আকাশপ্রিয়া #পর্ব_৩৬

0
33

#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব_৩৬
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা

[🚫কপি করা নিষেধ। সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য উন্মুক্ত ]

সময়ের কাটার পরিবর্তন এর সাথে প্রহর কেটেছে অতি দ্রুত।শিয়া প্রিয়া দুজনেই আজ বেশ কয়েকটা মাস পরে এসেছে নিজেদের বাড়িতে।এর মধ্যে অবশ্য দু চারবার শিয়ার আসতে হয়েছে। কয়েকবার জামাকাপড় এর জন্য, আবার কখনো বা কিছু ফাইলপত্রের জন্য। তবে সেসবই কয়েকমিনিটের জন্য। বাড়িটাতে ষ্থির হয়ে সময় আর কাটাতে পারেনি এ ছয় মাসে।ধুলো জমে গেছে অনেকটা।যদিও তারা আসবাবপত্র সবই সুন্দর মতো সাদা কাপড়ে ঢেকে রেখেই গিয়েছিলো।
কটেজ থেকে অয়ন আকাশ চলে যাওয়ার খানিক পরেই তারা দুবোনও চলে এসেছে।ঘরদোর দ্রুত ধোয়ামোছা করে ফেলতে হবে।এতগুলো দিন পর বাবা মা ফিরছে।দুজনে অবশ্য বেশ খুশি।কেমন পরিবার পরিবার ফিল আসছে।
বাড়ি এসেই নিজেদের চিরচেনা বেড রুমে এসেছে তারা।যেমন রেখে গেছিলো তেমনই আছে।কান্না পাচ্ছে প্রিয়ার।যতই যাই হোক নিজের মানুষ আর নিজের বাড়ির মতো শান্তি এ পৃথিবীর কোত্থাও খুজে পাওয়া যায়না। সম্ভবই নয়।

শিয়া এরই মধ্যে নিচের তলার সব গোছগাছে লেগে গেছে।রান্নাবাড়ির ঝামেলা আপাতত রাত অবধি নেই।কটেজ থেকে আসার সময় খাবার দিয়ে দিয়েছে রহিমা খালা।রাত অবধি খাবারের চিন্তা করতে হবে না আর।সারাদিন সব গুছিয়ে ফেলতে পারবে।সন্ধ্যায় ফ্লাইট তার বাবা মার।সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে আসতে প্রায় ঘন্টা দশেক সময় লাগবে। তারা যদিও জানেনা কোন ট্রানজিট দিয়ে আসবে।মাঝেসাঝে কাতার,ইস্তাম্বুল এসব জায়গায় বিমান ট্রানজিট করলে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।মোটামুটি হিসেবে আনিসুল সাহেব আর রেনুকা রহমান এর আসতে আগামিকাল বেলা হবেই।

প্রিয়া ঘন্টা খানেকের মধ্যে তাদের রুমটা গুছিয়ে ফেললো।কটেজ থেকে আনা স্যুটকেস গুলো জামাকাপড় সুন্দমতো আলমারিতে তুলে ফেললো।বাড়ি এসেছে প্রায় ঘন্টা তিনেক হচ্ছে। ঘড়িতে সময় বেলা সাড়ে তিনটা।দারুণ খিদে পেয়েছে।প্রিয়া বিছানা থেকে কালোরঙের ওড়নাখানা গায়ে জড়িয়ে ফোন হাতে নিচে নেমে আসে।শিয়া কোমড়ে ওড়না বেধে কাজ করছে।ড্রয়িং,ডাইনিং, কিচেন এড়িয়াও মেয়েটা সুন্দর মতো পরিষ্কার করে ফেলেছে।সবার আগে ঠিকঠাক করে এসেছিলো বাবা মায়ের কামড়া।মোটামোটি পুরো বাড়ি ঝকঝক করছে এখন।
দুবোন কোমড়ে হাত রেখে গোটা বাড়িতে নজর বুলালো। ময়লার ছিটে ফোটা নেই।এতদিন যে এ বাড়িতে জনমানব ছিলো না সেটা বুঝতে পারা যাচ্ছে না একদমই।একগাল হাসলো দু বোন।শিয়া মাথায় হাত বুললাো বোনের।
___”খিদে পেয়েছে?”
প্রিয়া সজোরে ওপর-নিচে মাথা ঝাকায়।শিয়া হেসে বোনের হাত টেনে এনে বসায় খাবার টেবিলে।
___”আমি হাতটা ধুয়ে আসি।”
___”গোসল করে নিতি?”
___”তোর তো খিদে পেয়েছে বললি।খেয়ে গোসল করবি?নাকি গোসল করে এসে?
প্রিয়া ভাবলো।ঝটপট দাড়িয়ে পরলো।
___”গোসল করে এসে খাই।”
শিয়া সম্মতি দেয়।দু বোনই ছোটে গোসলের উদ্দেশ্যে।

খাবার টেবিলে ঝড় উঠে গেছে খাবারের ওপর হামলে পরেছে প্রিয়া।শিয়া এর মধ্যে বেশকয়বার ধমক দিয়েছে আস্তে খেতে।আসলে অস্বাভাবিক খিদে পেয়েছে প্রিয়া।সকালেও খায়নি আকাশের ওপর অভিমান করে।এখনও ভেবেছিলো খাবে না।কিন্তু এতো এতো স্বুসাদু খাবার দেখে মাথা কাজ করছে না তার।বিকেল হয়ে গেছে।খিদে পাওয়াটাই স্বাভাবিক। পেট ভরে আসা মাত্রই ধীরেসুস্থে খাচ্ছে প্রিয়া।আচমকা মলিন মুখ চোখে পরতেই ভ্রুজোড়া তুললো শিয়া।
___”কি হয়েছে?উশখুশ করছিস কেনো!”
___”কিছুনা।”

শিয়া মিটিমিটি হাসলো।খাবারের লোকমা টা মুখে তুলে আপনমনে বললো,
___ “আকাশরা তিনটার দিকে পৌছেছে।আমরা গোসলে যাওয়ার আগে কল করেছিলো।”

প্রিয়া চট করে তাকায় বোনের দিকে।অভিমান জোড়ালো হয়।কিছু বলে না।খাবারে মন দেওয়ার চেষ্টা করে।আকাশের ওপর এক আকাশ সমান রেগে সে।ফালতু লোক একটা।কাল রাতে অযথা রাগ করলো,একা তার দোষ ছিলো?আচ্ছা মানলো তারই দোষ ছিলো।কিন্তু এতটাই কি দোষ ছিলো যে এতদিন দেখা হবে না জানা সত্ত্বেও না বলে চলে গেলো।পৌছে একবার ফোন দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করলো না।অয়ন ভাই তো সুন্দর মতো সকালে তার আপুর সাথে দেখা করে গেছে,গিয়ে সুন্দরমতো পৌছুনোর খবরও দিলো।

___”প্রিয়ু?”
___”কি হয়েছে?”
___”মন খারাপ কেনো?”
___”কই!”
___””আমার ভাইটার সাথে মান অভিমান কমেনি?”
___”মান অভিমান কমার জন্য কথা বলতে হয়,দেখা করতে হয়।তোমার ভাই তা করেছে? “

শিয়া অদেখা হাসে।বোনটা তার সত্যিই বাচ্চা।তবে মুখে সেসব কিছু বলে না।
___”আকাশ এর দোষ শুধু?তুই মরার মতো সকালে ঘুমুচ্ছিলি কেনো?”

প্রিয়া আহত চোখে তাকায়।এখন তার দোষ সবটা?সে কি জানতো আকাশ আজ বাড়ি ফিরছে।রাতে তো তাকে একবারও বলেনি সে কথা।শুধু বলেছিলে প্রিয়ারা বাড়ি আসার সময় দেখা হবে না।সে কিভাবে বুঝবে আকাশ তার আগে চলে যাবে।কাঁদো কাঁদো চোখে বোনের দিকে তাকায়।
___”আমাকে বলেনি তোমার ভাই।জানলে আমি কি উঠতাম না?সারারাত তোমার ভাইয়ের জন্য ঘুমাতে পারিনি।সে আমার ওপর শুধুশুধু রাগ করে।”

___”দুজনেই এমন মানঅভিমান বাড়ালে চলবে?একজনকে একটু নরম হতে হবে না?”

প্রিয়া এবার কেঁদে ফেলে।তার সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে
আকাশ ভালোমনে বিদায় নিয়ে আসলে এতো এমন লাগতো না হয়তো।এতদিন এর জন্য দেখাসাক্ষাৎ হবে না তাও এমন রাগ নিয়ে দূরে থাকবা এটা মানতেই পারছে না সে।বুকটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে।

___”তোমার ভাই কে ফিরে আসতে বলো।দেখা করে যেতে বলো।আমার বুকটা জ্বলে যাচ্ছে।”

শিয়া মায়াভরা চোখে তার ছোট্ট পুতুলটার বাচ্চামো দেখে।মেয়েটা জানেও না হয়তো আকাশকে সে কতটা ভালোবাসে।

__”এখন আর বলে কি লাভ হু?আগে।রাগ করে ছিলিনা কেনো?”

প্রিয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদেছে।পাতের শেষ লোকমাটা হাতে ধরে বসে আছে।
___”বারবার বলছি আমি রাগ করিনি।তোমার ভাই রাগ করেছে আমার ওপর।”

___”কি করেছিলি?”

___”আমি কি না করেছিলাম চুমু খেতে? দরজায় তুমি এসে
পরাতে… “

শব্দ করে মুখ চাপা দিলো বা হাতে।কি লজ্জা,কি লজ্জা।কথার পিঠে কথায় কি সব বলে দিতে যাচ্ছিলো সে।দাঁতে জিব কাটলো।শিয়া শব্দ করে।হেসে ফেলেছে।প্রিয়ার ফর্শা মুখখানা রক্তিম হয়ে গেছে লাজে।
___”থাক থাক বুঝেছি।আর বলতে হবে না।তাহলে দোষ তো দেখছি আমারই।আমি অসময়ে দরজা নক না করলে এমন হতোই না।”

প্রিয়া জবাব দেয় না।দিতে পারে না মূলত।লজ্জায় মিলিয়ে যাছে।যতই হোক বড় বোন শিয়া তার।
শিয়া নিজের পাতের খাবার টুকু শেষ করে ফেলেছে এরই মধ্যে।প্লেট খানা হাতে নিয়ে টেবিল ছাড়লো।
___”আমিই যখন ঝামেলাটা করলাম সমাধান ও আমারই করা উচিত। “

প্রিয়া তাকালোও না বোনের দিকে।সুতরাং শিয়া কি বোঝাতে চাইলো বুঝতে চেষ্টা করলো না সে।শিয়া বোনের দিকে বাঁকা হেসে টেবিলে মাংসের বোলের আড়ালে থাকা তার ফোনে কল টি কেটে দিলো।ফোন স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে আকাশের নাম।

____

চৌধুরী বাড়িতে হৈচৈ পরে গেছে।ছয়মাস পর আকাশ অয়ন বাড়ি ফিরছে।আমেনা চৌধুরি জা দের নিয়ে সারাদিন ভর রান্নাবান্নায় সময় পার করেছেন।শাহজাহান চৌধুরী সহ বাড়ির বাকি আরও তিন কর্তা কেউই বাড়িতে নেই।সাতদিন আগে চারভাই বিজনেস ট্যুরে সিঙ্গাপুর গিয়েছেন।শুধু এক দরকার অবশ্য নয়,মেজো কর্তার চোখের অপারেশন ও একটা কারণ বৈকি।বাড়িতে এই মূহুর্তে ছেলে মানুষ বলতে আকাশের মেজো চাচার ছেলে আরাফ।সে এবার এইচএসসি দিয়েছে। অ্যাডমিশন প্রার্থী। সুতরাং তাকে ছোট মানুষই বলা চলে।বাইরে গাড়ির শব্দে বাড়ির সবাই উচ্ছসিত হয়ে উঠলো।কাজের বেয়ারা রতন ছুটে এলো আমিনা চৌধুরীর দিকে।তিনি চুলো পায়েস নাড়ছিলেন।
___”আম্মাজান ভাইজানরা চইলা আইছে ।”

আমিনা নিজেও শুনেছে গাড়ির আওয়াজ। তবে ছেলেদের ওপর অভিমানে মুখে রা করলেন না তিনি।নিজমনে পায়েশ নাড়তে ব্যাস্ত।বাকি গিন্নি রা আড়চোখে হাসলো জা’য়ের অভিমানে।মেজা জা ঘাড় ঘুরিয়ে রতনকে ইশারা করলো এগিয়ে নিয়ে আসতে।রতন ছুটে বেড়িয়ে গেলো ব্যাগপোটলা এগিয়ে নিয়ে আসতে।মিনিট পাঁচেক এর মধ্যে বাড়িতে পা পরলো বড় রাজপুত্রর।অয়নকে দেখে ছুটে এসেছে তার ছোট বোন আরশি।বোনকে আগলে নিলো সে।
___”কি অবস্থা আমার টেডি’টার?”
___”খুব মিস করেছি বড়দাভাই।
___”আমিও মিস করেছি তো আমার টেডি টাকে।সব্বাই কে মিস করেছি।”

একগাল হেসে আরশি মুখ তুলে এদিক ওদিক খোঁজ করে আকাশের।বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তোলে।অয়ন দাতে জিব কেটে মাথা নাড়ে দুদিকে।ঠোটে আঙুল ঠেকিয়ে বোনকে ইশারা করে কথা না বলতে।
___”আসেনি কেনো?”
___”পরে বলি?”

আরশি বুঝদার এর মতো মাথা নাড়ে।সাথে সাথে চিন্তায় মলিন হয় মুখখানা।আকাশ তার মানে আসেনি।মায়ের কানে কথাটা গেলে আরেক দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে।এমনিতেউ মা টা তার ক্ষেপে আছে ভাইদুটোর ওপর।তারওপর এতদিন পর আসার কথা বলেও আকাশ আসেনি।মাতৃজননী কে মানানো এতো সহজ হবেনা। অয়ন বোনের দিকে তাকিয়ে বাড়ির সবার কথা জিজ্ঞেস করতেই একেএকে বেড়িয়ে এলো সবাই।চাচিদের সাথে গল্পে মশগুল। বাকি ভাইবোনেরা যারযার স্কুল,কলেজে।এখনো ফেরেনি সম্ভবত কোচিং থেকে।বাবা,চাচাদের কথা তো জানাই তার।তবে সবার মধ্যে মাকে চোখে পরলো না তার।চাচিদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে মেজো গিন্নি ইশারায় অয়নকে দেখিয়ে দিলো রান্নাঘর।অয়ন হেসে হাঁটা ধরলো সেদিকটায়।মা টা তার এক আকাশ সমান অভিমান করে বসে আছে।আসি আসি বলে বাড়ি আসলো ছয়মাস পর।তার ওপর আকাশটা আসলো না।প্রিয়ার সাথে দেখা করে না আসার অনুতাপে মাঝ রাস্তা থেকে ফেরত গেছে পাগল ভাইটা।সে কথা তো আবার এই মূহুর্তে মা কে জানানো যাবে না।হার্ট অ্যাটাক করতে পারে।চৌধুরীদের ছোট সাহেব কি না প্রেম করে!মায়ের আদরের ছোট ছেলে আকাশ এহনাজ চৌধুরী একটা হাটুর বয়সী মেয়ের প্রেমে দেওয়ানা হয়ে মাঝ রাস্তা থেকে লোকাল বাস ধরে ফেরত গেছে। এটা মায়ের কানে আসলে বড়সড় ঝটকায় মাথা ঘুরে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।আগেই কিছু-মিছু না জানানোই শ্রেয়।অয়ন মাকে পিছন থেকে জাপটে।ধরলো।আমেনা চৌধুরী মুখ ভার করে খালি কড়াই এ খুন্তি নাড়ছেন।বড় ছেলের অস্তিত্ব অনূভব করে কথা বললেন না তিনি।
___”মা?”
___”কাজ করছি দেখতে পারছো না?”

অয়ন হাসে।মা রেগে থাকলে তাদের দু ভাইকে তুমি সম্বোধন করে।
___”পায়েশ কি আমার জন্য? “
___”ওখানে গোলাপজাম আছে।খাও।তুমি পায়েশ খাওনা।
পায়েশ আকাশের।”

এইতো রাগ কমলো বলে।শেষ অস্ত্র টা চালানো যেতেই পারে এখন।মুখ নরমরম করে বললো,
___”সকাল থেকে না খাওয়া।মাথা টা…

আমেনা চৌধুরী লাফিয়ে সোজা হলেন ছেলের দিকে।ঘর্মাক্ত মুখখানা শাড়ির আচলে মুছতে মুছতে আর্তনাদ করে উঠলেন,
___”কিছু না খেয়ে পথেঘাটে বের হতে নিষেধ করি তো আমি।আমার একটা কথাও তোরা দু ভাই কানে তুলিস না।”

আমেনা চৌধুরী ব্যাস্ত হয়ে রান্নাঘর এর দরজার দিকে তাকায়।আকাশের খোজ করেন।
___”ওটা কোথায় আবার?বেড়িয়ে আসতে বলো,রাগ করবো না।”
অয়ন ধীরেসুস্থে আগলে নেয় মাকে।
___”আকাশ কাল সকালে আসবে মা।

আমেনা চৌধুরী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন জেনো।
___”কি রাজকার্য ওখানে শুনি হ্যা?”
___”খুবই দরকারই কাজ মা।চৌধুরীদের সামনের প্রজন্মের ব্যাপারস্যাপার।”

আমেনা চোখ বড় বড় করলো।ভাবুক চোখে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,
___“খুব ইম্পর্ট্যান্ট প্রজেক্ট বুঝি?”
___”খুব।এই প্রজেক্ট ঠিক না থাকলে তোমার ছোট ছেলের দিক থেকে প্রজন্মই আটকে যাবে।”

আমেনা চৌধুরী বুঝতে পারলো না।তবে কথা এগোলো না।গজগজ করতে করতে অয়ন কে ফ্রেশ হয়ে খেতে নামতে বললেন।

বিছানার ওপর পাশ ফিরে শুয়ে মোবাইল স্ক্রল করতে ব্যাস্ত অয়ন।শিয়ার সাথে মিনিট দশেক আগেই কথা শেষ করে ফোন রেখেছে সে।আকাশের সাথেও সবেই কথা হয়েছে।ওখানেই আছে।প্রিয়ার সাথে এখনো দেখা হয়নি।প্রিয়ার সাথে দেখা করে সকাল সকাল কাল রওনা দিবে।দরজায় কড়া পরতেই গলা উচিয়ে ভিতরে আসতে বললো।হাতে গোলাপজামের বাটি নিয়ে ঘরে আসলো আরশি। সাথে তার বাকি ভাইবোনরাও।আয়াশ সবার আগে এসে হাত মেলালো ভাইয়ের সাথে। অয়ন একগাল হেসে উঠে বসলো বিছানার ওপর।
___”বিচ্ছুর দল বোস। “
আরশি ভাইয়ের হাতে মিষ্টির বাটি টা দিয়ে ঘেষে বসলো।
___”এতদিন পর আসলে আমাদের গিফট।”

কপাল চাপড়ালো অয়ন।ভাইবোনের গিফট এর ব্যাগটা গাড়িতে রয়ে গেছে।কিছুক্ষণ আগেই ড্রাইভার কে গাড়ি নিয়ে আকাশের কাছে পাঠিয়েছে।

___”কাল পাবি।আকাশের কাছে আছে।”

হঠাৎ আয়াশ চোখমুখ কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
____”ছোটদাভাই আজ আসলো না কেনো।কাল রাতেও তো আমাকে বললো আজকে ওউ আসছে।”

অয়ন মিটমিট করো হাসো এবার।বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে।কোলের ওপর বালিশ ট চাপা দিয়ে।
____”তোদের ছোটভাবি একটু ছোট টো।বাচ্চা আরকি।তো বাচ্চার অভিমান ভাঙ্গাতে আজকে থেকে যেতে হলো আরকি।

ঘরময় সকলে আকাশ থেকে পরলো যেনো।একেকজনের চোয়াল ঝুলে গেছে। কথা বলতে পারছে না।তাদের সেঝো চাচার মেয়ে এনি সবার আগে মুখ খুললো,
___”মজা করছো বড় ভাইয়া?”

___”আমাকে তোদের এতো চিপ মনে হয়?ছোট ভাইয়ের বউ নিয়ে কেউ এহেন মজা করে!”

অয়নের মুখ দেখে সত্যি এই মূহুর্তে মনে হচ্ছে না মজা করছে।আরশি ভাইয়ের হাত ধরে ঝাকিয়ে ওঠে।
___”আমি দেখবো ভাবিকে।আমি দেখবো…”

আরশির সাথে গলা মেলায় ঘরের সকলেই
অয়ন নিজের ফোনখানা বের করে সেদিন পার্টিতে তোলা প্রিয়ার একটা ছবি বের করে ধরে ওদের দিলে।সবাই একপ্রকার থাবা দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে নেয় নিজেদের।
___”সাক্ষাৎ পরী তো এটা।”
আরশির হাতে ফোন।মন্তব্য টাও তারই করা।তার সাথে সহমত হলো একে একে সকলেই।
___”আল্লাহ… সত্যিই সুন্দর। মেয়েটা তোমাদের ওখানের?”

অয়ন মাথা নাড়ে।এলোমেলো চুলের ভিতর হাত চালায়।উদাশ গলায় বলে,
___”তোদের বড়ভাবির বোন আরকি।”
___”ও..
কথাটা আরাফ বলার পর হঠাৎ অয়নের শেষ লাইনটা মাথায় ক্যাচ করতেই ফট করে তাকালো আরশির দিকে।একেএকে এনি,এরিন,আয়াত সবার দিকে চোখ পরলো।দেরিতে ধরলো বোধহয় সবার মাথায় কথাটা।ধরতেই অয়নের দিকে তাকিয়ে এবার চিৎকার করো বসলো,
___”বড় ভাবি মানেএএএ!”

অয়ন দু হাতে কান চাপা দেয়।উঁচু হয়ে একবার দরজার দিকটা দেখে।
___”আস্তে কথা বল।আগেই ঢাকঢোল পেটাচ্ছিস কেনো গাধা।থাম।”
___”এত বড় চমক দিয়ে থামতে বলছো!”
___”চমকে কি দেখলি!বিয়ে করতে হবে না!এভাবেই বুড়ো হবো ভেবেছিলি নাকি!

হেসে ফেললো সকলে।অয়ন এবার শিয়া আর প্রিয়ার একসাথে ছবি দেখালো ভাইবোনদের।সবাই মুগ্ধ তাদের দুই ভাবির ওপর।বিষদ আলোচনা চললো বেশ রাত অবধি। আলাপ আলোচনায় ভাটা পরলো তার মায়ের আগমনে।আমেনা চৌধুরী ছেলের রুম থেকে সবকটাকে বের করলেন।ছেলেটা জার্নি করে এসেছে এতদূর।রাত ভর গল্প করার জন্য আর দিন পরে আছে।একে একে সবকটা বের হওয়ার পর নিজে এসে বসলো ছেলের পাশে।অয়ন অবশ্য জানে তার মা এখন কি কি বলবে,কি প্রশ্ন করবে।তারপরও চুপচাপ বসে রইলো মায়ের কথাবার্তা শুনতে।
___”আকাশ আসলো না কেনো সত্যি করে বলতো।

অয়ন ঠিক জানতো।তাদের মা তাদের মিথ্যে খুব সহজে ধরতে পারে।এদিকসেদিক কিছু হলেই চট করে ধরে ফেলে।
___”সত্যি অফিসের কাজ মা।কাল সকাল সকাল চলে আসবে।

___”আমাকে এতো ব্যাকডেটেড মনে হয় তোদের হু?

অয়ন হতভম্ব হয়।এখানে ব্যসকডেটেড মা কোথা থেকে আসলো!

___”ভেবেছিড তোদের হেয়ালি করা কথার প্যাচ আমি ধরতে পারবো না।মেয়েটা কে?”

অয়ন অবাক হয়না।হতাশ হয়।মা তার ভয়াবহ চালাক।
___”কেউ না মা সত্যি। কাজ ছাড়া ভাই অন্য দিকে মন দেয়?”

আমেনা খানিকক্ষণ ভাবে।কথাটা সত্যি। তার বড় ছেলে এর আগে এক মেয়ের কথা বললেও আকাশ এসবে ছিলো না কখনো।কোনো মেয়ে তার ছোট ছেলের মনে ধরেছে বলে তো শোনেনি।কতশত বার কতশত মেয়ে দেখিয়েছেন ছেলেদের একজনেরও মনে ধরে না।আমেনা স্বাভাবিক হন।ছেলের মুখের দিকে তাকায়।
___”তোর বাবা তোর জন্য সৌমির…

অয়ন সাথে সাথে থামিয়ে দেয়৷ মাকে।হতাশায় ভরে ওটে মুখখানা।
___”কাম অন মা।সৌমির আদৌপান্ত তোমাকে কিন্তু আমি জানিয়েছি।জানাইনি?ও একটা মেয়ে?বউ করে আনার মতো?সব শোনার পর তোমার এসব মনে হয় এখনো?”

আমেনা সজোরে মাথা নাড়ে এদিকওদিক। তার সৌমি মেয়েটাকে একদম পছন্দ না।বেশ কয়েকবার এসেছে বাড়িতে।শাহজাহান চৌধুরী অয়নের সাথে তার বন্ধুর মেয়ের সৌমির বিয়ে ঠিক করে বসে আছেন একপ্রকার। কিন্তু সে মেয়ের মতিগতি বোঝা যায়।মেয়ের চরিত্র তার মোটেই ঠিকঠাক লাগে না।সে নিজেও একজন নারী সুতরাং হাটুর বয়সী একটা মেয়ের মনোভান সহজে না বুঝতে পারার কারণ নেই,তিনি অশিক্ষিত বা বোকাও নন।মেয়েটা অয়নের সাথে সাথে আকাশের দিকেও ছোঁকছোঁক করে।যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয় একজনের সাথে অথচ হ্যাঙ্গলামো করে হবু দেবোর এর সাথে সেই মেয়ে ঘরে এনে বংশ ধ্বংস করার মানেই হয়না।কিন্তু শাহজাহান চৌধুরী এতসব জানেননা,তাকে জানান নি তারা।যে কারণে শাহজাহান চৌধুরী সৌমিকে বাড়ির বউ করে আনার জন্য এক পায়ে খাড়া।
___”তুমি এসব নিয়ে ভেবো না তো মা।ভাই আসুক কাল।তারপর তিনজন আমরা একসাথে মিটিং এ
বসবো কেমন?আমারও তো বিয়ের বয়স হলো নাকি?

অয়নের মুখে এখন এ কথাটা মোটেই আশা করেননি সে।ছেলে তার বরাবরই বিয়ে বিরোধি।বিগত ছয় বছর হলো ছেলের বিয়ের চেষ্টায় পাগলপ্রায় কিছুতেই রাজি করানো সম্ভব নয়।সেখানে ছেলে নিজ মুখে বিয়ের কথা বলছে।
___”তুই সত্যি বিয়ে করতে চাস বাপ?”
___”না চাওয়ার কি আছে!”

আমেনার চোখে পানি আসে।অয়ন যতটা স্বাভাবিক ভাবে আজ বলছে মোটেই এতদিন সেসব ব্যবহারের ছিটেফোঁটা ছিলো না।বিয়ের কথা তুললে বাড়ি ছাড়তো,খাওয়া দাওয়া বন্ধ করতো।তাই আর দশটা ছেলে বিয়ের কথা তাদের মা কে বললে যেমন সিন তৈরি হয় আমেনা চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন।
___”মেয়ে… মেয়ে পছন্দ বাপ?”

অয়ন ওপর নিচ মাথা নাড়।
___”খুব সুন্দর, লক্ষি মেয়ে মা কাল ভাই আসুক।সারপ্রাইজ আছে।”

_______

ঘড়িতে সময় রাত বারোটা।প্রিয়া শিয়া একরুমে আজকে।তাদের নিজেদের রুম।মানসিক শান্তি একদম।শিয়া ক্লান্ত খুবই।সারাদিন এর খাটনিতে চোখবুঝে আসছে। রাতের ডিনার সেরে বেশি রাত জাগেনি আর।তবে ঘুম নেই প্রিয়ার চোখে।ঘুমন্ত শিয়ার পাশে উশখুশ করছে এপাশ ওপাশ করছে বারবার।কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েছে,আকাশকে ফোন করবে করবে করেও করতে পারছে না।বারবার নাম্বার ডায়াল করতে গিয়ে রেখে দিচ্ছে।দু হাতে কপাল ডলে প্রিয়া।আকাশ যে খুব অভিমান করেছে বুঝতে বাকি নেই।কতগুলো দিন ধরে এমনই চলে আসছে।দেখা তাদের একদম কম হতো।তারপর শেষ কয়েকদিন তো প্রিয়া নিজেই অভিমান করে দরজা টরজা বন্ধ করে একসাড়।সব কাল রাতেই ঠিক করতে পারতো। তা না করে আরও ঝামেলা পাকিয়ে বসে রইলো।

প্রিয়া বিছানা ছেড়ে উঠে বসে।একরাশ খোলা চুল কোমড় ছড়িয়ে যায়।গায়ে সাদা টি শার্ট আর কালো একটা স্ক্রার্ট।হাটু পর্যন্ত উঠে আছে।বিছানা থেকে নেমে এসে দাড়ায় জানালার সামনে।বাইরে চাঁদ তাঁরা কিছু ওঠেনি নাকি!কিচ্ছু চোখে পরছে না।প্রিয়া বিছানা লাগোয়া পড়ার টেবিলের চেয়ার এসে বসে।তার এখন একটা বিধঘুটে শখ হচ্ছে। তার এখন শাড়ি পরতে ইচ্ছে হচ্ছে। সেদিন এর সেই লাল শাড়িটা।যে শাড়িতে আকাশ তাকে প্রথমবারের মতো শাড়িতে দেখলো।সেটায় আকাশের স্পর্শ আছে।সেটা গায়ে জড়িয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। মনখারাপ হয় প্রিয়ার।কারণ খুব সম্ভবত কটেজে নিয়ে যাওয়া একটা শাড়িও আসার সময় নিয়ে আসেনি।গুটিগুটি পায়ে বেলকনির দরজা খুলে এসে দাড়ায় সবুজের সমারোহে মোরা তার বেলকনিটায়।বেশিরভাগ গাছই আর সবুজ নেই।অনেক গাছ মরেও গেছে।এতদিন যত্ন নেই,যা ঝড়বৃষ্টির পানি আরকি অতটুকুই।প্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেলিঙ এ ভর দিয়ে দাড়ায়।সত্যিই অন্ধকার চারিদিকে। আকাশে একটা তাঁরার হদিশ ও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।তবে ঠান্ডা বাতাস।শরীরে খেয়াল করলো।হাতা ছোট টিশার্ট।ওড়না আনেনি।তাই গা ঢাকতে পারলো না।এখন গিয়ে রুম থেকে আনতেও ইচ্ছে হচ্ছে না।

আকাশ গাড়ির কার্টে হেলান দিয়ে অনিমেষ তাকিয়ে আছে দোতলার বারান্দায় প্রেয়সীর দিকে।এইরকম সিন এর আগেও একবার হয়েছিলো।কয়েকমাস আগে…সেদিনও পাগল প্রেমিকের মনের দহন থামাতে আকাশ এসেছিলো এখানটায়।সেদিনও সম্পূর্ণ আচমকাই প্রিয়াও এসে দাড়িয়েছিলো এখানটায়।সে দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখেছিলো সে কিশোরিকে।আজকেও একই ঘটনা।আকাশ বাড়ি যায়নি।যেতে পারেনি।প্রিয়ার সাথে মান অভিমান করে দূরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।মেয়েটাকে শেষ বার আসার সময় বিদায় না দিয়ে আসার আক্ষেপে পাগল হয়ে যাচ্ছিলো সে।সকালের ওই ঘুমন্ত নিস্পাপ মুখটা যতবার মুখের সমানে ভেসে উঠছিলো ততবারই হৃদয় থমকে যাচ্ছিলো না।
আকাশ মুচকি হাসে।মেয়েটা কেমন ছটফট করছে।অস্থির কিছু নিয়ে।তাকে মিস করছে কি!সে নিজেও সারাটাদিন অপেক্ষা করেছে প্রিয়ার একটা কলের।ম্যাডাম ভয়াবহ অভিমানী। বিকেলে প্রিয়ার কেঁদে কেঁদে বলা সে সব অভিমান, অভিযোগ শুনেছে সে।শিয়া শুনিয়েছে।আকাশ নিজের ফোনখানা বের করে।প্রিয়ার নাম্বার ডায়াল করতেই ওপরের বলেকনি থেকে ছুটে ভিতরে ঢুকতে দেখা যায় প্রিয়াকে। ফোনটা হয়তো ঘরে রাখা।কয়েক সেকেন্ড এর ব্যবধানে ফোন টা নিয়ে আবার বারান্দায় ও চলে আসে।বারান্দার দরজা আলগোছে চাপিয়ে। শিয়া ঘুমুচ্ছে খুব সম্ভবত। প্রথমবার রিং কেটে গেলো প্রিয়ার ধরতে ধরতে।আকাশের নাম্বার দেখে সে বিশ্বাস করতে পারছে না হয়তো।চোখে পানি ছলছল করছে মেয়েটার।তবে কল কেটে যাওয়ায় বেশ হতাশ হলো।সে ধরতেই পারলো না।হাত-টাত কেপে যাচ্ছেতাই।আকাশ আবার কল করে।এবার অবশ্য দেরি হয়না সাথে সাথে ফোন তোলে প্রিয়া।গলার কান্না খুব কষ্টে গিলে কোনোমতে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করে,
___”আ..আপনি খারাপ খুব খারাপ।”
___”আই ওয়ান্ট টু কিস ইউ।রাইট নাও।”

হতভম্ব হয় প্রিয়া।প্রথম লাইনটাই এটা!বললেই হলো এখন।রাতে ওই কিস টা করতে না পারার দুঃখে না বলেই চলে গেছে এখন অতদূর গিয়ে ফোন করে কিস করতে চাওয়া হচ্ছে! অসভ্য কি সাধে বলে সে!
___”আপনি…
___”প্রিয়া…আই ওয়ান্ট টু কিস ইউ সো রাফলি।রাইট নাও।”

বারবার এক কথা।কপাল চাপরায় প্রিয়া।কিছু বলার আগেই দু দু বার জোরসোরে গাড়ির হর্নের আওয়াজে কপালে ভাজ পরে তার।এতো রাতে এদিকটায় গাড়ি কার!তবে একটু খেয়াল করতেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে মেয়েটা।এক হাতে মুখ চাপা দেয়।সাদা শার্ট পরিহিত তার ব্যাক্তিগত সুপুরুষ অদূরে গাড়িতে হেলান দিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে।

___”আপনি আসবেন?নাকি আমি ওপরে উঠবো।”

___”আপনি এতো রাতে!এখানে!অসম্ভব। “

___”আসবে কি?আমার ওপরে যেতে হলে সোজা বেডরুমে আটকাবো কিন্তু। “

প্রিয়া সজোরে মাথা নাড়ে দুদিকে।পাগলের মতো ছুটে নেমে আসে নিচে।শিয়া মাথা তুলে দেখে বোনের ছুটে যাওয়া,সঙ্গে সঙ্গে আসা নিজের ফোনে আকাশের মেসেজে নিশ্চিত ঘুম দেয় একটা।

প্রিয়া এসে হামলে পরে আকাশের শক্তপোক্ত বুকে।ঢুকে যেতে চাইছে যেনো বুকের ভিতরে।আকাশ নিজেও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে প্রিয়া ধনুকের মতো বাকানো কোমড়খানা।প্রিয়ার ছোট্ট আবেদনময়ী শরীরের ভাজ গুলো ছুয়ে আছে তার শরীর।আকাশ এক হাতে পেচিয়ে নিলো প্রিয়ার খোলা চুলগুলো।মাথা হেলালো পিছন দিকে।প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে দাড়িয়ে আছে।
___”কি বললাম একটু আগে?”
প্রিয়ার মুখ লজ্জায় গাঢ় হয়ে ওঠে।এদিকওদিক তাকায়।একদম রাস্তার ওপর দাড়ানো তারা।অসহায় গলায় বলে,
___”এ..এটা তো রাস্তা।”
___”সো হোয়াট।”
___”রাস্তায় খারাপ দেখায়।”
___”বিয়ে ছাড়া তোমার সাথে কথাটাও খারাপই দেখায়।কিন্তু অতো হিসেব করতে পারছি না।ক্ষুদার্ত আমি।আই ওয়ানা ইট ইওর লিপস।ফিড মি।”

কান ঝাঁজিয়ে উঠলো প্রিয়ার। চেপে ধরে রাখা আকাশের শার্টের আস্তিন আরও শক্ত করে ধরলো।আকাশ তাকে চেপে রেখেছে নিজের সাথে।
___”কাপছো কেনো।”
___”ক..ক..কই?”
___”তোতলাচ্ছোও!”
___”বাড়ির ভিতরে চলুন।”
___”বাড়ির ভিতরে আরও অন্য কিছু মন চাইবে। “

প্রিয়া মুখ তুলতে পারছে না।মাথা ঝুঁকিয়ে অস্ফুটে বলে,
___”রাস্তায় কেউ দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”

___”কি আর হবে।জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে।এর থেকে কি আর!সেটাই পারফেক্ট।এর থেকে ভালো বিয়ের পদ্ধতি আর হয়না।আমি এতো অপেক্ষা করতে পারছি না।”

প্রিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয় আকাশের ঠোঁটকাটা কথাবার্তায়।
___”বাড়ির ভিতরে চলুন প্লিজ।রাতে খেয়েছেন কিছু?”
___”খেতেই তো এসেছি।”
___”ইশশশ… বাজে বকবেন না।খেয়েছেন?”
___”উহু।”
___”চলুন খাবেন চলুন।”
___”আমি যেট চাইছি সেটা আগে।”

প্রিয়ার শরীর আড়ষ্ট হয়।শিরশির করছে।আকাশের ঘোরলাগা তীক্ষ্ণ নজর না তাকিয়েও খেয়াল করতে পারছে সে।
___”দেবো।চলুন।”
___”সত্যি তো?”
___”হু।”
___”না দিলে কিন্তু আর ফিরবো না।”
___”চলুন।”

প্রিয়া কোনোমতে আকাশের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।আলতো হাতে আকাশের হাত খানা ধরে টেনে নিয়ে আসে বাড়ির ভিতরে।আজকে প্রথম প্রিয়াদের বাড়ির ভিতরে ঢুকলো।এর আগে যতবার এসেছে ওই রাস্তা অবধিই তার সীমা ছিলো।আকাশ এসে আয়েশ করে বসলো সোফার ওপরে।
___”ফ্রেশ হয়ে আসুন।আমি খাবার গরম করি।”
___”শিয়া কোথায়? “
___”ঘুমায়।ডাকবো?”
___”উহু।থাক।আমি বেশি দেরি করবো না।”

প্রিয়া আকাশকে বাথরুম দেখিয়ে দিয়ে নিজে দ্রুত এগোয় রান্নাঘরের দিকে।খাবার যথেষ্ট রয়েছে।ফ্রিজে তুলে রাখা।সব গরম করতে ব্যাস্ত সে।আকাশ এরইমধ্যে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়েছে।নিজ থেকেই এসে বসলো আবার সোফায়।রান্নাঘর থেকে আড়চোখে একবার আকাশকে দেখলো প্রিয়া।গলা উচুলো,
___”খাবার গরম হয়ে গেছে।ডাইনিং এ আসুন।”

আকাশ উঠলো না।ঠায় বসে রইলো।ঘুরে বসলো এবারে।এতক্ষণ প্রিয়ার গায়ে ওড়না দেখেনি।মেয়েটা এরইমধ্যে ওপর থেকে ওড়না এনে গায়ে জড়িয়েছে।কোমড়ে বেধে পাকা গিন্নির মতো খাবারগুলো গরম করছে।মিনিট দশেকের মাথায় সব খাবার এনে জড়ো করলো টেবিলে।
___”কি হলো আসুন।”
___”খাবার নিয়ে এখানে এসো।”

প্রিয়া প্রতিবাদ করে না।প্লেটে সুন্দর মতো খাবার তুলে এসে বসে সোফায়।প্লেটখানা এগিয়ে ধরে আকাশের দিকে।
___”নিন।ইলিশ মাছ খান তো নাকি?”

আাকাশ প্লেটের দিকে তাকায়।খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজি।পাশের টেবিলে রাখা বাটিতে গরুর মাংস সম্ভবত। সালাদ আছে সাথে। তার প্রিয় খাবার।তবে ইলিশ মাছের কাটা বাছার ঝামেলায় বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে চলে।এবার নিজের দৃষ্টি তাক করলো প্রিয়ার দিকে।আপনমনে নিজের পকেট থেকে সেলফোন খানা বের করে মন দিলো সেটায়।প্রিয়া অবাক চোখে তাকিয়ে রয়।খাবে না নাকি!

___”খাবেন না?এগুলো খান না?অন্য কিছু করে দেবো?বলুন কি খাবেন?”

প্রিয়ার অস্থিরতায় সত্যি সত্যি নিজেকে বিবাহিত পুরুষ লাগছে।সারাদিন এর কাজকর্ম শেষে স্বামী বাড়ি ফেরে,আর স্ত্রী ব্যাস্ত হয়ে তার আদরযত্ন করে।মূহুর্ত টা অসাধারন।তবে উচ্ছাস টা প্রকাশ হতে দিলো না।গম্ভীর মুখটা তুললোও না ফোন থেকে।
___”না খেলে কি বানিয়ে দেবে?”
___”বলুন কি খাবেন?”
___”রান্নাবান্না পারো তুমি?”

প্রিয়ার মুখ চুপসে আসে।সত্যিতো রান্না তেো সে জানেনা।আকাশ যদি খাবারগুলো না খায় কি বানিয়ে দেবে সে!এক ডিম সেদ্ধ ছাড়া বোধহয় আর কিছু পারবে না।মুখটা কাচুমাচু করে বললো,
___”বলুন।চেষ্টা করবো।”

আকাশ অদেখা হাসে।হাতের ফোনটা সাইডে দেখে সোফায় পা ভাজ করে প্রিয়ার দিক ঘুরে বসে।
___”খায়িয়ে দাও।”

প্রিয়া চমকায়।হাতের প্লেট খানা শক্ত করে ধরে রাখে।
___”আ..আমি?”

___”এখানে আর কে আছে!কাকে বলবো?”

প্রিয়া জড় বস্তুর মতো বসে থাকে।লজ্জা লাগছে তার।
___”দেবে? না হলে থাক।”

প্রিয়া ব্যাস্ত হয়।
___”এই না না।দিচ্ছি তো।আমিই দিচ্ছি।”

আকাশ চুপচাপ বসে।প্রিয়া ধীরেসুস্থে অতি যত্নের সাথে মাছের কাটা বাছে।খিচুরির সাথে সালাদ আর মাছ মাখিয়ে লোকমা তুলে ধরে আকাশের মুখের সামনে।আকাশ লক্ষ করে হাত কাঁপছে মেয়েটার।মনে মনে হাসে।শুরুতেই চুমুর কথা বলে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে।বাধ্য ছেলের মতো হা করে মুখে নেয় প্রেয়সীর ভালোবাসা মাখা খাবারের লোকমা টুকু।ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেয় প্রিয়া নরম সরম হাতের আঙুল।এবার ভালোরকম দৃশ্যমান কাঁপা কেঁপে ওঠে প্রিয়া।ঠোটে ঠোঁট টিপে ধরে সে।পায়ের আঙুল মেঝেতে চেপে ধরা।আকাশ বোঝে সবটাই।
___”দেবে না!খিদে তো…
___”দিচ্ছি তো।”

একেএকে খাবার তুলে দেয় আকাশের মুখে।মাছ শেষ করে মাংস তুলে নেয়।প্রতি লোকমাতেই একই কাহিনি। আকাশ ইচ্ছে করে ছুয়ে দিচ্ছে মেয়েটার আঙুল।এহেন স্পর্শে শরীরের অন্য রকম অনূভুতি তৈরি হচ্ছে মেয়েটার।ধীরেসুস্থে খাবার শেষ করলো আকাশ।প্রিয়া রান্নাঘরে সব তুলে রেখে পানির গ্লাস আকাশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বসলো আকাশের পাশে।বেশ খানিকটা দুরত্ব রেখে।আকাশ এক চুমুক এ পানি শেষ করে গ্লাসখানা রাখলো টেবিলের ওপর।তাকালো প্রিয়ার দিকে।মেয়েটা কেমন ভয়ার্ত মুখে বসে আছে।
___”অতো দূরে বসেছো কেনো!কাছে এসো।”
___”হ্যা?”
___”কাছে আসতে বললাম।”

প্রিয়া শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে আসে আকাশের দিকে।কাছাকাছি আসতেই বাহু ধরে টেনে একদম গা ঘেষিয়ে বসালো মেয়েটাকে।মাথা টা চেপে ধরলো নিজের বুকের বা পাশটায়।
___”রাগ কমেছে?”

প্রিয়া ওপরনিচ মাথা নাড়ে।মুখে বলে,
___”কথাটা তো আমি জিজ্ঞেস করবো।আপনার রাগ কমেছে কি না।আমিতো রাগ করিইনি।”

আকাশ মৃদু হাসে।মাথা নিচু করে নিজের চোয়াল ঠেকায় প্রিয়ার মাথায়।
___”প্রেয়সীর ওপর রাগ করা যায় হু?”
___”আপনি তো করেছেন।”
___”রাগ করলে সব ছেড়েছুড়ে মাঝরাস্তা থেকে লোকাল বাস ধরে এসে সারাদিন আপনার বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করি?”

প্রিয়া চমকে মাথা তুলতে চায়।আকাশ উঠতে দেয় না।
___”আপনি সারাদিন আমাদের বাড়ির সামনে ছিলেন?”

___”তাহলে ভাবো!অথচ তোমার দেখা পেলাম এই মাঝরাতে।আরও আগে দেখা হলে আরও আগে রাগ ভাঙতে পারি।”

প্রিয়া দু হাতে জড়িয়ে নেয় আকাশের কোমড়।মুখ গুজে রয় আকাশের বুকে।শ্বাস টেনে নেয় প্রাণভরে।আকাশও মুখ ডুবিয়ে আছে প্রিয়ার চুলের ভাজে।একই ঘ্রান টানায় মত্ত সে নিজেও।দু হাতের আজলায় মুখটা তোলে প্রিয়ার।সময় নিয়ে চোখ বুলায় মেয়েটার সম্পূর্ণ মুখজুড়ে।কি মায়াবী কায়া।মুগ্ধ করা সবকিছু।আলতো ঠোঁট ছোয়াল প্রিয়ার কপালে।প্রিয়া আবেশে চোখ বুজে নেয়।ঠোটের নরম স্পর্শ একেএকে নাকের ডগা, দু গাল সবশেষে অধর স্পর্শ করে।তিরতির করে কেঁপে ওড়ে ওষ্ঠ জোড়া।হাতের মধ্যে মুঠো করা আকাশের শার্টের আস্তিন।আকাশ কানের লতিতে ঠোঁট ছোয়ায়।হাস্কিস্বরে বলে,
___”এই ঠোঁটে ঠোঁট রেখে মৃত্যু কবুল জানপাখি।মৃত্যু কবুল…”

ছলছল চোখে তাকায় প্রিয়া।বিনা বাক্যে নিজের ঠোঁট জোড়া ছুয়িয়ে দেয় আকাশের ওষ্ঠে।নিজ থেকে আদরে ভরিয়ে দেয় তার প্রেমিক পুরুষ টাকে।
প্রিয়া ছাড়ে, আকাশ জোর করে না তারপর।প্রিয়া বোধহয় অবাকই হয়।মুখে কিছু না বললেও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।এত সহজে এই অধরসুধা পান করা থেকে দূরে যাওয়ার মানুষ নয় আকাশ।আজ কি হলো।আকাশ কথা বাড়ায় না।প্রিয়াকে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। মাথায় হাত বুলায়,
___”খুব শিগ্রই বৈধ ভাবে তোমায় ছোবো পাখি।ততদিন অপেক্ষা সইবে না?”

প্রিয়া লজ্জা পায়।চুপ করে থাকে।আকাশ মাথা ঝুকিয়ে তাকায় প্রিয়ার দিকে।
___”সইবে তো?”

সলজ্জ মাথা নাড়ে প্রিয়া।মুখ গুজে থাকে।আকাশের হাতের বাঁধন দৃঢ় হয়।
___”তোমার কাছে এলে আমি আমিতে থাকিনা।না চাইতেও অসম্মান করে ফেলি তোমাকে।যেটা আমি কিছুতেই চাইনা।কিন্তু একই ভুল আমার দ্বারা বারবার হয়।আমাকে বাঁধা দেবে কেমন?আমি তোমার ওপর নই,নিজের ওপর রাগ করি পাখি।”

___”আপনার ছোঁয়া আমি নিজেও চাই।হালাল করে চাই।”

___”বাড়ি যেতে হবে।পরিবার কে জানাবো।তুমিও জানাবে কেমন?”

___”হু।”

___”আমাকে এখন বের হতে হবে।”

প্রিয়া প্রায় আৎকে ওঠে।
___”এখন যাবেন মানে।কতরাত দেখেছেন?”

নিজেই সময় দেখে।রাত দেড়টা।
___”সকালে বের হন।আমি গেস্ট রুম রেডি করে দিচ্ছি।বিছানার চাদর পরিষ্কার একদম।আজ দুপুরেই পারা হয়েছে।”

___”সে বিছানায় আপনি থাকলে ভেবে দেখতে পারি। “

___”ইশশশ নির্লজ্জ। “

আকাশ হাসে এবার।দু হাতে চেপে ধরে প্রিয়া তুলতুলে গালটা।
___”দুজন মেয়ে বাড়িতে।আমি বাইরের পুরুষমানুষ। আশেপাশের মানুষের নজরে পরলে খারাপ বলবে।আমার বউ,বোনের দিকে কেউ আঙুল তুলুক এটা আমি সহ্য করবো।কেনো?তাছাড়া আপনার জন্য বাড়ি গেলাম না।ওদিকে আমার মাতৃদেবী রেগে বোম হয়ে আছে।তাকেও তো মানাতে হবে নাকি।”

___”তবুও এতো রাতে ড্রাইভ করবেন?”

___”ড্রাইভার আছে,মিলেমিশে চালাবো।সমস্যা হবে না।উঠি কেমন?”

প্রিয়াকে নিয়ে আকাশ উঠে দাড়ায়।বুকের ভিতরটা অস্থির লাগছে।ছেড়ে যেতে একবিন্দুও ইচ্ছে করছে না।প্রানভরে দেখে নিলো প্রেয়সীর মুখখানা।প্রিয়ার চোখে এরইমধ্যে পানি জমেছে।এক হাতে আকড়ে ধরে আছে আকাশের হাতখানা।
___”কবে ফিরবেন?”

___”দ্রুতই।”

___”আমার আপনাকে ছাড়া এক মূহুর্ত সহ্য হয়না।”

আকাশের হৃদয় থমকায়,শীতল স্রোত বয়।মেয়েটা কি সুন্দর অবলীলায় বলে দিলো কথাটা।অশান্ত হৃদয় টাকে থামতে বলে খুব করে।
___”খুব শীগ্রই আমার করে নিয়ে যাবো। কেমন?”

প্রিয়া জড়িয়ে ধরে আকাশকে।বেশখানিকটা সময় মুখ ডুবিয়ে থাকে আকাশের ঘাড়ে।পায়ে ভর দিয়েও অতদূর পৌছানো সম্ভব নয় প্রিয়ার।আকাশ কোমড় ধরে উঁচু করে আছে প্রিয়াকে।মেঝে থেকে বেশখানিকটা উঁচুতে শূন্যে ঝুলছে প্রিয়া পাজোড়া।
আকাশ আবার একদফা কপালে আদরের পরশ একে।বসলো গাড়িতে।প্রিয়া সদর দরজা ধরে দাড়িয়ে আছে।বারবার চোখজোড়া মুছতে ব্যাস্ত।

চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼🍂

[৪২০০+ শব্দ।লাইট ফেসবুক থেকে পড়া যায় কিনা জানা নেই।পড়ে ফেলবেন। সম্ভব হলে অরিজিনাল থেকে।
সামনের পর্ব থেকে অয়ন -শিয়ার বিষয়টা আসবে।তৈরি থাকুন।রোমান্সে ব্যাঘাত ঘটবে হয়তো সামনের কয়েকটা পর্ব।অনেকের মনমতো নাও হতে পারে🙂যাই হোক না কেনো গল্পে আশা করি ধৈর্য ধরে পড়বেন…]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here