#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [২৯]
আকবর সাহেব কিছুটা গম্ভীর হয়ে বসে আছে সাঈদ সাহেবের সম্মুখে। সাঈদ সাহেব অধীর আগ্রহে আকবর সাহেবের পানে চেয়ে আছে। সাঈদ সাহেবের পাশে আজ ম্যানেজার নেই। ম্যানেজার সাহেব নিচে গাড়িতে বসে আছে।
সাঈদ সাহেব আকবর সাহেবের পরিবার সম্পর্কে যা শুনেছে এবং যা উপলব্ধি করেছে, তাতে ম্যানেজার সাহেবকে এখানে আনাটা ঠিক মনে করেনি। তবে সাঈদ সাহেবের সাথে ফিরোজা খাতুন এসেছে। বোরকা পরিহিত ফিরোজা খাতুন আকবর সাহেবের পাশে বসার অনুমতি পেল আজ অনেক দিন পর।
কামরুন নাহার সালাম জানিয়ে নাস্তার ট্রে রেখে চলে গিয়েছে। পুরোপুরি যায়নি অবশ্য। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। আকবর সাহেবের মাথায় বহু চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ইতিবাচক মত তিনি দিতে পারছে না। সাঈদ সাহেব ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বলল,
–“আপনি মেয়ের বাবা। আপনি অবশ্যই নিজের মেয়ের ভালোটা চিন্তা করবেন। এজন্য বলবো তাড়াহুড়ো করে উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। আমাদের ব্যাপারে, আমার ছেলের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিন। শুধু অনুরোধ করব, আমার পেশাকে বিবেচনা করে আমার ছেলেকে না করে দিবেন না। দরকার পড়লে আপনি যেকোনো শর্ত রাখতে পারেন। তবুও আপনার মূল্যবান মেয়েকে আমার মেয়ে করে দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি!”
আকবর সাহেব সরাসরি কিছু বললেন না। শুধু জোরপূর্বক হেসে বলল,
–“আপনারা নাস্তা নিন।”
সাঈদ সাহেব অধরে হাসি লেপ্টে চা হাতে নিলো। আর ফিরোজা দুটো আঙ্গুর ফল নিকাবের মধ্যে দিয়েই মুখে নিল। একসময় ফিরোজা বিব্রত হয়ে বলল,
–“আপনি যদি কিছু মনে না করেন ভাই সাহেব, তাহলে আমি কী আপনার বড়ো মেয়েটাকে একপলক দেখতে পারি?”
আকবর সাহেব না করতে পারলেন না। হেসে বলল,
–“জি, নিশ্চয়ই। বাহিরেই আমার স্ত্রী আছে। সে আপনাকে নিয়ে যাবে!”
ফিরোজা খাতুন উঠে গেল। লিভিং-রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই কামরুন নাহারের মুখোমুখি হল। কামরুন নাহার পর্দার আড়ালে থেকেই স্বামীর কথা শুনতে পেয়েছে। এজন্য ওনি মুচকি হেসে বলল,
–“আমার সাথে আসুন!”
তরী বেশ বিধ্বস্ত হয়ে রুমে বসে আছে। সে কখনো কল্পনাও করেনি সাঈদ সাহেব প্রস্তাব নিয়ে আসবে। তার জল্পনা-কল্পনার মাঝেই কামরুন নাহার ফিরোজাকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করল। তরী চটজলদি মাথায় কাপড় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মৃদু স্বরে সালাম দিলো ফিরোজাকে। ফিরোজা তরীর সালামের উত্তর নিয়ে তরীর কাছাকাছি এলো। প্রাণভরে তরীকে দেখে ফিরোজা বলল,
–“আমাকে মনে আছে মা? আগেও সম্ভবত আমাদের দেখা হয়েছে।”
তরী কিছুটা ইতঃস্তত হয়ে ছোটো শব্দে বলল,
–“জি আন্টি, মনে আছে!”
ফিরোজা খাতুন বেশি কিছু বলল না। অপেক্ষায় রইল আকবর সাহেবের মতামতের। তরীকে তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কল্পনাতেই হঠাৎ তার ছোটো ছেলে সিদাতের সাথে তরীকে দাঁড় করালো। কী মিষ্টি লাগবে দুজনকে। ফিরোজা কামরুন নাহারের দিকে খুব বিনয়ী স্বরে বললো,
–“আপনার মেয়েটাকে আমার এক দেখাতেই ভীষণ পছন্দ হয়েছে। এখন দোয়া করি তরীর বাবা রাজি হয়ে যাক। আমার ছোটো ছেলেটা খুব ভালো। আমার বিশ্বাস তরীর ছায়া হয়ে রবে সে।”
কামরুন নাহার শুধু হাসলো। সে দেখেছে সিদাতকে। দেখতে-শুনতেই ভালোই সুপুরুষ। শুধু তাদের চাহিদা গুলো ভিন্ন। সিদাত যদি তাদের মেয়েকে সেই চাহিদা অনুযায়ী মেয়ের পাশে থাকতে পারে তাহলে বিয়ে নিয়ে অবশ্যই ভাবা যায়। কিন্তু কোথায় যেন একটা দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। ভীষণ বড়োলোক কী না, তাদের তো আবার সখ, আহ্লাদ অন্যরকম।
সাঈদ সাহেব আকবর সাহেবকে আরও জানালেন কিছু সত্য৷ সিদাতের মা সম্পর্কেও ধারণা দিলেন। এও জানানো হলো সিদাতের মা তরীকে পছন্দ করেছে৷ শয্যাশায়ী স্ত্রীর চাওয়া তো সে অপূর্ণ রাখতে পারে না। সাঈদ সাহেব একে একে সময় নিয়ে সবটা খুকে বললেন। তার মনে চেপে রাখা সেই ঘটনা গুলোও বললেন। সব শুনে আকবর সাহেব স্তব্ধ। কী বলার ভাষা পেলেন না। পরিস্থিতি এবং সময় মানুষকে ঠিক কোন পর্যায়ের বাধ্য করে সেটার জলন্ত উদাহরণ যেন সাঈদ সাহেব।
সেদিনের মতো সাঈদ সাহেব বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে জানালেন,
–“আমার মনে হয়েছে আপনার সবকিছু জানা জরুরি, এজন্যে আমি আপনার থেকে কিছুই লুকাইনি। যাতে করে পরবর্তীতে অন্যদের মুখে সব জানার পর আমাদের ভুল না বুঝেন। আর আপনার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম!”
আকবর সাহেবের মন জুড়ে নেতিবাচক ধারণা গুলোই বেশি এসেছে। তিনি স্ত্রীর সাথে সব আলোচনা করলেন। মেয়েকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তিনি। সিদাত এমনিতেও ভালো হলেও আকবর সাহেব সিদাতকে তার মেয়ের জন্যে পছন্দ করছেন না। সিদাত প্রতিদিন মিডিয়া পাড়ায় ওঠা-বসা করছে, পরিবার সুলভ হলেও রাজনীতিতে যুক্ত। সেখানে মেয়ে কতটুকু সুরক্ষিত তার উত্তরও নেই।
সাবিয়া তো খুব অবাক হয়ে তরীর দিকে চেয়ে আছে। তরী তখন মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সাবিয়ার এরকম চাহনি তরীকে বারবার বিব্রত করছে৷ তরী ঘাড় বাঁকিয়ে গরম চোখে সাবিয়ার দিকে চাইলো। সাবিয়া তখনো নজর সরালো না। মাদ্রাসা থেকে ফেরার পর মায়ের মুখে যা শুনেছে তাতে তার বিস্ময় চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। এখনো সেই অবিশ্বাস্য, বিস্ময় ভাব থেকে বেরুতে পারছে না সাবিয়া।
তরী কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
–“সমস্যা কী?”
সাবিয়া অস্ফুট স্বরে বলল,
–“সিদাত ভাইয়ার বাবা এসেছে? এটা কী সত্যি?”
–“একবার যা শুনেছিস তা আবার রিপিট করতে হবে কেন?”
–“আমার জানো বিশ্বাস হচ্ছে না।”
–“বিশ্বাস না হলে অন্য কোথাও গিয়ে বসে থাক, অন্তত আমার সামনে বসে এভাবে তাকিয়ে থাকিস না!”
সাবিয়া নীরবে অমান্য করল তরীর কথা। সে ওখানেই থম মেরে বসে রইলো। আর তরী না পেরে উঠে চকে গেলো বারান্দায়।
————
সাঈদ সাহেব অনেকদিন পর জয়ার কাছে এসে বসেছে। জয়া সাঈদ সাহেবের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে। তার চোখ জোড়া জলে টইটম্বুর। সাঈদ সাহেবের হাতে মুঠোয় জয়ার হাত। জয়া অন্য রকম ভালো লাগা অনুভব করছে। সাঈদ সাহেব স্ত্রীর হাত ধরে খুবই নরম গলায় বলল,
–“তোমার চাওয়া আমি আবারও নিজ হাতে পূরণ করে আসলাম। সত্যি তোমার পছন্দ সুন্দর। কী করে পছন্দ করলে এমন রত্নকে?”
জয়া যেন কান্নার মাঝেও হাসতে চাইলো, খিলখিল করে৷ এর মানে কী সিদাতের সেই নিকাব রাণী বউ হয়ে আসবে তার বাড়ি? সে চেয়ে দেখবে তরীকে? ততদিন অবধি বেঁচে থাকবে তো? হাজারো যন্ত্রণার মাঝেও অন্য রকম সুখ অনুভব করছে জয়া। অবশেষে তার পরিবারটা পূর্ণতা পাবে।
তরী পথে আপনমনে হাঁটছে। প্রস্তাব আসার পর থেকেই আকবর সাহেবকে দুশ্চিন্তার মধ্যেই দেখছে সে। কী প্রয়োজন ছিলো এই মুহূর্তে প্রস্তাব দেওয়ার? তরী তো আহামরি কেউ নয়। সিদাতের জন্যেও মেয়ের অভাব হবে না। তাহলে সব ছেড়ে সিদাত কেন-ই বা তাকে বেছে নিল? আকবর সাহেব তো জানে না সিদাত মদ্যপান করে তারই ঘরে ঢুকেছে। এটা কিছুতেই মুখ ফুটে বলার মতো নয়। নয়তো আকবর সাহেব হুলুস্থুল ঘটাবেন। এছাড়া তার বাবা রাজিও হবে না, এটা তরী জানা আছে। সিদাত মেনে নেওয়ার একটা কারণ থাকলেও মেনে না নেওয়ার কারণ অসংখ্য।
তরী হঠাৎ গলা খাঁকারির শব্দ শুনে সম্বিৎ ফিরে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে চাইল। সিদাত হাঁটছে তার পাশে। অধরে লেপ্টে আছে চওড়া হাসি। কী যেন বড়ো কিছু হাসিল করেছে সে। সিদাতকে দেখে তরী কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। তবে কিছু বলল না, এড়িয়ে গেল। আর যাই হোক, রাস্তাটা তার নিজের নয়। যে কেউ এই পথ দিয়ে চলতে পারে।
সিদাত ভীষণ সন্তুষ্ট। সে তার বাবার আশ্বাসে ইতিমধ্যে অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছে তরীকে নিয়ে। এজন্যে নিজের কথা বলতে দ্বিধা নেই এখন। সে সর্বপ্রথম-ই বলল তার মায়ের কথা।
–“তরী জানো, আল্লাহ্ আমাকে দুটো মা উপহার দিয়েছেন। কতটা ভাগ্যবান আমি বুঝতে পারছ? তুমিও ভাগ্যবতী হবে, একসাথে ডাবল ভালোবাসা পাবে। জানো, আমার মা-ই তোমাকে পছন্দ করেছে। মায়ের সাথে রোজ গল্প করতাম তোমায় নিয়ে। এরপর ব্যাস, এত আয়োজন হয়ে গেল!”
দুই মা! এই কথাটা তরীকে ভীষণ রকম নাড়িয়ে তুললো। না চাইতেও তার পা জোড়া থেমে যায় বিস্ময়ে। তরীকে থামতে দেখে সিদাত ফিরে তাকাল। তরী চোখ কপালে তুলে তার দিকেই চেয়ে আছে। সিদাত হাসল। বলল,
–“আমার বাবার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করছ বোধহয়?”
তরী আবারও অপ্রস্তুত হলো। নেতিবাচক মাথা নাড়িয়ে ছোটো শব্দে বলল, “না, তো!”
সিদাত হাসল। তরীকে হাঁটতে ইশারা করলে তরী আবার হাঁটতে লাগল। মুখ ফুটে বলতে পারল পারল না “আমার পিছু ছাড়ুন।”
কিন্তু কৌতুহল, আগ্রহের কারণে সেটা মনেই থেকে গেল। সিদাত বিশেষ কিছু বলল না। শুধু ধোয়াশাময় কিছু কথা বললো,
–“আমার বাবা চরিত্রহীন নয় নিকাব রাণী। বরং আমার বাবা একসময় শ্রেষ্ঠ হাসবেন্ডের তালিকায় ছিলেন। এখনো আছেন। তবে পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে। এই “চরিত্রহীন” কথাটা বলতে কত কষ্ট হয় জানো?”
তরী নীরব ভূমিকা পালন করছে। সিদাত আবার বলল,
–“আমার মা শয্যাশায়ী। অচল হয়ে বিছানায় পরে আছে। আমার আরেক মাকে তো দেখেছ-ই। তোমার বাসায় গিয়েছিল। তাদের দুজনের সম্পর্ক খুব নিবিড় জানো। ছোটো মাকে দেখে আমি শিখেছি, সৎ সবসময় দূরে ঠেলে দেয় না। মমতার সাথে আগলেও নেয়। আমার এক মা অচল এবং আরেক মা সচল। তবে আমি দুজনকেই ভালোবাসি। ভালোবাসাটআ তাদের জন্যে পরিমাপ করাটা মুশকিল!”
তরী এবারও নীরব। বেশ কিছুক্ষণ পর বলল,
–“এসব আমাকে বলছেন কেন? নিজের কথা বাইরের মানুষদের বলতে নেই!”
সিদাত হাসল। তরীর দিকে একপলক চেয়ে বলল,
–“যার জন্যে আমার হৃদয় খাচা ভেঙে পালিয়েছে, এক নারীকে হৃদয় জুড়ে ঠাঁই দিয়েছে, সে আর যাই হোক বাইরের মানুষ হতে পারে না!”
–“কী করে নিশিত হচ্ছেন আমার বিয়ে আপনার সাথে-ই হবে? বিয়ে ছাড়া কোনো বেগানা নারী, পুরুষ আপনজন হতে পারে না!”
–“চিন্তা করো না। সেটাও হয়ে যাবে। কারণ আমার মন বলে বিয়ে একদিন আমাদের হবেই। আমার অসুস্থ মায়ের দোয়া মাবুদ ফিরিয়ে দিবেন না! আমার সেই আস্থা আছে!”
সিদাতের এতটা আত্মবিশ্বাস দেখে তরী আর কঠিন গলায় কিছু বলতে পারল না। এড়িয়ে গেলো সিদাতকে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলো। সিদাতও তরীর সাথে তাল মেলালো। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বলল,
–“এইযে নিকাব রাণী শোনো, তোমার জন্যে হৃদয় এনেছি ভেজা। সেই ভেজা হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়ানোর দায়িত্বটাও দিতে এসেছি।”
তরী তাও সিদাতকে এড়িয়ে চলল, কোনো কথা শুনেনি ভাব করে হাঁটছে। সিদাত আবারও ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
–“তোমার স্কেচ নিয়েও আমার কোনো আপত্তি নেই নিকাব রাণী। তোমাকে জুড়ে থাকা সবকিছুই আমার পছন্দের, ভালো লাগার।”
——————-
তরীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে সিদাত নিজের বাড়ি ফিরে দেখলো বৈঠকঘরে সাঈদ সাহেব, সাইফ মুখ গম্ভীর করে বসে আছে। সাইফের পেছনেই দিয়া বিমর্ষ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা মোটেও সুবিধা লাগলো না সিদাতের। এগিয়ে গেল সেদিকে। সাইফ সিদাতকে দেখে মলিন চোখে চেয়ে রইল। সিদাত সাইফের চোখের ভাষা বুঝল না বরং জিজ্ঞাসু নজরে চেয়ে রইলো। সিদাত তার বাবার দিকে তাকালো। সাঈদ সাহেব মাথা তুলে চায় সিদাতের পানে। নীরবতা ভেঙে সিদাত বলে ওঠে,
–“কিছু হয়েছে কী বাবা?”
সাঈদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিন্তু জবাবে কিছুই বললেন না। মিনিটখানেক সময় নিয়ে আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
–“তরীর বাবা কল করেছিল। বিয়েতে পরিষ্কার করে “না” করে দিয়েছে। সঙ্গে এটাও বলেছে আমাদের এই পরিবেশ তাদের মেয়ের জন্য নয়!”
©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

