#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩০]
টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। কোনো এক অদৃশ্য রোষে ক্ষণে ক্ষণে গর্জে উঠছে আকাশ। বৈরী প্রকৃতির ছায়ায় ঘরজুড়ে খেলা করছে ঘোর অন্ধকার। দিনের পর দিন এভাবেই কেটে যায়। শ্রাবণের অবসান ঘটিয়ে আগমন ঘটে ভাদ্রের। তারপর ধীরে ধীরে সেও সময়ের স্রোতে বিদায় নিলে আশ্বিন এসে নিঃশব্দে ঠাঁই নেয় ধরায়।
বৃষ্টিতে আধভেজা হয়ে দুপুরের রান্না শেষে বাড়ির গৃহিণীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভাতের মাড় গালিয়ে ভেজা উঠোন পেরিয়ে বড়ো পাতিলটা ঘরে রেখে এলো মিছরি। ফরিদার সাহায্যে এই ক’দিনেই সে রপ্ত করে ফেলেছে সাংসারিক অনেক কাজ। চুলা ধরানো, ভাতের মাড় গালানো, থালা-বাসন মাজা থেকে শুরু করে টুকটাক সবকিছুই। এখন শুধু রান্না বান্নাটাই যা বাকি।
বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমতেই গোসল সেরে নেয় মিছরি। গামছা দিয়ে চুল মুছে ভেজা চুলে খোঁপা করে, কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে সোজা চলে যায় খাবার ঘরে। গরম ভাত, সুগন্ধি লেবু আর দেশি মুরগির ঝোল নিয়ে প্রবেশ করে শ্বশুরের ঘরে। তাকে দেখেই আনন্দে আটখানা হয়ে ওঠেন সুবহান আলী শাহ। বাচ্চাদের মতো নাড়াতে থাকেন হাত। মিছরি গ্লাসে পানি ঢেলে, ভাত মাখাতে লাগলো।
“আজ দেশি মুরগি আর কয়েক পদের ভর্তা তৈরি করা হয়েছে। আপনি তো আবার ঝাল খেতে পারেন না। তাই ঝাল দেওয়ার আগেই আপনার জন্য উঠিয়ে রেখেছিলাম।”
মাখানো শেষে মুখে লোকমা তুলে দিতেই শব্দ করে চিবোতে লাগলেন সুবহান আলী শাহ। প্রথম প্রথম এই মানুষটাকে মিছরি ভয় পেলেও, এখন আর পায় না। নাজিরই এক মাস ধরে জোর করে নিজ তত্ত্বাবধানে বাবাকে স্ত্রীর হাতেই খাবার খাইয়েছে। সুবহান আলী শাহও বুঝদার মানুষ। ছেলের হাতে খাওয়ার সময় বাচ্চাদের মতো আচরণ করলেও পুত্রবধূর কাছে বেশ শান্তশিষ্ট থাকেন।
মুখের খাবার শেষ করে হয়তো কিছু বললেন তিনি, কিন্তু মিছরি কিছুই বুঝলো না। দ্বিতীয় লোকমা মুখে দিয়ে আন্দাজে বলল,“আপনার বড়ো ছেলে বাড়িতে নেই। সকালের খাবার খেয়েই বাবু সাহেব সেজে শহরে গিয়েছে। কেন গিয়েছে, আমায় বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।”
খেতে খেতেই কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনলেন তিনি। মিছরি পুনরায় বললো, তবে এবার কণ্ঠে জমা হলো অভিযোগ,“আপনার ছেলেটা একদম ভালো নয়। কোনো শিক্ষা দিক্ষা দেননি? সারাক্ষণ মুখ দিয়ে পঁচা কথা বের হয়, আমাকে বকে। বাবার বাড়িতেও যেতে দেয় না।”
মেয়েটার ঠোঁট উল্টানো দেখে সুবহান আলী শাহর মায়া লাগলো। ঘ্যারঘ্যার আওয়াজ করে বাম হাতটা নাড়িয়ে ইশারায় বললেন, ছেলে বাড়ি ফিরলেই আচ্ছামতো শাসন করবেন তাকে। মিছরি কিছুই বুঝে না। খাওয়ানো শেষ করে সাবধানে মুখ মুছিয়ে দিয়ে কিছু ওষুধ সেবন করালো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো,“আমি এখন যাই। আপনি বিশ্রাম নিন।”
তা শুনে লোকটার মুখ ভার হয়ে গেলো। এই একা ঘরে সঙ্গিহীন জীবন তাঁর একদম ভালো লাগে না। অথচ কেউই যেন বুঝতে চায় না। শুধু নিয়ম করে তিনবেলা খাইয়েই চলে যায়। মাঝেমধ্যে মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে ছোট্ট আব্দুল্লাহ আসে। বিছানার বসে কী যে গল্প করে! সুবহান আলী শাহ ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও বেশ আনন্দ পান। আব্দুল্লাহও খুশি হয়, খিলখিল করে হাসে। তবে কয়েকদিন ধরে ছেলেটা আসছে না। মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলো? নাকি অসুস্থ? কাউকে যে জিজ্ঞেস করবেন সে উপায়টুকুও নেই। ছেলে ছাড়া কেউই তো বোঝে না তাঁর ভাষা।
মিছরি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। এঁটো প্লেট ধুয়ে বারান্দায় বসলো। আকাশের মতো তারও আজ মন খারাপ। নাজিরের জন্য? ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। এই বাড়িতে তার ভীষণ একা লাগে। কেউ হেসে দুটো কথা পর্যন্ত বলে না। নাজির তাকে যতই বকুক কিংবা কাজে ব্যস্ত থাকুক, একটু পর ঠিকই এসে ফাজলামি করে, হাসাহাসি করে। কিন্তু আজ সকাল থেকেই ব্যাটা বাড়িতে নেই। কখন আসবে কে জানে? ছাতাটাও সঙ্গে নেয়নি। যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল আকাশ তখন ফকফকা পরিষ্কার, পূর্ব দিগন্তে আলো ছড়াচ্ছিল আগুন সূর্য। অথচ তারপরেই নামলো তুমুল বর্ষণ।
দুপুরে আর খাওয়ার কথা মনে পড়ল না মিছরির। কেউ একবারের জন্যও ডাকলো না তাকে। থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে উদাস কিশোরীর ন্যায় বসে রইল সে। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে কে জানে? আচমকাই কোথা থেকে ভেসে এলো ডাক,“ফুফু! ফুফু!”
মিছরির ধ্যান ভাঙলো। চতুর্দিকে তাকাতেই দাঁড়িয়ে থাকা সুজাতাকে দেখে দৃষ্টিতে জমা হলো বিস্ময়।পরনে লাল ফ্রক, মাথায় শিং এর মতো বাঁধা দুটো ঝুঁটি। চিকন ঠোঁট জোড়ায় ঝুলছে টানটান হাসি। কিছু মুহূর্ত থম মেরে নিজের জায়গাতেই বসে রইল মিছরি। আকস্মিক ঘটনার সত্যতা টের পেয়ে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে ঝাপটে ধরে অবিশ্বাস্য স্বরে বললো, “সুজাতা!”
সুজাতা কিছু সময় চুপ থাকে। পরক্ষণেই কৈ মাছের মতো ছটফট করতে করতে অস্বস্তি নিয়ে বলে,“উঁহু, ছাড়ো ফুফু। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
তাকে ছেড়ে নিচু হয়ে বসলো মিছরি। দুই বাহু ধরে জিজ্ঞেস করল,“তুই এখানে?”
“মা সিফাতকে ঘুম পাড়াচ্ছিলো, সেই সুযোগে আমি চলে এসেছি এখানে।”
কথাটা শুনেই অভিমান জমা হলো মিছরির মনে। মুখ ভার করে বললো,“এতদিন আসিসনি কেন? মনে পড়েনি আমাকে?”
“মা আসতে দেয়নি। দুইবার লুকিয়ে আসতে গিয়ে সেজো চাচার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম।”
কান্না পেলো মিছরির। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো,“হ্যাঁ, বাঁধা তো দেবেই। এখন আমি পর হয়ে গেছি না? এই জন্যই তো দুই মাসে একবারও কেউ দেখতে আসেনি। সবাই খারাপ।”
হেলেদুলে সুজাতাও তার পিছুপিছু এলো। চারিদিকে তাকিয়ে বললো,“ছোটো দাদু রোজ তোমার কথা বলে। দাদা তোমার সাথে দেখা করতেও চেয়েছিল, কিন্তু দেয়নি।”
উপরের নিচু চাঙ থেকে বয়াম নামিয়ে বিস্কুট বের করে ভাতিজির হাতে দিয়ে প্রশ্ন করে মিছরি,“কে দেয়নি?”
“জানি না। সবাই এসব নিয়ে গল্প করছিল, আমি তখন শুনে ফেলেছি। পরে মা বকা দিয়ে বললো, এইখানে তোর কী কাজ?”
হাতের বিস্কুট দুটো খেয়ে আবারো হাত পাতলো সুজাতা। মিছরি পুরো বয়ামটাই তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিছানায় আয়েশ করে বসলো। খেতে খেতে গুঁড়া দিয়ে মুখ মাখিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। চিবোতে চিবোতে বললো,“তোমার শ্বশুরবাড়ি সুন্দর।”
“হ্যাঁ, তা বলা যায়।”
“বড়ো বাবার অসুখ।”
“কী অসুখ?”
“মনে হয় জ্বর। ঘর থেকে তেমন একটা বের হয় না। মা সেদিন বলেছে, বড়ো বাবাকে বিরক্ত করিস না।” থেমে এবার প্রশ্ন করল,“তুমি যাবে?”
“না, ডেকেছে নাকি?”
“আহা, চলো তো। নিজেদের বাড়িতে ডাকতে হবে কেন? তুমি রাস্তা চেনো না?”
চুপ করে থাকে মিছরি। সুজাতা ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে,“তুমি বউ সেজে আছো কেন?”
“আমি তো বউই।”
“কার?”
“ভুলে গেছিস? নাজির শাহর বউ। তোর ফুফা হয়।”
“কোথায় ফুফা?”
“জাহান্নামে।”
“ওখানে তো মরার পর যায়।”
“সে জীবিত অবস্থাতেই গেছে।”
আছরের আজান পড়ল। মিছরি মাথায় কাপড় দিয়ে সুজাতাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে শিকল আটকে তালা দিলো।চারিদিকে ভালো করে দেখলো একবার। না, কেউ নেই। মর্জিনার ঘর থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। তারা সবাই গল্পে মশগুল। এখন আর বের হবে বলে মনে হয় না। তাই বললো,“চল।”
“কোথায়?”
“বাড়িতে।”
“আগে ওখান থেকে চালতা পেড়ে দাও।”
সুজাতা আঙুল তাক করে দেখালো। মিছরি সেদিকে তাকালো। মুমিনুল শাহর দালানের পাশে বিশাল এক চালতা গাছ। এবার গাছ ভর্তি চালতা এসেছে। বিথীর মুখে শুনেছে, পূর্বে নাকি এত চালতা কখনো এ গাছে হয়নি। এটাই প্রথম। অত উঁচু গাছ থেকে চালতা পারা কী মিছরির পক্ষে সম্ভব? চাইলে অবশ্য গাছে ওঠা যায়! তবে কেউ দেখলে ঝামেলা হতে পারে। তবুও সুজাতাকে নিয়ে গাছের নিচে গেলো সে। না, একটা চালতাও নিচে পড়েনি। মুখ ভার করে এদিক ওদিক তাকাতেই নজরে পড়ল বারান্দায় সারিবদ্ধভাবে সাজানো কিছু চালতা। অধরে হাসি ফুটে উঠলো মিছরির। সেখান থেকে পাঁচটা চালতা নিয়ে দুইটা সুজাতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“নে, এবার চল।”
সুজাতার খুশি যেন আর ধরে না। আচার খেতে সে ভীষণ পছন্দ করে। বিশেষ করে চালতার আচার।তবে তাদের বাড়িতে এই চালতা গাছটিরই অভাব। মাথায় ভালো করে ঘোমটা টেনে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে মিছরি। আজ বহুদিন পর বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে। নাজির একটুও বের হতে দেয় না। অসভ্য লোক, যেন বিয়ে নয় বরং তাকে আসামি করে কয়েদখানায় এনে বন্দি করে রেখেছে। এসব মনে পড়লেই লোকটার প্রতি রাগ জন্মায় মিছরির।
আজান হওয়ায় একটু পরপর রাস্তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করছে। কেউ মসজিদে আবার কেউ বা যাচ্ছে দোকানপাড়, হাটে। যেতে যেতে সকলেই তাদের দিকে একবার হলেও তাকাচ্ছে। শেষমেশ একজন পথ রোধ করে দাঁড়ালো। সুজাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“তুই সুজনের মাইয়া না?”
সুজাতা উপরনিচ মাথা নাড়ালো। লোকটা পুনরায় প্রশ্ন করল,“তোর পাশেরজন কেডা? তোর মায়?”
সুজাতা জিভে কামড় দিলো,“না, আমার ফুফু।”
“কোনডা?”
সুজাতার হাত চেপে ধরলো মিছরি। নিচু মাথাটা তুলে সোজা তাকালো। লোকটাকে চিনতে তেমন অসুবিধা হলো না। সেদিন বিচারসভায় এই লোকটাও উপস্থিত ছিল। কী নাম যেন? মিন্নত ব্যাপারি বোধহয়। মিছরি আর দাঁড়ালো না সেখানে। পাশ কাটিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেলো। মিন্নত ব্যাপারি ঘাড় ফিরিয়ে তাদের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,“ওহ, নাজির শাহর বউ!”
কাঁচা রাস্তার এখানে সেখানে কাঁদা পানি জমেছে। পা রাখলেই ডেবে যাচ্ছে, নয়তো ছিটকে উঠে পোশাক নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু আকাশের তর্জন গর্জন আর তীব্র বাতাস এখনো থামেনি। সাবধানে পা ফেলে গন্তব্যে পৌঁছে গেলো দুজনেই।
বাড়ির ভেতরে পা রেখে বুক ভরে শ্বাস নিলো মিছরি। বহুদিন পর সবকিছু আপন আপন লাগছে। এই তো তার বাড়ি! উঁহু, বিয়ের আগে ছিল। এখন শুধু বাপের বাড়ি। হাতে ধরা চালতাগুলো দালানের সিঁড়ির উপর রেখে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে নেয় সে। মনের সুখে সারা উঠোন জুড়ে দৌড়ে বেড়ায়, ঢিল ছোঁড়ে জলপাই গাছে। সেই ঢিলে জমিনে লুটিয়ে পড়ে একটি আধপাকা জলপাই। সুজাতা দৌড়ে গিয়ে তা তুলে নিলো হাতে। আবদার করে বললো,“আরো পেড়ে দাও, ফুফু।”
মিছরির কর্ণকুহরে সেকথা পৌঁছালো না। খাঁচা থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া বিহঙ্গ সে। কী করবে তাই যেন বুঝে উঠতে পারছে না। ভেতর থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে সৈয়দুন নেছা বেরিয়ে এলেন,“কেডায় ঢিল ছোঁড়ে? কার এত্ত বড়ো সাহস!”
বাইরে এসেই বেশ অবাক হলেন বৃদ্ধা। হঠাৎ থেমে গেলো তাঁর তেজদীপ্ত কণ্ঠস্বর। মিছরি দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরলো দাদীকে। কাঁধে গাল ঘষে আহ্লাদ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছো, বুড়ি?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালা। তুই কেমনে আইলি?”
সুজাতা দাম্ভিক কণ্ঠে বললো,“আমি নিয়ে এসেছি।”
তাদের কথোপকথনের শব্দে পারুল, দিলারা বেগম, পলিও বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। মেয়েকে দেখতেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠলেন পারুল। বুকের সাথে জড়িয়ে নিলেন আদরে,“আমার মিছরি! কতদিন পর দেখলাম আমার মাইয়াডারে!”
ননদকে দেখে পলির খুশি আর ধরে না। দিলারা আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“জামাই কই?”
উত্তর দিলো না মিছরি। পারুল বিরক্তি নিয়ে বললেন, “মাইয়াডারে কতদিন পর দেখলাম! প্রশ্ন ছাড়ো তো, বুবু। আয় ভিতরে আয়, আম্মা। মুখটা শুকাইয়া গেছে একেবারে। দুপুরে খাইছোস?”
দুদিকে মাথা নাড়ালো মিছরি। পারুল আঁতকে উঠলেন,“হায়হায়, ক্যান? কত বেলা হইয়া গেছে, এতক্ষণ ধইরা তুই না খাওয়া? কেমন বাড়িত বিয়া দিছে! আমার মাইয়াডারে না খাওয়াইয়া রাখছে।”
হায়হুতাশ করতে করতে রান্নাঘর থেকে থালা ভর্তি ভাত, মাছ নিয়ে এলেন পারুল। সিঁড়িতে বসালেন মেয়েকে। সৈয়দুন নেছা চাপা স্বরে বললেন,“আহা, বউ! এইগুলা কেমন কথা? তোমার মাইয়া কী ছুডো পোলাপাইন মানুষ? অন্যেরে কইয়া খাওয়াইতে হইবো ক্যান? নিজের পেটের খবর নিজে জানে না?”
শাশুড়ির কথা শুনেও শুনলেন না পারুল।আচ্ছা করে ভাত মাখিয়ে মেয়েকে খাইয়ে দেওয়ায় মনোযোগী হলেন। এতদিন ধরে মায়ের হাতের বড়ো বড়ো লোকমার অভাববোধই করছিল মিছরি। ছোটো মামীও অবশ্য খাওয়ানোর সময় এত বড়ো লোকমাই মুখে ঠেসে দিতো। কিন্তু মায়ের মতো কী আর কেউ হয়? খাওয়াতে খাওয়াতে করুণ গলায় পারুল জিজ্ঞেস করলেন,“ওইখানে খাওয়ার অনেক কষ্ট না রে, মা?”
উত্তর দিলো না মিছরি। মুখে খাবার নিয়ে সিফাতের সাথে খোঁচাখুঁচি করতে সে ব্যস্ত। দিলারা জিজ্ঞেস করলেন,“ওই বাড়িত সবাই কী একলগেই খায় নাকি ভিন্ন? রান্ধন বাড়ন কেডায় করে?”
“ছোটো চাচারা আলাদা খায়, রান্নাঘরও আলাদা। আমরা খাই বড়ো চাচাদের সাথে। রান্না করে বড়ো চাচী আর ভাবি। আমি রান্না পারি না বলে রোজ বকে। সব দোষ তোমাদের। তোমরা শেখাওনি কিছু।”
দুঃখে পারুলের চোখের কোণে অশ্রু জমলো। স্বামীর উপর রাগও হলো। অন্য সময় হলে তো মেয়ের জন্য ভালোবাসা উতলে পড়ে। দোষারোপ করে তাকে, যেন মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি। অথচ ঠিকই নিজে ছোট্ট মেয়েটিকে নরকে ঠেলে দিয়েছে। বাম হাত দিয়ে মেয়ের হাতটা টেনে নিলেন। আহ সূচক শব্দ করে উঠলো মিছরি। পারুল আঁতকে উঠলেন,“কী হইছে? দেখি দেখি!”
বাম হাতটা চোখের সামনে ধরতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন তিনি। বুড়ো আঙুলের কাছটায় ঠোসা পড়ে কালচে হয়ে গিয়েছে চামড়া। এবার নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলেন না পারুল। গলায় কান্না দলা পাকিয়ে এলো। নাক টেনে শাশুড়ির উদ্দেশ্যে অভিযোগের সুরে বললেন,“দেহেন আম্মা, দেহেন। সুন্দর, নরম হাতটার কী অবস্থা হইছে! আব্বায় আর আমনের পোলায় মিল্যা আমার মাইয়ার জীবনডা শেষ কইরা দিছে।”
“চুপ থাহো তো। দুনিয়াত তোমারই শুধু মাইয়া আছে, আর কেউর নাই। কম গালমন্দ তো করো নাই এই মাইয়ারে। বরং আরো ছুডোকালে বিয়া দিয়া দিতে চাইছিলা। এহন যত রংঢং। কাজকাম করতে গেলে এমন একটু হয়। আমগোও কম হয় নাই। আমার যহন প্রথম বিয়া হইছিলো তহন আমার বয়স আছিলো এগারো। আমি কী মইরা গেছি? নাকি জীবন ধ্বংস হইয়া গেছে? সময় থাকতে কাম শিখাইলে আইজ এমন হইতো না। যেনে মায় কিছু শিখায় নাই সেইখানে চাচী শাশুড়িরা কী শিখাইবো?”
পারুলের মাতৃ মন সেকথা মানতে নারাজ। সৈয়দুন নেছা নাতনিকে টেনে তুললেন,“আয়, দাদার লগে দেখা কইরা আইবি।”
“দাদাজানের নাকি অনেক অসুখ?”
“অনেক না, ওই একটু ঠান্ডা লাগছে। বুইড়াকালে এই ঠান্ডাই অনেককিছু।”
আকবর মিয়া বিছানায় আধশোয়া। কাশেম আলীও সেখানেই বসে আছেন। কোনো বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছেন। নাতনিকে দেখে বাকিদের মতো তিনিও যারপরনায় অবাক হলেন।
“মিছরি!”
“আসসালামু আলাইকুম, দাদাজান।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।”
কাশেম আলী চট করে পিছু ফিরে তাকালেন। কন্যাকে দেখে গম্ভীর মুখখানায় ঝলকে উঠলো সূর্যের মতো হাসি। মিছরি একপলক বাবার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কথা বলবে না সে। বাবার উপর তার পাহাড়সম রাগ জমেছে। আকবর মিয়া তাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। মিছরি এসে বসলো। টুকটাক প্রশ্নের উত্তর দিলো। মেয়ের ফোলা ফোলা গাল আর বাঁকা চাহনি দেখে কাশেম আলী তার রাগটা খুব সহজেই ধরে ফেললেন। সাফাই দেওয়ার ভঙিতে বললেন,“আম্মায় কী তার আব্বার উপরে রাগ কইরা আছে? রাগ করে না, আম্মা। কত যে তোমার কথা আমার মনে পড়ছে!”
“মিথ্যা কথা। মনে পড়লে দেখা করতে যেতে।”
“চাইছিলাম কিন্তু বারবার গিয়াও বাড়ির কাছ থাইক্যা ফিরা আইছি। শত্রুগো বাড়িত কেমনে ঢুকি?”
“তাহলে শত্রুদের বাড়িতে বিয়ে দিয়েছো কেন?”
প্রশ্নের উত্তর ভদ্রলোকের কাছে নেই। অসহায় দৃষ্টিতে পিতার দিকে তাকালেন। আকবর মিয়া বললেন, “একলা একলা আইছোস, দাদু?”
“তো কার সাথে আসবো? সুজাতা গিয়েছিল আনতে।”
“নাতজামাই কই? হেয় জানে?”
“বাড়িতে থাকলে তো জানবে। সেই সকালে শহরে গেছে।”
“তারমানে না জানাইয়া আইয়া পড়ছোস? বাড়ির বাকি মাইনষেগো তো কওয়া উচিত আছিলো।”
“কাকে বলবো? প্রয়োজন ছাড়া কেউ আমার সাথে ভালো করে কথা বলে না। শুধু শত্রুর মেয়ে শত্রুর মেয়ে করে দূরে সরিয়ে রাখে। আমি ওখানে আর যাবো না।”
কাশেম আলী পিতাকে আর কিছু বলতে নিষেধ করলেন। মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে তাঁর। দাঁতে দাঁত পিষে জিজ্ঞেস করলেন,“নাজির কিছু কয় না হেগো?”
“উনার সামনে কিছু বললে তো! একবার বলেছিল, তাতেই আচ্ছামতো বকা দিয়েছিল। তারপর থেকে আর সাহস পায় না। যা বলে সব উনার অগোচরে বলে। আর উনাকে দেখলেই চুপ। বজ্জাত মহিলা।”
“নাজির কেমন?”
“ভালো না।”
“ক্যান? কিছু কইছে হারামজাদায়? গায়ে হাত তুললে ওর জান লইয়া লমু।” কঠোর শোনালো কাশেম আলীর স্বর।
“না, হাত তোলে না। তবে শুধু বকে, কথা শোনে না।”
এবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন কাশেম আলী।
_________
দিনটি চমৎকার। বহুদিন পর নিজেকে একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ মনে হচ্ছে নওশাদের। গত মাসেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে উঠে এসেছে একটি ভাড়া বাড়িতে। এলাকা কিছুটা ঘিঞ্জি, বাসাও হয়তো ছোটো তবে এখানেই যেন সে পাচ্ছে রাজ্যের আনন্দ। কারো কাছ থেকে তো অন্তত আর শুনতে হবে না যে সে ঘরজামাই। পুরুষের সম্মান, আনন্দ সবকিছুর মূল যেন এখানেই। আত্মসম্মান ছাড়া পুরুষ মানুষের আর কীই বা থাকে এই পৃথিবীতে?
লেখাপড়ার পাশাপাশি শহরের এক টিউন গ্যালারিতে পার্ট টাইম চাকরি নিয়েছে সে। দুপুর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে সেই কাজ। সকালে বাড়িওয়ালার ছেলে-মেয়েকে প্রাইভেট পড়ায়। দুজন এবার উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে।
কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো নওশাদ। ততক্ষণে রাত নেমেছে ধরণীতে। ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিলো লিলি। আজ তার চেহারা থেকে অন্যরকম এক জৌলুস ঠিকরে পড়ছে। চোখেমুখে প্রশান্তি, ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। ভেতরে ঢুকতেই খানিকটা থমকে গেল নওশাদ। বিছানার চাদর পাল্টানো, ঘর ভর্তি নতুন আসবাবে। লিলি গ্লাসে করে পানি এনে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“নাও, খাও। খুব ক্লান্ত লাগছে, তাই না? যাও, তাড়াতাড়ি গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আজ গরুর গোশত রান্না করেছি।”
পানির গ্লাসটা ধরলো না নওশাদ। সরাসরি প্রশ্ন করল,“কে এসেছিল বাড়িতে?”
“মেজো ভাইয়া।”
“এই রেফ্রিজারেটর, খাবার টেবিল, সোফাও কী তারাই দিয়ে গিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কেন আবার? নতুন সংসার আমাদের। ফাঁকা ঘর দেখতে ভালো লাগে? তাই ভাইয়াকে দিয়ে বাবা সব পাঠিয়ে দিয়েছে। সোফাটা সুন্দর হয়েছে না? আর রেফ্রিজারেটর ছাড়াই বা আজকাল চলে?”
“যৌতুক দিয়ে গেলো?”
“এসব আবার কেমন কথা? উপহার এগুলো। সব বাবারাই তার মেয়েদের দেয়।”
“কিন্তু তোমার বাবা দিতে পারবে না। তা আমি পইপই করে বলে দিয়েছি। তোমার স্বামী যা রোজগার করে তা নিয়েই তোমাকে খুশি থাকতে হবে। এসব গ্ৰহণ করার সময় কী আমার সম্মানটার কথা একবারও ভেবে দেখেছিলে?”
“তুমি কী বেশি বলে ফেলছো না?”
“কমই বলেছি। আমার সাথে সংসার করতে হলে এসব তোমার বাবার বাড়িতে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবে। কাল বাড়ি ফিরে যেন এসব আর ঘরে না দেখতে পাই।”
কথাগুলো বলেই যেভাবে এসেছিল তার থেকেও দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো নওশাদ। লিলি কিছু বললো না। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করল। এই ছেলেটা যে তার জীবন পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় তা আর লিলির অজানা নয়।তবে লিলিও কম নয়। কিছুতেই এসব জিনিসপত্র সে ফেরত পাঠাবে না। মেয়ে হিসেবে বাবার থেকে এসব তার পাওনা। সেও দেখবে নওশাদ কী করে।
চলবে _________

