#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
#উপসংহার
মৃতদেহের পাশে বসে পুত্রবধূরা কাঁদছে। শাশুড়ির জন্যও কেউ এমন করে কাঁদে? তাও আবার সম্পর্কে তিনি সৎ শাশুড়ি। চোখের পানিই যেন বুঝিয়ে দেয় মৃত নারী তাঁর জীবদ্দশায় সংসারের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। কান্নার শব্দে প্রতিবেশী নারীরাও ছুটে এসেছে দ্বারে। এই জীবনে বৃদ্ধা তাদের কম উপকার করেনি। আশির দশকে অনাহারে যখন ভুগেছিল তখন নিজের সিন্দুক থেকে চাল, ডাল বিলিয়ে দিয়েছিলেন। একাত্তরে হানাদারদের কবল থেকে তরুণীদের লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজের বাড়ির চিলেকোঠায়। সেই উপকার ভুলবে কী করে সবাই?
মৃত্যুর আগে ছেলেদের পইপই করে সৈয়দুন নেছা বলে গিয়েছেন, মৃত্যুর পর বেশিক্ষণ যাতে তার লাশ রেখে দেওয়া না হয়। মাইকে ঢালাওভাবে জানানোরও প্রয়োজন নেই। রাতের আঁধারে লোক জড়ো না করে স্বামীর পাশেই যেন তাকে দাফন করা হয়।
দাদী শাশুড়ির মৃত্যু সংবাদ পেয়েই স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছুটে এসেছে নাজির। তবে ভেতরে এখনো প্রবেশ করেনি। বিগত মাসগুলোতে মৃত্যু তাদের জীবনে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। এখন আর কষ্ট লাগে না, অবাক হয় না। শুধু একটা হাসিখুশি মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছে ভেবে শূন্যতা অনুভব হয় ভেতরে। তবে সেই শূন্য স্থানই বা আর কদিন শূন্য থাকে?
আজকাল নাজিরও মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পায়। সুযোগ পেলেই সিজদায় লুটিয়ে আল্লাহর কাছে মাফ চায়। সৈয়দুন নেছার মৃত্যুতে সে উপলব্ধি করল, তাকে ঠিক ভুল সম্পর্কে বোঝানোর মতো আরো একজন মানুষ তার জীবন থেকে চলে গিয়েছে।
মাসুম, রুহুল দাদীকে শেষ দেখা দেখে ফুপুদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। মিল্টনকে সঙ্গে নিয়ে নাজির গেলো কবর খুঁড়তে। মসজিদের খাটিয়া এনে বাড়ির উঠোনে রেখে দাদীর জন্য শেষ বাজার করতে হাটে চলে গেলো সুজন আর তালেব।
মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে মেয়েরা আর দেরি না করে তৎক্ষণাৎ স্বামী, সন্তান নিয়ে চলে এলো বাপের বাড়ি। সরলা এলো ভাতিজাদের সঙ্গে। বৃদ্ধ বয়সে তারাও কাঁদলো। কাঁদলো নাতি-নাতনিরা। শেষ গোসল দিয়ে সৈয়দুন নেছার প্রাণহীন দেহটাকে কাফনে জড়িয়ে সেই রাতেই যথাসময়ে দাফন কার্য সম্পন্ন করা হলো। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাশেম আলী চোখের পানি ছেড়ে বললেন,“মা কী বুঝার আগেই মা হারাইছি। আল্লাহর দয়ায় আরো একজন মা পাইলাম। হেই মাও গেলো গা, বাপ তো আরো আগেই গেছে। এহন বাড়ি ফিরা কার কাছে ছুটমু? কে বিপদে ভরসা দিবো, মাথায় হাত বুলাইয়া দিবো?”
নজরুল আলম নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। এই বয়সে এসে কাঁদার মতো বোকামি করতে চাচ্ছেন না বলেই মনে হচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু মনে মনে বললেন,“আল্লাহ, আমার আম্মারে তোমার কাছে রাইখা গেলাম। তারে ভালা রাইখো, সব ভুল মাফ কইরা বেহেস্তবাসী কইরো।”
ধীরে ধীরে সবাই বাড়ি ফিরে এলো। সৈয়দুন নেছা শুধু রয়ে গেলেন স্বামীর কবরের পাশে, নিজের নতুন ঠিকানায়। যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। এটাই চূড়ান্ত গন্তব্য, দীর্ঘ যাত্রার শেষ পথ।
শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে নওশাদ, শালিকও বাড়ি ফিরে এসেছে। মিছরিটা এখনো কাঁদছে। তার এটুকু জীবনে দাদী ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র। হতাশায় আশ্বাস দেওয়ার সঙ্গী। সেই দাদী আর নেই, তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে ভাবলেই বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। ছেলেটা ক্ষুধার চোটে রুবিনার কোলে কাঁদছে। কীভাবে কান্না থামাবে বুঝতে পারছে না রুবিনা। হাতের ইশারায় সুজাতাকে ডেকে বললো,“বাবু কানতাছে, কী করমু? তোমার ফুফুরে ডাকছি কিন্তু হুনে না। ছুডো দাদীরে ডাক দেও।”
“ছোটো দাদী ওই পাশে ফুফু দাদীদের সাথে বসে আছে। ডাকলে বকবে।”
রুবিনা বিপাকে পড়ল। অন্য কিছু খাওয়ানো গেলে সে নিজেই খাইয়ে দিতো। বেলীর ফিডার বিছানায় পড়ে আছে। তার চিন্তার মধ্যে হঠাৎ সেখানে পলির দেখা মিললো। জিজ্ঞেস করল,“পোলাপাইনডা কহন ধইরা কানতাছে আর তুমি এনে মগার মতন দাঁড়াইয়া রইছো? মিছরি কই?”
“হেয়ও কানতাছে। একবার লইয়া গেছিলাম হের কাছে, পোলার মিহি চায় নাই পর্যন্ত। এহন কী করি?”
“বেলীরে তোমার কাছে রাইখা ওরে আমার কাছে দেও। আইয়ো দেহি, আব্বা। মামীর কাছে আইয়ো।”
রুবিনার কোলে বেলীকে দিয়ে নক্ষত্রকে নিয়ে মিছরির কাছে এলো পলি। মেয়েটা সেই কখন থেকে দাদীর বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নক্ষত্রকে তার পাশে শুইয়ে দিলো পলি। বললো,“তোমার পোলা ক্ষুধায় কানতাছে। ওরে ক্যান কষ্ট দিতাছো কও তো? ওয় কী মানুষ মরার কষ্ট বুঝে? ওরে খাওয়াইয়া দেও। বাপের কাছে দিয়া আহি।”
মায়ের চোখে পানি দেখে অবুঝ নক্ষত্রের কান্না থেমে গেলো। ঠোঁট উল্টে অভিমানী চোখে তাকিয়ে রইল। কি মায়া সেই দৃষ্টিতে! মিছরি উপেক্ষা করতে পারলো না। চোখের পানি মুছিয়ে কপালে চুমু দিলো, ক্ষুধা নিবারণ হওয়া পর্যন্ত পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। খেতে খেতেই এতক্ষণ চিৎকার করে কাঁদতে থাকা ছেলেটা ঘুমিয়ে গেলো। পলি চাইলেও মিছরি ছেলেকে আর কাছ ছাড়া করল না।
সেই রাতে কারো চোখে ঘুম নামলো না। বাধ্য হয়েই রাতটা শ্বশুরবাড়িতে থেকে গেলো নাজির। নওশাদ অবশ্য শালিককে নিয়ে চলে গিয়েছিল বাড়ি।
মৃত্যু শোকের থেকে আরো বড়ো কোনো শোক আছে কিনা নাজিরের জানা নেই। সৈয়দুন নেছা পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর পৃথিবীর তিল পরিমাণ ক্ষতিও হলো না। দৈনন্দিন জীবন সময়ের নিয়মেই চলতে থাকলো।
মাঘ প্রায় শেষের দিকে। পলাশ গাছে কলি ধরা শুরু করেছে। হঠাৎ এক ব্যস্ত দুপুরে গ্ৰামের মেঠোপথে দেখা মিললো মুমিনুল শাহর বড়ো পুত্র নাজমুল শাহর। চুল, দাড়ি বাড়ন্ত। বংশ পরম্পরায় পাওয়া সুন্দর চেহারাখানা মলিনতার নিচে ঢাকা পড়েছে। চেনার উপায়টুকুও যেন নেই। সদ্য জেল থেকে মুক্তি মিলেছে তার। সরাসরি ভুক্তভোগীকে আঘাতের প্রমাণ না থাকায় জামিন মঞ্জুর হয়ে গিয়েছে।
শাহরিয়ার আর সামিউলটাই এখনো ছাড়া পায়নি। তাদের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তার আগমনে বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড় জমেছে। ফটকের সামনে থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে।
বাড়ির ভেতরে পা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাজমুল। উঠোনের আগাছা দিয়ে পায়ের মাংসপেশি ঢেকে যাচ্ছে, দুপাশের দুই দালানে শ্যাওলা জমেছে, মায়ের রান্নাঘরের চালা ভাঙা, গোসলখানার টিউবওয়েল দিয়ে পানি বের হচ্ছে না। কী অবস্থা তাদের পুরোনো বাড়িটার? কোথায় সেই দাপট, ক্ষমতা, ভাইদের দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া আর হৈ হৈ কলরব? নাজমুলের হাঁটু ভেঙে আসে। বাবা, ভাইদের কথায় প্রভাবিত হয়ে করা ভুলের জন্য আফসোস জাগে অন্তঃকরণে। কিন্তু লাভ কী সেই আফসোসের? মানুষ মেরে, হাসি-খুশি সুন্দর সম্পর্কগুলো নষ্ট করার পর আফসোস করে, কেঁদেকেটে কী লাভ? যেমন লাভ হচ্ছে না মুমিনুল শাহর আফসোসে! বাবাকে দেখেও মন কেঁদে উঠলো নাজমুলের। বোঝার আর বাকি রইল না, রব কর্তৃক পাপের শাস্তিই যে এসব। যা কেবল শুরু। ভয়ে মায়ের সাথে আর দেখা করতে সে যায়নি। তবে শিউলির সাথে দেখা করেছে, ক্ষমা চেয়েছে। পৃথিবীর সব স্ত্রীরা মিছরি বা মর্জিনার মতো হয় না। কিছু স্ত্রী আছে শিউলির মতো। যারা সমাজের ভয়ে, সংসার করার লোভে স্বামীর করা সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। শিউলিও তাই করেছে। সবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এসেছে।
মহাসড়ক দিয়ে আসা যাওয়ার পথে তার সাথে বেশ কয়েকবার নাজিরের চোখাচোখি হয়েছে। তবুও কেউ কারো সাথে কথা বলেনি। নাজমুল অবশ্য অনেকবার ভেবেছে, নিজের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাইবে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য জড়তা তাকে বিবেকের কাছে বারবার আটকে দেয়।
পারভেজটাকে আজকাল কোথাও দেখা যায় না। গুদামের সব মালামাল আর মালবাহী গাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে কোথায় যে ছেলেটা হারিয়ে গেলো? তার জন্য নাজিরের ভারি কষ্ট হয়। মনে হয়, এই ছেলেটাই শেষ পর্যন্ত ঠকে গেলো, একা হয়ে গেলো। ছেলেটা নওশাদের মতো বোকা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে আগলে নেওয়ার মতো কেউ নেই। নাজিরের মতো দায়িত্ববান একজন বড়ো ভাই নেই।
চায়ের দোকানে এই নিয়ে রোজ আড্ডা চলে। কেউ শাহদের জন্য আফসোসও করে। কী যে এক লোভে পড়ে এত সুন্দর একটা পরিবার ভেঙে গেলো? অথচ তাদের পরিবারেও কী লোভ, হিংসা কম আছে? রোজই তো বউদের মধ্যে চুলাচুলি লাগে, সম্পদ নিয়ে মারামারি আর ঝগড়া হয়। নাজিরের সামনাসামনি অবশ্য কেউ এসব কথা বলে না। নইলে ঠিক মুখের উপর উচিত জবাব দিয়ে দিতো। তবে নাজির আগের তুলনায় অনেক বদলে গিয়েছে। সেই ছন্নছাড়া, লাগামহীন ছেলেটা আর নেই। যার তার সাথে আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করে না, মুখ দিয়ে কটু শব্দও বের হয় না। সে এখন নীরব, পরিশ্রমী। যে রবের উপর সদা বিশ্বাসী। যে নিজের অতীতে করা কর্মের দ্বারা লজ্জিত।
সময় পরিবর্তনশীল। শোক কাটিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে গেলো নিজেদের জীবন নিয়ে। নতুন দালানের ইটের গাঁথুনি দেওয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে মিস্ত্রীরা। টিনের ঘর ছেড়ে কয়েকদিন আগেই জিনিসপত্র নিয়ে মাটির ঘরে উঠেছে নাজির আর নওশাদ। টিনের ঘর ভেঙে সেখানে বড়ো একটা চুলা বানিয়ে এখন মিল্টন আর তার স্ত্রী স্বপ্না মিলে খেজুরের রস জাল দেয়। এসবে আবার মেয়েটা বেশ পারদর্শী। তার বাবারও একসময় গুড়ের ব্যবসা ছিল। তাই সেখান থেকেই শিখেছে।
সংসারের কাজকর্ম সেরে বাকি সময় স্বামীর সঙ্গে এই বাড়িতেই মেয়েটা পড়ে থাকে। শালিকের সাথে তার আবার গলায় গলায় ভাব। তা নিয়ে মিল্টনের মা সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করেন। মাঝেমধ্যে মিছরির কাছে এসে আফসোস করে বলেন, ছেলেটা নাকি বউ পেয়ে তাঁর হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। নির্ঘাত বউটা চাল পড়া খাইয়ে বশ করেছে। নইলে মায়ের কথায় উঠবস করা ছেলে এখন নিজে নিজেই কীভাবে সব সিদ্ধান্ত নেয়? মিছরি তাঁর সামনে গম্ভীর থাকলেও আড়ালে জায়ের সাথে বসে এসব নিয়ে খুব হাসে।
রস জাল দিয়ে ঘন করা শেষ। জ্বলন্ত খড়ি টান দিতে গিয়ে হাতে সেঁকা লাগলো স্বপ্নার। মিল্টন কাজ ফেলে দৌড়ে এলো। স্ত্রীর হাতটা টেনে ধরে উন্মাদের মতো জিজ্ঞেস করল,“কী হইছে? কই দুঃখ লাগছে, বউ? তোমারে কইছি না এইসব কামের দরকার নাই। তুমি শুধু দেখবা।”
ঠান্ডা পানি এনে স্ত্রীর হাত ভিজিয়ে রাখলো। স্বপ্না আঁচল কামড়ে লাজুক হেসে বললো,“আমনে একটু বেশি বেশি করেন। এমন সেঁক কত খাইছি বাপের বাড়ি থাকতে!”
“বাপের বাড়িত খাও গা, আমার বাড়িত আমার কাছে ক্যান খাইবা? যাও গিয়া বারান্দায় বও।” শাসন করার ভঙিতে বললো মিল্টন। পিছু ফিরে তাকাতেই নাজিরের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। ঘাড় চুলকে বললো, “একটুও কথা হুনে না। খালি কাম দেখলে দৌড়াইয়া আইয়ে।”
নাজির কিছু বললো না। যেখানে তার মতো এক খিটখিটে, বদরাগী পুরুষ বউভক্ত সেখানে তার সহকারী আর কেমন হবে? কাতলা মাছটা রান্নাঘরে রেখে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললো,“মাছটা মাত্রই বরশীতে উঠছে। হাটে নিতাছিল। লগে লগে আমি কিন্না লইয়া আইলাম। আনাজ দিও না, বেশি বেশি পেঁয়াজ মরিচ দিয়া কসা কইরা ফেলাইয়ো।”
মিছরি মাথা নাড়ালো,“আচ্ছা।”
“আমার পোলা কই?”
“মনে হয় চাচার কাছে।”
“ওই মফিজরে দেখলেই এহন আমার মাথামোতা গরম হইয়া যায়। বাড়িত এমন একটা জাদুর বাক্স আনছে যে এহন আর বউ পোলাপাইন লইয়া বাড়িত একটু শান্তি পাই না। মহিলাগুলা কুইটনামি থুইয়া আমগো বাড়িত আইয়া পইড়া থাহে।”
মিল্টন বললো,“নওশাদ ভাইয়ের উপর আমিও নারাজ, ভাইজান। আমার বউডায় হেইদিন কয়, হের স্বপ্নের পুরুষ বলে আলমগীর। আমি তো হুইন্না টাস্কি খাইয়া ওই পাড়ার আলমগীরের লগে ইচ্ছা মতন কাইজ্জা করলাম। বাড়িত আইয়া হুনি ওই পাড়ার আলমগীর না, এই বাক্সর নায়ক আলমগীর হের পছন্দ।”
স্বপ্না মুখ বাঁকিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে মিছরির পাশে বসলো। নাজির আঙুলের সাহায্যে রস নিয়ে খেতে খেতে বললো,“এর লাইগাই ঝামেলা? কাইল বিহালে ছ্যাড়ায় আইয়া আমার কাছে বিচার দিলো।”
“আর কী কমু? আমার সংসারে কবে জানি বড়ো ধরণের অশান্তি লাগে।”
“এইদিক দিয়া তোর ভাবি আবার ভালা। আমারে ছাড়া তার আর কেউরে ভাল্লাগে না। আর লাগবোই কেমনে? আমি কী নায়কের থাইক্যা কম?”
“কী যে কন না? মনে আছে, শ্রীপুর ঘুরতে গিয়া একবার এক ডিক্তর আমনেরে ছায়াছবির প্রস্তাব দিছিলো?”
“আর কইস না।”
“ওইটা ডিরেক্টর হবে। বাংলায় পরিচালক।” নওশাদ বলে উঠলো। নাজির তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ছেলেকে নিয়ে নিলো নিজের কোলে।
স্বপ্না ফিসফিস করে বললো,“দেখছেন বুবু, কেমন চাপা মারে ব্যাডা মাইনষে?”
মিছরি চুলা থেকে ছাই তুলতে তুলতে বললো,“বাদ দাও, চাপা মারা এদের জাত স্বভাব।”
“দেন, মাছ আমি কাইট্টা আনি।”
“হাতে ফোস্কা পড়েছে না? এখন আর এসব করতে হবে না। বাড়িতে গিয়ে শাশুড়িকে একটু সাহায্য কর। এমনিতেই তোমার উপর নারাজ।”
“হের কথা কইয়েন না, বুবু। মহিলা দজ্জাল। কইলজা কাইট্টা দিলেও কইবো, লবণ কম হইছে। আমিও সাবানা না।”
“সাবানা কে?”
“জসিমের বউ। মাইয়াডা ভোলাভালা। শাশুড়ি, ননদ ছ্যাঁচা দিলেও কিছু কয় না।”
“জসিম আবার কে?”
“আরে ছায়াছবির নায়ক। আমনে চিনবেন কেমনে? দেহেন না তো।”
মিছরি মাছ নিয়ে চলে গেলো। শালিক এতক্ষণ ঘরে ছিল। সেও এলো। দুপুরের রান্নার আয়োজন করতে হবে।
স্বপ্না মেয়েটা বিয়ের পর থেকে ছায়াছবির বড়ো ভক্ত হয়েছে। সব নায়ক-নায়িকার নাম মুখস্থ। বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার বিকেলে টেলিভিশনের ঘরে পাড়ার নারী, বাচ্চাকাচ্চাদের ভিড় লেগে থাকে। নাজির মাঝেমধ্যে এ নিয়ে ভাইয়ের উপর রাগ ঝেড়ে বলে, “কী একটা ঝামেলা লগে কইরা আনছোস? আর ভাল্লাগে না।”
নওশাদ কিছু বলে না। প্রত্যুত্তরে শুধু হাসে। তার ব্যস্ততা আজকাল আকাশচুম্বী। নতুন ব্যবসার পেছনে ভালোই ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। একটা ব্যবসা দাঁড় করানো কী চারটে খানি কথা? নাজির এতে ভীষণ খুশি। ছেলেটা অন্তত নিজের জীবন নিয়ে হেলাফেলা বাদ দিয়ে সংসারি আর পরিশ্রমী হচ্ছে। অতীতের সমস্ত কালো অধ্যায়কে পেছনে ফেলে নতুন জীবনে উদ্যমী হয়ে উঠেছে। আর কী চাই?
গুড়ের কাজ শেষ হতে দুপুর পেরোলো। মাচা থেকে খড়কুটো নামিয়ে গরুগুলোকে খেতে দিয়ে ঘাস কেটে আনতে চলে গেলো নাজির। সমস্যা হলেও এই কাজটা সে নিজেই করে।
আজ চিরাচরিত বৃহস্পতিবার। দুপুরের ভোজন শেষে বিছানায় আর গা লাগালো না নওশাদ। ব্যাগে নিজের পোশাক গুছাচ্ছে। শালিক আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে এলো। স্বামীর কাজকর্ম দেখে মুখ ভার করল। নওশাদ ব্যস্ত হাতে কাজ করতে করতে বললো,“রাতে আজ ফিরবো না। অনেক দূরে যেতে হবে। মালপত্র আনতে হবে। ফিরতে ফিরতে ধরো কাল, পরশু তো লাগবেই! সাবধানে থেকো, নিজের খেয়াল রেখো।”
“ধুর, বিয়া কইরা ফাঁসছি। একলা একলা আমার আর ভাল্লাগে না।”
“একা কোথায়? সারাদিন বাড়িতে মানুষ গিজগিজ করে। জা হিসেবে নিজের মামাতো বোন পেয়েছো, কয়েক পা হাঁটলেই নানার বাড়ি। এত সুবিধার মধ্যেও একা?”
“জামাই যদি দূরে থাহে, এতশত সুবিধা দিয়া আর কী কাম?”
“তা জামাই কাছে বসে থাকলে চলবে কী করে? তুমি চাও না আমি কিছু করি?”
“চাই তো। আমনে ভালা কিছু করলে আমিই সবচেয়ে বেশি খুশি হমু।”
“তাহলে আফসোস আর মন খারাপ যে?”
“নক্ষত্রের মতন একটা পোলাপাইন দিয়া যান। যে মা মা কইয়া আমারে ডাকবো, চোখের আড়াল হইলে কানবো। তাইলে আর আমনের বিরহে মন খারাপ করমু না।”
নওশাদ চমকে তাকালো। শার্টের বোতাম লাগাতে থাকা হাতটা থেমে গেলো। মেয়েটা দিনদিন সব লাজ লজ্জা ভুলে বসছে। এগিয়ে এসে কোমর জড়িয়ে ধরে বললো,“এখন এত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময়? আগে বললে না কেন, পাখি? আচ্ছা যাও, কালই চলে আসবো। তারপর দশ মাসের জন্য ছুটি।”
স্বামীর বুকে ধাক্কা মেরে দূরে সরে গেলো শালিক। গোছগাছের অবশিষ্ট কাজ নিজেই সমাপ্ত করে বললো,“কইতে হইবো কেন? আমনে পুরুষ মানুষ বুঝেন না?”
“কীভাবে বুঝবো বলো? চালাক তো নই। বোকাসোকা মানুষ।”
“ঢং, না বোঝার ভান ধইরা থাকেন।”
নওশাদ হাসলো। মেয়েটা ভারি অদ্ভুত। এসেই তার জীবনটা কেমন বদলে দিয়েছে। নওশাদ কী কখনো ভেবেছিল তার এত সুন্দর একটা সংসার হবে? পেছন থেকে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে মান ভাঙাতে লাগলো।
খাওয়ার পর নাজির আর বিছানায় গেলো না। একটু পরেই নিশ্চিত নারীগুলো বিরক্ত করতে চলে আসবে। বাড়ি এখন ফাঁকা বলা চলে। মিল্টন বউকে নিয়ে নিজের বাড়ি চলে গিয়েছে। গোয়ালের গরুগুলো খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। এদের তেমন একটা বের করে না নাজির। ছাগল পাশের ক্ষেতে বাঁধা। কচি ঘাস খেয়ে সেখানেই শুয়ে আছে। আছরের আজান দিলে খোপে ঢোকাবে। শালিক কয়েকটা মুরগি পালন শুরু করেছে। তার দেখাদেখি মিছরিও শুরু করেছে। এতে সংসারে নাকি আয় হবে। বাইরে থেকে অযথা ডিম কিনে আনতে হবে না।
নক্ষত্র একটু একটু বসতে পারে। এখনো বালিশে হেলান দিয়ে বিছানায় বসে আছে। মিছরি ঝুনঝুনি নাড়িয়ে ছেলের সাথে খেলছে। তাদের দেখে মা-ছেলে কম, দূরসম্পর্কের ভাই-বোন লাগছে বেশি। ভাবনাটা মাথায় আসতেই চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো নাজির। খেলার মাঝখান থেকে কোলে তুলে নিলো ছেলেকে। মিছরি বিরক্তি নিয়ে বললো,“কোলে নিলেন কেন? এখন ওর ঘুমানোর সময়।”
“এত ঘুমাইয়া করবো কী? আইয়ো আব্বা, ঘুইরা আহি।”
“আ…ব..ব
“হ, কও আব্বা।”
বাবার ঠোঁট নাড়ানো দেখে নক্ষত্র পুনরায় চেষ্টা করল। মিছরি বললো,“বাবা ডাক শেখান। তার আগে মা ডাক শেখাতে হবে। মা বলো, মা।”
“ইম…
স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারে না। নাজির ঘর থেকে বের হতে হতে বললো,“মায়রে টাটা দেও। টা টা।”
বাবাকে অনুসরণ করে পেছনে ফিরে ছোটো ছোটো হাত নাড়িয়ে মাকে টাটা দিলো নক্ষত্র। নাজির বললো,“দরজায় শিকল লাগাও। চাইলে নক্ষত্রের মায়ও আমগো লগে আইতে পারে। না করমু না।”
শাড়ি ছেড়ে আজ সালোয়ার কামিজ পরেছে মিছরি। গৃহিণী থেকে কিশোরী লাগছে বেশি। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দরজার শিকল আটকে স্বামী-ছেলের পিছু হাঁটতে লাগলো সে। বিয়ের পর থেকে স্বামী আর বাপের বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যাওয়া হয়নি তার। একেবারে যেন ঘরবন্দি হয়ে আছে। তবুও মেয়েটার কোনো অভিযোগ নেই। দাদী মারা যাওয়ার পর থেকে চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। নাজির ভেবে রেখেছে, ছেলেটা হাঁটতে শিখলেই এদের মা-ছেলেকে নিয়ে ঘুরে আসবে সে।
মিছরি অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,“উল্টো পথে যাচ্ছি কোথায়?”
“চোখ যেইদিকে যায়। এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?”
মিছরি প্রত্যুত্তর করল না। নাজির এসে দাঁড়ালো তার বেগুন ক্ষেতে। ক্ষেত ভরে এবারো বেগুন হয়েছে। জিজ্ঞেস করল,“বেগুন ভর্তা খাইবা?”
উত্তর দিলো না মিছরি। ছেলের হাত নাড়িয়ে বললো, “বছর দুয়েক আগে এই ক্ষেত থেকে না বুঝে বেগুন ছিঁড়েছিলাম বলে এক অভদ্রলোক আমায় অনেক অপমান করেছিল, বেগুন চোর উপাধি দিয়েছিল। আজ দিন বদলেছে, এই বেগুন ক্ষেত এখন আমার, ক্ষেতের মালিকও আমার, এমনকি ভবিষ্যৎ মালিকও আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন। এই দিন, দিন না রে নাজির শাহর বাচ্চা। আল্লাহ কখন কার অহংকার, দম্ভ ভেঙে যে চুরমার করে দেন!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়িয়ে আশেপাশে তাকালো মিছরি। নাজির ফ্যালফ্যাল নয়নে স্ত্রীর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে শব্দ করে হেসে উঠলো। তার হাসি দেখে নক্ষত্রও গা দুলিয়ে হাসলো। নাজির স্ত্রীর গাল টেনে দিয়ে বললো,“হ, সব তোমার। আর আমি বানের জলে ভাইসা আইছি।”
মিছরি মুখ বাঁকালো। নাজির পথ বদলালো,“ক্ষেত দেখবা?”
“আবার কোন ক্ষেত?”
“হউরা ক্ষেত।”
মিছরি না বুঝে তাকিয়ে রইল। নাজির ছেলের উদ্দেশ্যে বললো,“মায়ের মতন শুদ্ধমারানি হবি না। হউরা বুঝে না। সরিষা, বউ।”
“আমার ছেলে শুদ্ধ ভাষাই শিখবে। সরিষা এখনো কাটেননি?”
“না, এইবার বীজ লাগাইতে দেরি হইয়া গেছে। তাই আরেকটু বাত্তি হোক।”
অলস দুপুর বেলা। কোথাও মানুষের চিহ্নটুকুও নেই। গ্ৰামের মানুষ দুপুরে পেট পুরে খেয়ে নাকে সরিষা তেল দিয়ে ঘুমাতে পছন্দ করে। আইল ধরে স্ত্রীকে নিয়ে সরিষা ক্ষেতে এলো নাজির। নীল আকাশের নিচে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত শুধু হলুদ রং দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেতে ইতোমধ্যে ফসল কাটা শেষ।মিছরির চোখে বিস্ময় খেলা করছে। বেশি সময় সেই বিস্ময় আটকে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “পুরোটাই আমাদের?”
“না, এইখান থাইক্যা ওই পাশের তালগাছ পর্যন্ত আমগো।”
“শুনেছি সর্ষের মধ্যে নাকি ভূত, পেত্নী থাকে? তার উপর এখন আবার দুপুরবেলা। চলুন বাড়ি ফিরে যাই।”
“পেত্নী কহনো পেত্নীরে ধরে হুনছো?”
বাঁকা দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকালো মিছরি,“আমি পেত্নী? আমায় পেত্নী বললেন?”
“না, তুমি তো আমার পরী, ময়না পাখি।”
মিছরির ভীষণ রাগ হলো। লোকটা তাকে পেত্নীর সাথে তুলনা দিয়েছে। শোধ না তুলতে পারলে কিছুতেই শান্তি পাবে না সে। নাজির নিষ্পলক দৃষ্টিতে স্ত্রীর রাগে ফোলা গাল দুটো দেখছে। মাথা থেকে ওড়না ফেলে খোঁপা করা চুল খুলে দিলো মিছরি। ঘন চুল দিয়ে পিঠ আর কোমর ঢেকে গেলো। সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ সে ঢালু জায়গা থেকে নেমে পড়ল ক্ষেতে। মূহূর্তেই মিশে গেলো হলুদে। নাজির অবাক হলো,“মাথা গেছে? করো কী?”
“আপনি আমায় পেত্নী বলেছেন না? এবার সত্যি সত্যি পেত্নী হয়ে আপনার ঘাড় মটকাবো।”
নাজির মুচকি হাসলো। ছেলের কানে ফিসফিস করে বললো,“তোর মা কী সুন্দর, দেখছোস? এত সুন্দর মাইয়া মানুষ আমি আমার জীবনে প্রথম দেখতাছি।”
নক্ষত্র কী বুঝলো কে জানে? মাই, মাই করতে করতে হাত নাড়ালো। বাপ, ছেলে মুগ্ধ চোখে সরিষা ক্ষেত জুড়ে বিচরণ করা মেয়েটাকে দেখছে। খাঁচায় বন্দি পাখি হঠাৎ ছাড়া পেয়ে দ্বিগিদ্বিক ভুলে যেমন মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায়? মিছরির হয়েছে সেই দশা। বহুদিন পর মেয়েটা মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে। নাজির তাকে বাঁধা দিলো না, বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো। একবার ছেলে, তো আরেকবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করল। পূর্ণতার স্বাদ বুঝি এমনই হয়? তার চোখ জোড়া ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। টোকা দিলেই যেন গড়িয়ে পড়বে অশ্রু। ঠোঁটে জ্বলজ্বল করছে প্রাপ্তির হাসি।
রক্তের স্বাদ একবার যে পায় সে নাকি আর ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু নাজিরের বেলায় কথাটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সে ফিরে এসেছে। রবের পথে ফিরে এসেছে। অবশেষে তার নিজের ঘর হয়েছে, মানুষ হয়েছে, সংসার হয়েছে, এমনকি সে বাবা হয়েছে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে থাকা সরল মেয়েটিই তাকে টেনে এনেছে পাপের দ্বারপ্রান্ত থেকে। নাজির আকবর মিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ। মন থেকে বুড়োর জন্য দোয়া করে। মাঝেমধ্যে বাজে স্বপ্ন দেখে যখন তার ঘুম ভেঙে যেতো তখন এই মেয়েটাই তাকে আগলে নিতো। অসহায় হয়ে যখন সে বলতো,“জীবনে যা পাপ করছি! যদি অভিশাপ হইয়া ফিরা আইয়ে?”
তখন এই মেয়েটাই মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো,“ভুলে যান সেসব। পথভ্রষ্টতা ছাড়া তেমন কিছুই নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফিরে আসা, যাত্রা ভুল জেনে বদলে ফেলা। যা সবাই পারে না। কিন্তু আপনি পেরেছেন। অসাধ্য সাধন করেছেন।”
নাজির এখন নিজের জীবন বদলানোর যাত্রায় ব্যস্ত। তার মস্তিষ্কে দুনিয়াদারির চিন্তা থেকে পরকালের চিন্তা এখন বেশি। সাহসী, পরিশ্রমী নাজির নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ব্যস্ত, তার মন এখন জাহান্নামের ভয়ে ভীত। তার সমস্ত বিশ্বাস শুধু রবের উপর, রবের ফয়সালার উপর। সে বিশ্বাস করে, দুনিয়ায় যে যা করেছে তার বিচার পরকালে হবে। যে যা হারিয়েছে তার থেকেও দ্বিগুণ আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেবেন।
ক’দিন আগে হাসপাতাল থেকে ঘুরে এসেছে নাজির। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার বলেছে, একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে লাগা ক্ষত শুকায়নি এখনো। মিছরি সেসব জানে না। কী প্রয়োজন তাকে জানানোর? এই সুন্দর সংসার ছেড়ে, স্ত্রী সন্তানকে ছেড়ে নাজির একদিন চলে যাবে। দূরে, বহুদূরে। এটা কোনো কথা? তার অবর্তমানে মিছরি মেয়েটার কী হবে?
অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই নাজির তা মুছে নেয়। ছেলেকে বললো,“তোমার মা দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর সৎ নারী। তারে কহনো কষ্ট পাইতে দিবা না। আমি যেমনে মাথায় তুইল্যা রাখছি, তুমিও রাখবা। জীবনে কহনো হার মানবা না। মনে রাখবা, তুমি নাজির শাহর পোলা।”
নক্ষত্র বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে হলুদের বিরান মাঠে নেমে পড়ল নাজির। জীবন অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু নাজির তার বর্তমান উপভোগ করতে চায়। তার প্রিয় সহধর্মিণী আর ছেলের সাথে সুন্দর স্মৃতি রেখে যেতে চায়।
ফুল ছিঁড়ে মিছরির কানে গুঁজে দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো,“এই সুন্দর যাত্রা শেষ না হোক। শেষ পথে একটু দেরিতে পৌঁছাইলে ক্ষতি কী?”
“সঙ্গে নাজির শাহ থাকলে কোনো ক্ষতি নেই।”
নাজির হাসলো। মা-বাবার হাসি দেখে নক্ষত্রও হাসলো। মুঠো ভরে ফুল ছিঁড়ে বাবার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
পরিশেষে তারা ভালো আছে, সুখে আছে, এতদিন যারা অন্যায় করেছে তারাও ইতোপূর্বে কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। ভালোরা, পরিশ্রমীরা এবং সময় থাকতে ফিরে আসা সবাই তাদের মতো ভালো থাকুক, পূর্ণতার স্বাদ আস্বাদন করুক, যাত্রা তাদের শুভ হোক। চিরকাল রবের উপর বিশ্বাস রেখে হতাশা এবং প্রতিশোধকে ভুলে যাক।
(সমাপ্ত)

