হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৮]

0
32

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৮]

নতুন বাসায় আসার পর গোছগাছে-ই প্রায় তিন দিন চলে গেল তরীদের। নতুন বাড়িটা খুব ভালো পরিবেশে। চারপাশে বাড়ি-ঘর তেমন নেই। কিছুটা দূরে দূরে নতুন, নতুন ভবনের ইন্সট্রাকশন চলছে। এবার তাদের ফ্ল্যাটটা পাঁচ তলায়৷ সিঁড়ির সাথে আধুনিক লিফটও আছে। ভাড়াটা বেশি হলেও আকবর সাহেব এই পরিবেশকেই খুব নিরাপদ অনুভব করল। এই ভবনটাও নতুন।

তরী খোলা বারান্দায় গিয়ে শান্তির শ্বাস গ্রহণ করল। দমকা হাওয়ায় তরীর ভেজা চুল গুলো উড়ছে। এই বারান্দায় তরীকে ওড়না দিয়ে মুখ লুকিয়ে আসতে হবে না। একে তো পাঁচ তলা। আশেপাশের তেমন বিল্ডিং-ও নেই যে তরীকে অন্য কেউ দেখতে পারবে। আগে রাস্তার পাশে বেলকনি ছিলো বিধায় রাত ছাড়া যেতেই পারত না। এখন মনে হচ্ছে সবকিছু সুন্দর, স্বচ্ছ।

সেই পথে হওয়া ঘটনা এখন অবধি তরী ভুলতে পারে না। ভোলা সম্ভব কিনা তরীর জানা নেই। তবে এই ভয়ংকর স্মৃতি তার মস্তিষ্কে পুরো জীবনের মতো থেকে যাবে। সত্যি বলতে সে সাইফ এবং সিদাতের প্রতি কৃতজ্ঞ। সিদাতের প্রতি সন্তুষ্টও। সিদাতের বলা কথাগুলো তার কানে সবসময় তরঙ্গিত হয়। তরীর কেমন মোহময় লাগে। এই মোহটা উপলব্ধি করতেই সেদিন সিদাতকে তরী ব্লক করে দিয়েছে। এবং প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থেকেছে এই ভেবে, না জানি সিদাত আবার তাকে কোন নাম্বার দিয়ে কল দেয়। কিন্তু তরীর সেই আতঙ্ক অবশ্য খামাখাই ছিলো।

তরী মা*রা-মা*রিকে কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু সেদিন সোলেমানের ব্যবহার, কাজ এতটাই বিশ্রী এবং জঘন্য ছিলো যে তরী মনে মনে না চাইতেও তাকে খুব ভয়াবহ অভিশাপ দিয়ে ফেলেছে। যে পুরুষ নারীকে সম্মান করতে জানে না, নারীকে সর্বদা ছোটো করে এবং নিজের চাহিদা মেটানোর বস্তু মনে করে সেই পুরুষ আর যাই হোক, মানুষের কাতারে পরতে পারে না। সোলেমাবনের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ভঙ্গি এবং আচরণ উভয়-ই অসুলভ। তরীর যদি সোলেমানের সাথে বিয়েও হতো তবুও তরী ভালো থাকত না, আর না সোলেমান ভালো হতো। এজন্যে তরী মাবুদের কাছে লাখ লাখ শুকুরিয়া করে। সাথে ক্ষমাও চায় এমন অভিশাপ দেওয়ার জন্য।

——————
সিদাত চেষ্টা করল তরীদের খুঁজে বের করার। সাইফকেও জানালো। কিন্তু সাইফ ইদানীং খুব ব্যস্ত। সিদাত দিনকে দিন কেমন অস্থির হয়ে যাচ্ছে। একসময় সাইফ সিদাতকে কল দিত! আর এখন সিদাত সাইফকে কল দেয়। বারবার জিজ্ঞেস করে,
–“তুমি কী এই ইহজনমেও ফ্রী হবা না ভাইয়া?”

সাইফ তখন সিদাতের অধৈর্য হওয়া গলা শুনলে মিটিমিটি হাসে। হাসি কোনোরকমে আটকে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
–“মিটিং আছে, আমি ফ্রী হলে কল দিব!”

বলেই সিদাতকে কিছু বলতে না দিয়ে কল কেটে দেয়। সাইফ তখন চাপা হেসে দিয়ার হাত ধরে হাঁটতে লাগে। আসলে এসব মিটিং, কাজ, ব্যস্ততা সবকিছুই বাহানা৷ সাইফ তো এসেছে বউ, শ্বশুরদের নিয়ে দিয়ার দাদু বাড়ি বেড়াতে। অথচ সিদাত জানে সাইফ রাজনৈতিক কাজে কোথাও গিয়েছে। অস্থির সিদাত খেয়াল-ই করছে না সাইফ ছাড়া এ-বাড়িতে দিয়াও নেই।

দিয়া মাথা তুলে সাইফের হাসির দিকে চাইলো। ভুরু কুচকে বলল,
–“ছেলেটাকে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছ কেন?”

–“শুধু, শুধু কী বলো? এগুলা ওর পানিশমেন্ট। তুমি তো জানো না এই ছেলে আমাকে কতবার নাকে দড়ি দিতে ঘুরিয়েছে। একটু বিরহ সহ্য করুক। বিরহ না হলে আবার প্রেম-ট্রেম জমে না!”

দিয়া চট করে সাইফের হাত ধরে দূরে সরে দাঁড়ায়। সাইফকে পথ দেখিয়ে দিয়ে চাপা হেসে বলল,
–“তুমিও তবে ঢাকা চলে যাও। এরপর ভাইয়ের সাথে বসে বসে বিরহ সহ্য করো। নয়তো আমি বুঝব কী করে তুমি আমায় কেমন ভালোবাসো?”

দিয়ার এরকম কথায় সাইফের মুখখানা দেখার মতো ছিল। মুখ ভার করে বলল,
–“এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। আমি কী তোমার প্রেমিক নাকি? আমি তোমার বর! বউকে ফেলে আমি কেন খামাখা ঢাকা যাব?”

–“প্রেমিক হলেই কেন বিরহ সহ্য করতে হবে? বিরহ সহ্য করার স্পেশাল অনুভূতি তো বরদের পাওয়া উচিত। তুমি যাও, আমি আব্বা-আম্মার সাথেই ফিরব!”

–“যাব না।”

–“যাবে। আমার সামনেই ম্যানেজার ভাইয়াকে কল দিচ্ছ তুমি ব্যাস!”

–“সিদাতের জন্যে এসব করছ তো? বরের চাইতে দেবর প্রিয় হয়ে গেলো?”

–“নাহ! সুযোগের সৎ ব্যবহার করছি। তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা! প্রেক্টিক্যালি টিকোনি এখনো!”

সাইফ গোমড়া মুখে বাড়ি ফিরতেই সিদাত চেঁচিয়ে উঠল। বলল,
–“আমাকে টেনশনে ফেলে, কাজের বাহানা দিয়ে এভাবে বউয়ের সাথে ঘুরতে চলে গেছ তুমি ভাইয়া!! ম্যানেজার না বললে তো আমি জানতেই পারতাম না। এদিকে যে আমার বউয়ের জায়গাটা ফাঁকা সেদিকটা দেখছ না!? এত স্বার্থপর কবে হলা তুমি?”

সাইফও রেগে যায়। সব কথা উপেক্ষা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“শুধুমাত্র তোর জন্যে আমার বউ আমাকে ধরে বেঁধে ঢাকা পাঠিয়ে দিলো৷ নয়তো কত সুন্দর টাইম স্পেন্ড করতাম। এটা তোর স্বার্থপরতা না? পড়ছিস তো প্রেমে কয়েকদিনের। এতেই কান ঝালা-ফালা না করলে তোর হয় না?”

দুই ভাইয়ে দাঙ্গা লাগল বউ নিয়ে। একজন বিয়ে করে একা, আরেকজন বিয়ে না করে বউ ছাড়া একা। একজন আরেকজনের দুঃখ বলে বলে ঝগড়া করতে ব্যস্ত। ফিরোজা খাতুন মুখে হাত দিয়ে হা করে দুই ভাইয়ের ঝগড়া দেখছে। সাইফ শেষমেষ চেঁচিয়ে বলল,
–“তোর ওই রাণী কই আছে, বলতাম না যাহ। দূরে যাহ!”

বলেই হনহন করে উপরে চলে গেল। আর সিদাত চুল ঠিক করতে করতে অফিস চলে গেল। সিদাতের আরও একটা দিন কেটে গেলো তরীকে ছাড়া। দুই ভাই-ই বিরহে সারা রাত পুড়লো। সাইফের জুবুথুবু অবস্থা। দিয়া তার ফোনও বন্ধ করে রেখেছে। এসবের কোনো মানে হয়? বউ ছাড়া জীবন এত অন্ধ, অন্ধ জানলে সে বিয়েই করত না!

তরী ভার্সিটির গেটের কাছাকাছি আসতেই ভীষণ রকম চমকালো। সিদাত দাঁড়িয়ে আছে। সিদাতের চেহারা মাস্ক দ্বারা আবৃত থাকলেও সিদাত প্রায় পুরোটাই তরীর চেনা। তরী ভেতরের তীব্র কম্পন অনুভব করল। ভীত চোখে কয়েক পলক চেয়ে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করলো। তরী চলে যেতে নিলেই দূর থেকে অস্ফুট স্বরে নিজের নাম শুনতে পেলো। এটা কার ডাক তরী তা জানে। তবুও কোনোরকমে একটি রিকশা নিয়ে সে দ্রুত পালায়। তরী চায় না সিদাত তাকে খুঁজে পাক, তরীর বর্তমান বাড়ির ঠিকানা জানুক। তরী এবং সিদাত দুজনেই দুই মেরুর মানুষ। তাদের দেখা হওয়াটা-ই অসম্ভব ব্যাপারের মধ্যে পরে।

—-
ছুটির দিনে অনয় সিদাতকে ডেকে পাঠালো। আপাতত অনয় ছাড়া আর কোনো গতি নেই। শহরে প্রায় অনেক জায়গাতেই তরীকে খোঁজা হয়েছে। কিন্তু সিদাত কোথাও পায়নি। সেদিন ভার্সিটিতে তরীকে একপলক দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো তার। কিন্তু তরী যেন ভীড়ের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। খোঁজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল সিদাত। অনয়ের কাছেও এতদিন আসেনি। বাসাতেই থেকেছে, মায়ের সংস্পর্শে থেকেছে সে।

কলিংবেল চাপতেই সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুললো না। সিদাত দূরবীন বাইরে থেকে চেপে রাখলো যাতে অনয় তাকে না দেখতে পায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে অনয় দরজা খুলতে দেরী করছে। সিদাত বিরক্তিতে কপাল কুচকাল। অনয় তো এত দেরী করে দরজা খোলে না। আজ সমস্যা কী?

সিদাত আবার কলিংবেল চাপল। এক মিনিটের মধ্যেই দরজা খুলে গেল। সিদাত কিছু বলতে নিবে তখনই দরজার পেছন থেকে মাথা বের করা মানুষটিকে দেখতে পায়। তরী সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলো। এবং সিদাতের মুখের ওপরই দরজা লাগিয়ে দিলো। আকবর সাহেব রোজ এই সময়ে বাড়ি ফিরে। এজন্যে তরী তার বাবাকে-ই ভেবেছিল। কামরুন নাহার অর্থাৎ তরীর মা তরীকে বারবার রান্নাঘর থেকে বলছিল দরজা খুলতে, কারণ তারও ধারণা ছিলো আকবর সাহেব-ই এসেছে। কিন্তু দরজা খুলে এমন কিছুর মুখোমুখি হবে তরী কল্পনাও করেনি। তার বুক কাঁপছে, দুরুদুরু শব্দ হচ্ছে ভেতরটায়।

সিদাত তখনো স্ট্যাচুর মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। চোখ জোড়া বদ্ধ দরজায় আবদ্ধ। দ্বিতীয় বারের মতো তরীর মুখখানা সে স্বচক্ষে আবারও দেখতে পেলো। কিন্তু তার মস্তিষ্ক স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে এরূপ আকস্মিক ঘটনায়!

তখনই পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে অনয় বেরিয়ে এলো। অনয়ের পেছন পেছন সাইফ। অনয় চওড়া হাসি দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল,
–“কেমন লাগলো সারপ্রাইজ, দোস্ত? ঝাকানাকা না?”

সিদাত বাস্তবে ফিরে এল। ঘাড় বাঁকিয়ে দুজনকে পরখ করে বল,
–“পেটে পেটে তাহলে এই ছিলো?”

অনয় এবং সাইফ দুজনে একসাথে হেসে ওঠে। সিদাত গরম চোখে তাদের দিকে চেয়ে আছে। এরা সব কিছু জানতো অথচ সিদাতের সাথে এতদিন ধরে মজা নিয়েছে? সাইফ হাসি থামিয়ে বলল,
–“তোর ভাবী বলেছে বিরহ বেদনা না পেলে নাকি প্রেম-ট্রেম হয় না। এজন্য তোর মনের রাস্তা এতদিন যাবৎ পরিষ্কার করছিলাম। অথচ এদিকে আমার মনের রাস্তা পরিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও তোর ভাবী আমাকে বিরহ বেদনায় টইটম্বুর করে রেখেছে। এবার অন্তত বিরহ কাটুক, তোর অভিশাপও আমার গায়ে না লাগুক!”

অনয় এবারও হাসলো। সাইফ আবার বলল,
–“আমি কিন্তু এখানে এসেছি বিরিয়ানি খেতে। অনয়, বাবুর্চি গিরি শুরু কর। অনেকদিন তোর হাতের বিরিয়ানি খাওয়া হয় না। আর হ্যাঁ সিদাত! বাবাকে আমি সবটা জানিয়েছি। বাবা এখন তরীদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিচ্ছে। আশা রাখছি বাবা কিছুদিনের মধ্যেই ওদের বাসায় আসবে।”

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]

বিঃদ্রঃ আমার দ্বিতীয় বই “অমানিশা” প্রি-অর্ডার করেছেন তো? ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here