মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #বোনাস_পর্ব

0
23

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#বোনাস_পর্ব

আরশান রিমির ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলল — “ব্যান্ডেজটা কে করেছে? টাইটই তো হয়নি! এভাবে থাকলে তো র’ক্ত পড়া বন্ধ হবে না।”

রিমির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। আরশান যেন ওর অস্তিত্বের চেয়ে ওর ক্ষতের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। আরশানের এই একগুঁয়েমি, রিমির কথা বা অনুভূতিকে তুড়ি মে’রে উড়িয়ে দিয়ে নিজের মর্জিতে সব করার প্রবণতা রিমির রাগকে উসকে দিল। রিমি বারান্দা থেকে উঠে গটগট করে ঘরে চলে এল। আরশানও পিছু পিছু এল এবং ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে আনল। ও রিমির হাতটা পুনরায় ব্যান্ডেজ করার জন্য ধরতেই রিমি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। উঁচু গলায় রিমি প্রশ্ন করল — “আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছি আরশান, সেটার উত্তর দিন। কেন বিয়ে করেছেন আমাকে?”

আরশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত বুলিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করল। গম্ভীর স্বরে বলল — “রিমি, এসব অপ্রয়োজনীয় কথা বলার অনেক সময় পাবে। আগে হাতটা দেখতে দাও।”

রিমির কণ্ঠে হঠাৎ একরাশ হতাশা ঝরে পড়ল!

“এটা দেখে কী হবে? এ তো সামান্য একটা আঘাত। আপনার সঙ্গে থাকতে গেলে আঘাত, কষ্ট আর অপমান এসব তো সহ্য করেই থাকতে হবে, তাই না? আপনার কাছ থেকে আমি এসব ছাড়া আর কিছু আশাও করি না।”

আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে ও রিমির দিকে তাকিয়ে আদেশসূচক স্বরে বলল — “Rimi, give me your hand.”

রিমি এক পা পিছিয়ে গেল। ওর ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল!

“দেখুন আরশান, আমি জানি না আপনার জীবনে আগে কে ছিল বা না ছিল। আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আপনার অতীত নিয়ে। কিন্তু আপনার জেদ আর আপনার পরিবারের জন্য আমি আমার জীবন, আমার শান্তি নষ্ট করতে পারব না। আপনি আমাকে দয়া করে একা ছেড়ে দিন! আমি একা অনেক ভালো থাকব।”

“একা ছেড়ে দিন” এই বাক্যটা আরশানের মস্তিষ্কে যেন একটা বৈদ্যুতিক শকের মতো কাজ করল। ও দ্রুত এগিয়ে এসে রিমির অন্য হাতটা সজোরে ধরে টেনে এনে বিছানায় বসিয়ে দিল। রিমির ওপর ঝুঁকে পড়ে ও হিসহিসিয়ে উঠল — “Not another stupid word, Rimi!”

রিমিকে রীতিমতো জোর করে বসিয়ে রেখে আরশান ওর হাতের ব্যান্ডেজ খুলতে শুরু করল। পুরোনো ব্যান্ডেজটা সরাতেই দেখা গেল ক্ষতটা বেশ গভীর। অনেকটা মাংস চিরে গেছে। আরশান যখন ওষুধ দিচ্ছিল, রিমির চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সারা হাত ব্যথায় টনটন করছে। আরশান ক্ষতের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল — “কীভাবে কে’টেছে হাতটা?”

রিমি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। চোখের জল মুছে বলল — “আমি কর্মে পারদর্শী নই, তাই অসাবধানতায় এমন হয়েছে। মধ্যে থেকে আপনার দাদীর আমলের দামী জিনিস নষ্ট করে ফেলেছি!”

আরশান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা ফুটে উঠল — “তুমি ওই শোপিস আর ওই ফুলদানির কথা বলছো? ওগুলো তোমাকে কে গোছাতে বলেছে?”

রিমি ক্লান্ত গলায় বলল — “এইসব কথা বাদ দিন আরশান। বাস্তবতা এটাই যে আমি গুছিয়ে কিছু করতে পারি না আর পারবও না। আমি আপনার পরিবারের মতো বিলাসিতায় বড় হইনি। ভবিষ্যতে আপনাদের কোনো মূল্যবান জিনিস আমার হাতে নষ্ট হলে আমি দায় নিতে পারব না। আমি সাধারণভাবে ঝামেলাহীন জীবন চাই। আরশান, প্লিজ…আমাকে আপনি যেতে দিন।”

রিমির মুখে বারবার এই ‘যেতে দাও’ কথাটা শুনে আরশানের ধৈর্য আজ সীমা ছাড়িয়ে গেল। ও হুট করেই রিমির দুই গাল এক হাত দিয়ে চেপে ধরল। ব্যথায় রিমির মুখটা কুঁচকে গেল। আরশান ওর খুব কাছে মুখ নিয়ে গর্জে উঠল — “আরেকবার যদি যাওয়ার কথা বলো রিমি, তবে আমি তোমার পায়ে শেকল বেঁধে এখানে ফেলে রাখব! Did I marry you just to let you go?”

“আমার সঙ্গে তো আপনি রাগ দেখানো আর ভয় দেখানো ছাড়া আর কিছুই পারেন না। আমাকে কি আপনার পাঞ্চিং ব্যাগ মনে হয়? নাকি আমার ওপর জোর খাটিয়ে আপনি পৈশাচিক মজা পান? আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে বিয়ে করলে তো তার সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারতেন না, তাই না?”

আরশান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর গালের ওপর রাখা হাতের বাঁধন কিছুটা আলগা হলো। ও বিস্ময়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল — “আমি পছন্দ করি? কাকে?”

আরশানের বিস্ময়ভরা প্রশ্নের জবাবে রিমি সরাসরি নীরার নাম নিল না, কিন্তু ওর কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপের রেশটুকু স্পষ্ট হয়ে উঠল। ও ভেজা চোখে আরশানের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল — “কে সে, সেটা কি সত্যিই আপনি জানেন না? যে আপনাকে চায়, যে আপনার প্রতিটা অভ্যাস নখদর্পণে রাখে, সে তো বারবার আপনার জন্যই এখানে ছুটে আসছে। আপনাদের মধ্যে আগে কী ছিল বা এখন কী চলছে, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আপনাদের এই নাটকের মাঝে পড়ে আমাকে কেন অকারণে অপমান সইতে হবে? এই মানসিক যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করব না।”

আরশান স্থির হয়ে রিমির মুখটা দেখছিল। মেয়েটা যে আগে অনেকটা সময় একা একা কেঁদেছে, সেটা ওর ফোলা চোখ আর লোহিত বর্ণ গাল দেখলেই বোঝা যায়। আরশান বুঝতে পারছিল না রিমি পরোক্ষভাবে কার দিকে আঙুল তুলছে, ও আর রিমিকে কোনো প্রশ্ন করল না কারণ ও জানে এখন রিমিকে কিছু বলতে গেলে ও আরও বিষ উগড়ে দেবে, যা আরশানের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে দেবে। আরশান ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ইনায়ার রুমের দিকে গেল। রিমির মনের ভেতরের খবর পেতে হলে ইনায়াই এখন একমাত্র ভরসা। আরশানকে দরজায় দেখে ইনায়া কিছুটা অবাক হলো — “ভাইয়া? কিছু বলবে?”

আরশান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল — “রিমির কি হয়েছে?”

ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবকিছু খুলে বলল — “ভাইয়া, আসলে ফুপু জোর করে রিমি মানে ভাবীকে দিয়ে ওই ভারী ভারী পাথরের শোপিসগুলো ওপরে রাখতে বলেছিলেন। হাতের ব্যালেন্স রাখতে না পেরে সেগুলো পড়ে ভেঙে যায়। কোনো একটার কোণা ভাঙ্গা ছিলো হয়তো, অতো পুরোনো জিনিস বলে কথা। রিমির হাতটা ওখান থেকেই মারাত্মকভাবে কে’টে যায়। আর ভাইয়া নীরা আপুও তখন ওখানেই ছিল। নিচে ঠিক কী কথা হয়েছে আমি সব জানি না, কিন্তু আমি নিশ্চিত ফুপু আর নীরা আপু ভাবীকে কিছু একটা বলেছে। তখন থেকেই ওর মনটা ভীষণ খারাপ।”

‘ফুপু?’ আরশানের কপালে চিন্তার রেখাগুলো আরও গভীর হলো। ছোটবেলা থেকেই ও দেখে আসছে, ফুপু এ বাড়িতে এলেই এক ধরণের অশান্তি তৈরি হয়। ওর মা সুরভী বেগমকেও কম সহ্য করতে হয়নি ফুপুর এই আধিপত্য বিস্তার। দাদী বেঁচে থাকতে ফুপুকে মাথায় তুলে রাখতেন বলে কেউ কিছু বলতে পারত না, কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। আরশান বুঝতে পারল, নীরা নিশ্চয়ই রিমির কানে কোনো বিষ ঢেলেছে আর ফুপু সুযোগ বুঝে ওকে শারীরিকভাবেও কষ্ট দিয়েছেন। আরশান কোনো কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যার পেছনে সময় নষ্ট করল না। ও নীরা বা ফুপুকে ডেকে কোনো কথা বলতেও চাইল না। যারা রিমিকে আঘাত করেছে, তাদের মুখের সাজানো মিথ্যে শোনার মতো ধৈর্য ওর নেই। ও সোজা ওর বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই সুরভী বেগমকে সামনে পেল আরশান। ওনার চোখেমুখে এক ধরণের বিষণ্ণতা। আরশান সরাসরি জিজ্ঞেস করল — “আম্মু, রিমির সাথে আজ ড্রয়িংরুমে যা হয়েছে, তা কি তুমি জানো?”

“হুমম, আমি তোর বাবার সাথেও এই নিয়ে কথা বলেছি। তোর ফুপু কাজটা মোটেও ভালো করেনি।”

আরশান যেন এই বিষয়টা নিশ্চিতভাবে জানার জন্যই অপেক্ষা করছিল। ও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ওর বাবা আরাফাত সাহেবের স্টাডি রুমে ঢুকল। আরাফাত সাহেব একটা বই পড়ছিলেন, আরশানের হঠাৎ ঝড়ের মতো আসায় উনি কিছুটা অবাক হলেন। আরশান ওনার সামনে পড়ার টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল। ও শান্ত কিন্তু চূড়ান্ত অপমানজনক এক সিদ্ধান্ত শোনানোর ভঙ্গিতে বলল…

“আব্বু, তোমার আদরের বোন আর বোনের মেয়েকে কি তুমি নিজে চলে যেতে বলবে, Or should I see them off?”

আরাফাত সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছুটা হাতাশার সুরে বললেন — “আরশান, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ো না। উনি তোমার ফুপু, এটা ভুলে যেও না।”

আরশানের চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। ও এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটল না। বরং অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে ঘাড় বাঁকিয়ে বলল— “রিমিও আমার স্ত্রী। ও আমার পরিবারের অংশ। তোমার বোনের সাহস হলো কীভাবে এই বাসার মধ্যে বসে ওকে এভাবে হ্যারাস করার? তোমার বোন বলেই আমি এখনও ভদ্রতা বজায় রেখে কথা বলছি।”

আরাফাত সাহেব এবার একটু রুষ্ট হলেন। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন — “একটা মেয়ের জন্য তোমার মাথা এভাবে খারাপ হয়ে গেছে? বড়দের সম্মান কীভাবে করতে হয় তা কি তুমি ভুলে গেছো? আর বিকেলে যা হয়েছে ওটা একটা দুর্ঘটনা। এতে তোমার ফুপুর দোষ কোথায়?”

“দুর্ঘটনা?” আরশান এবার পড়ার টেবিলে সজোরে একটা চাপড় দিল। কাঠের টেবিলটা কেঁপে উঠল সেই সাথে আরাফাত সাহেবও কিছুটা চমকে গেলেন। আরশান দাঁতে দাঁত চিপে বলল — “তোমার বোনের যদি ওই পুরনো জিনিসগুলো সাজানোর এতই শখ জেগে থাকে, তবে উনি নিজে কেন হাত লাগালেন না? রিমিকে জোর করে মইয়ে ওঠানোর কী দরকার ছিল? ওর হাতটা কতটা গভীর ভাবে কে’টেছে, একবার দেখেছো তুমি? নাকি রক্তের রং দেখেও তোমার মনে হলো ওটা দুর্ঘটনা?”

ছেলের এই রাগ দেখে আরাফাত সাহেব বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। আরশান সবসময়ই শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে কথা বলে। কিন্তু রিমির বিষয়ে এলেই ও যেন ওর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আরাফাত সাহেব পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য নরম সুরে বললেন — “ঠিক আছে, আমি বুঝেছি। তোমার রিসিপশনটা হয়ে যাক, তারপর তোমার ফুপু চলে যাবেন।”

“I don’t want to see your sister in our reception!” আগামীকাল সকালের মধ্যে তাদের এই বাসা থেকে বিদায় করো, Otherwise, I will handle it my way, and you won’t like my methods”

কথাটা শেষ করেই আরশান উত্তরের অপেক্ষা না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ছেলে রীতিমত হুমকি দিয়ে গেলো? ও যেটা বলে, সেটা যেভাবেই হোক করে ছাড়ে। আরাফাত সাহেব এবার চিন্তায় পড়লেন, নিজের আপন বোনকে এভাবে হুট করে চলে যেতে বলবেন কোন মুখে? আরশান যখন রুমে ঢুকল, দেখল ঘরের বাতি নেভানো। কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের মৃদু আলো বিছানার ওপর খেলা করছে। রিমি ঘুমিয়ে পড়েছে। সম্ভবত ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে ওর শরীর এখন ক্লান্ত। ও বিছানার একদম কর্নারে এমনভাবে শুয়ে আছে যেন আরশানের থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে চায় ও। আরশান ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে হাঁটু মুড়ে বসল। রিমির আহত হাতটা বিছানার বাইরে ঝুলে ছিল, সাদা ব্যান্ডেজটা অন্ধকারের মাঝেও স্পষ্ট। ওর ঘুমন্ত মুখটা আজ বড় মায়াবী দেখাচ্ছে। আরশান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ওর ঝুলন্ত হাতটা বিছানায় তুলে দিতে চাইল। কিন্তু ওর আঙুল রিমির ত্বকের কাছাকাছি পৌঁছাতেই রিমি ঘুমের ঘোরেই হাতটা খানিকটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল। যেন অবচেতন মনেও ও আরশানের স্পর্শ থেকে বাঁচতে চাইছে, যেন ঘুমের ঘোরেও ওই মানুষটার প্রতি ওর বিরক্তি আর ঘৃণা কাজ করছে। আরশান হাতটা ওভাবেই সরিয়ে নিল। রিমির ওই অবচেতন মনের প্রত্যাখ্যান ওকে ভেতর থেকে কোথাও একটা আঘাত করল। আরশানের রাগ হলো না, বরং এই মেয়েটার মন কিভাবে ভালো হবে সেই ভাবনাই প্রথম ওর মাথায় এলো!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1c3GZ5eXdz/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here