#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৫
(শব্দসংখ্যা ১০০০+)
নিজের ছেলের উপর মিতু ফরাজী প্রচন্ড আকারে বিরক্ত হয়ে আছেন। মনে মনে ছেলেকে কয়েকবার গালিও দিয়েছেন। তার মতো এতো বুদ্ধিমান মহিলার পেটে এমন ছেলে কিভাবে হলো। হাসপাতালে বদলে যায়নি তো।
সব ভাবনা একপাশে রেখে সে নাজমা বেগম আর মেঘলাকে একান্তে কথা বলার জন্য ভেতরের রুমে নিয়ে এলেন।বিনয়ের সুরে বললেন।
“খুবই দুঃখিত আপা। আমার ছেলে একটা ভুল করে ফেলেছে। আপনার মেয়ে ভেবে আপনার বৌমাকে পছন্দ করে ফেলেছে।”
নাজমা বেগম তার হাত ধরে বললেন,
“আরেহ আপনি এভাবে বলছেন কেনো?আসলে ওরা দুইজনই সেইম ইউনিভার্সিটিতে পড়তো। এরকম কনফিউশন হওয়ার স্বাভাবিক।”
মেঘলাও নিজের মায়ের কথায় সায় দিয়ে বললো,
“জি আন্টি, সালাম মামা বুঝতে ভুল করেছিলো তাই হয়তো মিস্টেক হয়েছে।”
এবার মিতু ফরাজী কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,
“আপনার বৌমার ব্যাপারে তো সবই শুনলাম। ও নাকি বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় বিধবা হয়েছে। আমার ছেলের বা আমাদের পরিবারের কারো এতে সমস্যা নেই। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনার বৌমাকেই আমরা ছেলের বউ করে নিয়ে যেতে চাই।”
মিতু ফরাজীর কথা শুনে মেঘলা আর নাজমা বেগম একে অপরের দিকে তাকালো।
“আমি বুঝতে পারছি যে এতে হয়তো আপনার মেয়ে মাহিরার খারাপ লাগবে কিন্তু…..”
“একদম ভুল বললেন আন্টি। একটুও খারাপ লাগবে না আমার।”
রুমের দরজা থেকে মাহিরা কথাগুলো বলে উঠলো।মেঘলা মাহিরাকে দেখে বলে উঠলো,
“তুই এখানে কি করছিস? ”
“সরি, লুকিয়ে কথা শোনার জন্য। আন্টি আমার এখন বিয়ে করার কোনো প্ল্যান ছিলো না। মা আর আপার জোরাজুরিতে পাত্রপক্ষের সামনে বসেছিলাম। আর ইরিনা ভাবীর সাথে আমার সম্পর্কটা বোনের মতো। আপু ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো।”
নাজমা বেগম ও তার কথায় সায় দিয়ে বললো,
“আমাদের কোনো আপত্তি নেই। ইরিনাকে আমি আমার মেয়ের মতো দেখে এসেছি।আমি আমার দুই মেয়েকে দিয়ে ইরিনাকে রাজি করার চেষ্টা করছি।,”
তারপর নাজমা বেগম মেঘনা আর মাহিরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোরা গিয়ে ইরিনার সাথে কথা বল। যেভাবে পারিস ওকে রাজি করা।”
—————
“না না আপু এটা কিভাবে সম্ভব। আমি আর বিয়ে করবো না। তোমার ভাইয়া আমার জীবনের প্রথম ও শেষ থাকবে।”
“এসব আবেগে জীবন চলে না ইরিনা। বয়সই বা কত তোমার? মাত্র ২৫। পুরো জীবন বাকি রয়েছে।”
মাহিরাও মেঘলার কথায় সায় দিয়ে বললো,
“হ্যা আপু। মেঘলা আপু ছেলেটার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছে। ছেলে খুব ভালো,ফ্যামিলি ও ভালো। তোমার অতীত নিয়ে ওনাদের কোনো সমস্যা নেই।”
“না আপু, আমার পক্ষে আর বিয়ে করা সম্ভব নয়।”
“নিজের মায়ের কথার ও কোনো দাম দিবে না তুমি?”
“মা, আপনি ও?কিন্তু মা….”
নাজমা বেগমকে দেখে ইরিনা কিছুটা অবাক হয়ে গেলো।
“কোনো কিন্তু না। আমার এখন বয়স হয়েছে আর কতদিন দিনে তোমাদের দেখবো? আমি চাই তোমার একজন জীবনসঙ্গী থাকুক। যে তোমার জীবনের ভালো খারাপ সব সময়ে তোমাকে সাপোর্ট করবে।”
“মা আপনার ছেলেকে ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
“আমার ছেলে অনেক আগেই চলে গিয়েছে। কিন্তু তেমার বয়স মাত্র ২৫। আমি চাই না যে তোমার জীবনটা একাকিত্বে কাটুক। তুমি এই বিয়ে না করলে আমি বাসা ছেড়ে চলে যাবো।”
“মা এরকম করবেন না। আমি এই বিয়েতে রাজি। আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। তারপর ও আপনি আমাদের ছেড়ে দূরে কোথাও যাবেন না।”
“ঠিক আছে যাবো না। যাও ওয়াসরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।”
ইরিনা চলে যেতেই নাজমা বেগম বললো,
“মেঘলা তুই মিহিরকে নিয়ে গিয়ে একটা রিং কিনে নিয়ে আয়। মিতু আপা আজই এনগেজমেন্ট করতে চাচ্ছে। শুভ কাজে দেরি করে লাভ নেই।”
————-
রওনক ষ্টুডিও তে রেকর্ডিং করছিলো। হঠাৎই স্টুডিও রুমের দরজায় ঝুলতে থাকা ষ্টার শেপের শোপিস দেখে তার সেদিন রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। হ্যা সেদিন তো সে সবুজ রঙের ষ্টার সাইন দেখেছিলো অটোর পিছনে। আরশাদের দেয়া ভিজিটিং কার্ড থেকে সে তার নাম্বারটা ডায়াল করলো। আরশাদ তখন মেঘলাদের বাসার সামনে। গাড়ি পার্ক করে নামতেই রওনকের কল এলো।
“হ্যালো আমি রওনক হাসান বলছিলাম।”
“জি বলুন, আপনার কি কিছু মনে পড়েছে?”
“হ্যা, সেদিন রাতে আমি অটোর পিছনে সবুজ রঙের বেশ বড়ো সাইজের ষ্টার সাইন দেখেছিলাম।”
“শিওর আপনি?”
“হ্যা, আমার একটু আগেই মনে পড়লো।”
রওনক এর সাথে কথা শেষ করে আরশাদ সাব ইন্সপেক্টর সাদাতের নাম্বার ডায়াল করলো।
“হ্যা সাদাত। ফোর্স নিয়ে উত্তরা বাস স্ট্যান্ডে দেখো কোনো অটোর পিছনে সব রঙের ষ্টার সাইজ পাও কিনা? পেলে আমাকে দ্রুত জানাও।”
“জি স্যার। আমি এখনই যাচ্ছি।”
সাদাতের সাথে কথা বলা অবস্থায় আরশাদ বাড়ির ভিতরে ঢুকতে নিলে কিছুর সাথে বেশ জোরেই ধাক্কা খেলো। নিজেকে সামলে পাশে ফিরতেই দেখলো বিশাল লম্বা চুলের ল্যাভেন্ডার শাড়ি পড়া এক মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। মেয়েটাকে মাটি থেকে তুলে সে বললো,
“সরি, সরি। আসলে আমি……..”
ইতিমধ্যে মেয়েটি আরশাদের দিকে তাকালে আরশাদ স্তব্ধ হয়ে গেলো। তার কাছে মনে হলো তার পৃথিবী যেনো কিছুক্ষনের জন্য থমকে গেছে। ১০ বছর আগের অতীত আজ আবার তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মেঘলা রিং কিনে কেবল বাসায় ঢুকছিলো। এর মধ্যেই আরশাদের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে গিয়ে হাত ও বেশ খানিকটা ছিলে গিয়েছে।
“আপনি কি অন্ধ? এতো বড়ো গেট থাকতেও এভাবে ধাক্কা দিলেন আমায়?”
আদিব ও আরশাদকে নিতে নিচে নেমেছে। মেঘলাকে এভাবে চিৎকার করতে দেখে সে কৌতূহলের স্বরে আরশাদকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে ভাইয়া? ”
আদিবের বড়ো ভাই আরশাদ এটা বুঝতে পেরে মেঘলা কিছুটা লজ্জা পেলো। ইশ নতুন মেহমানের সাথে এভাবে চিৎকার করা উচিত হয়নি। কি মনে করবে লোকটা? হাতেও এতো জোরে লেগেছে যে নিজের মেজাজটা কন্ট্রোল করতে পারে নি।
“কিছু হয়নি, আদিব। যাও যাও তোমার ভাইয়াকে নিয়ে উপরে যাও।”
—————-
রিং পড়ানো শেষে সবাই বসে একসাথে বিয়ের অনুষ্ঠান কিভাবে করবে তা নিতে কথা বলছে। আদনান ফরাজী নাজমা বেগমকে বললেন,
“আপা একটা বিষয়ে আপনার মতামত চাই। আসলে আমাদের পরিবারের সব বিয়েই আমাদের গ্রামের বাড়িতে হয়। তাই আপনাদের যদি কোনো আপত্তি না থাকতে তাহলে আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানটা আমাদের চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে করতে চাই।”
“কিন্তু ভাই আমাদের এই দিকের অনুষ্ঠানটা?”
এবার আদনান ফরাজী মিতু ফরাজীর দিকে তাকালো।
“আসলে আমাদের পরিবারে মেয়ের দিক থেকে তেমন কোনো অনুষ্ঠান করার নিয়ম নেই। আর বিয়ের অনুষ্ঠানের সব খরচ ছেলেপক্ষই বহন করে।আপনাদের যত জন আত্মীয় হবে জানিয়ে দিবেন আমরা ঐখানে সব ব্যবস্থা করে ফেলবো। আর বিয়ের পড়ে ঢাকাতেও আমরা একটা রিসিপশনের ব্যবস্থা করবো।”
নাজমা বেগম এবার মেঘলার দিকে তাকালো।মেঘলা এবার বললো,
“যেহেতু আপনাদের নিয়ম এটা সেক্ষেত্রে তো কিছু করার নেই। আর বিয়েটা এখানে থেকে দূরে হলেই ভালো হবে। আমাদের এলাকার লোকজন বিয়েতে এলে আবার কানাঘুসা শুরু করবে। আংকেল আপনি চট্টগ্রামেই সব ব্যবস্থা করুন।”
“আচ্ছা মা তাহলে তুমি আমাকে তোমাদের গেস্ট লিস্টটা দিয়ে দিও।”
“জি অবশ্যই। আমি কাল পরশুর মধ্যেই ফাইনাল লিস্টটা দিয়ে দেবো।”
এতো কোলাহলের মধ্যেও আরশাদের চোখ বার বার মেঘলার দিকেই আটকে যাচ্ছে। কেনো আবার ফিরে এলো মেয়েটা তার জীবনে, সব ভুলে গিয়ে সে তো নিজেকে সামলে নিয়েছিলো।
চলবে……
মনটা তেমন ভালো না। তাই একটু ছোট পর্ব দিলাম…

