মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_১৮

0
25

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_১৮

রিমির সঙ্গে ছোটো বাচ্চা দেখেই আরশান প্রশ্ন করলো — “Did you adopt this baby?”

আরশানের এমন অদ্ভুত আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে রিমি এক মুহূর্তের জন্য একদম থতমত খেয়ে গেল! — “কী বলছেন! অ্যাডপ্ট করতে যাব কেন? ও আমার ছোট বোন”

আরশান কোনো উত্তর দিল না। ও নিশ্চুপ হয়ে ওর সেই তীক্ষ্ণ আর শীতল দৃষ্টিতে ছোট্ট আয়েশার দিকে তাকাল। আরশানের দীর্ঘদেহী অবয়ব আর ওই গম্ভীর চাউনি দেখে রিমির জামাটা শক্ত করে খামচে ধরে রিমির পেছনে গিয়ে পুরোপুরি লুকিয়ে পড়ল। আয়েশার প্রতিক্রিয়া দেখে রিমি আরশানের দিকে বিরক্তিভরা চোখে তাকিয়ে বলল — “দেখুন, আপনার তাকানো দেখে বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছে। ও আপনাকে চেনে না, তাই প্লিজ এভাবে তাকাবেন না।”

আরশানের ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল যে হাসিটা পরিস্থিতির বিচিত্রতা উপভোগ করার জন্যে! ও এক পা এগিয়ে এসে ধীরলয়ে বলল — “Interesting. ও আমার দেখে এমন করছে যেন আমি ওকে খে’য়ে নেবো। ও যে তোমার বোন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই”

আরশানের এই বাঁকা কথা শুনে রিমি খুব একটা অবাক হলো না। ও জানে লোকটা সব কথাতেই একটু রহস্য মেশাতে পছন্দ করে। ও আয়শাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বিড়বিড়য়ে বললো — “আপনি মিছেই ভয় দেখাচ্ছেন ওকে। ও তো ছোট বাচ্চা, আপনার মতো গম্ভীর মানুষকে দেখেনি তো কখনো, তাই একটু ঘাবড়ে গেছে।”

রিমি আয়শার চুলে হাত বুলিয়ে উত্তর দিল — “আয়েশা অনেকদিন ধরে শিশু পার্কে যাওয়ার জন্য বায়না করছে। আজ একটু ছুটি পেলাম, তাই ভাবলাম ওর ইচ্ছেটা পূরণ করি। আপনিও চলুন আমাদের সঙ্গে”

আরশান শার্টের হাতাটা ঠিক করতে করতে রিমির দিকে ভ্রু কুঁচকাল। শিশু পার্ক মানেই সেই ভিড়, বাচ্চাদের চিৎকার আর ধুলোবালি? ও খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল…

“শিশু পার্ক? অকারণে ওই ভিড়ের মধ্যে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে চলো, আমি তোমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাই। অনেক সুন্দর জায়গা আছে শহরে।”

রিমি বুঝতে পারল আরশান ওর নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে বেরোতে চাইছে না। কিন্তু আয়শার কাছে শিশু পার্কের ওই সাধারণ দোলনাটাই বেশি দামী। রিমি একটু সময় নিয়ে আরশানের চোখের দিকে তাকাল। ওর মনে হলো, এই লোকটা বোধহয় কখনো সাধারণ মানুষের মতো আনন্দ করতে শেখেনি। এক ধরণের কৌতূহল আর অদ্ভুত এক সাহস নিয়ে রিমি বলে ফেলল—

“আমাদের জন্য সুন্দর জায়গা মানেই তো ওই পার্কটা। আয়শা ওখানে যাওয়ার জন্যই মুখিয়ে আছে। আপনার যদি খুব বেশি আপত্তি না থাকে, তবে চলুন না… আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন! আমাদের সাথে ঘুরে আসলে আপনার মেজাজটাও হয়তো কিছুটা ভালো হবে আর ওখানে অনেক মজাও হবে।”

কথাটা বলে রিমি নিজেই একটু থেমে আরশানের মুখটা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলো কারণ ও ভেবেছিল লোকটা হয়তো এখনই গম্ভীর মুখে মানা করে দেবে। আরশান এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রিমির দিকে তাকিয়ে রইল তারপর কিছু একটা ভেবে রিমির পেছনে লুকিয়ে থাকা আয়েশার দিকে তাকাল, যে এখনো বড় বড় চোখে ওকে পর্যবেক্ষণ করছে। আরশান খুব ধীরলয়ে ওর হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময়টা একবার দেখল। তারপর একটা গূঢ় হাসি দিয়ে বলল — “ঠিক আছে! চলো পার্কে। দেখি কেমন মজা হয়”

রিমির চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না—আরশান সত্যি সত্যিই রাজি হয়ে গেল? একদিকে রিমির এই অদ্ভুত ভালো লাগা আর অন্যদিকে আয়শার সেই অজানা ভয়—সব মিলিয়ে বিকেলটা যেন এক নতুন গল্পের সূচনা করতে চলেছে। আরশান পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করে একবার রিমির দিকে তাকাল। ওর চাহনিতে এখন কোনো কঠোরতা নেই, বরং এক ধরণের শান্ত কৌতূহল। ও রিমির পেছনে আধো-লুকিয়ে থাকা আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বেশ গম্ভীর কিন্তু নিচু স্বরে বললো — “Come here, little one”

আয়েশা রিমির জামা শক্ত করে ধরে ড্যাবড্যাব করে আরশানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরশান আগ্রহ দেখাচ্ছে দেখে রিমি আয়েশার মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো করে একটু সামনে ঠেলে দিল। আয়শা দ্বিধম মেশানো পায়ে দু-পা এগোতেই আরশান হুট করে ওকে হুট করে কোলে তুলে নিলো! হঠাৎ এই শূন্যে ভেসে ওঠায় আয়শা প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়ে রিমির দিকে হাত বাড়াতে চাইল। কিন্তু আরশান ওকে বাইকটার সামনের ট্যাংকের ওপর বসিয়ে দিল। আয়শার ছোট ছোট পা দুটো ঝুলছে, আর ওর ঠিক পেছনেই আরশান আষ্টেপৃষ্ঠে আগলে রাখার মতো করে বসল। রিমি বিষয়টা দেখে স্মিত হাসলো, আরশান যে বাচ্চাদের সঙ্গে এতো শান্ত আচরণ করবে ভাবতে পারেনি! তো রিমি এখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে ওর দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচিয়ে বলল আরশান বললো — “What are you waiting for? Get on.”

রিমি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও ভাবতেই পারেনি আরশান এত সহজে একটা বাচ্চাকে কোলে তুলে নেবে! রিমি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে পেছনের সিটে বসল। বাইক চলতে শুরু করলে ঝোড়ো বাতাস ওদের চুল আর ওড়না এলোমেলো করে দিতে লাগল। রিমি ভারসাম্য রাখতে না পেরে অজান্তেই আরশানের কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরল। আরশানের সেই কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আর বাইকের গতি সব মিলিয়ে রিমির মনে হলো ও এক অজানা ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। পার্কে পৌঁছাতেই দেখা গেল তিল ধারণের জায়গা নেই। ছুটির দিন হওয়ায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চারদিকে বাচ্চাদের চিৎকার আর হকারদের হাঁকডাক। আরশান বাইক পার্ক করে হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক পলক চারপাশটা দেখে নিল। ওর কপালে সামান্য বিরক্তির ভাঁজ পড়ল, এই ধরণের জগাখিচুড়ি পরিবেশ ওর পছন্দ না। কিন্তু পাশে দাঁড়ানো রিমির মুখে আনন্দের ঝলকানি দেখে ও আর কিছু বলল না। রিমি গিয়ে টিকেট কাউন্টারের লম্বা লাইন ঠেলে আরশান যখন টিকেট নিয়ে এল, আয়েশা ততক্ষণ আরশানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। ভেতরে ঢোকার পর ছোট্ট আয়েশা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো! চারদিকে কত রকমের রাইড! রঙিন আলো আর মিউজিকের শব্দে পার্কটা যেন এক স্বপ্নপুরী! রিমি আয়েশার হাত শক্ত করে ধরে সামনে এগোতে লাগল। ও দেখল একটা ঘোড়ার রাইড (Merry-go-round) যেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা কাঠের ঘোড়ায় চড়ে গোল গোল ঘুরছে। রিমি আয়শাকে ইশারা করে আরশানকে বলল — “ওই দেখুন, ওটা ওর জন্য পারফেক্ট। ঘোড়ায় চড়ে ও দিব্যি ঘুরতে পারবে। রাইডটাও সেফ”

আরশান এক ভ্রু উঁচিয়ে ওই ধীরগতির ঘোড়ার রাইডটার দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বিদ্রূপের হাসিটা ফুটে উঠল। ও রিমির দিকে তাকিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল — “That’s so boring”

রিমি অবাক হয়ে বলল — “তাহলে কোথায় চড়বে?”

আরশান কোনো উত্তর না দিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল পার্কের অন্যপ্রান্তে থাকা বিশাল এক ‘রোলারকোস্টার’-এর দিকে। যেটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে আর সেখান থেকে মানুষের চিৎকার ভেসে আসছে। রিমি ওটা দেখেই আঁতকে উঠল — “পা’গল হয়েছেন আপনি? ওটা তো অনেক বিপজ্জনক আর বড়রা কিভাবে চিৎকার করছে দেখেছেন? আর ও তো এইটুকু বাচ্চা, ভয় পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করবে”

“তুমি এই রাইডে ভয় পাও নাকি?”

“হ্যাঁ, আমার বাবা অতো সাহস নেই। হালকা রাইডগুলোই ভালো আর বিপদ নেই”

আরশান এবার নিচু হয়ে আয়েশার দিকে তাকালো, ও না থাকলে এতক্ষণে রিমিকে জোর করে নিয়েই ওই রাইডে যেতো যাতে রিমির ওই রাইডের প্রতি ভয় ভেঙে যায়। কিন্তু একটা বাচ্চার সামনে কাউকে ফোর্স করা সভ্য কাজ না বিধায় খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললো — “যা করার তাড়াতাড়ি করো, এই ভীড় আমার পছন্দ হচ্ছেনা”

রিমি আয়েশাকে এক ঘোরায় উঠিয়ে দিয়ে নিজেও উঠলো, আরশান ভ্রু কুঁচকে একটু জোরেই জিজ্ঞাসা করলো — “তুমি এখানে উঠলে কেনো?”

রিমি হেসে বললো — “আমিও রাইড ইনজয় করতে চাই, আপনি এক কাজ করুন। আমাদের কয়েকটা ভালো ভালো ছবি তুলে দিন”

আরশান আর কিছু বলতে পারলো না, তার আগেই ঘোড়া ঘুরতে শুরু করলো। রিমি দেখলো আরশান একপাশে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ও ছবি তুলবে না বুঝে রিমি খানিকটা হতাশ মুখ ঘুরিয়ে নিল। আরশান প্রথমে খুবই বিরক্ত লাগছিল, চারপাশে বাচ্চার মা বাবাদের কথা আর বাচ্চাদের হাসাহাসি চলছে। এর মধ্যে হঠাৎ আরশানের চোখ আটকে গেলো রিমির দিকে, মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসছে যেনো শৈশবের দিনগুলো নতুন করে উপভোগ করছে। আরশান কয়েক মুহূর্ত ওকে দেখে নিজের ফোনটা বের করে স্বযত্নে কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। প্রথমবারের মতো আরশান রিমিকে শুধু নিজের মস্তিষ্কেই নয় বরং নিজের গ্যালারিতেও বন্দী করে নিলো! পার্কে ঘন্টা দুয়েক রিমি আয়েশাকে নিয়ে অনেক মজা করলেও আরশান মোটেও সময়টা ইনজয় করতে পারেনি। কারণ ওর ইচ্ছে ছিলো রিমির সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর, সে সময়টুকু রিমি অন্য কাউকে দিয়েছে সেটা ওর মোটেও পছন্দ হয়নি। রিমির ওই পিচ্ছি বোনের প্রতিও রাগ হচ্ছিল আরশানের! তো পার্কে ঘোরাঘুরি শেষে বাসার রাস্তায় আসার পর আরশান রিমিকে বললো — “ওকে দিয়ে আবার ফেরত আসবে”

“আজ তো অনেক ঘুরলাম, আবার কেনো?”

আরশান চোখ গরম করে বললো — “তুমি কিন্তু আমার সঙ্গে সময় কাটাওনি রিমি!”

রিমি জানে এই লোকের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, তাই ও আয়েশাকে বাসায় দিয়ে আবার ফেরত এসেছিলো। আরশান ওকে লং রাইডে নিয়ে গেছিলো, এতো জোরে বাইক চালিয়েছে যে ভয়ে রিমির হৃদপিন্ড বুঝি গলায় এসে আটকে গেছিলো! ও মাঝে মাঝে ভাবে এই লোকটার এমন অদ্ভুত সব শখ কেনো কে জানে?
_____________________________________

ডিনার শেষে ড্রয়িংরুমের আলোগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেবল করিডোরে একটা মৃদু নীলচে আলো জ্বলছে। আরশান নিচতলায় ওর বাবার ঘরে গিয়েছিল একটা জরুরি ফাইল আর কিছু ব্যবসায়িক আলাপ করতে। বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে ও যখন দোতলায় নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল, তখনই এক নরম হাত পেছন থেকে ওর ডান কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল। আরশান চমকে উঠল না ঠিকই, কিন্তু ওর কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। ও খুব ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। দেখল নীরা দাঁড়িয়ে আছে। নীরা আজ খুব পরিপাটি করে সেজেছে। ও নিজেকে আরশানের সামনে সবচেয়ে আকর্ষণীয় করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আরশান ভ্রু কুঁচকে নীরার সেই সযত্ন সজ্জার দিকে একপলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ও খুব শান্ত এবং শীতল গলায় নিজের হাতটা আলতো করে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল — “কথা তো মুখ দিয়ে বলবে নীরা, তার জন্য হাত ধরার কী প্রয়োজন?”

নীরার দু-চোখে তখন একরাশ আকুলতা নিয়ে প্রশ্ন করলো — “আমাকে কেমন লাগছে আরশান ভাই?”

আরশান উত্তর দিলো — “একইরকম!”

নীরা আরশানের এই উত্তরকে উপেক্ষা হিসেবে নিলো! এই শীতলতা উপেক্ষা করে হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। ওর কণ্ঠে রাজ্যের আবেগ মিশিয়ে বলল — “আরশান ভাই, আমি এতদিন ধরে এ বাসায় আছি। আমি তোমার কাছ থেকে একটু সময় চাই। একটুখানি মনোযোগ চাই। তুমি কি সত্যিই বোঝো না?”

নীরার এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি আর গায়ের ওপর পড়ে অধিকারবোধ দেখানো আরশানের সহ্যসীমা অতিক্রম করে গেল। ও কারো ব্যক্তিগত আবেগের দায়ভার নিতে মোটেও প্রস্তুত নয়, বিশেষ করে যখন সেটা ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়। নীরা কথাটা শেষ করার আগেই আরশান বিদ্যুতের গতিতে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ঝটকাটা এতই তীব্র আর আকস্মিক ছিল যে নীরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে টাল সামলাতে পারল না নীরা। ওর পায়ের নিচের ভারসাম্য হারিয়ে গেল। ও ছিটকে দু-তিন ধাপ সিঁড়ি গড়িয়ে একদম নিচে মেঝেতে গিয়ে পড়তেই আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে। পড়ার সময় ওর গোড়ালিটা সিঁড়ির ধারালো কোণায় লেগে মচকে গেল। ওর চিৎকার শুনে ওর মা এলো, মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখে উনি ভেবেছিলেন পা পিছলে পড়েছে। আরশান তখন ওর ফুফুকে বলবে — “ফুফু, তুমি আমার বিয়ের খুব চিন্তা করছিলে না? আমার মনে হয় তোমার উচিত আগে তোমার মেয়েকে বিয়ে দেওয়া। আবেগের বশে নিজের সীমানাও ভুলে গেছে!”

ওর ফুফু বুঝলো না আরশান কি বোঝাতে চাইলেন? নীরা যন্ত্রণায় ওর পা চেপে ধরে মেঝেতে পড়ে, ওর চোখের কোণে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আরশানের সেসবে পাত্তাই নেই! ও চলে গেছে নিজের ঘরে, নীরার হঠাৎ বোধ হলো ও হয়তো মরীচিকার পেছনে ছুটছে, যা ও আশা করছে সেটা সম্ভব না! সেদিন পার্কে আরশানের সঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারটা বাসার কাউকে জানাতে আয়শাকে বারণ করে দিয়েছিল রিমি। বাচ্চা মেয়েটা বড় বোনের কথা রেখেছে, টু শব্দটিও করেনি। তো এক রাতে, ইলোরা বেগম মেয়ের ঢুকলেন। রিমিকে বিছানায় বসে থাকতে দেখে ওনার পাশে এসে বসলেন। মাকে এই সময়ে ঘরে দেখে রিমি খানিকটা অবাক হলো! হঠাৎ ওর সেদিন বিকেলে শোনা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ওর মা আর মায়ের শাশুড়ির মধ্যে হওয়া ওর বিয়ে নিয়ে আলোচনা! রিমি মাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে ভুলেই গেছিলো, আজ হঠাৎ আবারো মনে পড়লো। ইলোরা বেগম রিমির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে খুব মোলায়েম গলায় কথা শুরু করলেন — “রিমি, শোন। তোর জন্য একটা খুব ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে মাশাআল্লাহ সুন্দর আর পরিবারটাও আমাদের চেনা। আমার মনে হয় তোর জন্যে ভালোই হবে”

রিমির মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় প্রশ্ন করল — “কিন্তু মা, আমি তো সবে অনার্সে পড়াশোনা করছি। এখন এসব বিয়ের কথা কেন আসছে?”

ইলোরা বেগম একটুও দমে না গিয়ে উত্তর দিলেন — “পড়াশোনা তো বিয়ের পরেও করা যায়! ওনারা কথা দিয়েছেন, তোকে সব ধরণের সুযোগ দেবেন। এমন সোনার টুকরো ছেলে কিন্তু বারবার কপালে জোটে না”

রিমি এবার সোজা হয়ে বসল। ওর চোখে এক ধরণের অভিমান আর বিস্ময় খেলা করছে। ও সরাসরি প্রশ্ন করল — “বুঝলাম না মা! হঠাৎ আমার বিয়ে এত আগ্রহ কেন জাগল? আমি তো এখন বিয়ে করতে চাই না, আর আমি নিজেই নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করছি। তোমার ওপর কোনো চাপও দিচ্ছিনা তাহলে এই বিয়ের জবরদস্তি কেন?”

ইলোরা বেগমের গলায় এবার কিছুটা কর্তব্যের সুর ফুটে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন — “জানি রে, তুই চাস না। কিন্তু তুই যেহেতু এখনো আমাদের কাছে আছিস, তোর একটা ভালো গতি করে দেওয়া তো আমার বড় কর্তব্য। দিনকাল যে হারে খারাপ হচ্ছে, একজন শক্ত মানুষের হাতে তোকে সঁপে দিতে না পারলে আমি শান্তিতে মরতেও পারব না আর আমার শাশুড়িও বলছিলেন তোর জন্যে ছেলেটা ভালো হবে।”

মা এরপর ছেলের বংশ-মর্যাদা আর গুণের এক লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে যেতে লাগলেন। রিমির কানে তখন কথাগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। ওর কেবল মনে হচ্ছিল, সবাই মিলে যেন ওর চারপাশটা একটা অদৃশ্য শেকলে বেঁধে ফেলছে। মা যেভাবে প্রশংসা করছেন, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ওনারা মনে মনে সব পাকা করে ফেলেছেন। কিন্তু ওর মনে হচ্ছে এর পেছনে যেনো কোনো কারণ আছে, এ বাসার মানুষ ওর সঙ্গে ভালোমত দুটো কথা অব্দি বলেনা সেখানে এই বাসার যে বড় মানে ওর মায়ের শাশুড়ি সেই কিনা ওর ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ার জন্যে একপ্রকার উঠেপড়ে লেগেছেন? রিমির সন্দেহ হলো, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1DuCgZaEVj/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here