হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৫]

0
40

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৫]

রাজিব সাহেব আবিরকে মেনে নিয়েছেন তা ভাবাটা ভুল। সে শুধুমাত্র চুপ আছেন মেয়ের জন্যে। বাড়ি-ভর্তি মানুষের মাঝে চিল্লা-পাল্লা করাটা তার অপছন্দের বিষয়। পারিবারিক সমস্যা সে পারিবারিক ভাবেই সমাধান করবেন। এজন্যে একপ্রকার বাধ্য হয়েই নীরবে সব কাজ করছেন। আবির আসার পরপর বাবার সাথে কাজে হাত লাগাচ্ছে আবিরও। একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা, সে তো আর চুপ করে বসে থাকতে পারবে না। বড়ো ভাইয়ের দায়িত্বটুকু নিজের সবটা দিয়েই পালন করবে সে।

রাতে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো। আজ একটু তাড়াতাড়ি-ই মৌসুমির শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন এসেছে। আজ সাদিয়া আসেনি। তাদের মুখে শোনা যায় গতকালের পরপর দু’বার লম্বা জার্নির জন্যে সাদিয়া কিছুটা অসুস্থ। এজন্যে সে চেয়েও আসতে পারেনি তার হবু ভাবীর গালে হলুদ ছোঁয়াতে। তরী এক পাশে একা দাঁড়িয়ে সাবিয়ার দিকে লক্ষ্য রাখছে। সাবিয়া ছাদের আরেক প্রান্তে কিছু সমবয়সীদের সাথে খুব আনন্দ করছে। তরী তাকে বারণ করেনি। প্রাণ খুলে আনন্দ করুক। এখন তো ওদের আনন্দ করার বয়স। অবশ্য এই আনন্দ একদমই লাগাম ছাড়া নয়। লাগাম ছাড়া যাতে না হয় সেদিকেও তরী লক্ষ্য রাখছে।

আচমকা কোথা এক ছেলে এসে তরীর মুখোমুখি দাঁড়ালো। তরী অপ্রস্তুত হলো এতে। এক পলক ছেলেটিকে পরখ করে চোখ নামিয়ে অন্যদিকে সরে গেলো সে। তবুও ছেলেটি সরলো না। তরীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। আশেপাশে নজর বুলিয়ে একটু টিটকারি মে*রে বললো,

–“ব্যাপার কী মিস? বিয়ে বাড়ির পরিবেশে এমন মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? খোলামেলা নিঃশ্বাসের সাথে অভিমান করেছেন বুঝি?”

তরী অস্বস্তিতে পড়লো, তবে কোনো জবাব দিলো না। ছেলেটি আবার হেসে বললো,
–“আপনি বেয়াইন রাইট? মুখ লুকাবেন না, বন্ধুত্ব-ই করতে তো এসেছি। আচ্ছা রিলেক্স!”

ছেলেটি আরও কিছু বলার পূর্বেই তাদের দুজের মাঝের দূরত্বে এসে দাঁড়ালো সিদাত। চওড়া হাসি দিয়ে নরম গলায় বললো,
–“একটি মেয়ে কথা বলতে চাইছে না, অস্বস্তি অনুভব করছে, তাকে খুঁচিয়ে কথা না বলাই ভালো ব্রো।”

সিদাতকে দেখে ছেলেটা চমকালো। মনে হলো সিদাতকে কোথায় যেন দেখেছে? তবে সিদাতের কথাগুলো তার কাছে অপমানজনক লাগলো। তাও অধরে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
–“বুঝতে পেরেছি।”

বলেই ছেলেটি চলে গেলো। তরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পিছে ফিরে রেলিঙে দু’হাত প্রসারিত করলো। সিদাত হঠাৎ হাঁচি দিয়ে উঠলো। পরমুহূর্তে পকেট থেকে একটা মাস্ক বের করে পরে নিলো সে। কারো সম্মুখে হাঁচি দেওয়াটা তার নিকট বড়োই বিব্রতকর। এজন্যে মাস্ক পরে হাতের ব্যবহৃত টিস্যুটা ফেলে তরীর থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়ালো। অদূরে শূন্য নজর নিক্ষেপ করে বললো,
–“আমার ধন্যবাদ পাওয়ার কথা ছিলো!”

তরী কোণা চোখে সিদাতের দিকে চাইলো। সিদাতের কন্ঠটা কেমন ভেঙে গিয়েছে। কন্ঠ অন্যরকম শোনাচ্ছে। হয়তো-বা ঠান্ডা ভালোই তাকে কাবু করে নিয়েছে। তরী সঙ্গে সঙ্গে বললো,
–“ধন্যবাদ!”

সিদাত হাসলো। পরমুহূর্তে আর কথা হলো না। সময় গড়াতে লাগলো। চারপাশে মানুষদের সমাগম, সড়গোল অথচ তাদের দুজনের মধ্যে রাজ্যের নীরবতা। এভাবেই কতক্ষণ কেটে যায়। সিদাত হঠাৎ আনমনে বলে ওঠে,
–“আমার সাথে কেন বন্ধুত্ব করলে না তরী? আমার সাথে বন্ধুত্ব না করার দুটো কারণ বলো তো?”

তরী এবার পাশে তাকালো। সিদাত হাত দুটো অস্বাভাবিক ভাবে পকেটে পুরে রেখেছে। কেমন যেন হাবভাব তার। কন্ঠস্বরও কেমন বদলাচ্ছে। তরী ঘাড় কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে সিদাতের মুখ দেখে বোঝার চেষ্টা করলো।
–“কী হলো তরী? বলো?”

তরী চোখ ফিরিয়ে নিলো। সিদাতের এতক্ষণে হুঁশ এলো। সে কীসব বলছে? বরফে জমে যাওয়ার হাতটা কপালে রাখলো। জ্বর-টর এলো নাকি? হ্যাঁ! আসছে আবার জ্বর। এজন্যই তো হঠাৎ কেমন শীত শীত করছে। হাত-দুটো পকেটেও উষ্ণ হচ্ছে না। তরীকে করা প্রশ্নটা মাথায় আসতেই সিদাত বিব্রত হয়ে পরলো। একদম চুপসে গেলো সে। কিন্তু তরীর কাছে উত্তর জানতেও সে আগ্রহী। এজন্যে তার জায়গা থেকে সরলো না। সটান মেরে দাঁড়িয়ে রইলো।

মিনিটখানেকের মধ্যে হঠাৎ তরী মুখ খুললো,
–“আপনি পুরুষ মানুষ!”

সিদাত হয়তো এই উত্তরটা ধারণা করেছিলো। তাও তরীর মুখের বুলি শুনতে ইচ্ছে করছিলো। এজন্য ইচ্ছেকৃত আবার প্রশ্ন করলো,
–“আর?”

তরী ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলো সিদাতের দিকে। ভুরু কুচকে বললো,
–“এটার চাইতে বড়ো কারণ আর কী হতে পারে?”

সিদাত নাছোড়বান্দা কন্ঠে বললো,
–“দ্বিতীয়টাও বলো!”

তরী ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। অদূরে চেয়ে কিছু একটা ভাবলো। এরপর আবারও থমথমে চাপা গলায় বললো,
–“আপনি মাতাল হয়ে আমার বাসায় ঢুকেছেন!”

তরীর এ-কথা শুনে সিদাতের আর সেখানে দাঁড়ানোর ইচ্ছা করলো না। মুখ ঘুচে সে তৎক্ষনাৎ নিচে চলে এলো। রুমে এসে জ্বর, সর্দির নির্ধারিত ওষুধ খেয়ে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পরলো। কাশির মেডিসিনটা খেলে সিদাতের খুব ঘুম পায়। হাই পাওয়ারের ওষুধ ওটা। সেজন্যই লাইট নিভিয়েছে সে। শুয়ে শুয়ে ভাবছে তরীর কথা। তরীর বলা দ্বিতীয় কারণটা তাকে পোড়াচ্ছে। ভীষণরকম ক্ষত-বিক্ষত করেছে। সিদাতের কাছে মনে হলো তরীর প্রথম বলা কারণের চাইতে দ্বিতীয় কারণটা বেশি শক্ত, গভীর, বিক্ষত। অন্ধকারে অসংখ্য দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো সে। তরীর কাছে বারবার ছুটে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে,

–“তুমি আমাকে ভুল বুঝলে নিকাব রাণী। আমি মোটেও স্ব-জ্ঞানে আজ অবধি নেশা করিনি। অন্যের দায় আমার কাঁধে কেন পরবে, আমার কাঁধ-ই কেন ভার হবে?”

কিন্তু সাফাই দিতেও ইচ্ছা করলো না। তরী তাকে অলরেডি সেই ধরণের ছেলে ভেবেই নিয়েছে। কিন্তু একটা মানুষকে ভুলের পর্দার আড়ালে রাখাটাও বোকামী। এরকম নানান চিন্তা-ভাবনা করতে করতে সিদাত ঘুমিয়ে পরলো।
পরেরদিন বিয়ে শেষ করেই সিদাত ইমার্জেন্সি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। এখানে তার এখন দমবন্ধকর অনুভব হচ্ছে। তরীকে দেখলেই নিজেকে মাতাল, নেশাখোর লাগে। এই পদবী সিদস্ত একদমই নিতে পারে না। তরীকে দেখেও নিজের অস্থিরতা কমাতে পারে না। মেয়েটা তাকে প্রতিনিয়ত ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে।

তরীরা ঢাকা ফিরলো বিয়ের আরও দুই দিন বাদে। মৌসুমীর বিদায় দিয়েই রাজিব সাহেব জুঁইয়ের বাবা-মাকে ডেকে পাঠালো। সবার সামনে রাজিব থমথমে গলায় তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলো,

–“একটা কথা মনে রাখবেন, ছেলে-মেয়েরা মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের কঠোর শাসনের ভয়ে ভুল করে বসে। সেই ভুলের শাস্তি প্রতিনিয়ত পোহাতে হয় বাবা-মা কে। যখন আপনারা জানলেন আপনাদের মেয়ে সম্পর্কে জড়িয়েছে তখন মেয়ের সাথে ঠান্ডা মাথায় কথা না বলে, ছেলের ব্যাপারে খোঁজ-খবর না নিয়ে কীভাবে পারলেন এরকম চরম বোকামি করতে? মেয়েকে জোর করে বিয়ে দিলে কী পেতেন? আল্লাহ্ না করুক, আপনাদের এই তীব্র জেদ এবং রাগের বশবর্তী হয়ে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর শুনলেন মেয়ে সুখে নেই। তখন কেমন লাগতো?”

রাজিব সাহেব থেমে আবার খুবই নরম সুরে বললেন,
–“আপনাদের উচিত ছিলো মেয়ে কার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তার খোঁজ-খবর নেওয়া। যদি দেখতেন ছেলে এবং ছেলের পরিবার আপনার মেয়েকে সুখে, শান্তিতে রাখবে না তখন আপনি অন্য পন্থা অবলম্বন করবেন। কারণ আমরা বাবা-মা কখনোই চাই না ছেলে-মেয়ে অসুখী, বেপথে যাক। আপনাদের এই একটা ভুলের জন্যে আমরা দুই পরিবারই ক্ষতির সম্মুখীন হলাম!”

এভাবে নানান কথাবার্তার মধ্যেই দীর্ঘক্ষণ বৈঠক হয়। জুঁইয়ের বাবা অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে জানায় সে ভালো ছেলে খুয়াতে চায়নি, একপ্রকার ভয় নিয়েই জলদি জলদি সব ব্যবস্থা করেছে। তার ভাষ্যমতে ভালো ছেলে কখনোই সম্পর্কে জড়ায় না। কিন্তু পরে তার মেয়ের পালিয়ে যাওয়ার পরপরই তার কানে খবর আসে জুঁইয়ের জন্যে ঠিক করা ছেলেও নাকি অন্য এক মেয়ের সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলো। এ খবর কানে আসতেই তীব্র আফসোসে জর্জরিত ছিলেন। মেয়ের খোঁজ-খবরও নিতে পারেননি সে। আফসোসের সাথে দিন-রাত মনে হতো, একবার মেয়ের কথা শুনলে কী এমন ক্ষতি হতো?

ঝামেলা মিটমাট করে বাসায় ফিরে তরী প্রথমে ফ্রেশ হয়েই বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পরলো। সাবিয়া তরীর আসার পরপরই বাথরুমে ঢুকেছে। তরীর মনে হচ্ছে কতদিন পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে। অদ্ভুত শান্তি, ভালো লাগা, স্বস্তি সব দেহ জুড়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার। আসলেই, আপন নীড়ের মতো শান্তি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

———–
সিদাত ভুরু কুচকে সাইফের দিকে চেয়ে বলে,
–“এভাবে ইমার্জেন্সি ডাকলে কেন ভাইয়া?”

সাইফ সিদাতের কথায় ফোড়ন কেটে বললো,
–“সেসব কথা বাদ। তার আগে এটা বল তুই আবার কবে গার্লফ্রেন্ড জুটালি? এত বড়ো কথা তুই আমার থেকে এভাবে লুকাতে পারলি?”

সিদাত শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিলো। সবেই গোসল দিয়ে বেরিয়েছে সে। ভেজা চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে তার। সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরছে। সাইফের কথা শুনে সিদাতের হাত নিজের অজান্তেই থেমে গেলো। বিস্ময় ভরা চোখে সাইফের দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,

–“এসব কী বলছো? গার্লফ্রেন্ড?”

সাইফ চোখ গরম করে তাকালো সিদাতের দিকে। হাত উঠিয়ে মা*র দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো,
–“মে*রে পিঠের চামড়া তুলে নিবো। আড়ালে-আবডালে সব সেরে এখন ন্যাকা সাজা হচ্ছে? গার্লফ্রেন্ড কী জিনিস তা তুমি বুঝো না?”

–“আমি আসলেই বুঝতে পারছি না ভাইয়া তুমি কী বলছো? আমার গার্লফ্রেন্ড আসবে কোথা থেকে? আমি তো সবেই জামালপুর থেকে আসলাম। মাথাটা তোমার আসলেই গেছে?”

–“মাথা আমার পুরোপুরি সুস্থ। কোথাও যায়নি। তুই সত্যি বলবি নাকি আমি বাবার কানে এই কথা লাগাবো?”

–“আমার গার্লফ্রেন্ড আছে আমিই জানি না আর তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছো? কে বলেছে এসব অহেতুক কথা?”,

সাইফ ভুরু কুচকালো। সিদাতের মুখ-ভঙ্গি স্বাভাবিক। সিদাত মিথ্যে বললে সাইফের কাছে সবসময় ধরা খায়, কিন্তু আজ কোনো দিক দিয়ে মনে হচ্ছে না সিদাত মিথ্যে বলছে। এর মানে কী দিয়া তাকে ভুল বললো? সাইফ কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,
–“তোর ভাবীর বোনেরা নাকি বলেছে তোর গার্লফ্রেন্ড আছে?”

সিদাত চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আবার শার্টের বোতাম লাগাতে মনোযোগী হয়ে বললো,
–“এমনেই বলেছিলাম গার্লফ্রেন্ড আছে। স্বভাব সুবিধার লাগছিলো না এদের!”

সাইফ এতক্ষণে অংকের হিসেবটা মেলাতে সক্ষম হলো। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
–“যাক, ভালোই হয়েছে। ও হ্যাঁ তোকে আরেকটা নিউজ দেওয়ার আছে!”

–“কেমন নিউজ?”

–“বাবা এবার বিয়ের জন্যে তোর পিছে লেগেছে। মায়ের ইচ্ছে তোর বউও শীঘ্রই দেখতে চায়!”

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ অনেকদিন পর লিখলাম। কেমন হয়েছে, লেখার ধারাবাহিকতা ঠিকাছে কী না বুঝতে পারছি না। অবশ্যই ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিবেন, আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করবো। আর হ্যাঁ! দুদিন গল্প না দেওয়ার জন্যে দুঃখিত। পরীক্ষার পরপর চোখের সমস্যা হয়েছে। এখন চোখে চশমা পরে লিখেছি। যতটুকু সম্ভব হয়েছে লিখেছি। আপনারা দয়া করে সাড়া দিবেন প্লিজ। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here