেতু গিয়েছো, মসজিদে এসে নামাজটা পড়ে যাও!”

বলেই থমথমে মুখে বেরিয়ে গেলো। ভদ্রলোকের কথায় সিদাত আপত্তি করলো না। গায়ের টি-শার্ট চেঞ্জ করে বাইরে এসে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নিলো। অতঃপর সে দো’তলা থেকে নেমে বেরিয়ে গেলো। বেরিয়ে আসতেই দেখলো তার থেকে কিছুটা দূরে আকবর সাহেব মসজিদের দিকে যাচ্ছে। সিদাত তার পিছু পিছু গেলো। কারণ সে মসজিদের পথ চিনে না।

ফজরের নামাজ পড়ে আকবর সাহেব বেরিয়ে এসে জুতা পরার মুহূর্তে সিদাতকে দেখতে পায়। সঙ্গে দেখতে পায় তরীর খালু এবং মিরাজকেও। তাদের সকলকে দেখে আকবর সাহেব ভীষণ খুশি হলেন। সিদাত আকবর সাহেবকে দেখে ইতঃস্তত হয়ে পরলো। আকবর সাহেব তরীর খালুকে নিয়ে আগে আগে হাঁটতে শুরু করে।

সিদাত এবং মিরাজ পাশাপাশি হাঁটছে। মিরাজ অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললো,
–“তখন যা দেখেছো সব ভুলে যাও।”

সিদাত বুঝলো মিরাজ কী বোঝাতে চেষ্টা করছে। সিদাত চাপক হাসলো। বললো,
–“আশপাশটা ঘুরে দেখাও, তারপর ভুলে যাবো!”

অগত্যা মিরাজ সিদাতকে নিয়ে বাড়ি না ফিরে আশপাশটা ঘুরাতে লাগলো। কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুরাতে পারলো না। এর মাঝেই রাজিবের কল আসে। এখনই মিরাজকে ফিরতে হবে। মিরাজের সাথে সিদাতও ফিরে এলো।

———-
নাস্তার পরপর তরী, সাবিয়া, মৌসুমী সহ সব বোনেরা একসাথে ছাদে বসেছে। ছাদে ডেকোরেশনের কাজ চলছে। তরী এবং সাবিয়া মুখে মাস্ক পরে, মাথায় ঘোমটা টেনে বসে আছে। এ নিয়ে কয়েকজন কাজিন হাসি-ঠাট্টা করছে। একজন তো বেফাঁস বলেই ফেললো,
–“তরী এবং সাবিয়ার করোনা হইছে। সবাই ওদের থেকে দূরে দূরে থাকো।”

এতে সবাই যেন হাসিতে ফেটে পরলো। শুধু হাসলো না মৌসুমী সহ আরও দুই বোন। সাবিয়া তরীর হাত শক্ত করে চেপে বসে রইলো। আরেকজন বললো,
–“আরে না, না। আমাদের এই দুই বোন অনেক সুন্দরী তো! এজন্যে মুখ দেখাতে লজ্জা পায়।”

তরী তীক্ষ্ণ নজরে ছাদের ওপাশে কাজ করা লোকগুলোর দিকে তাকালো। ওরা কাজের ফাঁকে এদিকে তাকাচ্ছে। তরী হেসে বললো,
–“লজ্জা কেন পাবো বলো তো আপা? আমরা নিজেকে মূল্যবান মনে করি দেখেই নিজেদের পর্দার আড়ালে রাখি!”

এর বেশি কিছু বললো না তরী। এর বেশি বলা তার মানা। তরীর এ-কথায় সেই বোনের কেমন গা জ্বলে উঠলো। কিন্তু কিছু বললো না। তাদের মধ্যে আগে থেকেই নীরব যুদ্ধ চলছে। তবে তার ঠাট্টা নামক খোঁটার পরিবর্তে তরীও কিছু বলবে সেটা আশা করেনি।

তরীর মামা বাড়ি সহ বেশ আত্নীয়-স্বজন তাদের পরিবারের মতো না। তাদের তরী বা তার পরিবার কিছু বলে না। আকবর সাহেব আগেই বলে দিয়েছে, ওরা যা ইচ্ছা করুক সেই ব্যাপারে ওরা স্বাধীন। তাদের ব্যাপারে নাক গলিয়ে কিছু বলতে গেলে নিজের নাক কাটা যাবে। এজন্যে যে যেমনই হোক, খুব নম্রতার সাথে মিশতে বলেছে। শুধু তোমাকে নিজের জায়গায় ঠিক থাকলেই চলবে। তরী এবং সাবিয়া তার বাবার কথা রাখতেই তাদের সাথে নম্রতার সাথে মিশছে। তবে মৌসুমী জানে তার ফুপি, ফুপা, বোনগুলো কেমন। এজন্যে মৌসুমী ওই বোনকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়। যেহেতু বোনেদের মধ্যে মৌসুমী সবার বড়ো, সেহেতু মৌসুমীর কথায় তরীকে আর কিছু বললো না। মৌসুমীর হবু বরকে নিয়ে নানান আলাপ করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। এর মাঝেই ওদের মধ্যে একজন বলে ওঠে,
–“চা খেতে ইচ্ছে করছে। তরী, যা তো চা করে আন আমাদের জন্যে। তোর হাতের চা খেতে ইচ্ছে করছে।”

তরী সম্মতি জানিয়ে সাবিয়াকে সাথে নিয়ে নিচে নামলো। নিচে আসতেই মৌসুমীর খালাকে দেখতে পায় সে। সেই মহিলা পান চিবুতে চিবুতে সাবিয়া এবং তরীকে দেখছে। ঠেস মেরে বললো,
–“ঘরের মধ্যে এমন মুখ ঢেকে চলাফেরা করতেছো কেন? কোনো সমস্যা হইছে?”

তরী নেতিবাচক মাথা নাড়িয়ে বললো,
–“না, কোনো সমস্যা নেই!”

মহিলা এবার তরীর মাথা থেকে পা অবধি দেখলো। মুখ কিছুটা কুচকে ফেললো সে।
–“বিয়ে বাড়িতে মেয়েরা এরকম বেশভূষায় থাকে নাকি? সুন্দর সাজগোছ, শাড়ি, জামা পরে ঘুরবা তা না!”

সিদাত তাদের পিছে দিয়েই যাচ্ছিলো তখনই মহিলার কথাগুলো শুনতে পায় সে। এক মুহূর্তের জন্যে থেমে যায় সে। একপলক তরীর দিকে তাকালো। তরী শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিদাত ভারী অবাক হলো। তরী যেভাবে চলাচল করছে তা খুবই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই মহিলার কথায় এত তাচ্ছিল্য কেন? ভেবে পেলো না সিদাত।

তবে সে তরীকে বিব্রত করতে চায় না। সে চটজলদি পা চালিয়ে চলে গেলো। রান্নাঘর থেকে তৎক্ষণাৎ তরীর মামী ছুটে এলো। তার বড়ো বোন কে সামলে বললো,
–“থামো আপা। কাকে কী বলছো? ওরা আমাদের কামরুন আপার মেয়ে।”

মহিলা বুঝতে পারলেন। কিছু অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
–“ওহ!”

বলেই মহিলা চলে গেলো। মামী অমায়িক হাসি দিয়ে বললো,
–“আমার আপার কথা কিছু মনে নিও না। সে একটু অন্যরকম। তোমরা বলো, কিছু লাগবে?”

তরী বললো,
–“আমি চা বানাতে চাই মামী। আপুরা সবাই খেতে চাইলো!”
–“আমি-ই তো কত চা বানালাম, আলাদা করে আবার বানানোর কী দরকার? তোমরা উপরে যাও। আমি চা পাঠাচ্ছি!”

তরী কিছু বললো না। ছাদে না গিয়ে সাবিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। আশেপাশে ঘুরবে দুই বোন।

দুপুরের দিকটায় তরী রাজিবদের পুকুরের সামনে এসে দাঁড়ালো। পুকুরের অন্য পাশে ছেলেরা একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ভীষণ গরম। এই গরমে সব কাজের ভাড় রাজিব তাদেরকেই দিয়েছে। ওদের মাঝে মিরাজ এবং সিদাতকেও দেখা যাচ্ছে। তরী, সাবিয়ার পিছু পিছু মেয়েরাও এসে পরেছিলো। মেয়েদের দেখতে গিয়ে তরীর এক কাজিন তার পাশের ছেলেটাকে ধাক্কা দেয়। যার ফলে সে গিয়ে দুম করে পুকুরে পরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ হলো। অতঃপর হাসিতে ফেটে পরলো সকলে। তরীও হাসলো। দিই পাড়ে হাসির রোল পরে গেলো।

এভাবে আরও কয়েকজন পরলো। হাসির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। মিরাজ সাহস করে সিদাতকে ধাক্কা দিলে সিদাত মিরাজের হাত ধরে ফেলে। যার ফলে মিরাজকে নিয়েই সে পুকুরে পরলো। সিদাতের পুকুরের পানিতে জুবুথুবু অবস্থা। সাবিয়া এই দৃশ্য দেখে আরও বেশি হাসিতে ফেটে পরলো। মেয়েরা হাসতে হাসতে বলছে,
–“দেখ, দেখ! এই আরজেও পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। মিরাজ বেচারা অন্যকে ফেলতে গেলে নিজেও পরে গেলো। হায়রে কপাল!”

যোহর অবধি তাদের হাসা-হাসি মজা-ঠাট্টা চলছে। যোহরের আযানের আগেই মেয়েরা ভেতরে চলে গেলো। আর ছেলেরা যোহর অবধি পুকুরে ডুব দিয়ে গোসল সেরে নেয়।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ আমার দ্বিতীয় বইয়ের প্রি-অর্ডার চলছে। আপনারক প্রি-অর্ডার করেছেন তো?

ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় আছি!💝

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here