হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৬]

0
43

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৬]

তরী ফুটপাতের বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পিছে ফিরতেই কারো সঙ্গে ধাক্কা খেল। যার ফলে তার হাতে থাকা স্কেচবুক আর পেন্সিলগুলো পরে যায়। তরী অপ্রস্তুত হয়! সামনে তাকাতেই ভড়কালো। সিদাত মাথা নিচু করে স্কেচবুকের পেজটির দিকে চেয়ে আছে। তরী শুকনো ঢোক গিলে দ্রুত সেগুলো উঠিয়ে তার ব্যাগে পুরে নেয়। সিদাত অবাক স্বরে বললো,

–“তোমার স্কেচ তো দারুণ নিকাব রাণী!”

তরী বিব্রত হলো। মিথ্যাও বলতে পারল না। এজন্যে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“যা দেখেছেন তা ভুলে যান!”
বলেই সিদাতের পাশ কেটে যেতে নিলে সিদাত বলল,
–“প্রতিভা ভুলতে নেই। তোমার স্কেচ সত্যি-ই সুন্দর। তুমি কী চারুকলা থেকে পড়ছো?”

তরী জবাব দিলো না। সে চলতে লাগলো। সিদাতও তার পিছে পিছে হাঁটছে। তরী প্রথমে সেভাবে খেয়াল করেনি। কী মনে করে পিছে চাইতেই সিদাতকে পেলো। সিদাত অমায়িক হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে পরেছে। তরী সিদাতের সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল,
–“ভুলে যেতে বলেছি ভুলে যাবেন!”

–“কেন? আঁকিবুঁকি তোমার টপ সিক্রেট নাকি?”

তরী মুখে কিছু না বললেও সিদাত যা বোঝার বুঝে নিল। সিদাত হেসে প্রসঙ্গ পালটে বলল,
–“ট্রুলি বলি নিকাব রাণী? তোমাকে দেখলে আমার চক্ষের শান্তি মিলে। এমন কেন হয়?”

তরী হকচকালো। মাথা তুলে সিদাতের চোখের দিকে চাইলো। পরমুহূর্তেই বিব্রত হয়ে পরলো সে। এই চোখ জোড়ায় অন্য রকম কিছু ছিল, যা তরীকে কেমন চমকিয়ে দেয়। তরী কোনো রকমে বললো,
–“আমার পিছু নেবেন না!”

বলেই তরী চলে গেলো। সিদাত সত্যি-ই পিছু নেয়নি। পাশের টঙে গিয়ে বলল,
–“আমাকে দুই কাপ চা দিন তো। হৃদয় ম্যাজম্যাজ করছে!”

দোকানদার অবাক চোখে চাইলো সিদাতের দিকে। কী ম্যাজম্যাজ করছে, তা বোধহয় বুঝতে পারেনি। সিদাত ভুরু কুচকে বলল,
–“তাকিয়ে আছেন যে?”
–“কী ম্যাজম্যাজ করছে বললা?”

সিদাত মাথা চুলকালো। আমতা আমতা করে বলল,
–“নাথিং, চা দিন। দুধ মেশানো চা কিন্তু!”

সিদাত চা দুই কাপ নয়, বরং পাঁচ কাপ খেলো। এক নাগাড়ে নয় অবশ্য। থেমে, থেমে। দুশ্চিন্তা, দোটানা, অস্থিরতা সব একসাথে তার ওপর হামলে পরেছে। এজন্যই এই চা খেয়ে মন ও মস্তিষ্ক ঠিক করতে চাইছে। কিন্তু সে গুড়ে বালি! মাগরিবের আযান পড়েছে। সিদাত চায়ের বিল পে করে ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনয়কে ভয়েজ মেসেজ দিলো,

–“প্লিজ ভাই! তুই আজ আমার অফিসে আয়। অস্থির লাগছে। সলিউশন না পেলে আজকে আমি হোস্ট করতে পারবো না। জলদি আসিস!”
সিদাত মসজিদে ঢুকে পরলো।

—————
সিদাত তার মায়ের পাশে বসে আছে। জয়া আজ চোখ বুজে রয়েছে। সিদাতের উপস্থিতিতেও তিনি চোখ খুলছে না। চাপা অভিমানে জর্জরিত তিনি। সিদাত হতাশ হয়ে বলছে,
–“কথা বলবে না আমার সাথে? বিয়ে করবো না বলেছি দেখে এত রাগ?”

জয়া চোখ মেলল না।
–“আম্মা, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। সবে তো ভাইয়ার বিয়ে হলো। একটু তো সময় দাও আমায়?”
জয়া তাও উত্তর দিলো না। হঠাৎ দিয়া পেছন থেকে বলে ওঠে,

–“মা ততক্ষণ রাজি হবে না, যতক্ষণ না তোমার গার্লফ্রেন্ডকে সে নিজের ছোটো ছেলের বউ হিসেবে দেখছে!”

সিদাত পিছে ফিরে বললো,
–“মেয়েটা মোটেও আমার গার্লফ্রেন্ড নয় ভাবী। জাস্ট চেনা-জানা।”
–“সেই একই হলো। মায়ের চাওয়াটা পূর্ণ করাটা এখন তোমার দায়িত্ব!”

–“পূর্ণ করবো কী করে বলো ভাবী? সামান্য বন্ধুত্ব করতে গিয়েছিলাম, এতেই আমার মুখের ওপর বলে দিলো আমি নাকি মাতাল হয়ে তার বাসায় ঢুকেছি, তাই আমাকে মেনে নিবে না। আমি মোটেও ইচ্ছাকৃত মাতাল হইনি এটা তাকে কে বুঝাবে?”

জয়া এবার চোখ মেলে তাকালো। দিয়া হেসে দিলো। হাসি বজায় রেখে বলল,
–“দারুণ, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! মা, আপনার পছন্দ আছে!”

জয়া পলক ফেললো। সিদাত কিছুক্ষণ আপনমনে তার মায়ের দিকে চেয়ে রইলো। মিনিটখানেক সময় নিয়ে বললো,
–“ওকে, ফাইন। করবো ওকে বিয়ে। তবে আমার কিছুটা সময় চাই।”

—–
–“এত ডাকাডাকি কেন?”
সিদাতের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। সিদাত চাপা স্বরে বললো,
–“আই থিংক, তুই রাইট!”

অনয় ভুরু কুচকে বলল,
–“প্রেমে পড়াটা?”
–“খাচা ভেঙে মন পালানোটা!”
সিদাতের এরূপ স্বীকারোক্তি শুনে অনয় হো হো করে হাসতে শুরু করলো। বলল,
–“একই তো!”
সিদাত আবার বললো,
–“বিয়ে বাড়িতে না গেলেই হতো। ওখানেই চব্বিশ ঘন্টা ঘুরঘুর করতো, মন আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না!”
–“তাহলে আর চিন্তা কিসের? তুই কী খুশি হোসনি?”

এই পর্যায়ে এসে সিদাত হাসলো। বলল,
–“খুশি না হওয়ার কী আছে? অস্থির ছিলাম তোকে বলার জন্যে। দ্যাট’স ইট। আমি যথেষ্ট হ্যাপি নিকাব রাণীর মতো একজনকে পেয়ে। কেউ সাধনা করেও এরকম মেয়ে পায় না রে!”

–“তাহলে আর সমস্যা কী? ঝামেলা তো মিটেই গেলো!”

সিদাত হাসলো। পরমুহূর্তে অনয়কে বললো,
–“আমার আম্মা তরীকে পছন্দ করেছে আমার বউ রূপে!”
অনয় যেন আকাশ থেকে পরলো সিদাতের কথা শুনে। সিদাতের অধরে তৃপ্তির হাসি ঝুলছে। অনয় অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললো,
–“সত্যি?”
–“হ্যাঁ! মা-ই জেদ ধরেছে আমার বউ দেখার। অবশ্যই তরীকে। কিন্তু বাবাকে বলব কী করে?”
–“বাবাকে বলার আগে শ্বশুরের মন জিততে হবে। শ্বশুর মেয়ে না দিলে তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার বন্ধু। এজন্যে আগে শ্বশুরকে প্রায়োরিটি দিতে হবে! সে পটে গেলেই ভেবে নে তোর লাইফ সেট!”

—————————-
সিদাত অনয়ের সাথে কলে কথা বলতে বলতে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। হঠাৎ অদূরে চাইতেই দেখলো আকবর সাহেব বাজারের ভারী ব্যাগ বয়ে হাঁটছে। সিদাত অনয়কে কল কাটতে বলে চোখের সানগ্লাস খুলে ফেললো। চুল ঠিক করতে করতে আকবর সাহেবের দিকে চলে গেল। প্রথমেই অমায়িক হাসি দিয়ে সালাম দিলো আকবর সাহেবকে। আকবর সাহেব হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
–“তুমি সিদাত না?”
–“জি আঙ্কেল। বাজারের ব্যাগটা আমায় দিন, আপনার বোধহয় কষ্ট হচ্ছে।”

–“আরে না, না। আমি পারবো।”
–“সেটা তো বললে চলে না আঙ্কেল। প্লিজ না করবেন না, আমাকে দিন!”

আকবর সাহেবের থেকে একপ্রকার জোর করে ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো। এরপর দুজন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন ব্যাপারে গল্প করতে লাগলো। সিদাত আকবর সাহেবের কাছে মাদ্রাসার ঠিকানা চাইলে আকবর সাহেব বলল,
–“হঠাৎ? কেন বাবা?”

–“একচুয়ালি আঙ্কেল, হঠাৎ নয়। আগামী সপ্তাহেই আমার দাদীর মৃত্যুবার্ষিকী। এজন্য বাবা প্রতিবারের মতো চাচ্ছেন কিছু মাদ্রাসায় মিলাদ পড়িয়ে বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্যে৷ এতিমখানাতেও খাবার রান্না হবে। তাই আমি মাদ্রাসার ঠিকানা যোগাড় করছি!”

আকবর সাহেব সন্তুষ্ট হলেন সিদাতের কথা শুনে। যাক, অন্তত এই ধরণের ছেলেরা টাকা ওড়ায় না। খুবই নেক চাওয়া এগুলো। আকবর সাহেব সায় জানিয়ে ঠিকানাটা বলে দেয়। সিদাতের এখানে মিলাদ নিয়ে আকবর সাহেবকে সন্তুষ্ট করার ইচ্ছে নেই।

আজ ছুটির দিনে সকাল সকাল বের হয়েছেই এসব কারণেই। সাইফ বাজার, আয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখছে আর সে সর্বপ্রথম এতিমখানা, মাদ্রাসার খোঁজ করতে বেরিয়েছে। আকবর সাহেবের বাজার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে সে চলে গেলো মাদ্রাসায়।

পরের সপ্তাহে খুব সুন্দর ভাবে মিলাদ পড়ানো হলো। সাঈদ সাহেব নিজে সিদাতের নির্ধারিত এতিম খানা এবং মাদ্রাসাগুলোতে চক্কর দিয়েছিলেন। বাচ্চারা খুব খুশি হয়েছে সাঈদ সাহেব, সাইফ এবং সিদাতকে পেয়ে। তরী খবর কিছু কিছু জানলেও সেরকম কোনো পতিক্রিয়া করেনি। আকবর সাহেবের মুখেই শুনেছিলো।

তরী ছাদের এক পাশে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। শেষ বিকালের শীতল বাতাস তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ শুনে চোখ মেলে চাইলো। পাশে চাইতেই চমকালো। বিস্ময়ে দুই ধাপ পিছিয়ে যায় তরী। সিদাত পশ্চিমাকাশে চেয়ে আছে আগের মতোই। তরী ভুরু কুচকে সিদাতের দিকে তাকালো। পরমুহূর্তে পিছে ফিরে তরী অন্য দিকে যেতে নিলে হঠাৎ সিদাত উচ্চস্বরে বললো,
–“বিয়ে করবে আমায়?”

তরীর পা জোড়া না চাইতেও থমকে গেল। হতভম্ভ সে। পিছে ঘুরে সিদাতের দিকে তাকাতেই সিদাত মুচকি হেসে বললো,
–“এই প্রস্তাবই সরাসরি তোমার বাবাকে গিয়ে দিব। তুমি আমার মায়ের পছন্দ। আমার মায়ের পছন্দ আমি খোয়াতে পারি না নিকাব রাণী!”

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ পর্বটা মন মতো সাজাতে পারিনি মনে হচ্ছে। ছোটো করে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত! ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here