#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৪
#আরিবা_নাওশীন
বিয়ের আর মাত্র দশ দিন বাকি। পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ, কিন্তু রিন্নির মনে কোনো শান্তি নেই। তার ওপর নতুন আপদ হিসেবে জুটেছে তানিন। তানিন হলো রিন্নির বাবার দূর সম্পর্কের এক বন্ধুর ছেলে। সে নিজেকে বিশাল বড় কবি আর রোমান্টিক মনে করে, কিন্তু আসলে সে আস্ত একটা বলদ। সে রিন্নিকে পছন্দ করে এবং মনে করে এই বিয়েটা রিন্নির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সকালে রিন্নি ড্রয়িংরুমে বসে বিয়ের কার্ডের লিস্ট করছিল, এমন সময় তানিন এসে হাজির। হাতে একটা লাল গোলাপ। সে রিন্নির সামনে এসে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “রিন্নি, তুমি কি সত্যিই এই মরুভূমির মতো শুষ্ক লোকটাকে বিয়ে করতে যাচ্ছ? ফিজিক্সের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তোমার এই ননী পুতুলের মতো দেহটা কি ছাই হয়ে যাবে না?”
রিন্নি কার্ড লিখতে লিখতে মুখ না তুলেই বলল, “মরুভূমি না তানিন ভাই, উনি তো আগ্নেয়গিরি। আর ননী পুতুল বলে গালি দেবেন না তো, কালকে আয়নায় দেখেছি আমি আগের চেয়েও বেশি কিউট হয়েছি।”
তানিন গোলাপটা টেবিলের ওপর রেখে আবেগঘন স্বরে বলল, “তুমি তো অবুঝ। ওই খিটখিটে প্রফেসর কি তোমার এই সৌন্দর্য বুঝবে? সে কি কোনোদিন তোমার চোখের তারায় ব্ল্যাক হোল ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবে?”
ঠিক তখনই দরজায় দাঁড়িয়ে গলার স্বর পরিষ্কার করলেন আরাভ চৌধুরী। পরনে আজ তার সেই চিরাচরিত গম্ভীর কালো ব্লেজার। আরাভকে দেখে তানিন একটু চমকে গেল।
আরাভ ভেতরে ঢুকে তানিনের দিকে একবার তাকিয়ে রিন্নির দিকে ফিরলেন। “মিস রিন্নি, বিয়ের কার্ডের লিস্টে কি এই কাব্যিক প্রাণীটির নামও আছে? নাকি এ আপনার কোনো নতুন আগমনকারী প্রাণী?”
রিন্নি নিজের হাসিটা চেপে বলল,” স্যার আপনি ফিজিক্সেই ঠিক আছেন। বাংলা আপনার সাথে যায় না! ”
তানিন তখন গর্বের সাথে বলল,” সবাই কি আর কবি হতে পারে?”
আরাফ সোফা বসতে বসতে বলল,” তা ঠিক। কিন্তু তোমার নামের আগে কবি ট্যাগটা বসে গেলে কবি নামটাই মারাত্মক অসম্মান হবে!”
রিন্নি ফিক করে হেসে দিল। আরাভের এই কথা বলার ঢংটা সে এখন বেশ উপভোগ করচ্ছে । তানিন বুক ফুলিয়ে বলল, “স্যার, আপনি কি জানেন রিন্নি কত কোমল মনের মেয়ে? আপনি ওকে ক্লাসে বকেন, অপদস্থ করেন। আমি ওকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে চাই!”
আরাভ একটা সোফায় পা তুলে বসল। তারপর তানিনকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বলল, “মুক্ত করবেন? আপনি কি জাদুকর নাকি কোনো এনজিও চালান? আপনার চিন্তাভাবনা তো দেখছি প্রচুর ভুল। রিন্নিকে মুক্ত করা মানে হলো আমার জীবন থেকে একটা অশান্তি কমে যাওয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অশান্তিটা আমার এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।”
রিন্নি টেনে টেনে বলল, “স্যার! আমি না বুঝেই পাই না আপনি কখন প্রশংসা করেন আর কখন আপমান করেন। আর তানিন ভাই, আপনি যে মুক্তির কথা বলছেন, সেখানে কি তিন বেলা আইসক্রিম আর প্রতিদিন অনলাইনে শপিং করার সুযোগ আছে?”
তানিন আমতা আমতা করে বলল, “রিন্নি, প্রেম কি আইসক্রিমে মাপা যায়?”
রিন্নি চোখ বড় বড় করে বলল, “আলবাত যায়! আইসক্রিম না দিলে তো আমার প্রেম ঠান্ডাই হবে না। আর শোনেন তানিন ভাই, আপনার ওই কবিতা শোনার চেয়ে প্রফেসরের ধমক শোনাও অনেক বেশি ভালো। অন্তত উনি যখন বকেন, তখন মনে হয় ফিজিক্সের কোনো জটিল সূত্র সলভ করছি। আর আপনি যখন কথা বলেন, মনে হয় কোনো পুরনো রেডিওর সিগন্যাল ছিঁড়ে গেছে!”
আরাভ এবার মনে মনে হাসল। তার হবু গিন্নি যে এভাবে জবাব দিতে পারে, সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল। আরাভ তানিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “শুনুন কবি সাহেব, আপনার কাব্যে হয়তো আবেগের আছে, কিন্তু আমার লাইফে রিন্নির প্রতিসরণ শুরু হয়ে গেছে। সো, আপনার এই লাল গোলাপটা নিয়ে আপনি বরং পাশের বাড়ির চন্দনাদের বাসায় যান। ওখানে এখন প্রেমের সিজন চলছে।”
তানিন অপমানে লাল হয়ে বলল, “স্যার, আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন! আমি রিন্নিকে ভালোবাসি!”
আরাভ উঠে দাঁড়াল। তানিনের সামনে গিয়ে তার জ্যাকেটের কলারটা একটু ঠিক করে দিয়ে বলল, “ভালোবাসা একটা ভেক্টর রাশি তানিন সাহেব যার মান আর দিক দুটোই থাকতে হয়। আপনার মান তো জিরো দেখছি, আর দিকটাও একদম ভুল। এবার লজিক্যালি চিন্তা করে প্রস্থান করুন, নতুবা আমার হাতের ডাস্টারটার টার্গেট মিসাইল কিন্তু খুব নিখুঁত।”
তানিন আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। গোলাপটা সেখানেই ফেলে দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
তানিন যাওয়ার পর রিন্নি হেসে কুটোপুটি। আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব তো হাসছেন। আপনার এই ফ্যান-ফলোয়ারদের লিস্ট কি আরও লম্বা? নাকি এই একজনই আপনার কবিতার খাতা?”
রিন্নি হাসি থামিয়ে নাকে হাত দিয়ে বলল, “হিংসা হচ্ছে স্যার? আপনার তো কোনো ফ্যান নেই। মেয়েরা আপনাকে দেখলেই ১০ ফুট দূরে দৌড়ে পালায়।”
“সেটা তারা ভয় পায় বলে। ফিজিক্সের স্যারদের প্রতি ভয় থাকাটা ভালো,” আরাভ রিন্নির পাশে এসে বসল। “তা আপনি কেন পালাননি? আপনি তো আমাকে দেখলেই ন্যাকামি শুরু করে দেন।”
রিন্নি এবার একটু সিরিয়াস হলো। নিচু গলায় বলল, “আমিও তো পালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তো আমাকে আপনার ওই অসমাপ্ত সমীকরমণ-এ আটকে ফেলেছেন। এখন পালিয়ে যাব কোথায়?”
আরাভ রিন্নির হাতের তালুতে নিজের হাতটা রাখল। গাম্ভীর্য তখনো মুখে ছিল, কিন্তু স্পর্শে ছিল অদ্ভুত এক মমতা। সে বলল, “শুনুন রিন্নি, জীবনটা তো ল্যাবরেটরি নয় যে সব কিছু পারফেক্ট হবে। মাঝে মাঝে তানিনদের মতো কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তি আসবেই। সেগুলোকে এড়িয়েই করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”
রিন্নি ফিসফিস করে বলল, “আপনি সব সময় ফিজিক্স দিয়ে কথা কেন বলেন স্যার? মাঝেমধ্যে একটু নরম হয়ে কথা বললে কি আপনার নিউটনের সূত্র ভুল হয়ে যাবে?”
আরাভ রিন্নির দিকে একটু ঝুঁকল। তার চোখের মণির গভীরে তাকিয়ে বলল, “নরম কথা বলা মানে হলো রেজিস্ট্যান্স কমে যাওয়া। আর রেজিস্ট্যান্স কমে গেলে কারেন্ট বেড়ে গিয়ে শর্ট সার্কিট হতে পারে। আপনি কি বিয়ের আগেই বাসর রাতের শর্ট সার্কিট করতে চান?”
রিন্নি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি কার্ডের লিস্ট নিয়ে মুখ ঢাকল। “আপনি একটা আস্ত অসভ্য রোবট স্যার! আমি আপনার সাথে কথা বলব না।”
আরাভ একটা সশব্দ হাসি দিল। ড্রয়িংরুমে সেই হাসির আওয়াজ শুনে আফজাল চৌধুরী ভেতর থেকে বলে উঠলেন, “কিরে আরাভ! সূর্য কি আজ পশ্চিমে উঠল নাকি? তুই হাসছিস?”
আরাভ শান্ত গলায় উত্তর দিল, “না আব্বু, পশ্চিমে না। সূর্যটা আজ আমার ড্রয়িংরুমেই আকাশী থ্রিপিস পরে বসে আছে।”
রিন্নি মনে মনে বলল, “লোকটা কি প্রশংসা করল? আল্লাহ! আমি পা-গল হয়ে যাব!”
—-
পরদিন ইউনিভার্সিটিতে রিন্নি দেখল তানিন আবার এসেছে। এবার সে একা নয়, সাথে একটা গিটার। রিন্নিকে দেখেই সে সুর ধরে গাইতে শুরু করল— “ও রিন্নি, তুমি আমায় ভুল বোঝো না…”
পুরো ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টরা ভিড় করে হাসছে। রিন্নি লজ্জায় মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে আরাভের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মিস্টার তানিন, ইউনিভার্সিটির করিডোর কি আপনার বাসর ঘর নাকি স্টেজ? এখানে গিটার বাজিয়ে উচ্চশব্দ তৈরি করা মানে ফিজিক্সের ল অনুযায়ী শব্দ দূষণ করা।”
তানিন গিটার থামিয়ে বলল, “স্যার, গানের ভাষা কি আপনার কানে পৌঁছায় না?”
আরাভ এবার রিন্নির দিকে তাকালেন। “রিন্নি, এই ছেলেটার প্রশ্নের উত্তর কি আমি দেব নাকি আপনি দেবেন?”
রিন্নি এবার বুক ফুলিয়ে সামনে এগিয়ে এল। তানিনের গিটারের একটা তারে টাস করে একটা টোকা দিয়ে বলল, “তানিন ভাই, আপনার গানে সুর আছে কিন্তু তাল নেই। আর আপনার ভালোবাসায় লজিক আছে কিন্তু আমার ইচ্ছা নেই। এর চেয়ে আপনার এই গিটারটা দিয়ে আপনি বরং আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে সানাই বাজানোর প্র্যাকটিস করেন। আপনাকে কার্ড পাঠিয়ে দেব।”
তানিন হা করে তাকিয়ে রইল। রিন্নি আরাভের দিকে তাকিয়ে বলল, “চলুন স্যার, ক্লাসে দেরি হয়ে যাচ্ছে। দেরি করলে আবার আপনি আমাকে সবার সামনে ঝাড়ি দেবেন।”
আরাভ আর রিন্নি পাশাপাশি হেঁটে ক্লাসের দিকে চলে গেল। পেছনে পড়ে রইল তানিনের ছেঁড়া সুরের গিটার আর একদল হাসিমুখ স্টুডেন্ট।
হাটতে হাটতে আরাভ হঠাৎ বলল, ” এ দারান দাড়ান।। আপনি কি বিয়ে রাজি হয়ে গেলেন নাকি?”
রিন্নি:” আমি সেটা কখন বললাম?”
আরাভ:” এই যে বললেন তানিনকে আমাদের বিয়ে সানাই বাজাতে!”
এবার পড়ল রিন্নি মহাবিপদে। কথা কথা এটা কেনো বলে দিল সে, এখন সেটাই মাথায় আসছে না। “স্যার আসলে আ… আমাদের না আমার বিয়ের কথা বলছি”
আরাভ আড়চোখে রিন্নি দিকে তাকাল।” তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমি ভুল শুনছি”
রিন্নি একটা দৌড় দিয়ে যেতে যেতে বলল, ” সেটা নতুন কি? আপনি তো এক লাইন বেশিই বুঝেন!”
আরাফ রিন্নি দৌড় দেখে বেশ হাসি পেল। কিভাবে তার ভয়ে দৌড়ে চলে গেল। সে হাটতে হাটতে বলল,” পালিয়ে কতদূর যাবেন পাখি। সারাদিন এদিক ওদিক দৌড়ে সন্ধ্যায় সেই আমায় কাছে ফিরতে হবে।”
চলবে,,,,

