#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৩]
মুহূর্তে-ই সিদাতের আশেপাশে থাকা ছেলেরা অর্থাৎ মৌসুমীর ভাইয়েরা অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। সিদাত হতভম্ভ এরকম কথা শুনে। তরী বেশ চমকে তাকালো শাওনের দিকে। শক্ত গলায় শুধালো,
–“সানিয়া মোটেও এরকম কিছু বলেনি। কেউ হাসবেন না। শাওন মজা করছে।”
তরী থেমে গিয়ে গলায় আরও কিছুটা কাঠিন্য ফুটিয়ে শাওনের উদ্দেশ্যে বললো,
–“বোনকে সম্মান করতে না পারো, অন্তত মানুষের কাছে তাকে হাসির পাত্রী বানিও না!”
সানিয়া লজ্জায় সটান মে*রে দাঁড়িয়ে ছিলো। তরী সানিয়ার হাত ধরে অন্যদিকে চলে গেলো। তরীর কথাগুলো শাওনের কানে পৌঁছাতেই তার মুখ ভার হয়ে গেলো। সে তো শুধু মজা নিচ্ছিলো। তাই বলে তরী তাকে এত কঠিন কথা বলে গেলো?
তরী সানিয়ার মন ভালো করতে মৌসুমীর কাছে নিয়ে গেলো। মৌসুমীর আশেপাশে মেহেদী পরানোর জন্যে মেয়েরা রয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে তরী বললো যাতে সানিয়াকে মেহেদী পড়িয়ে দেয়। রাজি হলো সেই মেয়েটি। মুহূর্তে-ই সানিয়ার অধর জোড়া প্রসারিত হলো। তা দেখে তরীও হাসলো।
মৌসুমীকেও ভীষণ খুশি দেখা যাচ্ছে। মৌসুমীর খুশি দেখে তরী একটু শান্তি পেলো। মৌসুমী হাত দিয়ে তরীকে কাছে ডাকলে তার দিকে এগিয়ে গেলো তরী। মৌসুমী বললো,
–“জানিস, ঢাকা থেকে আমার ননদ, আর কিছু দেবর’রা আসছে। আমার দারুণ অনুভূতি হচ্ছে রে তরী! শুনেছি ওরা আমার বেনারসি, অলংকার, নানান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব একসাথে আজ-ই নিয়ে আসছে!”
মৌসুমীর পাশে বসা মৌসুমীর সেই খালার মেয়ে আনিকা বললো,
–“কিছু ভাগ আমাকেও দিও আপু। না জানি কোন মার্কেট তুলে আনছে!”
মৌসুমী সে-কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিলো। এমন সময় সেই মেয়েটি-ই আবার বললো,
–“ওরা আসলে আমরা কিন্তু সবাই মিলে নাচবো! ঠিকাছে তরী?”
তরীর চোখ কপালে উঠে যায় এ-কথা শুনে। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো আনিকার দিকে। নিজেকে ধাতস্থ করে হাসার চেষ্টা করলো। বললো,
–“আরে ধুর। কী সব বলছো?”
তরী সাবিয়াকে খোঁজার বাহানায় সেখান থেকে চলে এলো। গা ঘিনঘিন করছে তার। তরী যেতেই মৌসুমী ধমকালো আনিকাকে। বললো,
–“তরীকে নিয়ে সমস্যা কী তোদের? ওর পিছে কেন লাগিস? জানিস না ও ব্যতিক্রমধর্মী? কেন নিচু কথা বলে ওকে অস্বস্থিতে ফেলিশ?”
আনিকা হাসলো। পৈশাচিক হাসি। মৌসুমীর কথা গায়ে না মেখে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
–“কাকে কী বলছো আপু? এই মেয়ে পর্দাশীল, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী? আমার তো এগুলা কল্পকথা ছাড়া কিছুই মনে হয় না। এত প্রেক্টিসিং মুসলিম হলে কখনোই এত গান-বাজনা দিয়ে ঘুরে বেড়াত না। এগুলা হুদাই ঢং করে মানুষদের দেখানোর জন্যে। যাতে সবার নজর, আকর্ষণ অর দিকে যায়। শহুরে মেয়ের মতলব বুঝি না ভাবছো? হাহ্!”
মৌসুমী আবার ধমকালো। আনিকা শুনলো না। সে নিজের মতো বলেই যাচ্ছে। এসব বলে সে ভেতরটা নরম করতে চাইছে। যেন তার মন জুড়ে তরীর জন্যে নীরব ক্ষোভ পুষে রেখেছে। যা প্রকাশ করার মোক্ষম সুযোগ সে পেয়েছে। মৌসুমীর অপর পাশে বসা সানিয়া আনিকার দু’একটা অস্পষ্ট তিক্ত বাণী শুনতে পেলো। কিন্তু সে কিছু বললো না। মূর্খদের সাথে তর্কে জড়াতে নেই।
এশার আযানের ঠিক পরপর-ই মৌসুমীর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন এলো। তরী এবং সাবিয়া তখন নামাজ পড়তে নিচে চলে গেছে। আযানের সময় থেকে গান-বাজনা বন্ধ। রাজিব সাহেবের কড়া নির্দেশ, নামাজের সময় শেষ না হওয়া অবধি গান বাজানো যাবে না।
সিদাত দেখেছে আযানের সময় তরীকে হন্তদন্ত হয়ে নিচে চলে যেতে। কেন যাচ্ছিলো তা বোধহয় সিদাত ধারণা করতে পেরেছে। এজন্যে দু’একটা হাঁচি দিয়ে শাওনকে নিয়ে সেও মসজিদের উদ্দেশ্যে চলে গেলো। শাওন তো সেই খুশি। তার পছন্দের আরজে তাকে নিয়ে মসজিদে যাবে, একসাথে নামাজ পড়বে। এমন হলে শাওন বারবার মসজিদে যেতে রাজি।
তরী সালাম ফিরিয়ে খাটের দিকে তাকাতেই কিছুটা চমকে গেলো। খাটে বসে একটি অল্প বয়সী মেয়ে তরীদের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। তরী অপ্রস্তুত হয়ে নজর ফিরালো। মেয়েটি তরীর সম্পূর্ণ অপরিচিত। তরী চোখ বুজে মোনাজাত শেষ করে আবার খাটে তাকাতেই দেখলো মেয়েটি আগে মতোই চেয়ে আছে।
তরী জায়নামাজ নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তার কিছুক্ষণ বাদে সাবিয়াও জায়নামাজ নিয়ে দাঁড়ালো। তরী মেয়েটিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারে মেয়েটি হয়তো সানিয়ার বয়সী। সাবিয়া মেয়েটির দিকে অবাক চোখে চেয়ে আছে। অস্ফুট স্বরে বললো,
–“তোমাকে তো চিনতে পারলাম না!”
মেয়েটা হাসলো। বললো,
–“আমি সাদিয়া। মৌসুমী ভাবীর একমাত্র ননদ। তোমরা?”
তরী এবার চিনতে পারলো। আলতো হেসে বললো,
–“মৌসুমী আপু আমাদের মামাতো বোন!”
মেয়েটার চোখ-মুখ চকচক করে উঠলো। খুশি মনে আওড়ালো,
–“লম্বা জার্নি করে আমি ভীষণ ক্লান্ত। বলা বাহুল্য একটু অসুস্থ হয়ে পরেছি। বিশ্রামের জন্যে আমাকে এই ঘরে পাঠানো হলো। আমি রুমে এসে দেখি তোমরা দু’জন নামাজ পড়ছো। দেখতে কী যে ভালো লেগেছে। মনে হচ্ছে ক্লান্তি সব ধুঁয়ে মুছে সাফ!”
তরী আবারও হাসলো। সাদিয়ার সাথে ওরা দুজন পরিচিত হয়ে নিলো। সাদিয়া খুশি-মনে ওদেরকে নিজের সঙ্গী করে ফেললো।
ছাদে আসতেই আবারও গান-বাজনা শুরু হলো। সাদিয়ারা ঘন্টা দুয়েক থেকে আবারও রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশ্যে। সাদিয়ার সাথে আসা ছেলেগুলো বড্ড উশৃঙ্খল ছিলো। তরীর তো ওদের মোটেও ভালো লাগেনি। তবে তরীর বোনে’রা হাসি-তামাশা করছিলো খুব।
সিদাত সারাদিন কোনোরকমে থাকলেও বাইরের ঠান্ডা বাতাসে তার গায়ে জ্বর বাঁধলো। ছাদে তখনো হৈচৈ চলছে। সিদাতের শরীর খারাপ লাগায় সে নিচে চলে এসেছে। বিছানা গা এলিয়ে দিতেই আর মাথা তুলে বসার মতো অবস্থা হলো না তার। কোনোরকমে পাঞ্জাবি বদলে একটি টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলো। উপরের সিলিং ফ্যানটা বন্ধ।
গান-বাজনায় আর থাকতে পারছিলো না তরী। মাথা অসম্ভব ব্যথা করছে তার। এজন্যে সাবিয়াকে মায়ের কাছে রেখে মৌসুমীর ঘরের দিকে যাচ্ছিলো পেইন কিলারের জন্যে। মৌসুমী জানিয়েছে তার ঘরে পেইন কিলার আছে। হঠাৎ সিদাতের ঘরে চোখ যেতেই দেখলো সিদস্ত কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। চেহারাটাও কেমন শুকিয়ে আছে।
এর মাঝে সিদাত একবার হাঁচি দিলো, খুঁক খুঁক শব্দে কাশলো। তরী চেয়েও সিদাতকে এড়িয়ে যেতে পারলো না। সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে নীরবে পর্যবেক্ষণ করলো সিদাতকে। তবে তরী রুমের ভেতরেও প্রবেশ করলো না।
সানিয়া শাওনকে এড়িয়ে চলছে। বড্ড অভিমান জমেছে তার মনে। ছোটো ভাইটা এভাবে বেফাঁস কথা বলে তাকে এভাবে লজ্জায় ফেলবে বুঝতে পারেনি। এজন্য সানিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাওনকে এড়িয়ে চলবে। তবে শাওনের মোটেও এই ব্যবহার পছন্দ হচ্ছে না। বারংবার বোনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে সে।
–“এই আপু। শোন না!”
সানিয়া শাওনের ডাকে দাঁড়ালেও জবাব দিলো না। শাওন থেমে আবার বললো,
–“স্যরি আপু। আমি বুঝতে পারিনি আমার মজাটা এরকম হয়ে যাবে। আর কখনো করবো না এরকম মজা। প্লিজ কথা বল।”
সানিয়া ভারী গলায় বললো,
–“ব্যস্ত আছি। অন্য হাতের মেহেদী ওঠাতে হবে। পরে কথা বল!”
সানিয়া চলে গেলো। শাওন হতাশ নজরে সানিয়ার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো। এমন সময় তরী চাপা স্বরে শাওনকে ডাকলো। বললো,
–“জলদি আসো। তোমার সাথে আমার কাজ আছে!”
তরী শাওনকে নিয়ে সিদাতের রুমের দরজায় দাঁড়ালো। শাওন ভেতরে গিয়ে সিদাতের গালে, কপালে হাত রাখলো। মুহূর্তে-ই সে চমকালো। অস্ফুট স্বরে তরীর দিকে তাকিয়ে বললো,
–“সিদাত ভাইয়ার যে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তরী আপু!”
তরী নামটা সিদাতের কান দিয়ে প্রবেশ করলো। কোনোরকমে চোখ মেলে চাইলো সে। নিভু নিভু নজরে এপাশ ওপাশ চেয়ে শেষে দরজায় তার নজর আটকালো। অস্পষ্ট গলায় শুধালো,
–“নিকাব রাণী!”
©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় আছি।

