#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [৩০]
ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁইছুঁই। নিরিবিলি এলাকা যেন আরও গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে কোনো রকম হাক-ডাক শোনা যাচ্ছে না। শুধুমাত্র নির্জন রাস্তায় নিয়ন আলো বিস্তৃত।
সিদাত প্যান্টের পকেটে হাত জোড়া পুরে ল্যাম্পপোস্টের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ভাসছে তরীর মুখখানা। বর্তমানে তরীদের এপার্টমেন্টের সম্মুখেই দাঁড়িয়ে আছে সে। কেন দাঁড়িয়ে আছে জানে না, তবে তীব্র অস্থিরতায় সে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। সিদাতের চুলগুলো এলোমেলো, মুখটাও কেমন শুকিয়ে গিয়েছে। অফিস থেকে সোজা এখানেই এসেছে সে। বাইকটা তার কাছাকাছি পার্ক করে রেখেছে।
সিদাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা তুলে তরীদের এপার্টমেন্টের দিকে তাকাল। আবার চোখ নামিয়ে ফেলল। তরীকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা ভালোই কাবু করেছে তাকে। কিন্তু সে তরীর বাবার মুখের ওপর কী বলবে? আকবর সাহেবের মতো লোককে বলবে, সে তরীকে ভালোবাসে? এটা শুনলে তো আরও দূরে সরিয়ে রাখবে তরীকে। কেমন দম বন্ধকর পরিস্থিতি সিদাতের। আগে কখনো এরকম অনুভূতি হয়নি। পেতে পেতে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার শূন্যতা সহ্য করার ক্ষমতা ক’জনের আছে?
জয়ার আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। হাতে কারো স্পর্শ অনুভব করতেই সে পাশ ফিরে তাকাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু পারল না। পারলে হয়তো দেখতে পেত তার বিধ্বস্ত ছোটো ছেলেকে। জয়া তাও সিদাতের নিজস্ব পারফিউমের জন্যে তাকে চিনে ফেলল। মা যতই অচল হোক না কেন, সন্তানের ঘ্রাণেই সে উপলব্ধি করতে করতে পারে তার পাশে কোন সন্তান আছে।
সিদাত জয়ার দিকে তাকাতেই কিছুটা চমকালো। আমতা আমতা করে বলল,
–“ঘুমাওনি?”
জয়া কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করল। সিদাত চটজলদি নিজের চুল ঠিক করে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক করে মায়ের দৃষ্টি সীমানার কাছাকাছি গেল। জয়া ছেলের মুখটার দিকে অপলক চেয়ে রইলো। সিদাতের নাক লাল, চোখ জোড়াও কেমন যেন, লাল লাল! চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা, বিষাদ ফুটে ওঠেছে। জয়া সেই চোখ পড়ে নিল। মা নাকি সন্তানকে দেখেই ধারণা করতে পারে তার ভেতরে কী চলছে। এবারও এই প্রবাদের ব্যতিক্রম হলো না। সিদাত হাসি-মুখে নানা কথা বলছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার তরীকে নিয়ে বলছে না, আগের মতো প্রাণখোলা নেই তার ছেলে।
এসব চিন্তা করে জয়াও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সিদাত কোনো রকমে শেষে বলল,
–“মা, খুব ঘুম পাচ্ছে। তুমিও ঘুমাও। আমি যাই হুঁ?”
বলেই সিদাত মায়ের হাতের পিঠে চুমু দিয়ে চলে গেল। আর জয়া নির্ঘুম সময় কাটাতে লাগল।
তরী আগের মতোই চলাচল করছে। তবে আগের মতো সিদাতকে পথে দেখতে পায় না। তরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এতে। তবে তাও কিছু একটা ফাঁকা লাগছে তার নিকট। তবে তরী তোয়াক্কা করল না। সবসময়ই নিজের মতো চলাফেরা করে। সিদাতকে যে আকবর সাহেব মেনে নিবে না এটা তরী আগে থেকেই জানত।
আরও এক সপ্তাহ কেটে গেল। হঠাৎ আকবর সাহেবের মোবাইলে কল এলো। ঘুমন্ত আকবর সাহেবের এতে ঘুম ভেঙে যায়। কোনো রকমে মোবাইলটা হাতে নিয়ে পিটপিট করে তাকালো। এরপর ধীরে-সুস্থে উঠে বসে বিছানার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালাল। আননোন নাম্বার থেকে কল আসছে। আকবর সাহেব হাই তুলে কল রিসিভ করল। সালাম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে-ই ওপাশ থেকে কেউ অস্থির হয়ে বলল,
–“দোহাই লাগে ভাই সাহেব। আপনি প্লিজ একটু কষ্ট করে আপনার মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আসুন। এক অভাগা স্বামীর এই অনুরোধটা পূরণ করুন ভাই সাহেব। আমি আপনাকে হাসপাতালের ঠিকানা বলছি!”
আকবর সাহেব যেন আকাশ থেকে পরল এই ধরণের কথা শুনে। আকবর সাহেবের বুঝতে বাকি নেই এটা কার গলা। ব্যস্ত হয়ে আকবর সাহেব ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত প্রায় আড়াইটা। আকবর সাহেব বলল,
–“কিন্তু হঠাৎ, হাসপাতালেই কেন?”
সাঈদ সাহেব ভাঙা গলায় বলল,
–“আমার স্ত্রীর অবস্থা ভালো না। আজ দু’দিন যাবৎ হাসপাতালে ভর্তি। এখন অবস্থা ক্রিটিকাল। আপনার মেয়েকে দেখতে চাইছে। দয়া করে আসুন ভাই সাহেব। নয়তো আমি নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না!”
আকবর সাহেবও ভড়কে গেল। কোনোরকমে বলল,
–“আসছি!”
আকবর সাহেব চটজলদি স্ত্রীকে ডেকে তুলল। কামরুনকে অল্প করে ঘটনা বুঝিয়ে দিয়ে তরীকে ডাকতে চলে গেল। তরী ঘুমায়নি আজ। স্কেচ করছিল বারান্দায় বসে। হঠাৎ এত বিকট কড়াঘাত শুনে তরী ভীষণ ভড়কালো। তরী সব গুছিয়ে জলদি করে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই আকবর সাহেব ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
–“তাড়াতাড়ি তৈরি হও মা। হাতে সময় নেই।”
–“কিন্তু কোথায় যাব বাবা?”
আকবর সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বলল,
–“হাসপাতালে।”
বলেই আকবর সাহেব ব্যস্ত হয়ে ছুটল নিজের ঘরের দিকে।
—————
হাসপাতালে কেবিনের বাইরে করিডরে প্রায় কম-বেশি সবাই উপস্থিত। ফিরোজা একপাশে বসে কাঁদছে। জয়া তার একমাত্র বান্ধুবী। জয়ার সাথে তার সখ্যতা আজীবনের। ফিরোজার বিপদে একমাত্র জয়াই তাকে কাছে টেনে নিয়েছে। সারাজীবন জয়ার জন্যে করে গেলেও তার ঋন শোধ হবে না। সেই পরম বন্ধুর এত করুণ অবস্থা কীভাবে সহ্য করবে সে?
সিদাত এবং সাইফ এদিক সেদিক ছুটছে। মাঝেমধ্যে সিদাত নিজেকে সামলে বাবাকেও সামলাচ্ছে। অত্যন্ত কঠোর, শক্ত মানুষটা আজ কেমন ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। ফিরোজার পাশে দিয়া এবং দিয়ার মা। জয়ার অসুস্থতার কথা শুনে দিয়ার বাবা-মাও ছুটে এসেছে। অনয় আসতে পারেনি। অফিসের কাজে সে ঢাকার বাইরে গিয়েছে।
মিনিট দশেকের মাঝেই আকবর সাহেব তরীকে নিয়ে ছুটে এলো। সিদাত তাদের দেখে ঢোঁক গিলে কোথাও চলে গেল। আকবর সাহেব সাঈদ সাহেবের কাছে এগিয়ে এসে তার পাশে বসল। তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো। সাইফ তাদের দেখতেই দ্রুত সিদাতকে ধরে আনলো। ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
–“মা তরীকে দেখতে চাইছে! চাইলে আপনারা দুজনও ভেতরে আসতে পারেন। ডাক্তারের থেকে অনুমতি নিয়েছি!”
তরী আকবর সাহেবের দিকে তাকাল। আকবর সাহেবের মুখখানাও বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেছে। আসার পথে সে কয়েকবার বলেছিল,
–“সিদাতের মায়ের কিছু হলে আমি নিজেকে বোধহয় ক্ষমা করতে পারব না মা!”
তরী এই কথার অর্থ বুঝেনি। তবে সিদাতের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে তরী সে-কথার অর্থ বুঝতে পেল। অতঃপর তারা পাঁচজন ভেতরে প্রবেশ করল। ডাক্তার, নার্স ছোটাছুটি করছে। জয়ার মুখে অক্সিজেন মাস্ক। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে না। এই প্রথম তরী সিদাতের মাকে দেখল। জয়ার এই করুণ অবস্থা থেকে তরীর চোখ জোড়া ভেঙে পড়ল। ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার। আড়চোখে সিদাতের দিকে তাকাল একবার।
সাঈদ সাহেব তরীকে নিয়ে জয়ার সম্মুখে আনল। তরী সঙ্গে সঙ্গে তার নিকাব খুলে ফেলল। সাঈদ সাহেব তরীকে দেখিয়ে বলল,
–“এইযে দেখ জয়া। তোমার ছোটো বউমাকে নিয়ে এসেছি!”
জয়া দেখল নীরবে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন এলো না। তবে ধীরে ধীরে সে কিছুটা ঝিমিয়ে এলো। সাঈদ সাহেব পিছে ফিরে করুণ নয়নে আকবর সাহেবের দিকে তাকাল। তরীকে জয়ার কাছে রেখে সাঈদ সাহেব আকবর সাহেবের কাছে এগিয়ে গেল। ভাঙা গলায় হাত জোর করে বলল,
–“দয়া করে আপনার মেয়েটিকে আমার ছেলের বউ করে দিন ভাইজান। আমার স্ত্রী যখন শুনেছে আপনি না করে দিয়েছেন তবে থেকেই নানান দুশ্চিন্তায় আজ সে হাসপাতালে ভর্তি। দয়া করে তার চাওয়াটা পূরণ করুন ভাইজান। আমার ভুলের শাস্তি আমার ছেলে আর স্ত্রী কেন ভুগবে? আমি আর এই অশান্তি নিতে পারছি না।”
সাঈদ সাহেব খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। আকবর সাহেবও এই কঠিন পরিস্থিতিতে ডুবে গিয়েছে। সাঁতরে কিছুতেই আলোর দেখা পাচ্ছে না। তবে এই কঠিন মুহূর্তে এসেও সবটা আল্লাহ্’র উপর ছেড়ে দিলেন। আকবর সাহেব তরীকে কাছে ডাকলেন। তরী আবার নিকাব বেঁধে বাবার কাছে এগিয়ে এলো। আকবর সাহেব অধরে কিছুটা ফাঁক করে সাঈদ সাহেবের সামনেই তরীকে বলল,
–“আজ তোমাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে মা!”
তরী জিজ্ঞাসু নজরে বাবার দিকে তাকালো। আকবর সাহেব থেমে আবার বলল,
–“তোমাকে সিদাতকে বিয়ে করতে হবে। তুমি কী এতে রাজি? তোমার মতামত এই বিয়েতে অবশ্যই প্রয়োজন!”
তরী একপলক সিদাতের দিকে তাকালো। শূন্য নজরে মায়ের দিকে চেয়ে আছে সিদাতের পানে। এই সিদাত-ই সেদিন হাস্যোজ্জ্বল মুখে তরীকে বলেছিল,
–“জানো, আমি খুব ভাগ্যবান। আমি দুই মা পেয়েছি। এবার তুমিও ভাগ্যবতী হবে, কারণ আমার তরফ থেকে জোড়া মায়ের ভালোবাসা পাবে।”
তরীর কানে কথাগুলো বারবার বাজছে যেন। আজ সিদাতের এক মায়ের অবস্থা ভালো না। এই মা-ই নাকি তরীকে না দেখেই নিজের ছেলের জন্যে পছন্দ করেছে। তার জন্যে হাসপাতাল অবধি পৌঁছে গিয়েছে। তরী দম ফেলে বলল,
–“আমার কোনো আপত্তি নেই বাবা!”
সাইফ যেন কাজী আগে থেকেই ঠিক করে বসে ছিলো। তরীর মতামত শুনে সাইফ তৎক্ষণাৎ কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বিয়ে এক্ষুণি তার মায়ের সামনেই হবে। এদিকে সিদাত অনুভূতিহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মধ্যেই সেরকম আনন্দ নেই, উচ্ছাস নেই। শুধুমাত্র এই পরিস্থিতিতে এসে যেন জয়া একটু হাসার চেষ্টা করল।
অবশেষে বিয়ে সম্পূর্ণ হল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে কেউ সেরকম সামলে উঠতে পারেনি। আসলেই, পরিস্থিতি মানুষকে কতটা অসহায় করে তোলে। সিদাত, তরী এক সঙ্গে এগিয়ে যায় জয়ার কাছে। জয়া চোখের সামনে সিদাতের বিয়ে দেখলো, তার সকল চাওয়া যেন পূরণ হয়ে যায়। দিয়া তরীকে নিকাব খুলতে বললে তরী নিকাব খুলে ফেলল। দিয়া জয়ার হাত ওঠাতে সাহায্য করলো। কম্পিত হাতে তরীর মাথায় স্নেহের সাথে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। যদিই দিয়া-ই জয়ার হাত নাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু জয়ার মন থেকে স্নেহ, দোয়া আসছে। মুখে কিছু বলতে না পারলেও মনে সহস্র কথা বলেছে সে। হাজারো যন্ত্রণা যেন এই সুখের কাছে কিছুই না। সে তরীকে পছন্দ করে ভুল করেনি, তা নিবিড় ভাবে উপলব্ধি করল। তরী জয়ার হাতটা তার হাত জোড়ার মুঠোয় নিয়ে খুবই নরম গলায় বলল,
–“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন মা!”
জয়া হঠাৎ চোখ বন্ধ করে ফেলল। অতি সুখে তার চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।
তরীর চাওয়াটা বোধহয় পূরণ হল না। সকল ছেলেরা যখন ফজরের নামাজ পড়তে চলে গেল তখন জয়ার অবস্থা আবারও খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তার’রা আবার তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তরী এখনো জয়ার হাত ধরে বসে আছে। মনে-প্রাণে দোয়া করছে মানুষটাকে সুস্থ হয়ে ওঠার কামনায়। দিয়ার চোখ জোড়া ভিজে যাচ্ছে বারবার। খবর পেয়ে ছেলেরা দ্রুত চলে আসে। তারা সবাই কেবিনে আসতেই জয়া হঠাৎ কেমন নিথর হয়ে গেল। চোখ উলটে গেল তার। কথা বলতে না পারা জয়া হঠাৎ-ই মিনমিন করে কালেমা পড়লো। অতঃপর…
হঠাৎ চারপাশে কান্নার শব্দ বেড়ে গেল। আকবর সাহেব ব্যথিত চিত্তে জয়ার দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]
বিঃদ্রঃ আজকের পর্বটা একটু লিখতে কষ্ট হয়েছে। বারবার কেমন লাগছিল, কিন্তু তাও.. শক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছি। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

