আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_৮

0
36

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৮

(শব্দসংখ্যা ১১৩০+)
(কপি পোস্ট করা সম্পূর্ণ নিষেধ)

“মা আর ঝামেলা করো না। এবার এই গানটা বন্ধ করো।”

সবাই মিলে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছে।
গাড়ির ভেতর জুড়ে বেশ জোরে জোরে বাজছে ” জয় বাংলা জিতবে এবার নৌকা…”

মিতু ফরাজী এমন উৎসাহ নিয়ে গানটা চালাচ্ছে যেন গাড়িটা কোনো নির্বাচনী মিছিল।একজন নয়, দু’জন নয়—গাড়ির প্রায় সবাই তাকে অনুরোধ করেছে গান বন্ধ করতে।কিন্তু মিতু ফরাজী কানে যেন তুলো গুঁজে রেখেছে।শেষমেশ আরশাদ আর সহ্য করতে না পেরে বললো,

“মা, তুমি কি এই গানটা বন্ধ করবে? আমার মতো একজন সরকারি আমলার গাড়িতে যদি এমন ফ্যাসিস্ট সরকারের গান বাজে, তাও আবার নির্বাচনের সময়,আমার চাকরির বারোটা বাজবে!”

এই কথা শুনে অবশেষে মিতু ফরাজী গান বন্ধ করলেন।।বিরক্ত গলায় স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“এইজন্যই তো বলেছিলাম, চলো আমরা দুইজন নিজেদের পার্সোনাল গাড়িটা নিয়ে যাই। কিন্তু না, তোমার তো বাকি সবার সাথে যাওয়া লাগবে। এখন দেখছো তো, আমি একটু মন মতো গানও শুনতে পারছি না!”

স্ত্রীর মুড যে আজ বেশ টালমাটাল, সেটা আদনান সাহেব বুঝে গেলেন।তাই শান্ত কণ্ঠে স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বললেন,

“সরি, আমার ভুল হয়েছে। ফেরার সময় আমরা পার্সোনাল গাড়ি নিয়েই আসবো। তুমি তখন মন ভরে জয় বাংলা গান ইনজয় করো।”

এই কথা শুনে মিতু ফরাজীর মুখে হালকা একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।আর গাড়ির বাকি সবাই মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিল,আজকের জন্য অন্তত এই জয় বাংলা থেকে বেঁচে গেলো।

———–

আরশাদ আস্তে আস্তে হেঁটে গাড়ির পিছনের দিকের সিটে গেলো। যাওয়ার পথে একবার আড়চোখে ঘুমন্ত মেঘলার দিকে তাকালো।ইশ, মেয়েটা ঘুমালে দেখতে এত নিষ্পাপ লাগে কেন?পিছনে গিয়ে সে রবির পাশে বসল।

রবি ফিসফিস করে বললো,

“মামা, এইজন্যই কি সেদিন বলছিলি যে তুই সব ম্যানেজ করে নিবি? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে তুই এত সহজে মেঘলাকে পেয়ে যাবি। একদম ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেল!”

আরশাদ ভ্রু কুঁচকে রবির দিকে তাকালো।
“তোর কি মনে হয়, ওকে পাওয়া এত সহজ? এখন পর্যন্ত যতবার দেখা হয়েছে, কোনো না কোনো ঝামেলা হয়েছেই আমাদের মধ্যে। আর ওর মেজাজ তো সবসময়ই সাত আসমানে থাকে। ওকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া তো দূরের কথা, ক্যাজুয়ালি যদি বলি যে ওকে পছন্দ করি,ওইখানেই হাঙ্গামা শুরু করবে। শেষে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি লাগবে!”

রবি হেসে বললো,
“বাহ্ এসএসপি সাহেব! যে কিনা পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে এতগুলো কেস সলভ করেছে, সে কিনা শেষমেশ এই ভালোবাসার ধাঁধায় ফেঁসে গেছে! ভাই, আজকাল মানুষের কোনো গ্যারান্টি নেই। শেষে কে কোন দিক থেকে এসে সাথে করে নিয়ে যাবে বলা যায় না। তাই সময় থাকতেই বলে দে।”

রবির কথা শুনে আরশাদ কনফিউজড হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।মনে মনে ভাবলো, কেস সলভ করা তার কাছে রোজকার কাজ… কিন্তু মেঘলা নামের এই কেসটা যেন এমন এক ধাঁধা, যেটা সমাধান করতে গিয়েই সে নিজেই গোলোকধাঁধায় ফেঁসে যাচ্ছে।

—————

চট্টগ্রাম শহরের এক শান্ত, অভিজাত এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফরাজী পরিবারের রাজকীয় বাড়িটি। বাড়িটি ফরাজী ভিলা নামে পরিচিত। বাইরে থেকে তাকালেই বোঝা যায়, এটি শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয় এটি কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্য, সম্মান আর আভিজাত্যের প্রতীক। সুউচ্চ লোহার গেটের উপর খোদাই করা নকশা, মাঝখানে পরিবারের মনোগ্রাম, আর দুই পাশে সুবিন্যস্ত বাগান সব মিলিয়ে প্রথম দর্শনেই এক ধরনের মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতে প্রথমেই আদনান ফরাজীর দূরসম্পর্কের বোনের সাথে দেখা হলো। মহিলার নাম হেনা খাতুন,বয়স ৫০ এর আশেপাশে হবে। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মেয়ে কেয়াকে নিয়ে এই ফরাজী ভিলাতেই থাকে। পাশাপাশি আদনান সাহেবের মা মনোয়ারা বেগমের দেখাশোনা ও করে।

“হেনা,বাড়ি এতো শান্ত লাগছে কেনো? বাহিরের লাইট গুলো ও তো এখনো লাগায়নি।

“আহা ভাইজান, লোক খবর দিছি। একটু পরেই লাগাই যাইবো। এতো ব্যস্ত হইও না।”

তারপর হেনা খাতুন নিজে থেকেই ইরিনাকে কাছে টেনে এনে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।

“বউ তো সুন্দরই আছে। তয় এর চাইতেও ভালো মাইয়া তো আমগো এইখানেই পাওয়া যাইতো।”

মিতু ফরাজী খুব ভালো মতোই তাঁর ননদের হাবভাব বুঝতে পারলেন। তাই সে নিজে থেকে এগিয়ে এসে বললো,

“কি যে বলো না হেনা। ইরিনা এই তো কিছুদিন হলো মাস্টার্স কম্প্লিট করে একটা সরকারী কলেজে প্রফেসর হিসেবে জয়েন করেছে। তুমিই বলো আজকাল এমন মেধাবী বৌমা কয়টা পাওয়া যায়? রূপ আর গুন তো সবারই থাকে কিন্তু মেধা সেটা তো আর সবার থাকে না।”

হেনা খাতুন ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ঝুলিয়ে ইরিনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মেয়ের দিকে ইশারা করলেন।
“আচ্ছা ভাবী, এই যে আমার কেয়া ওও তো কম না। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি থেইকা অনার্স-মাস্টার্স দুইটাই করছে। এখন আবার বিসিএস দেওয়ার প্রস্তুতি নিতাছে। মেয়েটা যেমন সুন্দর, তেমনি ঘরের কাজেও পটু। আমি তো মাঝে মাঝে ভাবি, এমন মাইয়া যে ঘরে যাইবো ঐ ঘর আলোকিত হইয়া যাইবো।”

কথাগুলো বলার সময় হেনা খাতুনের চোখে গর্বের ঝিলিক স্পষ্ট দেখা গেলো। আর সেই গর্বের আড়ালেই লুকিয়ে থাকা তুলনার ইঙ্গিতটা বুঝতে কারো বাকি রইলো না।মিতু ফরাজী মুহূর্তেই ব্যাপারটা ধরতে পারলেন। ঠোঁটে নরম একটা হাসি রেখে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন,

“মাশাআল্লাহ, কেয়া যে ভালো মেয়ে এতে কোনো সন্দেহ নেই। পড়াশোনা করেছে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা। কিন্তু ভাবো তো হেনা, প্রত্যেকটা মেয়ের জায়গা তো আলাদা। ইরিনার সাথে কেয়ার তুলনা করা যেমন ঠিক না, তেমনি কেয়ার সাথে ইরিনার তুলনাও ঠিক হবে না।”

হেনা খাতুন কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মিতু ফরাজী থামলেন না।
“আরেকটা কথা, বউ হিসেবে আমরা শুধু রেজাল্ট শিট বা রূপ, গুন দেখি না। আমরা দেখি মন-মানসিকতা, দায়িত্ববোধ আর পরিবারের প্রতি সম্মান।এই গুণগুলোই তো শেষ পর্যন্ত সংসার টিকিয়ে রাখে।”

মিতু ফরাজীর কথায় হেনা খাতুনের মুখের হাসিটা একটু ফিকে হয়ে এলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিনা লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলো।মিতু ফরাজী স্নেহভরা চোখে ইরিনার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

“আমার কাছে আমার বউ-ই সেরা। ঠিক যেমন তোমার কাছে তোমার মেয়ে সেরা। এই জায়গাটায় কোনো তুলনার দরকার নেই।”

কথাগুলো এমনভাবে বললো যে সেখানে আর কোনো পাল্টা যুক্তির সুযোগ রইলো না। হেনা খাতুন একদম চুপ করে গেলেন।

হেনা খাতুন চুপ করে যাওয়ার পর মুহূর্তেই ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। বাইরে থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের গাড়ির হর্ন ছাড়া তেমন কোনো শব্দ নেই। মেঘলা এবার একটু নড়েচড়ে বসলো । লম্বা জার্নির ধকল এখনো চোখেমুখে লেগে আছে। সে একটু নড়েচড়ে বসতেই বুঝতে পারলো নিজের ওড়নার একপাশ কাঁধ থেকে নেমে গেছে।
ঠিক তখনই আরশাদ পাশে এসে দাঁড়াল।নিচু স্বরে বললো,

“ওড়নাটা ঠিক করে নাও… ।”

মেঘলা হালকা চমকে উঠে তাকালো। চোখাচোখি হতেই দু’জনেই এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলো।
মেঘলা তাড়াতাড়ি ওড়না টানতে গেলো, কিন্তু অজান্তেই আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে গেলো ওড়নার এক কোণা। সে একটু অস্বস্তিতে পড়তেই আরশাদ ধীরে এগিয়ে এসে খুব সাবধানে ওড়নার কোণাটা ছাড়িয়ে দিলো।আঙুলের ডগা দু’টার মাঝে হালকা একটা ছোঁয়া লাগলো।একদম সামান্য।কিন্তু সেই সামান্য ছোঁয়াটাই যেন দু’জনের বুকের ভেতর আলাদা রকমের ঝড় তুলে দিলো।

মেঘলা চোখ নামিয়ে ফেললো। গাল দুটো অজান্তেই লাল হয়ে উঠেছে।আরশাদও নিজের চোখ সরিয়ে নিলো, কিন্তু বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা কোনোভাবেই থামাতে পারলো না।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মেঘলা আস্তে করে বললো,

“থ্যাংক ইউ…”

আরশাদ খুব নিচু স্বরে উত্তর দিলো,
“ইটস ওকে…”

দু’জনের মাঝখানে তখন আর কোনো কথা নেই।
কিন্তু কথা না থাকলেও, নীরবতার ভেতর দিয়েই যেন হাজারটা অনুভূতি চলাচল করছে।আরশাদ মনে মনে ভাবলো,কেস সলভ করা সে জানে…
কিন্তু এই মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের হার্ট কন্ট্রোল করা যে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মিশন।

মেঘলা আবার ধীরে ধীরে আরশাদের দিকে চোখ তুলে তাকালো।আরশাদের দৃষ্টিও ঠিক তখনই ওর চোখে গিয়ে আটকে গেলো।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here