#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৭
(শব্দসংখ্যা ১৪০০+)
মেঘলা রেস্টুরেন্ট থেকে বাসায় ফিরে টের পেলো ঘরের পরিবেশটা কেমন থমথমে। ইরিনা আর মাহিরা বারান্দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নাজমা বেগম জায়নামাজে বসে গুনগুন করে কাঁদছেন। আর মিহির টিভির সাউন্ড মিউট করে পাকিস্তান–ইন্ডিয়ার ম্যাচ দেখছে।
ছোটবেলা থেকে মেঘলা কোনো সমস্যায় পড়লেই নাজমা বেগম জায়নামাজ পেতে নফল নামাজে বসে যেতেন। কিন্তু আজ আবার কী হলো? সকাল পর্যন্ত তো সব ঠিকই ছিল। মেঘলা ধীরে গিয়ে মিহিরের পাশে বসলো।
“তা আমাকে নিয়ে বাসায় আবার কী হলো?”
মিহির কিছু না বোঝার ভান করে বললো,
“কই, কিছু হয়নি তো?”
মেঘলা এবার চোখ গরম করে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“শোন, তোর অনেক বছর আগে আমি পৃথিবীতে এসেছি। তাই মাকে ভালো করেই চিনি। সত্যি করে বল, কী হয়েছে?”
মিহির আর লুকাতে পারলো না।
“আপু, এভাবে তাকাচ্ছো কেন? বলছি তো। আসলে ওই স্টুপিড নাবিলের মা এসেছিল। কাউন্সিলরের মেয়ের সঙ্গে নাবিলের বিয়ে সামনের মাসে।সেই বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল। সাথে আবার ফ্রিতে কিছু এক্সট্রা কথাও শুনিয়ে দিয়ে গেছে। এসব নিয়েই সবার মুড অফ।”
“ধ্যাত! এর জন্য মা কাঁদছে? কতবার তোদের বলবো আমার কপালে যদি বিয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই হবে। তোরা এসব নিয়ে এত প্যারা নিচ্ছিস কেন?”
মিহিরের গলাটা নরম হয়ে এলো।
“আপু, বাইরের সবাই ভাবে আমরা হয়তো তোমাকে ইউস করছি। কিন্তু আমরা জানি তুমি আমাদের কাছে কী। তুমি আমাদের লাইফ সাপোর্টের মতো। জাস্ট আর দুই–তিনটা বছর। আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলেই চাকরি নেবো। তারপর আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না।”
মেঘলার ঠোঁটে হালকা হাসি খেললো।আহ্লাদের সুরে বললো,
“ওরে বাবাহ, আমার ভাই দেখি ধীরে ধীরে অনেক দায়িত্বশীল হয়ে যাচ্ছে। চাকরি পেয়ে বিয়ে করবি তো? আমাদের কিন্তু একদম লাল টুকটুকে মিষ্টি একটা ভাইয়ের বউ লাগবে।”
মিহির লজ্জা পেয়ে বললো,
“ধ্যাত, আপু কী যে বলো না।”
—————–
“কিরে ভাই, ইউনিভার্সিটির পর তো একবারে উধাও হয়ে গেছিস। কোনো রিইউনিয়নেই তোকে দেখা যায় না। পাঁচ বছরে একবারও ইউনিভার্সিটিতে গেলি না। কারণটা কী?”
আজ আরশাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড রবি। কথাটা শুনে আরশাদ হালকা করে মুচকি হাসলো। হাসির আড়ালে লুকোনো ক্লান্তিটা রবির চোখ এড়ালো না।
“আরে না রে, তেমন কিছু না। কেস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকি। তাই আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না।”
রবি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আরশাদের দিকে। তারপর বললো,
“সত্যিই কি তাই? নাকি এখনো দশ বছর আগের সেই বিরহ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছিস?”
আরশাদ চোখ সরিয়ে নিল। গলায় অস্বস্তি চেপে রেখে বললো,
“না রে, এমন কিছু না। আমিই তোর অফিসে যেতাম। এই নে কার্ড। আদিবের বিয়ের অনুষ্ঠানটা চট্টগ্রামে হচ্ছে। অবশ্যই আসবি।”
রবি কার্ডটা হাতে নিয়ে হেসে ফেললো,
“তুই ইনভিটেশন না দিলেও আসতাম। চাটগাঁইয়া বিয়ে কি আর মিস করা যায়!”
“আমরা পরশু সকাল আটটার দিকে রওনা দেবো। তুই তাহলে সকালে ভাবী আর বাবুকে নিয়ে সোজা আমাদের বাসায় চলে আসিস। একসাথেই যাবো।”
“ঠিক আছে,” রবি বললো, “সকাল সাতটার মধ্যেই তোর বাসায় পৌঁছে যাবো।”
চা শেষ করে কার্ডটা টেবিলের ওপর রাখতেই রবির চোখ আবার আরশাদের মুখের দিকে গেল। এত বছরের বন্ধুত্বে সে জানে এই ছেলেটা যতটা কথা বলে, তার চেয়েও বেশি কথা লুকিয়ে রাখে।
রবি হালকা হাসলো। “একটা কথা জিজ্ঞেস করি? রাগ করবি না কিন্তু।”
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “তুই আবার কী অদ্ভুত প্রশ্ন করবি?”
“মেঘলার ব্যাপারে কিছু জানিস?”
হঠাৎ এই প্রশ্নটা শুনে আরশাদ এক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে গেল। হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলো ধীরে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখের গভীরে একটা ক্ষণিকের ঢেউ খেলে গেল যেটা রবির চোখ এড়ালো না।
“কেন? হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
রবি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। “কারণ আমি জানি, তুই যতোই নিজেকে ব্যস্ততার অজুহাত দিস এই নামটা তোর ভেতর এখনো কোথাও না কোথাও আছে।”
“অনেক বছর আগের কথা, রবি। এখন এসব টেনে লাভ কী?”
“লাভ–ক্ষতির কথা না,” রবি গম্ভীর স্বরে বললো।
“আজ বাসায় মেঘলার প্রেমিকের বিয়ের কার্ড দেখলাম। আসলে আমার ছোট ভাই রকিব তো ওদের ফ্রেন্ড। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম।”
“নাবিল,” সে ধীরে বললো।
রবি চমকে তাকালো। “তুই জানিস?”
আরশাদ শান্ত গলায় বললো,
“অনেক আগে থেকেই জানতাম।”
রবি আবার বললো,
“কিন্তু একটা ব্যাপার তুই জানিস কি না জানিস না।মেঘলা আর নাবিলের মধ্যে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। এক মাস আগেই ব্রেকআপ হয়েছে।নাবিল তানিয়া নামের একটা মেয়েকে বিয়ে করছে ”
এই কথাটার জন্য আরশাদ প্রস্তুত ছিলোনা। চোখের দৃষ্টি রবির দিকে স্থির হয়ে গেল, যেনো হঠাৎ করে ঘরের সব শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
“কি বললি?”
“হ্যাঁ,”ওরা আলাদা হয়ে গিয়েছে।নাবিলের বিসিএস হওয়ার পর নাকি নাবিলের অনেক পরিবর্তন হয়েছিলো। নাবিলের মা ও মেঘলাকে তেমন পছন্দ করতো না।সব মিলিয়ে ব্যাপারটা ভেঙে গেছে।“
আরশাদ কিছু বললো না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। ঠিক যেমন দশ বছর আগে, এরকম এক মুহূর্তেই সে মেঘলাকে প্রথম দেখেছিলো। রবি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“তুই এখনো ওকে ভালোবাসিস, তাই না?”
“ভালোবাসা কি কখনো শেষ হয়, রবি?”
“দেখ,যদি চাস তোর সাথে মেঘলাকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।মেঘলা কিন্তু এখন একদম পিউর সিঙ্গেল। তোর বয়স অলরেডি ৩০। আমরা সবাই বাচ্চার বাবা হয়ে গেছি আর তুই এখনো বিয়েই করিসনি।
“তোর এসবে জড়ানো লাগবে না। আমি ম্যানেজ করে নেবো।“
“দেখ, তুই যা ভালো মনে করিস।“
————–
হলুদের আউটফিটের সঙ্গে ম্যাচিং চুড়ির দরকার ছিল, তাই বাসায় ফেরার পথে মেঘলা নিউমার্কেটের দিকে গেল। চুড়ি কিনতে দোকানে ঢুকেই চোখে পড়লো দু’জন পরিচিত কিন্তু ভীষণ অপছন্দের মানুষের দিকে।তানিয়া আর নাবিল ও দোকানে চুরি কিনতে এসেছে। তানিয়া হাতে করে চুড়ি পরে দেখছে, আর নাবিল তার পাশেই দাঁড়িয়ে। এক মুহূর্তের জন্য মেঘলার ইচ্ছে হলো দৌড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। এভাবে বেরিয়ে গেলে ওরা ভাববে সে দুর্বল, একসঙ্গে ওদের সহ্য করতে না পেরে পালাচ্ছে। সেই সুযোগটা সে দিতে চাইল না। তাই নির্বিকার ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকে চুড়ি দেখতে লাগল।
নাবিল কয়েকবার আড়চোখে তাকালো মেঘলার দিকে। হয়তো ভাবছে, মেঘলা কেন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, এত সহজে সবকিছু কীভাবে মেনে নিচ্ছে। তার এসব ভাবনার মাঝেই তানিয়া বললো,
“এই চুড়িগুলো নেবো? টোটাল ছয় হাজার টাকা হয়।”
“জাস্ট দুই-তিনটা অনুষ্ঠানের জন্য এত টাকার চুড়ি?”
“মানে তুমি কী বলতে চাও? আমি বিয়েতে আমার শখগুলো পূরণ করবো না?”
“না, মানে… আরেকটু কমের মধ্যে নিলে হতো না?”
“এত হিসেব করলে কি আর বিয়ের শপিং করা যায়? ধ্যাত, আমি কিছুই কিনবো না।”
গটগট করে তানিয়া দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। নাবিলও তার পিছু পিছু ছুটল। পুরো ঘটনাটা মেঘলার চোখ এড়ালো না। এসব দৃশ্যের সঙ্গে সে অনেক আগেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। নাবিল বরাবরই একটু কিপ্টে স্বভাবের। কিছু উপহার দিলেও তার দামটা বারবার বলে বেড়ায়। সম্পর্কের শুরুতে মেঘলারও বিষয়টা খারাপ লাগতো। একটা ফুল দিলে সেটার দাম নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করতো নাবিল। একসময় অসহ্য হয়ে মেঘলা নিজেই তাকে কোনো গিফট আনতে নিষেধ করেছিলো। তবে সব মেয়ে তো আর মেঘলার মতো এত লো মেইনটেন্যান্স না, অবশ্য এই সত্যিটা নাবিল ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে।
—————–
বাড়ির মেইন গেট খুলতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো জোরে গান বাজানোর শব্দ। আরশাদ একটু থমকে গেলো। এই বাড়িতে সাধারণত এত জোরে গান বাজে না। জুতো খুলে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখলো ড্রয়িংরুম পুরোপুরি তিনজন দখল করে নিয়েছে ।
আদিব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাচের স্টেপ প্র্যাকটিস করছে। তার দুই পাশে যমজ কাজিন পিকু আর মিকু, দু’জনেই মোবাইল হাতে ভিডিও করছে।
“এক… দুই… তিন… আর ঘুর!”
মিকু জোরে বলে উঠলো।
তাল মেলাতে গিয়ে আদিব হোঁচট খেয়ে গেল।
“ধুর! এই স্টেপটা মাথায় ঢুকছে না,” বিরক্ত গলায় বললো আদিব।
পিকু হেসে বললো, “ভাই, এটা ব্রেকআপ সং। মুখে একটু কষ্ট আনো। বিয়ে করতে যাচ্ছ বলে সব সময় হাসলে হবে নাকি!”
এই পুরো সময়টায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আরশাদের দিকে কারো খেয়ালই নেই।
“বিয়েতে ব্রেকআপ সং?”
একসাথে তিনজন ঘুরে তাকালো।
“ভাই!” আদিব দৌড়ে এসে আরশাদকে জড়িয়ে ধরলো।
“তুমি কখন এলে?”
“একটু আগেই। বিয়েতে এত স্যাড গান বাজাবি?”
আরশাদের কথা শুনে পিকু চোখ বড়ো করে বললো,
“ভাইয়া, তুমি এসব ব্যাপারেও জানো?সিরিয়াসলি?”
আরশাদ কোট খুলে সোফায় রেখে হালকা হেসে বললো,
“গান চালা। তোদের দেখাচ্ছি নাচ কাকে বলে।”
গান শুরু হতেই আরশাদ স্বাভাবিকভাবেই তাল ধরলো। শুরুতে শুধু হাতের মুভমেন্ট, তারপর ধীরে ধীরে পায়ের স্টেপ। যেন শরীর নিজেই জানে কোথায় কীভাবে নড়তে হবে। পিকু আর মিকু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“ভাইয়া তুমি তো আগুন!” পিকু চিৎকার করে উঠলো।
মিকু হেসে বললো, “এই নাচটা বিয়েতে রাখতেই হবে।”
নাচের মাঝখানে হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য আরশাদ চোখ বন্ধ করলো। মাথার ভেতরে ভেসে উঠলো একটা পরিচিত মুখ,শান্ত চোখ, দৃঢ় হাসি।হ্যা,মেঘলা। কিন্তু আজ বুকটা ভারী হলো না। বরং মনে হলো, জীবনটা কোথাও না কোথাও নতুন করে শুরু হতে পারে।
গান শেষ হতেই আদিব হাততালি দিয়ে উঠলো।
“ভাইয়া, তোমাকে আজ এতদিন পর এমনভাবে দেখছি, খুব ভালো লাগছে।”
আরশাদ কপাল মুছতে মুছতে বললো,
“আমারও আজ খুব ভালো লাগছে।”
আরশাদ জানে না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। শুধু এই মুহূর্তে সে নিজেকে একটু জীবিত অনুভব করছে। এবার সে কোনো সুযোগ হাতছাড়া করবে না। যেভাবেই হোক,এবার মেঘলাকে নিজের করে নেবে।দশটা বছর সে চুপচাপ অপেক্ষা করেছে।কোনো অভিযোগ নয়, কোনো দাবি নয়।দূর থেকে শুধু মেঘলাকে সুখী দেখার চেষ্টা করেছে, নিজের ইচ্ছে আর কষ্ট গুলোকে সময়ের ভেতর গিলে ফেলেছে নিঃশব্দে।আজ মনে হচ্ছে, সেই দীর্ঘ অপেক্ষাটাও বৃথা ছিল না।হয়তো সব অপেক্ষারই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে।আর আজ, নীরবতার পর প্রথমবার, ভালোবাসা ধীরে ধীরে তার দিকেই মুখ ফিরিয়েছে।
চলবে…..
(একটা বিষয় নিয়ে না লিখে পারলাম না। গল্প লিখি আমি। কিন্তু আমার অরজিনাল পোস্টে তেমন কোনো রিয়েক্ট নেই, রিচ নেই। কিন্তু যারা গল্প কপি করে পেইজে পোস্ট করে তাঁদের পোস্টে রিয়েক্টের বন্যা বয়ে যায়। যারা পেইজ ওনার আছেন। গল্প পেইজে পোস্ট করেন সমস্যা নাই, জাস্ট একটু গল্পের হ্যাশট্যাগ টা ইউজ করেন। আর যারা গল্প পড়বেন তারা একটু কাইন্ডলি রিয়েক্ট, কমেন্ট করে যাবেন। তাহলে আমি লিখতে একটু উৎসাহিত হবো আর আপনারাও পরবর্তী পর্ব দ্রুত পেয়ে যাবেন।)

