#আকাশপ্রিয়া
#পর্ব ৩৭
#dure_dilshad_dua_দুর_এ_দিলশাদ্_দুআা
[🚫কপি করা নিষেধ, সম্পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক দের জন্য ]
রাতের দশটা বেজে পনেরো মিনিট এই মূহুর্তে। ঘরময় কঠোর নিরবতা বিরাজ করছে। রেনুকা রহমান একবার মেয়েদের দিকে আরেকবার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছেন।
তারা এসে পৌছেছেন আজ সকালে।মেয়েদের সাথে এতদিন পর দেখায় একপ্রকার আবেগের বহিঃপ্রকাশ এ কেটেছে গোটা দিন।এই মূহুর্তে রাতের ডিনার সেরে তারা বসেছে ড্রয়িং রুমে।যে কারণে এসেছে সে কথাটা বলার জন্য। তবে বেশ সময় নিচ্ছে আনিসুল সাহেব।অনেক অনেক অবান্তর গল্প করে যাচ্ছেন তিনি।প্রিয়া শিয়া এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করেছে।তারা মূলত বুঝতে পারছে না বাবা তাদের কি বলতে চাচ্ছে। আনিসুল সাহেব নানা গল্প গুজবের মধ্যে দিয়ে এবার আসল কথাটা পারলেন।শিয়ার দিকে তাকালেন।
___”আমার ওপর ভরসা আছে তো?”
আচমকা এহেন প্রশ্নে থমকায় শিয়া।তবে সামলে নিয়ে সাথে সাথে মাথা ঝাকায়
___”কেনো থাকবে না বাবা।অবশ্যই আছে।”
আনিসুল সাহেব প্রশান্তির হাসি হাসেন।রেনুকা রহমানের মুখটা এখনো চুপসে আছে।তিনি যেনো কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছেন।আনিসুল সাহেব এবারে গলা পরিষ্কার করে নিলেন খানিকটা।
___”বয়স হয়েছে মা আমাদের। দেশে থাকবনা আরও আড়াই বছর।আজকাল নিজের আয়ুকে ভরসা হয়না।আমি চলে গেলে তোমাদের দু বোনকে নিয়ে তোমার মা অথৈ সাগরে পরে যাবেন।আমাদের আর কেউ নেই এই আমরা ছাড়া। “
শিয়া, প্রিয়ার বুকটা ধকধক করে ওঠে বাবার কথায়।শিয়া ব্যাস্ত হয়ে বলে ওঠে,
___”এসব বলার মানে কি বাবা।ভালো লাগে না শুনতে।
আনিসুল সাহেবের মুখটা খানিক মলিন হয়।হেসে বলেন,
___”বাবা মা আমরা।তোমাদের নিয়ে আমাদের চিন্তা নিশ্চয় অবান্তর নয়?”
___”তা হবে কেনো!”
___”তাহলে আমার অনুরোধ রাখতে হবে তোমাকে। “
শিয়া বাবার হাত ধরে।
___”বলো কি করতে হবে।”
রেনুকা রহমান শ্বাস আটকে বসে আছেন।আনিসুল সাহেব বড় মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন।হাত বাড়িয়ে ছোট মেয়েকেও কাছে টেনে নিলেন।পরপর চুমু আঁকলেন দুজনের কপালে।
___”দু বোন একে অপরের ঢাল হবে কেমন?আমি থাকি বা না থাকি।মা কে দেখবে।আমরা জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও।আজীবন।”
রেনুকা রহমান থমকায় স্বামীর এহেন কথায়।চোখে জল জমে।শিয়া,প্রিয়া বাবাকে আকড়ে ধরে কেদে ফেলেছে ততক্ষণে। আনিসুল সাহেব শুকনো ঢোক গিলে মেয়েদের দিকে তাকালেন।
___”মনে থাকবে?”
দু বোন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।মনে থাকবে।
___”যাও ঘরে যাও।রাত হয়েছে।ক্লান্ত আমরাও।ঘুম দরকার।”
বাবা মা নিজেদের ঘরে গেলে দু বোন চলে আসে নিজেদের কামড়ায়।রেনুকা রহমান স্বামীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আছেন তখন থেকে।দরজা আটকে বিছানা তৈরি করতে করতে বললেন,
___”বিয়ের কথাটা বললে না কেনো?”
আনিসুল রহমান পায়ের পাঞ্জাবি খানা পাল্টে,সফেদ ফতুয়া গায়ে জড়ান।স্ত্রীর দিকে না তাকিয়েই জবাব দেন,
___”আগেই বলে ওকে নার্ভাস করতে চাইনা।কাল নিলয় দের বাড়িতে যাবো নিলয়ের মা আর দাদিকে দেখতে।তখন একেবারে যা হওয়ার…
রেনুকা রহমান বাধা দিলো স্বামীকে।
___”হুট করে জানিয়ে বেশি নার্ভাস করার থেকে আগে থেকে অন্তত একটু জানিয়ে রাখা ভালো নয় কি?”
___”আমার মেয়েরা আমার সিদ্ধান্ত হাসিমুখে মেনে নেবে।এতো ভেবোনা তুমি।”
রেনুকা রহমান চুপ করেন,তবে স্বামীর কথা মন থেকে মানতে পারেননা।মেয়েরা বড় হয়েছে।বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো মেনে নিলো সবটা।তারপর? তারপর কি?মেয়েদের এখন নিজেদের ব্যাক্তিগত পছন্দ থাকতেই পারে।বরং না থাকাটাই অস্বাভাবিক। থাকাটাও দোষের নয়।সুতরাং হুটহাট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মানেই হয়না।তবে স্বামী কে প্রেশার দিতে বড্ড ভয় পান তিনি।নিলয় ছেলেটাকে তারও পছন্দ নয়।কাল ওখানে আদোতে প্রিয়া,শিয়া যেতে চাইবে কি না এ নিয়েই তার ঘোর সন্দেহ আছে।আর তো বাকি রইলো বিয়ে।
____
আকাশ বাড়ি এসে পৌছেছে দুপুরের পর।বলা যেতে পারে ততক্ষণে বিকেলই হয়ে গেছে। অয়নের মতো তারও বেশ কসরত করতে হয়েছে মায়ের অভিমান ভাঙাতে।বাড়ির সকলে একসাথে ডিনার সেরে দু ভাই এসেছে মায়ের রুমে।বাড়ির কর্তারা ফিরবেন সামনে সপ্তাহে।আমেনা চৌধুরীর কোলে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো শুয়ে আছে দুই ছেলে।বাকি ছেলেমেয়ে গুলোও ছিলো এতক্ষণ। মাত্রই আকাশ ধমকি-ধামকি দিয়ে বের করেছে।যার যার ঘরে শুতে পাঠিয়েছে।মায়ের সাথে তাদের দু ভাই এর কি এক দরকারি কথা আছে।
আমেনা চৌধুরী হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তার ছেলেদুটোর মাথায়।অয়নই এবার আগে উঠে বসলো মায়ের মুখোমুখি, আকাশের দিকে এক পলক ফেলে মায়ের হাত টা টেনে নিজের হাতের মুঠোতে নিলো,নরম গলায় বললো,
___”মা আমি একটা মেয়ে কে ভালোবাসি।”
এমন কথা কল্পনাও করেননি তিনি।ছেলের কথায় চোয়াল ঝুলে পরলো তার।
___”মেয়ে টা খুব ভালো মা,খুব লক্ষী।”
আমেনা যেনো কিছু শুনতেই পারছে না কানে।অবিশ্বাস মাখা নয়নে তাকিয়ে আছে বড় ছেলের দিকে।আকাশের মাথায় রাখা তার অন্য হাতও থমকে আছে।আকাশ মিটিমিটি হেসে নিজের সোজা হয়ে বসে।অয়ন মায়ের অবাক হওয়ার কারণ টের পায়।এর আগে হাজার বার তাকে বিয়ের জন্য জোরাজোরি করা হয়েছে। রাগে বাড়িও ছেড়েছে দু এক বার।আর সেই ছেলে নিজে যদি আগ বাড়িয়ে বলে সে কথা।
___”কি বললি বাপ?”
অয়ন মনে মনে হাসে।একই গলায় বলে,
___”আমি বিয়ে করতে চাই মা।”
এবার যেনো চোখের জলের বাধ ভাঙলো আমেনা চৌধুরীর।ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার অয়নের মুখটা দু হাতের আজলায় নিলো।
___”সত্যি বাপ?তুই রাজি হ্যা?”
অয়ন মায়ের হাত দুটো আগলে নেয়।মৃদু হাসে।মাথা ঝাকায়।
___”মেয়েটা কে হ্যা?দেখা আমাকে।”
অয়ন খানিকটা সময় নেয়।
___”তার আগে আরেকটা কথা বলবো। শক্ত হবে কিন্তু। শকট হবে না?”
আমেনা চৌধুরী মাথা নাড়ে দুদিকে।এই মূহুর্তে অয়ন বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যে শক্ট টা দিলো তাকে, আর কোনো কিছুই এর থেকে বেশি অবাক করতে পারবে না।অয়ন ভাইকে পরখ করে বাঁকা গলায় বলে ফেললো,
___”তোমার ছোট ছেলেও বোধহয় বিয়ে করতে চায়।”
আকাশ, আমেনা দুজনেই হতভম্ব হয়ে গেলো।চোয়াল ঝুলে পরলো আমেনার।আকাশ বড় বড় চোখ করে তাকালো ভাইয়ের দিকে।সে বারবার বলে দিয়েছিলো তার বিষয়টা সে ধীরেসুস্থে জানাবে।অয়ন তখন মাথা ঝাকিয়ে সায় দিয়ে মায়ের সামনে এসে যে হাটে হাড়ি ভাঙবে তা সে কল্পনাও করেনি।আমেনা চৌধুরীর অবস্থাও দেখার মতো।এ জীবনে সে এতে চমকানো বোধহয় চমকায়নি।অয়নের বিষয় যেমন তেমন আকাশ!মাথা বনবন করে ঘুরছে তার।দু ছলের দিক কাতর দৃষ্টিতে তাকালো।
___”এতদিন তো রাজিই হচ্ছিলি না।কি এমন হলো যে একসাথে দু ভাই বিয়ের বায়না জুড়লি।বউমাদের দেখা।দেখি কোন জাদুতে আটকালি।”
আকাশ ভাইয়ের দিকে তপ্ত দৃষ্টি তাক করে নিজেই আগ বাড়িয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে।ভাইয়ের আগে নিজে বের করে প্রিয়ার ছবি বাড়িয়ে ধরে মায়ের দিকে।মা নিজের ছলছল চোখজোড়া মুছে কাঁপা হাতে ধরে ফোনটা।
___”এমন পরী কেথায় পেলি ছোট আব্বা।বল তো।”
দু ভাইয়ের মুখেই হাসি ফোটে।আকাশ ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে।
___”পছন্দ? “
আমেনা চৌধুরী শাড়ির আচলে চোখজেড়া মুছে ফোনের ওপর প্রিয়ার ছবিটাতে চুমু খায়।ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
___”হবে না?আমার ছেলেদের সুখ এরা।পছন্দ না হয়ে কোথায় যাবে।”
আকাশ ভাইকে ইশারা করে এবার,
___”তোমার বড়বৌমা কিন্তু এর আপন বড় বোন।”
আরেকদফা চমকানোর পালা আমেনার।
___”বলিস কি।কে আগে পেলো পরীর হদিশ হ্যা?”
আকাশ মাথা চুলকায়।ঘাড় তুলে ইশারা করে অয়নকে।
___”তোমার বড় ছেলে।আমার এসবে সময় কই বলো।”
শব্দ করে হেসে ফেলে আমেনা।গাল টিপে ধরে ছোট ছেলের।
___”সময় নেই তাই বুঝি কাল আসা হলো না হ্যা?”
___”ওই আরকি।তোমার বউমা একটু রেগে ছিলো আরকি।না বলে আসায়।”
___”মেয়েটা কে শাড়িতেও কেমন বাচ্চা বাচ্চা লাগছে।আঠারো হয়েছে তো বাপ?আবার বাল্যবিবাহের দায়ে জেল খাটবি না তো?”
মায়ের রসিকতায় হেসে ফেলে দুজনেই।মাথা নাড়ে আকাশ।
___”বাচ্চাই।আমাদের আরশির সমবয়সী আরকি।আঠারো পেরিয়েছে।”
___”শেষমেশ বোনের বয়সী এক মেয়ে মনে ধরলো হ্যা?বউমা আমার জাদুই জানে বল?”
আকাশ হাসে।ভাইয়ের দিকে তাকায়।
___”তুমি দেখাচ্ছো না কেনো।তোমার বউও একই রকম সুন্দর। হিংসে না করে দেখাও।একই রক্ত বলে কথা।দেখাও দেখাও।”
অয়ন একগাল হাসে ভাইয়ের কথায়। শিয়ার ছবিটা বাড়িয়ে দেয় মায়ের দিকে।আমেনা হাসিমুখে হাতে নেয় সে ছবি।তবে এবারে মুখে হাসি ফোটে না।তিনি ভয়ংকর ভাবে চমকায়,থমকায়।এক নিমিষে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যায় বদনখানা।কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে ওঠে,
___”এটা তো সেই মেয়ে।”
বলেই তাকালেন বড় ছেলের দিকে।অয়ন বুঝতে পারছে না তার মায়ের কথাটা।অপ্রস্তুত হাসি এখনো রয়েছে মুখে।হাসতে হাসেতই জিজ্ঞেস করলো,
___”কোন মেয়ে মা!কার কথা বলছো।”
___”ওর নাম ইনশিয়া না?”
আকাশ অয়নের চোখাচোখি হয়।তাদের মায়ের শিয়াকে চেনার কথা নয়।একদমই নয়।আজকেই প্রথম দেখালো শিয়াকে।অথচ তাদের মা কি সুন্দর শিয়াকে এক দেখাতেই নাম বলে দিলো।
আমেনা চৌধুরীর মুখ তখনও আরও বজ্রকঠিন হয়ে গেছে।ছেলের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
___”এই মেয়ে সে নয় যে তোমাকে ছয় বছর আগে ছেড়ে গিয়েছিলো? “
দু ভাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়।চমকে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে।আমেনা খানিক দম ফেলে।
____”সেই মেয়েকে আবার তোমার জীবনে এনেছো,আসতে দিয়েছো মানে কি?আমি এ মেয়েকে মানি না।অসম্ভব। বেইমান,চরিত্রহীনদের স্থান নেই চৌধুরী বাড়িতে।”
অয়ন ব্যাস্ত হয়।
___”মা তুমি যা জানো সম্পূর্ণ ভুল।আমাকে এক্সপ্লেইনেশান দিতে দাও।”
আমেনা চৌধুরী ততক্ষণে বিছানা থেকে উঠে দাড়িয়েছেন।অয়ন আকাশও তাই।
___”আমি যা জানার জানি সবই।আমি ছয় বছর আগে থেকেই জানতাম এ মেয়ের কুকীর্তি। তোমরা এদের ছলনা ভুলতে পারো।আমি নই।”
দুই ভাই স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকে।মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।তাদের কথা শোনার আগেই আমেনা চৌধুরীর শিয়ার প্রতি এরুপ বিরূপ ধারনার কারণ তারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না।এবার আকাশ মায়ের দিকে এগিয়ে যেতেই একই তপ্ত দৃষ্টি আমেনা তাক করলো।আকাশ কিছু বলার আগেই কঠিন গলায় তিনি বলে উঠলো,
___”ওই বেইমান,ছলনা করা পরিবার এ আমি কোনো ধরনের সম্বন্ধ করতে রাজি নই।”
আকাশ এক মূহুর্ত থমকালেও নিজেকে সামলে নেয় প্রায় সাথে সাথেই।অয়ন তখন হতভম্ব হয়ে পাথরের মতো দাড়িয়ে। মা কে শিয়া সম্পর্কে এহেন কথা কে বলতে পারে সেই হিসেব মেলাতেই সে ব্যাস্ত।আকাশ বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করলো।একই গম্ভীর গলায় বললো,
___”আমি প্রিয়াকে ভালোবাসি।পাগলের মতো ভালোবাসি মা।ভাই ও তাই।শিয়া ছাড়া ভাইয়েরও সম্ভব নয় কাউকে বিয়ে বা পছন্দ করা।উই আর সরি।”
এবার অয়নও এগিয়ে এলো মায়ের দিকে।
___”মা তোমাকে কে বা কারা কখন,কবে এসব বলেছে জানিনা।তবে শুনে রাখো সে সত্যি বলেনি।শিয়া ছেড়ে গেছিলো তবে সেটা বেইমানি করে নয়।আর চরিত্রহীন!হাহ্ সেটা আমার শিয়া?”
আমেনা চৌধুরী হাত তুলে থামতে বলেন ছেলেকে।
___”আমার শেষ কথা আমি বলে দিয়েছি তোমাদের। আমি আর একটা কথাও শুনতে চাইনা বিষয়ে।তোমাদের অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।এটা আমার শেষ কথা।”
___”মা…”
___”আকাশ আমাকে বলতে দাও।নাকি এখন মায়ের কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করো না।”
আকাশ ভ্রু কুচকে চুপ করে।অনিচ্ছায় মায়ের কথায় মন দেয়।
___”ওই মেয়ের থেকে সৌমি শতগুনে ভালো।তোমার ক্ষেত্রেও তাই আকাশ।অপুর সাথে বড় ভাই তোমার বিয়ের কথা বলছিলেন।আমি এতদিন মানা করলেও আজ আমার আর আপত্তি নেই।আশা করি তোমারও থাকবেনা।”
তিনি আবার ফেরেন অয়নের দিকে।
___”তোমাদের বাবার তোমার জন্য সৌমিকে পছন্দ। আমার কিছু বলার নেই।”
___”অসম্ভব মা।শিয়া ছাড়া একজীবনে আমি আর কোনো নারীকে মনে জায়গা দিতে পারবনা।কার শোনা কথায় কান দিয়ে তুমি তোমার ছেলেদের ভরসা করতে পারছো না।”
___”আমার মরা মুখ দেখতে না চাইলে আমার কথা মানতে হবে তোমাদের দু ভাইকে।তবে সেটা চাইলে আলাদা কথা।যেতেই পারো মেয়েদুটোর কাছে।আমি ধরে রাখবো না।”
দু ভাই বাকরুদ্ধ হয়।মায়ের এহেন কঠিন রুপ তাদের সামনে আজ প্রথম।আমেনা চৌধুরী ছেলেদের বেড়িয়ে যেতে বলেন নিজের রুম থেকে।অয়ন আকাশ একপ্রকার বাকহারা হয়ে বেড়িয়ে আসে মায়ের ঘর থেকে।ছোট বাচ্চারা আবদার করার পর মা সেটা না মানলে যেমন হয় আজ তাদের অনেকটা তেমন অবস্থা।দুজনের মুখই একদম কঠিন।আকাশের মুখ রাগে লাল হয়ে আছে।দু ভাই এসে দাড়ায় ছাদে।খোলা আকাশের নিচে শীতল বাতাস।তবে ঠান্ডা লাগার মতো নয়।জোৎস্না রাত।আকাশের বেশ তাঁরা লুকোচুরি খেলছে।আকাশ এই প্রথম ভাইয়ের সামনে সিগারেট ধরায়।না তাকিয়েই একটা বাড়িয়ে ধরে ভাইয়ের দিিকে।অয়ন বিনা বাক্যে হাতে নেয় সেটা।অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
___”মায়ের এমন করার কারণ?”
___”বুঝতে পারছি না।”
___”সরি ভাই।”
___”তুমি সরি বলছো কেনো?”
___”প্রিয়া শিয়ার বোন এটা না বললে অন্তত তোদের নিয়ে মায়ের সমস্যা থাকতো না।
আকাশ মৃদু হাসে সিগারেট এর ধোয়া ওরায় ওপর দিকে।রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়ায়।ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
___”এটা লুকানোর বিষয়?আগে পরে জানতোই।আমার টা আপাতত সলভ না হলেও হবে।তোমার টা সলভ বেশি জরুরি…”
অয়ন সিগারেট ফুঁকছে। বুকটা জ্বলছে কেমন একটা।শিয়া শুনলে খুব কষ্ট পাবে বোধহয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের তারাদের দিকে তাকায় সে।নিজের পরিবার কে খুব ইজিলি মানিয়ে নিতে পারবে বলে আশা ছিলো তার।ঘটলে উল্টো।শিয়ার পরিবার তো দূরেই রইলো।অশান্তি লাগছে খুব।তাদের মা মোটেই বোকা নয়।উচ্চ শিক্ষিত।সুতরাং মা যার কথায় প্ররোচিত হয়েছে সে যে যথেষ্ট চালাক তা বুঝতে বাকি রইলো না তাদের।ফোন বের করে।শিয়ার বেশ কয়েকটা কল।কেনো জেনো রিপ্লাই করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।মা কে পাগলের মতো ভালোবাসে তারা।মার ধারনা ভুল প্রমান না করে শিয়া কে বিয়ে করতে পারবে না সে।আবার মা না মানলে তারপরও শিয়াকে ছাড়তে পারবে না সে।অসম্ভব। আড়চোখে কপালে ভাজ ফেলে শূন্যে তাকিয়ে সিগারেটে টান দেওয়া ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায় সে।আকাশও একই বিষয় ভাবছে নিশ্চয়।
_____
শুনশান কটেজে শোনা যাচ্ছে শুধুমাত্র ঘড়ির টিকটিক শব্দ।এরই মধ্যে বেপরোয়া ভঙ্গিতে দরজা খুলে ঢুলতে ঢুলতে ভিতরে ঢুকলো রিয়ান।রাতুল ঘরেই ছিলো।রাকিব,রেদোয়ান ও যারযার ঘরেই।আচমকা এমন সময়ে সদর দরজায় এমন জোরসে শব্দ হওয়ায় তিনজনই হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে।রিয়ান এলোমেলো পদচারণে ওপরের দিকেই আসছে।রাকিব সর্বপ্রথম মুখ খোলে।
___”হারামজাদা ড্রিংক করে এসেছে।”
রেদোয়ান মাথা ঝকায়।রাতুল নিশ্চুপ। আজকাল রিয়ান সম্পর্কে মন্তব্যে তার রুচিতে বাধে।এতদিন বন্ধু হিসেবে সব মানিয়ে নিয়েছে।ইভেন মনেও করেনি ওর বাজে স্বভাব গুলো।তবে আজকাল খুব নজরে লাগে।
রিয়ান মাথা তুলে সিঁড়ির মাথায় ওর দিকে তাকিয়ে থাকা তিনজোড়া বাকা চোখের দিকে তাকালো।বাজেভাবে হাসলো দাত বের করে।চূড়ান্ত মাতাল বুঝতে বাকি রইলো না করোর।রাকিব এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতে চাইলেও ঝটকা দিয়ে সরিয়ে ফেললো।তাকে পাশ কাটিয়ে সিড়ির মাথায় দাড়িয়ে থাকা রাতুলের মুখোমুখি হলো।ভকভক করে গন্ধ আসছে মুখ থেকে।বাকিরা যেমন তেমন,ড্রিংক করা পাবলিক রাতুল একদম নয়।তার এই মূহুর্তে অসহ্যই লাগলো সে হিসেবে।বিরক্তি নিয়ে পিছিয়ে দাড়ালে রিয়ান আবার হাসলো।সাথে সাথে রাতুলের টি শার্টের কলার চেপে ধরলো দু হাতে।
___”আমি বাজে? আমি খারাপ একা?হু?একা আমি?তোরা সবকটা স্বার্থপর সব কটা।”
রাকিব,রেদোয়ান ভ্রু কুচকে তাকানো।রাতুল ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো রিয়ান কে।
___”ঘরে যা।মাঝরাতে এসে মাতলামি করছিস।মেয়েগুলো থাকলে কি ভাবতো?ভাগ্যিস নেই।”
রিয়ান শব্দ করে হাসে।কয়েকপা পিছিয়ে দেয়ালে ভর দেয়।তিনজনের দিকে নিভু নিভু চোখে তাকায়।আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গি করে।
___”মেয়েগুলো বলবি না?প্রিয়া।প্রিয়া বলবি।নাহ।তাও বলবি না।ওর নাম শুধু আমি নেবো।আমি।ও আমার।শুধু আমার।”
রাকিব,রেদোয়ান পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।বড় বড় চোখে তাকায় রিয়ানের দিকে।
___”আমার ও। ওকে?শুনলি?বুঝলি।হ্যা?আকাশের না।ঠিকাছে?ও রিয়ানের।প্রিয়া শুধু রিয়ানের।আমি আজই শেষ।আজই শেষ অন্য মেয়েকে ছুঁয়ে এলাম।আর ছোঁবো না।এইতো গিয়ে শাওয়ার নেবো।হট শাওয়ার।তারপর থেকে প্রিয়াকে ছোঁবো আমি।আর কোনো অন্য নারীর সাথে বিছানায় যাবো না।কখনো না।”
রিয়ান কোনোমতে দাড়িয়ে আছে।পড়ে যাবে যাবে ভাব।অন্য সময় হলে ছুটে গিয়ে ধরতে চাইতো রিয়া,রেদোয়ান। এখন ধরছে না।আদোতে তারা মূর্তিবনে গিয়েছে। রিয়ানের মুখে এহেন কথা শুনে বাকহারা তারা।রাকিব একপ্রকার উড়ে গিয়ে সামনে দাড়ালো রিয়ানের।দু গাল ধরে ঝাকালো।
___”রিয়ান?কাম অন বাডি।হুশে আয়।কি যা তা বকছিস!”
রিয়ান সরিয়ে দেয় রাকিবকে।তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে রাতুলের দিকে।রাতুল চুপচাপ গম্ভীর মুখে দাড়ানো।
___”তুই শালা মহা বেইবান।ওই আকাশের দালালী করস।বলেছি না প্রিয়া আমার।তোর মানতে সমস্যা কোথায়।প্রিয়া মানলেই হলো।”
রাতুল বিরক্ত মুখে তাকিয়ে রয়।রেদোয়ান এসে কাঁধ ঝাকায় রাতুলের।
___”ও কি যা তা বকছে বলতো।মাতাল হয়ে প্রিয়ার নাম নিচ্ছে কেনো।”
রাতুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।ধীর গলায় বলে,
___”ডাফার টা নাকি প্রিয়াকে পছন্দ করে।”
আকাশ থেকে পরে রাকিব,রেদোয়ান। তারা এসব আন্দাজও করতে পারেনি।রিয়ান আঙুল নাড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ করতে ব্যাস্ত।
___”কিসের পছন্দ হ্যা?কিসের পছন্দ।?আমি বলেছি না তোকে?অ্যাম ইন লাভ উইট হার।”
___”ঘরে যা।ঠান্ডা পানির নিচে সারারাত বসে হুশে ফের যা।”
রিয়ান আচমকা সজোরে ঘুষি বসায় রাতুলের নাকে।ছিটকে পরে যায় রাতুল।গলগলিয়ে রক্ত বেড়িয়ে আসে।ঠোঁট কেটে গেছে।আতঙ্কিত রাকিব দৌড়ে ঠেকায় রিয়ানকে।রেদোয়ান ছোটে রাতুল এর কাছে।রাতুল তবুও নির্বিকার। রয়েসয়ে উঠে দাড়ায়।সজোরে থাপ্পড় মারে রিয়ান এর গালে।দুজন একে একে তেড়ে আসে একেঅপরের দিকে।রাকিব রেদোয়ানের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে পরছে প্রায় দুজনকে আটকে রাখা।কোনোমতে রাকিব রিয়ানকে ঘরে নিয়ে এলো।রাতুল তখনও তপ্ত চোখে সেদিকে তাকিয়ে।
___”দেখি ঘরে চল।ঠোঁট টা তো কেটে গেছে।আয়।”
রাতুল জবাব দেয় না।হম্বিতম্বি করে ঢোকে নিজের ঘরে।রেদোয়ান বন্ধুর পাশে বসা।রক্ত পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে।আধঘন্টার মধ্যে ঘরে ঢিকলো রাকিব।মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। রেদোয়ান চোখের ইশারা করতেই চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,
___”লেবু পানি খায়িয়ে ঘুমের ওষুধ দিয়ে এসেছি।ঘুমুচ্ছে।”
রাতুলের দিকে ফিরলো এবারে দুজন।
___”কি হলো এটা বলতো
“
রাতুল ঠোঁট উল্টায়।ট্যিসু দিয়ে ঠোঁটের আশপাশ টা মুছতে মুছতে বলে,
___”সাচ আ ব্লাডি।”
রাকিব,রেদোয়ান এর আগে কক্ষনো কল্পনাতেও রাতুল কে এতেটা রাগতে দেখেনি।গায়ে হাত তোলা তো অনেক দূরের বিষয়আশয়। তবে আজ চূড়ান্ত রাগী রাতুলকে দেখলো তারা।ভয়ংকর রুপ।রাকিব,রেদোয়ান চূড়ান্ত অবাক হয়েছে যাকে বলে আরকি।
___”রিয়ান প্রিয়াকে…
রাকিবের কথায় মাথা ঝাকায় রাতুল।
___”বলে তো ভালোবাসে।এটা ভালোবাসা।আজও অন্য মেয়ের সাথে বেডশেয়ার করে এসেছে…”
রেদোয়ান বাঁকা হাসে।
___”রিয়ান আর ভালোবাসা কাম অন গায়েজ।”
___”আমিও সেটাই জানি।তবে এমন পাগলামি শুরু করেছে ও।ভাবতে পারিস আকাশের কানে কথাটা গেলে কি হবে?এতদিন জাস্ট আমি জানতাম।আজ তোদের সামনে মাতলামি করে সব বলে দিলো।কাল আকাশের সামনে। পরশু যে সে তার স্বভাব বশত প্রিয়াকে অসম্মান করবে না তার কি গ্যারান্টি?”
রাকিব,রেদোয়ান মাথা ঝাকায় দুজনেই।রাতুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথায় হেলায় বিছামার হেডবোর্ডে।
___”আমি ভালো খারাপ যেমন হোক। রিয়ানকে আমার বন্ধু ভাবি।তবে আকাশের কোনো ক্ষতি করলে আমি ছাড়বো না ওকে।অসম্ভব। “
রাকিব বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকে।সে জানে রাতুল কি পরিমাণ কৃতজ্ঞ আকাশের প্রতি।তারাও তাই।সবারই কমবেশি উত্থান পতন গিয়েছে গোটা জীবনে।সব সময় ঢাল হয়ে পাশে থেকে আকাশ।রাতুলের ক্ষেত্রে সেটা একটু বেশিই।তবে তারাও কম কৃতজ্ঞ নয় আকাশের প্রতি।প্রতিদান এ জীবন দিতে প্রস্তুত।
___”কবে থেকে জানতিস?”
___”কক্সবাজার ট্যুরের আগের রাতে।যেদিন রাকা রা আসলো।আকাশকে স্বীকার করালাম ও প্রিয়াকে ভালোবাসে।”
ধীরস্থির হয়ে সব কথা এক এক করে খুলে বলে রাতুল।রাকিব,রেদোয়ান দুজনেরই মুখ কঠিন হয়।
রাকিব গম্ভীর গলায় বলে,
___”রিয়ান খুন হতে চায়।আকাশ জানলে মেরে ফেলবে।ফ্রেন্ডশিপ টা ইতিমধ্যে খতম হয়েই গেছে।”
রাকিবের কথা য় মাথা ঝাকিয়ে একমত জানায় রাতুল,রেদোয়ান।
___”আমি সে কারণেই চেয়েছি যত কম মানুষ জানে বিষয়টা আর রিয়ান ভুলে যাক প্রিয়াকে।কিন্তু রিয়ান সেটা মানতে নারাজ।”
রেদোয়ান হেলান দিয়ে বসে।
___”ও প্রিয়াকে যতটা না ভালোবাসে।তার থেকে হাজারগুন জেদ ওর আকাশকে হারানোর।”
রাতুল মুখ ডলে নিজের।সেটা তারা সবাই জানে।খুব ভালো করেই জানে।বরাবরই চরম হিংসে মনোভাব রিয়ান পোষন করতো আকাশের প্রতি।মাঝখানের বেশ কয়েকবছর সেটা প্রকাশ না পেলেও প্রিয়ার বিষয়টার পর থেকে পায়।এখন তো রাকিব,রেদোয়ান ও জানলো।আকাশের সামনে রিয়ানের এহেন সিনক্রিয়েট করতে আর কতদিন!আজই কেলেংকারী ঘটতো।ভাগ্যিস কেউ নেই ওরা।থাকলে আজ ঝড় কিভাবে সামলাতো ওরা!মাথা ভনভন করে ওঠে তিনজনেরই।
___”সৌমি সেদিন শিয়া আর প্রিয়া কে দেখে কি কাহিনি করলো দেখলি?”
___”ওর কথা বলিস না প্লিজ।ওটা নারী?ছিহ্।কোন পুরুষ মানুষ ওসব মেয়ে ছোয় বলতো।”
রাকিব হেসে ফেলে।
___”রিয়ান।”
রাতুল মাথা নাড়ে হতাশায়।
___”তো বিয়ে করুক সৌমিকে।সংসার করুক।এখানে আকাশ প্রিয়ার মাঝে ওর কাজ কি!”
রেদোয়ান ভাবুক চোখে বন্ধুদের দেখে।একই গলায় বলে,
___”সৌমি চায় টা কাকে বলতো?অয়ন ভাই?নাকি আকাশ?”
রাতুল হাতের ফেনটা চার্জে লাগায় কাত হয়ে।বাঁকা গলায় বলে,
___”ওর বাপ চায় অয়ন ভাইকে।যেহেতু অয়ন ভাই বড় ছেলে।বাট আই থিং সি লাইকস আকাশ।”
শব্দ করে হেসে ফেলে তিনজন।ভয়াবহ ব্যাপার স্যাপার।
____
সকাল সকাল বহুদিন পর মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে প্রিয়ার।আগে হলে বিরক্ত হতো।ঘ্যানঘ্যান করতো ডেকে তোলার জন্য। একদফা চিৎকার চেচামেচি চলতো বাড়িজুড়ে।আনিসুল সাহেব চাপা কন্ঠে স্ত্রী কে ধমক দিতেন মেয়েদের এভাবে বকাবকি করে ডেকে তোলার অপরাধে।রেনুকা রহমান অবশ্য স্বামীর সে কথায় মোটেই কান দিতেন না।বরং আরও দ্বিগুণ জোরে মেয়েদের ডাকাডাকি করতেন।আজ তা হলো না।বরং দু ডাকেই লাফিয়ে উঠলো প্রিয়া।পাশে বিছানা খালি।শিয়া আগেই উঠে গেছে।এলোমেলো চুলগুলো খোপা করে সময় দেখলো।সাড়ে আটটা।দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।তার ধারনা ছিলো ভোর সম্ভবত এখন।ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসতেই সেই চিরচেনা সকাল। মা রান্নাঘরে ব্যাস্ত।বাবা সোফায় সংবাদপত্র পড়ছেন।শিয়া হাতে হাতে সাহায্য করছে মাকে।প্রিয়া মিষ্টি হাসলে।কি যে সুন্দর মূহুর্ত।সিড়ি মাথায় দাড়িয়ে ক্যাপচার করে নিলো ফোনে সে সুন্দর মূহুর্তটা।ধীরেসুস্থে নেমে এলো নিচে।বাবা কে ঘেষে বসলো।
আনিসুল সাহেব মেয়েকে আগলে নিলেন।
___”ঘুম ভাঙলো আমার ছোট রাজকন্যার।”
মাথা থাকায় প্রিয়া।বাবার কাছ থেকে উঠে এগয়ে যায় মায়ের কাছে। কি রান্না হচ্ছে দেখতে।পরোটা করা হচ্ছে। সাথে বুটের ডালের হালুয়া,খাসির মাংস।প্রানভরে শ্বাস টেনে নেয় সে।কতোদিন পর মায়ের হাতের রান্না খাবে।ভাবা যায়।ভেবেই প্রশান্তি কাজ করছে তার।কড়াই থেকে একপিস মাংস হাতে তুলে মুখে পুরতে পুরতে ছুটে এসে বসে বাবার পাশে।
___”আজ দুপুরে দাওয়াত আছে একটা।”
প্রিয়া ভ্রু তোলে।
___”কোথায়?”
আনিসুল সাহেব ঘাড় বাকিয়ে পরখ করে স্ত্রী আর বড় মেয়েকে। মৃদু হেসে বলে,
___”তোমাদের আজগর আংকেল এর বাসায়।”
ওই নামটা শুনেই মুখ চুপসে যায় প্রিয়ার।বড় বড় চোখে তাকায় একবার মা আর বোনের দিকে।শিয়া মাথা নেড়ে আশস্ত করে বোনকে। প্রিয়া আবার বাবার দিকে তাকাতেই আনিসুল সাহেব হাতের পেপার টা রেখে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলেন,
___”আজগরের স্ত্রীর ক্যান্সার।শুনেছিলে নিশ্চয়? ওর মায়েরও বয়স একশর কাছাকাছি। যখন তখন…যাই হোক।আমার কাছের মানুষ আজগর।দেখে আসাটা দায়িত্ব নয়?”
প্রিয়া নিজের হতবিহ্বলতা কাটিয়ে সজোরে মাথা ঝাকায়।
___”অবশ্যই বাবা।অসুস্থ মানুষ। তাছাড়া আজগর আংকেল তোমার একমাত্র বন্ধু। বন্ধুর বিপদে বন্ধু পাশে থাকবে না!অবশ্যই যাবো আমরা।”
আনিসুল সাহেব সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে। বড় মেয়েও ঠিক একই ভাবে সম্মতি দিয়েছিলো।
___”কখন বেরোবো বাবা?”
ঘড়ি দেখলেন আনিসুল সাহেব। গম্ভীর গলায় বললেন,
___”দুপুরের লাঞ্চ ওখানে গিয়ে করবো।সুতারং বারোটার দিকে তৈরি হয়ে থেকো।”
প্রিয়া মাথা নেড়ে এগিয়ে যায় মা বোনকে সাহায্য করতে।
____
চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং এ কঠিন নিরবতা।এমনিতেও এমনই থাকে রোজ।খাবার টেবিলে কথা বলা এ বাড়ির কর্তারা একদম পছন্দ করেননা।তবে আজকের চিত্র অন্য রকম। স্পষ্ট অন্য কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
অয়ন,আকাশ খাবার টেবিলে একটা কথাও বলছে না।তাদের মুখ দেখে বাকি ভাইবোন গুলো কিছু বলেও সাহস পাচ্ছে না।তার থেকেও বড় কথা তাদের বড় মা আজ অস্বাভাবিক ঠান্ডা মেজাজে আছেন।আরাফ মাথা ঝুকিয়ে মুখ আনে আরশির কানের কাছে।ফিসফিসিয়ে বলে,
___”কি হয়েছে রে।”
আরশি ঠোঁট উল্টায়।মাথা নাড়ে দুদিকে।সে জানবে কি করে।একই ভাবে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই মাথা নাড়লো এনি,এরিন, আয়াত সকলেই।আরাফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাবারে মন দিতে চেষ্টা করে।কারোরই জানার কথা নয়।
অয়ন খাবার আধাআধি শেষ করে উঠে পরে।আমেনা চৌধুরী বিরক্ত মুখে দেখে ছেলের কান্ড।তবে কিছু বলেন না।আকাশ নিজেও বলছে না কিছু।অয়ন আকাশের দিকে ফিরলো,
___”খেয়ে হোটেল প্রজেক্ট টা দিস আমাকে। কমপ্লিট হয়েছে কি?”
আকাশ মাথা নাড়ে।
___”হয়েছে।রাতুল করে দিয়েছে।”
___”গুড ওটা নিয়ে আয় রুমে।”
অয়ন হাঁটা ধরতেই কানে ভেসে আসে আমেনা চৌধুরীর গমগমে কন্ঠস্বর।
___”সৌমির বাবা মা আসছে কালকে।তোমার বাবা চাচারাও ফিরছেন আজকে।।”
অয়ন থমকায়।মায়ের দিকে কঠিন চোখে তাকায়।
___”আমি না করেছিলাম তোমাকে।”
___”তোমার অনুমতির দরকার নিশ্চয় আমার নেই।বাড়িতে থাকবে কালকে দু ভাই।মাথায় থাকে যেনো।”
অয়ন অগ্নিমুখে গটগট করে ওপরে চলে যায়।শিয়ার ফোন ধরছে না কাল থেকে।অস্বস্তি হচ্ছে তার।তার মা কি না তার শিয়াকে ভুল বোঝে।নিজের অপরাধবোধ কাজ করছে তার।
আকাশ নিজের খাবার খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকয়।
___”আমাদের ওপর জোরজবরদস্তি চলে মা?”
আমেনা চৌধুরী যেনো বুঝতে পারেনা হঠাৎ আকাশের বলা কথা।চুপ করেই থাকেন কঠিন চোখেমুখে। আকাশ নিজের বাকি খাবার শেষ না করে পানি ঢালে সেথায়।অস্বাভাবিক কঠিন গলায় বলে,
___”শুধুমাত্র তুমি বলে এই জোর টা করতে পারছো
না হলে আকাশ এহনাজ চৌধুরী অথবা অয়ন মেহনাজ চৌধুরি এ দুনিয়ার আর কারোর কসম টসমের ধার ধারে না মা।এটা কিন্তু জানো তুমি।আর জানো বলেই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল টা করছো।”
___”তোমাদের ভালোর জন্য… “
___”আমরা তোমার কোলের ছোট বাচ্চা নই মা।ত্রিশ পেরিয়েছে ভাইয়ের আর তিন বছর আগে।আমার ত্রিশ ছুইছুই।এমন দুটো ছেলেকে নিজের কসম দিয়ে জোর করা অন্যায় বলে মনে করো না তুমি?”
আমেনা চৌধুরীর চোখ ছলছল করে ওঠে ছেলের এমন কঠিন কথায়।
___”কাঁদবে না মা প্লিজ।কাঁদতে আমাদের ইচ্ছে হচ্ছে। পারছি না।পুরুষ মানুষের কাঁদতে হয়না বিধায়।এটা তোমাদেরই শেখানো।ভাইয়ার অবস্থা কল্পনা করতে পারছো তুমি?পারছো না।অথচ সবথেকে বেশি ভাইয়াকে বোঝার কথা ছিলো তোমার।আমাদের থেকেও তুমি ভরসা বেশি করছো কোনো এক অজানা বাইরের মানুষকে।আমাদের দু ভাইয়ের সামান্য কথা শোনার ধৈর্যও তোমার নেই মা??অথচ এ পৃথিবীতে আমাদের দু ভাইয়েরই সবথেকে কাছের মানুষ তুমি,বেস্ট ফ্রেন্ড তুমি।এক নিমিষে সেটা এলোমেলো করে দিচ্ছো অযৌক্তিক ইমোশনে বেধে!”
___”তোদের ভালো চাওয়া টা অন্যায় আমার?”
___”মোটেই নয়।আমাদের ভালো গোটা পৃথিবীতে তোমার থেকে বেশি কেউ চায়না।তবে তুমি যেটাকে ভালো চাওয়া বলছে সেটা ভালো চাওয়া নয় আমাদের জন্য। “
___”যখন বললি তোরা বিয়ে করতে চাস,মেয়ে পছন্দ।না করেছি আমি?রাজি হইনি?কিন্তু পরে দেখার পর শুধু বলছি ওই মেয়েদুটো নয়।রুপের ছলনায় ভুললে চলে?
___”সেটাই তো সমস্যা মা।ভাইয়া বা আমি গোটা পৃথিবীতে তোমার পরে যদি কেনো নারীর দিকে তাকাই সেটা ওরা দু বোন মা।এ জীবনে আর কোনো মেয়ের দিকে দৃষ্টি দেইনি।দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনা।”
___”ওই মেয়েদুটো বাদে যাকে বলবি…”
___”মা…ওই মেয়েদুটোকে নিয়ে তোমার যে সমস্যা কেনো ক্লিয়ার করতে দিচ্ছো না আমাদের। তোমার ভুল ধারনা সবটা।”
আমেনা চৌধুরী এতক্ষণে শাড়ির আচলে মুখ চেপে কেঁদে ফেললো শব্দ করে।ছেলের কঠিন কথায় নাকি রাতে অয়নের কথা শুনলো না কেনো সে কারণে বোঝা যাচ্ছে না।আকাশ কপাল কুচকে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে ধাতস্থ করে নিজেকে।নিয়ন্ত্রণ করে সম্ভবত।শব্দ করে চেয়ার ঠেলে উঠে যায়।
___”কেঁদো না মা।আমাদের আর নিচে নামিয়ো না।শেষমেশ আমাদের জন্য তোমার চোখে পানি।এ দৃশ্য কল্পনা করলেও শরীর কাঁপছে। তোমার চিন্তা ধারনা নিয়েই থাকো।জেদ নিয়েই থাকো।”
আকাশ চলে যায় নিজের রুমে।খাবার টেবিলে কেউ খাচ্ছে না।খানিকদূরে বাকি দুই জা ছলছল চোখে তাকানো।আরাফ,আরশিদের অবস্থা একই।এমন যুদ্ধ এ জীবনে তারা দেখেনি বোধহয়। বাড়ির কর্তাদের সাথে ছেলেদের টুকটাক ঝামেলা দেখে তার বেশ অভ্যস্ত।তবে তাদের বড় মায়ের সাথে! অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার।
_____
শহরের সবুজেঘেরা আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে একমনে চলছে গাড়ি।ড্রাইভিং করছে সয়ং আনিসুল রহমান। পাশে স্ত্রী বসা দু মেয়ে পিছনে।প্রিয়া শিয়া যতটা আমোদে থাকার কথা তার মোটেও তা নেই।তার ঘোরতর কারণ আছে বইকি।যেখানে যাচ্ছে সেখানে তারা মোটেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করেনা।তার কারণ অবশ্য নিলয় নামের লোকটি।বয়সে শিয়ার থেকে এক দু বছরের বড়।সুদর্শন পুরুষ।বাবার বন্ধু আজগর আংকেল এর একমাত্র ছেলে।বড়লোকদের একমাত্র ছেলে থাকলে যা হয় আরকি।বখে যাওয়া যাকে বলে।তার সাথে আজগর সাহেব প্রানপন চেষ্টা করেন শিয়ার বিয়ে দিতে।শিয়ার বাবাও মুখে না বলতে পারেননা একমাত্র বন্ধু কে।এ শহরে আসার পর বিপদে আপদে তাকেই সর্বোক্ষন পাশে পেয়েছে যে।তাছাড়া বছর ছয়েক আগে প্রিয়া,শিয়া যখন রাস্তা বাজে ছেলেদের হাতে অসম্মানিত হচ্ছিলো তখনও আজগর আংকেল এর সাহায্যেই বাচাতে পারে মেয়েদুটোকে।ভিতরের ঘটনা বেশ ভিন্ন হলেও আনিসুল সাহেব ওই অবধিই জানেন।
স্থানীয় এক মার্কেটের দিকে গাড়ি থামিয়ে ফল,মিষ্টি কিনে নিলেন আনিসুল রহমান। তারা পৌছুলো তখন প্রায় দেড়টা বাজে।বাড়িতে ঢুকেই চোখ ধাঁধিয়ে গেলো প্রিয়া, শিয়ার।আজই প্রথম এলো তারা এ বাড়িতে।এর আগে আজগর আংকেল তার পরিবার নিয়ে প্রিয়াদের ছোট্ট বাড়িতে বেশ কয়েকবার আসলেও তারা আসেনি একবারও।আনিসুল সাহেব অবশ্য স্ত্রী কে নিয়ে এসেছেন দু একবার।বাড়ির ভিতরটা আলিশান।তবে তার থেকে বড় কথা কেমন একটা সাজানো। মোটেই মনে হচ্ছে না এ বাড়িতে দু দুটো রুগী আছে এবং তারা সেই রুগী দেখতে এসেছেন। বাড়ির ভিতরের সাজসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে বড়সড় কোনো অনুষ্ঠান আছে,কেমন বিয়েবাড়ি টাইপের সাজসজ্জা আরকি।
প্রিয়া বোনের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে,
___”বড়লোকদের কি মরা বাড়িও এমন বিয়ে বাড়ির মতো লাগে আপু?”
শিয়া চোঙ রাঙায় বোনকে।
___”কি সব বাজে কথা বলছিস।”
প্রিয়া ঠোঁটে ঠোঁট টিপে বলে,
___”বাজে কথা কই!এ বাড়ি দেখে কেউ বলবে এ বাড়ির দু দুটো ইম্পরট্যান্ট মানুষ মৃত্যুপথযাত্রী।”
___”না বললো।চুপ কর তুই।”
বাড়ির ভিতর ঢুকতে না ঢুকতেই সিড়ি দিয়ে হৈ হল্লা করে নেমে আসতে দেখা গেলো আজগর সাহেব কে।বন্ধু কে এতদিন পর দেখে যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে।পারছে না শুধু উড়ে এসে জড়িয়ে ধরতে।লোকটার এহেন ছেলেমানুষি আহ্লাদ দেখে ফিক করে হেসে ফেলে প্রিয়া।শিয়া চোখ রাঙিয়ে বোনকে চাপা ধমক দেয়।
আজগর সাহেব ততক্ষণে নেমে এসেছে।জড়িয়ে নিয়েছে বন্ধু কে বুকে।নিচতলার একটা রুম থেকে আজগর সাহেবের ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রী কে হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে আসতে দেখা গেলো এক হেল্পিংহ্যান্ডকে।তার মুখও বেশ হাস্যজ্বল। মোটেই রুগী রুগী ভাব নেই।
উনি এসেই কুশল বিনিময় করে সবার আগে এগিয়ে এলো শিয়ার দিকে।শিয়া প্রিয়া দুজনেই বিনয়ের সাথে সালাম জানালো।বসলো সোফাতে। মহিলা বেশ সময় নিয়ে পরখ করলো শিয়াকে। তারপর আচমকা আনিসুল সাহেব এর দিকে ফিরে কেমন একটা গমগমে গলায় বলে উঠলো,
___”এর সাথে আমার ছেলের আজ বিয়ে বুঝি?”
শিয়া প্রিয়া কয়েক মূহুর্ত হতভম্ব হয়ে গেলো।একে অপরের হাত খামচে ধরলো প্রায়।মহিলার মুখটা আবার ঘুরলো প্রিয়ার দিকে।তার পর শিয়া।
___”তোমার বয়স কত? “
শিয়া নরম গলায় বললো,”সাতাশ পেরিয়েছে “
___”বলো আটাশ।বেশ বয়স।”
মহিলা কুচকানো নজরে তাকালো প্রিয়ার দিকে।সে বেচারি বোনের হাত ধরে বসা।
___”তোমার?”
প্রিয়া এদিকে-ওদিক বাবা মায়ের দিকে তাকালো।মহিলার কথার ধরন তার একদম পছন্দ হয়নি।তাদের কি কাজে এখানে আনা হয়েছে হালকা বুঝতে পারছে বোধহয়।মহিলা কে দেখে মোটেই মৃতপথযাত্রী লাগছে না।আনিসুল রহমান, রেনুকা রহমান বসে আছে সামনেই।রেনুকা রহমানের মুখ বেশ কঠিন হয়ে এসেছে।
___”কি হলো?বয়স কত তোমার?”
___”আঠারো চলে।”
মহিলার মুখে হাসি ফুটলো খানিকটা।স্বামীর দিকে ফিরে বললো,
___”একে রেখে বয়ষ্ক মেয়ে মনে ধরলো তোমার ছেলের?”
আজগর সাহেব খুকখুক করে কেশে ওঠেন স্ত্রী চাঁচাছোলা কথায়।মহিলা নিজেই আবার শুধরে নেয়।
___”রুপ আছে মাশাআল্লাহ দুজনেরই। তবুও বাচ্চাকাচ্চা কি আর অতো বয়সী মেয়ের পেটে ধরবে!”
মহিলার এমন অপমানজনক কথায় বাকহারা হয়ে গেলো সকলে।রেনুকা রহমান তখন উঠে পরেছে সোফা ছেড়ে।আনিসুল রহমানর মুখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেছে।বন্ধুর বাড়িতে দাড়িয়ে আছে আর মহিলা অসুস্থ এই খাতিরে চুপ করে আছেন তিনি।রেনুকা রহমান একপলক স্বামীর দিকে তাকিয়ে ফিরলো এদিকে,
____”আমার মেয়েরা মোটেই আমার কাছে বোঝা না।ওরা বিয়ে করতে চাইলে করবে না হলে না।হয়নি বলে নয়,করতে চায়নি বলে এখনো অবিবাহিত ও।”
মহিলা বোধহয় মুখ ফসকে বলা কথাগুলো ধরতে পারলো।অতি ব্যাস্ত হয়ে এগিয়ে এলো রেনুকা রহমান এর দিকে।মুখটা বেশ কপট মলিন করে বললো,
___”আপা ক্ষমা করবেন।খুব একটা শিক্ষিত নই আমি।কি বলতে কি বলি।শুনতে খারাপ লাগে।অতো ভেবে বলি নাই।আপনার বড় মেয়ে মাশাল্লাহ পরী।আমার অন্য উদ্দেশ্য ছিলো না বলার।”
রেনুকা রহমান আরও কঠিন কথা বলতে গিয়েও বললেন না মহিলার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে।মহিলাও বোধহয় এই ফায়দাই তুললেন।শব্দ করে।কেঁদে ফেললেন তার হাত ধরে।
___”ছেলেটাকে বিয়ে করিয়ে বউয়ের মুখ দেখে মরতে চাই আমি।আমার ছেলে আপনার মেয়েটাকে পছন্দ করে।আমটাও করি।আমার এই মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছা টা পূরন…
বাধা দিয়ে ওঠেন আজগর সাহেব।স্ত্রীর কাছে এসে মুছে দেয় চোখের পানি।বন্ধুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন,
___”রাজি নয় মানে।রাজি বলেই তো এসেছে।আজই কাবিন করে ফেলবো। সামনে সপ্তাহে ধুমধামে ঘরে তুলবো শিয়া মাকে।”
শিয়া আকাশ থেকে পরে।পায়ের নিচে শূন্য অনূভব করে।এর জন্য এসেছে মানে টা কি।আজকেই কাবিন এ কথাটা দিয়ে কি বোঝালো!বাবা মায়ের দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালো।প্রিয়া তখনও শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে বোনের হাত।সেও সমান ভাবে অবাক হয়েছে।রেনুকা রহমান ছলছল চোখে মেয়ের আহত দৃষ্টি দেখলো।আনিসুল রহমান তাকালো পর্যন্ত না।শিয়ার বুকটা ভারি হয়ে এলো।তার বাবা শেষ পর্যন্ত মিথ্যা বললো তাকে!তার বাবা।মাথা ঘুরছে তার।
___”তোমরা তাহলে ওপরে যাও।রুম ঠিক আছে।রেস্ট করো,ফ্রেশ হও।লাঞ্চ টা করে নাও।সন্ধ্যার পর কাজি সাহেব আসবে।কালেমাও পড়িয়ে রাখি বলো?নাকি!অবশ্য তারপর বউমাকে রেখে দিলেও পারি সব যখন আমাদের বাড়িতেই হচ্ছে। “
বলেই অট্টহাসি তে ফাটলেন তিনি।আনিসুল রহমান মলিন হাসলেন।রেনুকা রহমান কঠিন দেখলেন স্বামীকে।কোন ঋনে জর্জরিত হয়ে তার স্বামী এই ভাবে মাথা নোয়াচ্ছে হিসেবে মিলছে না তার।
___”মজা করছিলাম ভাবি সাহেবা।আমার ছেলে চলে আসবে।একটু শহরের বাইরে আছে।সন্ধ্যার মধ্যে এসে যাবে।চিন্তা করবেন না।বিয়ে পরিয়ে রাখবো।সামনে সপ্তাহে তুলে আনবো অনুষ্ঠান করে।আপনাদের বাড়িতেই সব করতে পারতাম।বুঝতেই পারছেন আমার স্ত্রী তো বাড়ির বাইরে যাওয়া….
আর কোনো কথা বললো না তিনি।কাজের লোক কে ব্যাস্ত তাড়া দিলো ওদের গেস্ট রুম অবধি নিয়ে যেতে।শিয়া প্রিয়া দুজনেই পাথর হয়ে বসে আছে।প্রিয়ার চোখ ছলছল করলেও আশ্চর্যজনক ভাবে শিয়ার চোখ এখন শুকনো।বোধহয় বাবার কাছ থেকে এটা আশা করেনি সে।একদম করেনি।
চলবে ইনশাআল্লাহ 🌼
[🚫৫০০০ শব্দ প্রায়।গল্পে লাইক,কমেন্ট বাড়াবেন আরও।পরীক্ষার কারণে ব্যাস্ত আমি।দেরি হলে মানিয়ে নেবেন একটু।সামনে ঝড় আসবে…সামনের পর্বেই কিনা বলতে পারছিনা।]
বিয়েটা সামনের পর্বেই দিয়ে দিবো?🙂

