বসন্তের_ঝরা_ফুলসূচনা_পর্ব

0
44

“তুই এত সুন্দরী একটা মেয়ে হয়ে গ্রামের সবচেয়ে বোকা ছেলেকে ভালোবাসিস এটা শুনতে কিন্তু খুবই খারাপ লাগে।”

​কলেজে যাওয়ার পথে, বৃষ্টি তার বান্ধবী শিউলির উদ্দেশে কথাটা বলল। কিন্তু শিউলি তার কথায় কোনো সায় দিল না, সে চুপ রইল।
​বৃষ্টি আবারও বলল, “তোর পেছনে কত ছেলেরা ঘুরে! তুই চাইলেই তাদের সাথে প্রেম করতে পারিস।”

​কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিউলি কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে এক রাশ সারল্য নিয়ে বলল,
​“আমি তো শুধু প্রেম করতে চাই না। আমি ভালোবাসতে চাই। আর সে ভালোবাসা সারাজীবনের জন্য পেতে চাই।”

​বৃষ্টি শিউলিকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কাকে ভালোবাসে? সেই প্রশ্নের উত্তরে শিউলি জানিয়েছিল, সে তাদের বাড়ির পাশের শিমুল নামের ছেলেটাকে ভালোবাসে। যে ছেলেটা কিনা গ্রামের চোখে সবচেয়ে বোকা। গ্রামের সবাই ছেলেটাকে বোকাসূলভ স্বভাবের জন্য ‘বলদ শিমুল’ বলে ডাকে।
​প্রিয় বান্ধবীর এমন অদ্ভুত কথায় আর ভালো না লাগায়, বৃষ্টি সামান্য ক্ষুণ্ণ হয়ে শিউলির পাশ থেকে আগে আগে হেঁটে চলে গেল

শিউলি কলেজের মূলপথ রেখে বাম দিকের সরু পথ ধরল।এখন বসন্ত কাল চলছে।হালকা রোদ আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, আর বাতাসে সেই নরম উষ্ণতা। গাছের শুকনো ডালে নতুন কচি পাতা ফুটছে, ঝুলছে সবুজ ঝুলন্ত কুঁড়ি। শিমুল পলাশের লাল কমলা ফুল চারপাশে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়েছে। পাখির ডাক, মৌমাছির গুঞ্জন, প্রজাপতির নরম ডানা সব মিলিয়ে বসন্তের নতুন প্রাণ বয়ে নিয়ে এসেছে। ছোট ছোট নদী খালও স্বচ্ছ জল দিয়ে হাসছে।

​শিউলি কিছুদূর এগোতেই দেখল, শিমুল ভাই পালংশাকের ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করছে। শিউলি তা দেখে ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকালো। ‘এটা তো শিমুলদের ক্ষেত নয়! তাহলে কেন সে নিজেদের ক্ষেত রেখে অন্যের ক্ষেতে কাজ করছে?’
​শিউলি এগিয়ে গিয়ে ডাকল,
​“শিমুল ভাই! ও শিমুল ভাই। ওই ক্ষেতে কী করো?”

​কারো ডাক শুনে নিচু হয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে থাকা, সাদা গেঞ্জি পরা আর মাথায় গামছা পেঁচানো ছেলেটা শিউলির দিকে তাকালো। শিউলিকে দেখতে পেয়ে সে দ্রুত এগিয়ে এলো। দাঁত বের করে প্রাণখোলা হাসি হাসতে হাসতে শিউলির কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
​“কী রে শিউলি। ডাকিস ক্যান?”

​শিউলি রোদে পোড়া শিমুলের দিকে তাকাল। বলল,
​“শিমুল ভাই, তুমি নিজেদের ক্ষেত রেখে জামিল চাচার ক্ষেতে কী করছো?”

​ছেলেটা শিউলির কথায় আবারও হাসল, বলল,
​“জামিল চাচা কইল তার ক্ষেতে নাকি খুব আগাছা হইছে, তাই কইল সাফ করে দিতে।”

​শিউলি এবার সবটা বুঝতে পারল। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ছেলেটাকে বোকা পেয়ে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সব কাজ করিয়ে নেয়। শিউলি রাগী সুরে বলল,
​“তুমি কেন তাদের কাজ করে দিবা? কয়েকদিন আগেই তো তোমায় শুধু শুধু মারলো জামিল চাচা, মনে নেই?”

​শিমুল নিজের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“হ, মনে আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, ওইদিন আমি লাউ চুরি করি নাই, তবুও আমারে মারছে।” অসহায়ভাবে কথাটা বলল শিমুল।

​শিউলি কোমল কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি তুমি কিছু করো নাই। আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তোমার জন্য আমি পাটিসাপটা পিঠা এনেছি।”

​পিঠার কথা শুনতেই শিমুলের মুখে মুগ্ধতার হাসি ফুটে উঠল।
​“হাছা? দে, খাই!” আগ্রহ নিয়ে হাত পেতে বলল সে।

শিউলি এবার একটু শাসনের সুরে বলল,
​“এই! হাতে ময়লা নিয়ে খাবে? যাও আগে হাত ধুয়ে শিমুল গাছের তলায় আসো।”
শিউলি বিশাল বড় শিমুল ফুলের গাছটার দিকে ইশারা করে বলল।

​শিমুল ‘আইচ্ছা’ বলেই দৌড়ে ক্ষেতের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট খালের কাছে চলে গেল।
​শিউলি ততক্ষণে সেই বড় শিমুল গাছটার নিচে গিয়ে বসে পড়ল। গাছটা বিশাল, তাতে লাল ফুল ফুটে আছে। বসন্তের নতুন পাতাও গজাচ্ছে ডালে ডালে। শিউলি ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটা বের করে শিমুলের হাতে দিল। শিমুল বক্সটা নিয়েই তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল।
​শিউলি এক ধ্যানে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

​“আমাকে একটু দিবে না? তুমি কি একাই খাবে?” শিউলি মুচকি হেসে বলল।

​শিমুল খেতে খেতেই বলল, “তুই খাস নাই? খাইবি?”

​“আমার ভাগের পিঠাটাই তো নিজে না খেয়ে তোমার জন্য নিয়ে আসছি। তোমার পছন্দ, তাই।”

​শিমুল তখন একটা পিঠা শিউলির দিকে এগিয়ে ধরে বলল, “নে, খা।”

​“তুমি খাইয়ে দাও শিমুল ভাই।” শিউলি আদুরে আবদার করল।

​শিমুল সরল হাসি হেসে বলল,
​“আমি ক্যান খাইয়ে দিমু? তোর জামাই তোরে খাইয়ে দিবে।” ​বলেই শিমুল মুচকি হাসল।

​আর কিছু না বলে শিমুল আবারও খাওয়ায় মন দিল।
​“জানো শিমুল ভাই, তুমি এই শিমুল ফুলের মতোই সুন্দর।” শিউলি নরম সুরে বলল।

​শিউলির কথায় ছেলেটা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, “হাছা?”

​“হ, হাছা। শিমুল ভাই, আমি কি দেখতে সুন্দর না?”

​“হ, তুইও ম্যালা সুন্দরী আছস, ম্যালা।” শিমুল খেতে খেতে কথাটা বলল।

​“কই, কখনও তো বলো না আমি সুন্দর,” একটু থামে শিউলি। তারপর সরাসরি প্রশ্ন করে, “আমি কি তোমার বউ হওয়ার মতো সুন্দরী?”

​শিউলির এমন কথায় শিমুল হকচকিয়ে তাকালো। তার মুখে হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল। এরপর হাতে থাকা টিফিন বক্সটা শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল,
​“ধর, আমি তোর পিঠা খাব না। তুই লজ্জা লজ্জা কথা বলিস।”

​শিউলি হেসে বলল,
“লজ্জার কথা কই বললাম! পিঠাগুলো খেয়ে নাও। আর না খেতে পারলে চাচির জন্য নিয়ে যেও।”

​বলেই শিউলি উঠে দাঁড়ালো। দুই কদম সামনে এগিয়ে আবারও পেছনে ফিরে তাকালো। কিছুটা শাসনের ভঙ্গিতে বলল,
​“তুমি আর জামিল চাচার ক্ষেতে কাজ করবে না। তোমার নিজের ক্ষেত আছে তো! সেখানেই কাজ করো।”

রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে শিউলি। আজও তার কলেজে পৌঁছাতে দেরি হবে, তবে তাতে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে ধীর স্থিরভাবেই হেঁটে চলেছে।

​রাস্তার পাশে টংয়ের দোকানে সামনে বাইকে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে তামিম ইকবাল। প্রতিদিনই তাকে এখানে দেখা যায়। সাথে আরও কয়েকটি ভণ্ড ছেলেপুলে। গ্রামের প্রায় সব মেয়েদেরকেই বিরক্ত করা এদের প্রধান কাজ। এই ছাড়া এদের আর কোনো কাজ নেই। বাপ চেয়ারম্যান বলে কেউ এদের কিছু বলতেই পারে না।

​শিউলি যতটা সম্ভব দ্রুত এই জায়গাটা পার হতে চাইছে। সে মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল। পেছন থেকে ছেলেগুলো শিস বাজাচ্ছে।
​তখনই তামিম জোরে বলল,
​“আরে তোরা থাম! তোদের ভাবি হয়। একটু সম্মান দে।”
​সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল সবগুলো ছেলে একসুরে ডাকছে, “ভাবি!”

​তামিম এসে শিউলির রাস্তা আটকিয়ে দাঁড়ালো। শিউলি পাশ দিয়ে যেতে চাইলে সে আবারও সামনে এসে দাঁড়াল। তামিম সিগারেট টান দিয়ে শিউলির মুখের সামনে ধোঁয়া উড়ালো। শিউলি নাক মুখ কুঁচকে চেপে ধরল। স্পষ্ট রাগে সে বলে উঠল,
​“সমস্যা কী আপনার? পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেন?”

​“আর এক কথা কত বলবো সুইটহার্ট? কতবার করে বললাম ভালোবাসি তোমাকে, কিন্তু না! তুমি তো আমার কথা শোনো না।”

​“আমিও আপনাকে বলেছি, আমি আপনাকে ভালোবাসি না! তবুও কেন এত ঝামেলা করছেন? আপনার জন্য গ্রামে আমাকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়!” শিউলি তার কণ্ঠে তীব্র রাগ নিয়ে বলল।

​তামিম সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বেশ উদ্ধতভাবে বলল,
​“আমি যা বললাম সেটা চিন্তা করো। তা না হলে এর থেকে বড় ধরনের বদনাম হবে। পরে কিন্তু গ্রামে মুখও দেখাতে পারবে না, সুইটহার্ট।”

​শিউলি রাগী গলায় আবারও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
​“আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন, আমার সমস্যা নেই। এবার পথ ছাড়ুন।”
বলেই সে অন্য পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।
​তামিম গিয়ে আবারও সেই একই জায়গায় বসল। তার সাথের একটা ছেলে বলল,
​“শিউলির বাপ তো এই গ্রামের মেম্বার। যদি কোনো সমস্যা হয়?”

​ছেলেটার কথায় তামিম তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
​“তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস, আমি চেয়ারম্যানের ছেলে। ওর বাপের কাছে বিচার দিয়েও কিছু করতে পারবে না। কারণ ওর বাপ ইদ্রিস খুব ভালো করেই জানে, আমার বাবা চাইলেই ওকে মেম্বারের পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে।”

​সবগুলো ছেলে একসাথে অট্টহাসি হেসে উঠল। তামিম আরেকটি সিগারেট ধরাল। খুব আয়েশ করে টান দিল সেই সিগারেটে।

#চলবে…?
#সূচনা_পর্ব
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
(জানিনা কেমন হলো, হঠাৎ করেই প্লট টা মাথায় আসলো আর লিখে ফেললাম।ভালো লাগলে জানাবেন আর ভালো না লাগালেও জানাবেন। ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here