যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:২৭]

0
28

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৭]

সদ্য এতগুলো স্বর্ণালংকার হারানোর দুঃখে ভেঙে পড়েছেন ফরিদা। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। মাথা যন্ত্রণা করছে, খেতে গেলেই গুলিয়ে উঠছে গা।
আমিরুল শাহ ঘর জুড়ে পায়চারি করছেন। বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করে বলছেন কিছু। ফরিদা কান পেতে শোনার চেষ্টা করেও কিছুই বুঝতে পারলেন না। শেষে অপারগতা মেনে নিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। আমিরুল শাহ হাঁটা থামিয়ে বসলেন গিয়ে কেদারায়। বললেন,“হারামজাদায় এইবার বেশি বাড়াবাড়ি করতাছে। ওরে আলাদা কইরা দেও। মজা বুঝুক।”

“এইগুলা কী কন? মা হারা পোলা, সারাদিন খাটে। আলাদা করলে কেমনে চলবো?”

“বিয়া কইরা বউ আনছে না? হেয় চালাইবো।”

“ওইটুকুন মাইয়া একলা একলা কী আর সংসার চালাইতে পারবো? আমনে রাইগেন না তো। ছুডোরা একটু আধটু ভুল করেই।”

“এইডা ভুল না, বেয়াদবি। কাউরে মানে না। কিছু কইতে গেলেই কয়, আমনে আমার বাপের জমি ভোগ করতাছেন। ওর বাপের জমি মানে? এইসব আমার বাপের জমি। আমার বাপের জমি আমি ভোগ করি, ওর কী? ভিটে দিছি, দুই ভাইরে খাইতে দিছি, থাকতে দিছি, চাষের জমিও দিছি কিন্তু কোনো কৃতজ্ঞতা নাই। যদি ছুডো থাকতেই গলাডা চিপ দিয়া ধরতাম তাইলে আইজ আর এই দিন দেখা লাগতো না।”

“এত সহজ নাকি? পারতেন মারতে? আর মারলেও ধামাচাপা দিতে পারতেন? পারবেন না বইল্যাই তো বাঁচাইয়া রাখছিলেন।”

শীতল দৃষ্টিতে স্ত্রীর পানে তাকান লোকটা। চেহারা থেকে অদ্ভুত এক জৌলুস ঠিকরে পড়ছে যেন। কেদারার হাতল শক্ত করে চেপে ধরেন। ফরিদা সেই দৃষ্টি অবজ্ঞা করে শোয়া থেকে উঠে বসে চুলে খোঁপা করতে লাগলেন। বললেন,“বাপ আমনের একলার না, বাপ সুবহানেরও। আর সেই বাপের প্রিয় পোলাও কিন্তু হেয়ই আছিলো। ভিটে আমনে মন থাইক্যা দেন নাই, দিছেন এলাকার মাইনষের চাপে পইড়া। না হইলে তো আসল রূপ ধরা পইড়া যাইতো। পোলায় খায়ও নিজের কামাই। তাই এত সাধু আমার কাছে সাজবেন না।”

“মাগী, এহন ভালা সাজোস? যা করছি তোর আর তোর লোভী ভাইয়ের উষ্কানিতে করছি।”

“লোভী ভাই আমার নাকি আমনের?”

বসা থেকে উঠে গিয়ে স্ত্রীর গলা চেপে ধরলেন আমিরুল শাহ। ফরিদা ভয় পেলেন না। কিছু মুহূর্তের ব্যবধানে সহজ, সরল মহিলার অন্য এক রূপ বেরিয়ে এলো। হাসলেন শব্দ করে,“খুব সাহস বাড়ছে? কথায় কথায় গায়ে হাত তোলা না আমনের আবার কাল হইয়া দাঁড়ায়!”

শেষ বিকেলের রোদের মতো আমিরুল শাহর সমস্ত তেজ কমে এলো যেন। মুখ ফিরিয়ে বসে রইলেন। ফরিদা বালিশ উঁচু করে পিঠ ঠেকিয়ে বললেন,“ব্যাডা মাইনষে কথায় কথায় কয়, মাইয়া মাইনষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুর নিচে। কিন্তু সত্য তো হইলো, হাঁটুর নিচে বুদ্ধি থাকে ব্যাডা মাইনষে গো। সবসময় হাত চালাইয়া সমস্যার সমাধান করতে চায়। বয়স হইছে, এই জোর আর কয়দিন?”

“কী কইতে চাস?”

“এহন আর নাজিরে একলা নাই। আকবর মিয়া কী এমনি এমনি নাতনি বিয়া দিছে হের কাছে? এহন ওরে আলাদা কইরা দিলে ট্যাহা-পয়সা, সম্পত্তিসহ সবকিছুর দখল যাইবো বউয়ের হাতে। বউয়ের হাতে মানে পুরা মাস্টর বাড়ির কাছে। টিকতে পারবেন তহন? না জানি পরে আবার দাদার ব্যবসার ভাগ চাইয়া বসে।”

হতবিহ্বল চোখে স্ত্রীর দিকে আবার তাকান লোকটা। এসব তো কখনো তিনি ভেবে দেখেননি! মাথা ঠান্ডা করে বসে থাকেন। ফরিদা বলেন,“পুরুষ মানুষ সফলতার পর মাইয়া মাইনষেরে ভুইল্যা যায়, কথাডা আমনেরে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। এই ফরিদা বানুর লাইগা আইজ আমনের মতো মাইনষে সমাজে মাথা উঁচা কইরা চলতে পারতাছেন, প্রত্যেকদিন কাচারি ঘরে পায়ের উপর পা তুইল্যা বইয়া ট্যাহা গুনতে পারতাছেন, বাবু সাহেব সাইজা চলতে পারতাছেন। আমি আর আমার ভাই না থাকলে পারতেন এইসব করতে? বিয়ার পর আমার গলার চেইন বেইচ্চা জুয়া খেলছেন, বাপের গাইল খাইছেন। এহন কয় সব দোষ আমার! মুমিনরেও ভাগ দিতে হইতো না, যদি না বেশি পাকনামি না করতেন। ওর তিন পোলা, তিন পোলার ঘর থাইক্যাও আরো কত্তগুলা হইবো। ব্যবসার ভাগ কই যাইবো কোনো হুঁশ আছে? খালি দোষারোপ করে আমারে।” থেমে শান্ত করলেন নিজেকে। সজাগ কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন,“আমনে সব মন ধ্যান ব্যবসায় দেন। সংসার এতকাল আমি দেখছি, এহনো আমিই দেখমু।”

“হ, এতোই দেখছোস যে পোলাডারে ঠিকঠাক বড়ো করতে পারলি না। তোর হাতেই তো দিছিলাম ওরে, হেরপরেও নাজিরে এমন হইলো কেমনে?”

“আমি জানি? দোষ আমনের। আমনে উষ্কানি দিয়া এমন বানাইছেন।”

“এহন সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়া নিজে ভালা মানুষ সাইজা বইয়া থাক, হারামজাদী।”

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চমকে উঠলো। একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে শুয়ে পড়লেন ফরিদা। আমিরুল শাহ এগিয়ে গিয়ে দরজার পর্দা সরাতেই আরো এক ধাপ চমকালেন। বিস্মিত স্বরে বললেন,“তুমি?”

মিছরি অপ্রস্তুত হলো বেশ। হাতের খাবারের থালাটা দেখিয়ে বললো,“বড়ো ভাবি এসব চাচী আম্মার জন্য পাঠিয়েছেন।”

“তো শব্দ করো নাই ক্যান? কারো ঘরের সামনে চুপচাপ দাঁড়াইয়া আড়ি পাতা ভালা না।”

“আমি মাত্রই এসেছি, এসেই দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। মোটেও চুপচাপ আড়ি পাতছিলাম না।”

“আইচ্ছা যাও।” তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন অন্যদিকে।

মিছরি ভেতরে প্রবেশ করল। বিথী জোরপূর্বক তার হাতে খাবারের থালাটা ধরিয়ে দিয়ে বলেছে,“আমার শাশুড়ি তোমার উপরে রাইগা আছে। খাবার লইয়া যাওয়ার বাহানায় রাগ ভাঙাও গিয়া। না হইলে টিকতে পারবা না এই সংসারে।”

অগত্যা তাকে আসতেই হলো। ফরিদা প্রতিক্রিয়াহীন তাকিয়ে রইলেন মেয়েটির দিকে। পরনে কালো রঙের সুতির সালোয়ার কামিজ, মাথায় ঘোমটা। হাতে চকচক করছে সোনার এক জোড়া চুড়ি। যা বাপের বাড়ি নাইওরে যাওয়ার সময় তিনিই আলমারি থেকে বের করে হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন মিছরিকে। তাঁর কত পছন্দের ছিল এই চুড়ি জোড়া! বিথী চাওয়ার পরেও দেননি। মোটে দুইবার পরেছিলেন শুধু। অথচ সেই চুড়ি জোড়া এখন অন্য কারো দখলে। দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে উঠে বসলেন ফরিদা,“তুমি আবার খাওন লইয়া আইতে গেলা ক্যান?”

“ভাবি যে বললেন!”

মনে মনে পুত্রবধূকে আচ্ছামতো গালি দিলেন তিনি। কিন্তু মুখে বললেন,“তুমি খাইছো?”

“হ্যাঁ।” একটু ভেবে বললো,“আপনি কী আমার উপর রেগে আছেন?”

“রাগমু ক্যান?”

“ওই যে, গতকাল গয়না নিয়ে ঝগড়া হওয়ায়?”

“কী যে কও না! নাজির একটু অমনই, অল্পতে চেইত্তা যাওয়া পোলা। বয়স কম তো! মায়রে কাছে পায় নাই, বাপের অবস্থা তো দেখছোই? ছুডো ভাইডার দায়িত্বও ওর উপরে। চাচী কী আর মায়ের মতন হইতে পারে? তবুও আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করছি, ওগো আগলাইয়া রাখছি। তাই ওয় আমার পোলাই। পোলা আর পোলার বউয়ের উপরে মা কহনো রাগ করতে পারে? সামান্য কয়ডা গহনাই তো। এমনিতেই দিয়া দিতাম।”

“উনি যে বললেন এসব উনার মায়ের?”

“ওর কথা ধইরা লাভ নাই। মায়ের কথা ওর মনে আছে? পুরাইন্না সাদাকালা ছবিতে কি না কি দেখছে? আগেকার সব গহনাগাটির নকশা তো একরকমই থাকতো। তাই হয়তো মনে করছে।”

মহিলা সুন্দর করে কথা বলেন। তাই বিপরীতে ভাবুক মনে মাথা নাড়ালো মিছরি। বিশ্বাস করেছে কিনা বুঝা গেলো না। কিছুক্ষণ গল্প করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। উঠোন পেরোতেই রান্নাঘর থেকে ডাক এলো,“এই নতুন বউ! যাও কই? এনে আইয়ো। মেলা কাম পইড়া রইছে।”

মিছরি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রান্নাঘরে এসে পিঁড়িতে বসলো। দুপুরের রান্নার আয়োজন করছে বিথী। চোখেমুখে তার লেপ্টে আছে একরাশ বিরক্তি। কতগুলো সবজিসহ একটি ডালা আর বঁটি এগিয়ে দিয়ে বললো,“ধরো, কাইট্টা ফালাও তো এডি। আমার আবার আব্দুল্লাহরে গিয়া গোসল করাইতে হইবো। কাটা শেষ হইলে ডাক দিও, রান্ধা বসামু।”

ডালার ভেতরে মিষ্টি কুমড়া, কচুর লতি, পেঁয়াজ, ঝিঙা, কাঁচা মরিচ, কাঁঠাল বিচি আর ডাটা। মিছরি অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার না একটা মেয়ে আছে, সে কোথায়? খুব কম দেখা যায়।”

“ওয় ইশকুলে। এইবার কেলাশ ফোরে পড়ে। সকালে যায়, দুপুরের আজান দিলে আইয়ে।”

উত্তর দিয়ে দ্রুত প্রস্থান করল বিথী। মিছরি বঁটি নিয়ে বসে রইল। কাটাকুটি তো দূরে থাক, জীবনে নিজ হাতে খাবার বেড়ে খেয়েছে কিনা সন্দেহ। বাড়িতে কোনো কাজই তাকে করতে হতো না। রান্নাঘরের ধারে কাছেও তেমন একটা ঘেঁষেনি কখনো। সেখানে একা হাতে কিনা এতগুলো সবজি কাটবে? কিন্তু সেই দুর্বলতার কথা বলবে কাকে? তবুও চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ বসে থেকে প্রথমে কাঁঠাল বিচি দিয়েই শুরু করল। কিন্তু পরপর কয়েকটা ছিঁলতে না ছিঁলতেই আঙুল হয়ে গেলো আঠালো। হার মেনে নিয়ে শেষ বিকল্প হিসেবে কাটা ধরলো পেঁয়াজ। কুচি করতে তো পারলোই না বরং কেটে ফেলল বুড়ো আঙুলের ডগা। সেই কাটা স্থান থেকে রক্ত ঝরছে। অপর হাতে চেপে ধরে ওভাবেই বসে রইল সে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার।

“হায়হায়, এহনো কাটাকুটি হয় নাই?”

হঠাৎ চিৎকারে লাফিয়ে উঠলো মিছরি। ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো বিথীকে। জুতা খুলে ভেতরে এসে দাঁড়ালো সে। মিছরি বসে আছে দরজার ঠিক পাশ ঘেঁষে, উল্টো দিকে ঘুরে। তার মুখের দিকে দৃষ্টি তাক করে বিথী বললো,“তোমারে কইয়া গেছিলাম না আমি আইয়া রান্ধা বসামু? মাত্র চাইরডা বিচি কাটছো? বাকিগুলা কেডায় কাটবো?”

কান্না গিলে হাতের ক্ষত দেখিয়ে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বললো,“হাত কেটে গেছে।”

“কেমনে কাটছে? চোখ নাই? আমগোও কাটে, তাই বইল্যা বইয়া থাকি নাকি? এমন করলে তো মাইনষে না খাইয়া মরবো।”

“আমি কাটতে পারি না।”

“কী পারো না?”

“সবজি কাটতে পারি না, কখনো কাটিনি।”

বিথী ভারি অবাক হয়। দুই হাত কোমরে রেখে আরো জোরে চিৎকার করল,“কিহ! মাগী মানুষ হইয়া কয়ডা আনাজ কাটতে পারো না? তাইলে পারোডা কী? খালি গিলতে? শরীরডা তো কম হয় নাই। কী খাইয়া বানাইছো? দুই দুইডা ভাইয়ে অকর্মার ঢেঁকি ধইরা আনছে। না আছে রূপ আর না আছে কোনো গুণ।”

প্রথম চিৎকারেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল লিলি। চুপচাপ দেখছিল চলমান ঘটনা। কিন্তু এর ভেতরে নিজের নাম আসতেই চুপচাপ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না সে। ওই বারান্দা থেকে এই বারান্দায় উঠে এসে বললো,“আপনি তো রূপে গুনে সবজান্তা, তাহলে আরেকজনের উপর হুকুম চালাচ্ছেন কেন? নিজেই করুন না সব। এতদিন কী না খেয়ে থেকেছেন?”

বিথীর রাগ বাড়লো। শাশুড়ির মতো নরম মানুষ সে নয়‌। বরং ছোটো চাচী শাশুড়ির মতোই ঝগড়ুটে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,“আইছে আরেকটায়। নিজেও খারাপ, বড়ো জারেও এহন খারাপ বানাইবো।”

“খারাপের কী দেখেছেন?”

তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে মিছরির উদ্দেশ্যে বললো,“ছুডো জায়ের মতন এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা কওনের সাহস আমার লগে আবার কইরো না, মাইয়া। মনে রাইখো, ওয় শহরে চইল্যা গেলেও তোমারে কিন্তু জামাই লইয়া এনেই থাকতে হইবো। বেশি করলে…..

বাকি কথাটা অর্ধ সমাপ্তই রয়ে গেলো। আচমকা তার ফাটা বাঁশের মতো গলা থেমে যাওয়ায় মিছরি, লিলি দুজনেই বেশ অবাক হলো। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই দেখতে পেলো নাজিরকে। পূর্ব দিক থেকে এসে রান্নাঘরের সোজাসুজি দাঁড়িয়েছে। হাতে মাটি লেগে থাকা কাস্তে, ঘেমেনেয়ে একাকার অবস্থা দেহের। স্ত্রীর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে টিনের চালে কাস্তে গুঁজে কোমর থেকে গামছা খুলতে খুলতে বললো,“পুরা কথাডা শেষ করেন, ভাবি। বেশি করলে কী করবেন ওরে আর ওর জামাইরে?”

বিথী অপ্রস্তুত হলো। দেহের ঘাম ইতোমধ্যে ছুটে গিয়েছে। আমতা আমতা করে বললো,“আনাজ কাটতে দিয়া গেছিলাম কিন্তু পারে না। তাই আরকি..”

“তাই আরকি গলার জোর বাইড়া গেছিলো। একটু হেডাম দেহাইতাছিলেন, তাই না?”

“না, ভুল বুইঝেন না ভাই।”

“নিজের কানে সব হুনার পরেও ভুল ক্যান বুঝমু? তা আমনে কোন মহাভারত শুদ্ধ করতে গেছিলেন?”

“আব্দুল্লাহরে গোসল করাইতে।”

“এইডা গোসল করানের সময়? কবেত্তে গোসল করান এই সময়ে?”

আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না বিথী। নাজির বললো,“সবাই মায়ের পেট থাইক্যাই কাম শিইখা আইয়ে না। কাম না পারলে শিখান। চিল্লাইলে কোনো লাভ হইবো? মাইয়া বয়সে, জ্ঞান বুদ্ধিতে ছুডো হইলেও মাইয়ার জামাই কিন্তু ছুডো না। কথা একটু বুইঝা হুইন্না কইয়েন।”

কথাগুলো বলে ফটকের দিকে হাঁটা ধরলো সে। যেতে যেতে বলে গেলো,“ক্ষেতে যাই, আইতে আইতে বিকাল হইবো।”

লিলি সবটা দেখলো। একটা ব্যাপার খুব ভালো করেই লক্ষ্য করল নিজের স্বামী, চাচা শ্বশুর থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই তার ভাসুরকে কিছুটা ভয় করে চলে। পাছে যাই করুক, সামনে ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না এমন। অথচ এই লোকটার সাথেই শুরু থেকে সে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে, দুর্ব্যবহার করেছে! যদিও সেই ব্যবহারের পাল্টা জবাবে প্রত্যেকবারই নাজির তাকে প্রতিহত করেছে!
___________

ক্ষেতের সবুজ ধানগুলো প্রায় হাঁটু সমান লম্বা হয়েছে। নাজির বুদ্ধি করে আইল দিয়ে লাগিয়েছে এবার কচু গাছ। সেই গাছগুলোর গোড়াও এই কদিনে বেশ মোটা হয়েছে, লম্বা লম্বা লতিও ধরেছে ভালোই। জেলা শহরের বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি করা যায় এগুলো। তবে সে আর অতদূরে যাবে না। ক্ষেত থেকেই ব্যাপারিদের কাছে বিক্রি করে দেবে।
লুঙ্গি হাঁটু সমান উঁচু করে কোমরে শক্ত করে বাঁধলো সে। ক্ষেতে নামতে যাবে তখনি পেছন থেকে ডাক এলো,“ভাই!”

রোদ মাথায় নিয়ে কোমরে হাত রেখে পিছু ফিরে চাইলো নাজির। দেখতে পেলো এদিকেই এগিয়ে আসতে থাকা নওশাদকে। কিছু সময়ের মধ্যেই কাছে এসে দাঁড়ালো। দুই হাতে ধরে রাখা দুইটা আইসক্রিম থেকে বাড়িয়ে দিলো একটি,“আগাছা পরিষ্কার করবা?”

“হ, কয়দিন আগে করছিলাম কিন্তু আবার বাড়ছে।” হাত থেকে আইসক্রিমটা নিয়ে মুখে ঢুকালো নাজির। কিছু একটা ভেবে বললো,“যা, সবকয়ডা পরিষ্কার কর তো।”

“আমি?”

“তো এনে আর আছে কেডায়? কাম কর, যা। শরীর, মন ভালা থাকবো। কয়দিন আগে লতিফ পরিষ্কার কইছিল, বিনিময়ে পঞ্চাশ ট্যাহা দিছিলাম। তোরে না হয় একশ দিমু। কামে লাইগা পড়।”

বোকার মতো বড়ো ভাইয়ের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে নওশাদ। তেইশ বছরের জীবনে কাঁদা পানিতে নেমে এসব কাজ কখনো সে করেনি। করতে চাইলেও ভাই কখনো করতে দেয়নি, কিন্তু আজ কিনা! নাজির তাড়া দিলো,“ভ্যাটকাইয়া না থাইক্যা কাম কর।”

হাতের আইসক্রিম অর্ধেক খেয়ে বাকিটা অদূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো নওশাদ। পরনের বাংলা প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত ভাঁজ করে ক্ষেতে নেমে পড়ল। আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজেই মেখে গেলো কাঁদায়। নাজির ঘাসের উপর স্থবির বসে চেয়ে দেখছে সেসব। সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হয় না। তাই ডিপকল থেকে পানি এনে দিতে হচ্ছে। আচমকা আহসূচক শব্দ করে উঠলো নওশাদ। নাজির জিজ্ঞেস করল,“হইছে কী?”

“মনে হয় কিছুতে কামড় দিছে।”

“এইদিকে আয় দেখি।”

ড্রেনের পানিতে কোনোমতে পা ধুয়ে উপরে উঠে এলো নওশাদ। টাকনুর কাছটাতে কামড় দিয়ে ধরে রেখেছে একটা জোঁক। নখের সাহায্যে আস্তে আস্তে সেটাকে শরীর থেকে উপরে ফেলে দিলো নাজির। গামছাটা ড্রেন থেকে ভিজিয়ে এনে ক্ষত স্থান মুছে দিতে দিতে বললো,“ক্ষেতে কাম করতে গেলে এমন একটু আধটু হয়, কতকিছুতেই কামড়ায়। গা পুড়াইয়া জ্বর আসে, বিষব্যথা করে। কিন্তু ব্যাডা মাইনষেগো তাতে ডর লাগলে চলবো না। ডর, বিষ জিনিসটা ব্যাডা মাইনষেগো লাইগা না।”

মোছা শেষ হতেই জমাট বাঁধা রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগলো। নাজির সেখানে ভেজা গামছাটা বেঁধে দিয়ে নিজেই নেমে পড়ল কাজে। নওশাদ বিমূঢ় দৃষ্টিতে চুপচাপ শুধু দেখে গেলো। একসময় বললো,“আমি কী ভুল করলাম, ভাই?”

“কেমন ভুল?”

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলো না নওশাদ। নাজির জিজ্ঞেস করল,“ক্যান, আফসোস হয়?”

“বোধহয়।”

“লাভ নাই। আফসোস জিনিসটা খুব খারাপ। ধরতে গেলে লোভের মতোই খারাপ। বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব নষ্ট কইরা দেয়।”

“কিন্তু ভুল তো করেছি।”

“আপাদ দৃষ্টিতে দেখতে গেলে ভুল তুই করছোস কিন্তু তার ভাগিদার আমিও কম না।”

“তুমি! কীভাবে?”

“অতিরিক্ত তোলা তোলা কইরা বড়ো করছি তোরে। উচিত আছিলো বইয়ের দিকে শুধু ঠেইলা না দিয়া বাস্তবতা সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, একটু কষ্ট দিয়া বড়ো করা। তাইলে হয়তো এত নরম মনের মানুষ হইতি না, হুদাই অন্যের মিষ্টি কথা আর চোখের পানিতে ভুলতি না।”

নওশাদ আবার চুপ থাকে। অনেকক্ষণ ভেবে তারপর জিজ্ঞেস করে,“এখন উপায়?”

“মন শক্ত কর, সবার আগে নিজের আত্মসম্মানরে গুরুত্ব দে, নিজের বিবেক আর মাথা দিয়া ভাবতে শিখ, নিজের মতামত দিতে শিখ। তাইলেই জীবনের অর্ধেক সমস্যা মিইটা যাইবো।”

ঘাসের উপরে শুয়ে পড়ে‌ নওশাদ। স্থির চোখে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাদা বক উড়ে যাচ্ছে কোথাও। তুলোর মতো মেঘেরা ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ছুটোছুটি করছে। ছেলেবেলায় নওশাদও ঠিক এমনটাই করতো। বড়ো ভাইয়ের আঙুল ধরে কিংবা পিছুপিছু মাঠে ঘাটে দৌড়াতো। তার জীবনে ভরসার স্থল, মাথার উপর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছ একমাত্র তার বড়ো ভাই। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক ভাইও রয়েছে যারা সামান্য কিছু অর্থ, সম্পদের লোভে ত্যাগ করে নিজের ভাই-বোনদের।

ক্ষেতের সব আগাছা পরিষ্কার করে উঠে এলো নাজির। বললো,“বাড়িত চল।”

নওশাদ উঠে দাঁড়ালো। পিছুপিছু হাঁটতে লাগলো। দূরে দেখতে পেলো মতিন আর দেলোয়ার যাচ্ছে। চোখা দৃষ্টিতে পেছন ফিরে দুই ভাইয়ের দিকে একপল তাকিয়ে বাঁক নিলো ভিন্ন রাস্তায়। নাজির ওদের দেখিয়ে বললো,“এই মানুষগুলারে দেখছোস? ওগো কাম অন্যের বাড়ি কী হয়, না হয় তার খবর বাহির কইরা অন্যের সংসারে নাক গলানো। অথচ ওগো জীবনে কিন্তু সুখ-শান্তি নাই, ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নাই, মায়েরে ভাত দেয় না, অসুইখা বাপের সেবা করে না। হেগো সকাল শুরু হয় বউ পোলাপাইনের ক্যাচাল দিয়া, দিন শেষে ঘুমাইতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তা চলতে থাকে। তাই এতসব জটিলতার মাঝখান দিয়া অন্যের শান্তি হেগো সহ্য হয় না। হেরা ভাবে, আমগো জীবনে যা নাই অন্যের জীবনে ক্যান তা থাকবো? আমরা যেইডা পাই নাই অন্যেরা ক্যান তা পাইবো? এমন কইরাই হিংসা আর লোভ জন্মায়। এই দুইডা জিনিসই খুব খারাপ রে, নওশাদ। জীবন, সম্পর্ক, শান্তি ধ্বংস কইরা দেয়। মানুষ কত কথা কইবো, তা ধইরা লাভ আছে? একবেলা না খাইয়া থাকলেও কেউ কহনো জিগাইবো না, খাইছোস? কইবো না, আয় আমি খাওয়াই। বরং তারা সামনে থাইক্যা খাওন কাইরা নিতে চাইবো। তাই জীবনে যা করবি নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়া ভাইবা, চিন্তা করবি। আল্লাহর উপরে বিশ্বাস রাখবি।
ট্যাহা পয়সা, ধনসম্পদ জীবনের সবকিছু না। কিন্তু মানুষ তা বুঝে না। দুনিয়াতে এমন কইরা চলে যেন তারা অমর! অথচ মাটির তলার সাড়ে তিন হাত কবর অপেক্ষা করতাছে তাগো লাইগা, দুনিয়ার কিচ্ছু তহন লগে যাইবো না। জীবনে ততটুকুই করবি যতটুকু কইরা কবরের আজাব সহ্য করতে পারবি, আল্লাহর সামনে গিয়া দাঁড়াইতে পারবি।”

নাজির থামলো। সময় নিয়ে বললো,“দুনিয়া একটা পরীক্ষাক্ষেত্র। সেই পরীক্ষা ক্ষেত্রে সুখের স্বপ্ন দেখা বিলাসীতা। মানুষ ততটুকুই পাইবো, যতটুকু সে অন্যের লগে করবো। বইয়ের শিক্ষা দিয়া তুই হয়তো ভালা একটা চাকরি পাইবি কিন্তু বাস্তবমুখী শিক্ষা, অভিজ্ঞতা দিয়া তুই এই দুনিয়ায় সম্মান লইয়া, মাথা উঁচা কইরা রবের পথে টিইকা থাকতে পারবি। এহন সিদ্ধান্ত তোর। তুই কোনদিকে যাবি?”

এই ক্ষণিকের কথপোকথনে নওশাদ তার জীবনের বহু সমস্যার সমাধান পেয়ে গেলো। খুঁজে পেলো দিশেহারা আঁধারের মধ্যে এক টুকরো আলো।

চলবে ________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here