#বিপরীত_মেরুর_টানে
#বোনাস_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
সকালবেলাটা আরাভ চৌধুরীর জন্য সাধারণত খুব সুশৃঙ্খল হয়। সে ঘুম থেকে উঠে ক্যালেন্ডার দেখে, তারপর এক কাপ কড়া চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি খেয়ে নিজের ল্যাবের শিডিউল চেক করে। কিন্তু আজ সকালটা শুরু হলো অন্যভাবে।
ডাইনিং টেবিলে বসে আরাভ দেখল, তার চিরচেনা সাদা পোর্সেলিনের কাপে কফির বদলে এক কাপ ঘোলাটে চা রাখা। আর পাশের চেয়ারে বসে রিন্নি খুব আয়েশ করে একটা পাউরুটি চিবোচ্ছে। আরাভ ভুরু কুঁচকে চায়ের দিকে তাকাল।
“মিসেস চৌধুরী, এটা কি চা নাকি কোনো ড্রেনের ময়লা পানি? আর আমার কফি কোথায়?” আরাভের কণ্ঠস্বরে ভোরের গাম্ভীর্য তখনো স্পষ্ট।
রিন্নি পাউরুটির টুকরোটা গিলে খুব মিষ্টি করে একটা হাসি দিল। “স্যার, কফি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ক্যাফেইন আপনার নিউরনগুলোকে উত্তেজিত করে দেয়। তাই আমি ভাবলাম, আমাদের দেশি মশলা চা আপনার নার্ভকে একটু শান্ত করবে। এতে আদা, তেজপাতা আর এক চিমটি কালো জিরা আছে।”
আরাভ কাপটা একটু দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল, “মশলা চা? আপনি কি জানেন ব্ল্যাক কফি ছাড়া আমার দিন শুরু হয়? আর কালো জিরা? আপনি কি চা বানাচ্ছেন নাকি কবিরাজি ওষুধ?”
রিন্নি এবার মুখটা একটু বাংলা পাঁচের মতো করল। “আমি অনেক কষ্ট করে ভোরবেলা উঠে এটা বানিয়েছি স্যার। আপনি তো শুধু খুঁত ধরেন। কাল রাতে যে আমি আপনার ওই শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিলাম, তারও কোনো ক্রেডিট নেই।”
আরাভ তেড়েফুঁড়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাড়ির কর্তার প্রবেশ ঘটল। আফজাল চৌধুরী গায়ে একটা হাফ হাতা গেঞ্জি দিয়ে লুঙ্গিটা একটু মালকোঁচা মে*রে টেবিলে এসে বসলেন। ছেলের গরম মেজাজ দেখে তিনি তর্জনী উঁচিয়ে হুংকার দিলেন।
“খবরদার আরাভ! সকালেই মেয়েটাকে বকছিস কেন? তোর কি মুখে মধু নেই? মা রিন্নি, ও কি বলেছে রে তোকে? আমাকে বল, আজ ওর একদিন কি আমার একদিন!”
রিন্নি সাথে সাথে আফজাল সাহেবের দিকে ঘুরে গিয়ে ছলছল চোখে চাইল। “আঙ্কেল, মানে আব্বু… স্যার বলছেন আমার চা নাকি ড্রেনের পানির মতো। আমি নাকি কিছুই পারি না।”
আফজাল চৌধুরী এবার রেগে মেগে মেজে কাঁপিয়ে বললেন, “কী! ড্রেনের পানি? আরাভ, তোর জিব কি লোহার হয়ে গেছে? মা কত যত্ন করে আদা-তেজপাতা দিয়ে চা বানিয়েছে, এটা তো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো! তুই কি জানিস আদা খেলে লিভার ভালো থাকে?”
আরাভ অসহায় চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আব্বু, আদা খেলে লিভার ভালো থাকে ঠিক আছে, কিন্তু চা টা বিস্বাদ। আর ও কেন আমার কফিটা ফেলে দিল?”
“ফেলে দিয়েছে ভালো করেছে! তুই তো একটা কালো কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছিস কফি খেয়ে খেয়ে। আজ থেকে তুই এই মশলা চা-ই খাবি। আর যদি মা’কে বকিস, তবে আমি তোর ওই আর-ওয়ান ফাইভ বাইকটা বিক্রি করে দিয়ে একটা পুরনো ভাঙাচোরা ভ্যানগাড়ি কিনে দেব। ওইটা চালিয়ে ল্যাবে যাবি!”
আরাভ এবার চুপ হয়ে গেল। সে জানে তার বাবা একবার যা বলে তা করে ছাড়ে। রিন্নি আড়চোখে আরাভকে একটা ভিক্টরি সাইন দেখাল। আরাভ বিড়বিড় করে বলল, “বাঘের ঘরে এখন শিয়ালের রাজত্ব চলছে।”
নাস্তা শেষ করে আরাভ যখন নিজের ঘরে ল্যাপটপ ব্যাগ গোছাচ্ছিল, তখন ফাহিমকে দেখল পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ফাহিমের হাতে একটা নীল রঙের লেটার প্যাড। সে খুব সাবধানে চারদিকে তাকাচ্ছে।
রিন্নি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফাহিমকে ইশারা করল। ফাহিম ঘরে ঢোকার আগেই রিন্নি ওকে জাপটে ধরে এক পাশে নিয়ে এল।
“কী খবর ফাহিম সাহেব? ওই নীল প্যাডটা কার জন্য? রুম্পার?” রিন্নির কণ্ঠস্বরে ডিটেকটিভের মতো ধার।
ফাহিম ভুত দেখার মতো চমকে উঠে নিজের বুক চেপে ধরল। “ভাবী! আপনি এখানে? মানে… এটা আসলে… একটা কিছু না।”
রিন্নি প্যাডটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিল। ভেতরে চোখ বুলিয়ে দেখল লেখা “নয়না”
রিন্নি হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। “ফাহিম! তোর ভাই তোকে ফিজিক্স শেখাতে শেখাতে তোকে কবি বানিয়ে দিয়েছে রে! কিন্তু এই চিঠি যদি আব্বুর হাতে পড়ে, তবে তোর ওই হার্টরেট চিরতরে জিরো হয়ে যাবে।”
ফাহিম প্রায় রিন্নির পা ধরতে বাকি রাখল। “ভাবী, দয়া করে এটা ভাইয়াকে বলবেন না। ভাইয়া জানলে আমাকে ল্যাবে নিয়ে গিয়ে কোনো বৈদ্যুতিক তারের সাথে ঝুলিয়ে দেবে।”
রিন্নি একটা শয়তানি হাসি দিয়ে চিঠিটা ফাহিমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। কাল সকালে স্যার যখন আমাকে ভাইভা নেওয়ার ভয় দেখাবে, তখন তুই মাঝখানে এসে এমন কোনো একটা কাণ্ড করবি যাতে স্যারের মনোযোগ ঘুরে যায়। আর হ্যাঁ, ফ্রিজে রাখা ওই চকলেট আইসক্রিমটা আজ আমার রুমে পৌঁছে দিবি। মনে থাকবে?”
ফাহিম কাঁচুমাচু করে বলল, “মনে থাকবে ভাবী। আপনি তো দেখি ভাইয়ার চেয়েও বড় রাক্ষস।”
বিকেলে আরাভের মা রোকেয়া বেগম ড্রয়িংরুমে বসে সুঁই-সুতা দিয়ে কাজ করছিলেন। ঠিক তখন তিনি দেখলেন ফাহিম আর রিন্নি সোফার এক কোণে বসে খুব নিচু স্বরে শলাপরামর্শ করছে।
রিন্নি বলছে, “ফাহিম, নয়নার ছোট ভাইটাকে ম্যানেজ করতে হবে। ওকে একটা ভিডিও গেম কিনে দিলে ও আমাদের হয়ে কাজ করবে।”
ফাহিম বলল, “কিন্তু ভাবী, টাকা কোথায়? ভাইয়া তো সব আমার পকেট মানি কেটে দিচ্ছে।”
রিন্নি ফিসফিস করে বলল, “টাকা আমি দেব। স্যারের মানিব্যাগ থেকে গতকাল রাতে আমি পাঁচশো টাকার একটা নোট সরিয়েছি। ওটাকে আমরা সার্ভিস চার্জ হিসেবে ধরব।”
রোকেয়া বেগম সুঁইটা কাপড়ে গেঁথে রেখে কড়া চোখে ওদের দিকে তাকালেন। “রিন্নি! ফাহিম! তোমরা ওখানে বসে কী করছ? আর রিন্নি, তুমি কি আমার বড় ছেলের পকেট কাটতে শুরু করেছ?”
রিন্নি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। “আম্মা… ওটা আসলে… স্যার আমাকে বলেছিলেন ওনার মানিব্যাগ থেকে খুচরো টাকা নিতে…”
রোকেয়া বেগম বিরক্তি নিয়ে বললেন, “আমি কি অন্ধ? আমি দেখছি তোদের কর্মকাণ্ড। একজন তো বিয়ে করে এসে এই বাড়িটাকে যাত্রা প্যান্ডেল বানিয়ে ছেড়েছিস। আর ফাহিম, তুই কি পড়াশোনা ছেড়ে এখন ভাবীর সাথে মিলে মাস্তানি শুরু করলি? তোদের বাবাকে না বলা পর্যন্ত তোদের শিক্ষা হবে না।”
রিন্নি তাড়াতাড়ি রোকেয়া বেগমের পাশে গিয়ে বসল। খুব নরম গলায় বলল, “আম্মা, আপনি তো বড় বড় সেলাই করেন, আপনার হাতের কাজ কী সুন্দর! ওই যে নীল চাদরটা বানাচ্ছেন, ওটা যদি শেষ করেন তবে আমি ওটাতে একটা সুন্দর লেস লাগিয়ে দেব। স্যার বলছিলেন আপনি নাকি খুব ভালো এমব্রয়ডারি করেন।”
আরাভের নাম শুনে রোকেয়া বেগমের রাগ একটু পানি হলো। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আরাভটা তোকে এসব বলেছে? ও তো নিজের চশমার ফ্রেম ছাড়া কিছু চোখে দেখে না। যাই হোক, তুই ন্যাকামি কমিয়ে রান্নায় একটু মনোযোগ দে। কাল কিন্তু তোর বাবার বাড়ি যাওয়ার দিন। কিছু মিষ্টি না বানালে মানুষ কী বলবে?”
রিন্নি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে ফাহিমকে চোখ টিপল।
রাত দশটা। আরাভ ঘরে ফিরে দেখল রিন্নি বিছানায় শুয়ে তার ফিজিক্সের মোটা একটা বই উল্টাচ্ছে।
আরাভ ঘরে ঢুকে শার্ট খুলতে খুলতে বলল, “কী ব্যাপার? আজ কি সূর্য পশ্চিমে উঠেছে? আপনি বই নিয়ে বসেছেন?”
রিন্নি বইটা মুখের সামনে ধরে বলল, “স্যার, এই চ্যাপ্টারটা খুব বোরিং। এই যে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিজম, এটা কি আমাদের সংসারের ঝগড়ার মতো?”
আরাভ বিছানার এক কোণে বসল। “সংসারের ঝগড়া হলো কেটিক (Chaotic) মোশন। এর কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নেই। কিন্তু ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিজম হলো সুশৃঙ্খল। এখন ন্যাকামি না করে বইটা রাখুন, আমি খুব টায়ার্ড।”
রিন্নি হঠাৎ আরাভের খুব কাছে এল। আরাভের শার্টের হাতাটা টেনে ধরে বলল, “স্যার, আপনি কি আমাকে সত্যিই পছন্দ করেন? নাকি আব্বুর ভয়ে আমাকে সহ্য করছেন?”
আরাভ এক মুহূর্তের জন্য রিন্নির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। সে রিন্নির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
আরাভ খুব নিচু স্বরে বলল, “রিন্নি,আপনি হলেন সেই নর্থ পোল যার কোনো লজিক নেই, আর আমি হলাম সেই সাউথ পোল যার লজিক ছাড়া কিছু নেই। আমাদের এই আকর্ষণের কোনো সলিউশন নেই, এটা শুধু অনুভব করা যায়।”
রিন্নি একটু লজ্জা পেয়ে গেল। সে আরাভের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আপনি তো রোমান্টিক কথাও ফিজিক্স ছাড়া বলতে পারেন না!”
ঠিক তখনই জানালার ওপাশ দিয়ে একটা বিকট শব্দ হলো। রিন্নি আর আরাভ দুজনেই চমকে উঠল। জানালার কাছে যেতেই দেখা গেল ফাহিম বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার হাতে একটা ভাঙা পানির পাইপ।
আরাভ জানলা খুলে চিৎকার করে বলল, “ফাহিম! তুই এখানে কী করছিস?”
ফাহিম তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ভাইয়া… আমি… আমি আসলে ড্রেনেজ সিস্টেমের ভেলোসিটি মাপছিলাম। মানে… পাইপটা হঠাৎ করে ফেটে গেল…”
আরাভ কপাল চাপড়ে বলল, “ভেলোসিটি মাপছিলি না তুই উঁকি মারছিলি? কাল সকালে তোকে আমি ল্যাবে নিয়ে গিয়ে সেন্সর বসাব, দেখি তোর কত ভেলোসিটি!”
রিন্নি খিলখিল করে হেসে উঠল। আরাভ ফিরে এসে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন রিন্নি, এই বাড়িতে আপনার আর আমার রোমান্স মানেই হলো একটা পাবলিক সার্কাস। আপনি কি এখনো মনে করেন এই সংসারটা ডিসিপ্লিনড?”
রিন্নি আরাভের চশমাটা নাক থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “ডিসিপ্লিন দিয়ে কী হবে স্যার? টম আর জেরি কি কোনোদিন ডিসিপ্লিন মেনে মা-রামারি করেছে?”
আরাভ ম্লান হাসল।
রিন্নির বাবার বাড়ি যাওয়ার আগের রাত। রিন্নি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার হারটা খুলছিল, এমন সময় আরাভ ঘরে ঢুকল। রিন্নির মনে এখন একটাই চিন্তা কাল বাড়ি গেলে তানিন ভাই নিশ্চয়ই কোনো না কোনো ঝামেলা পাকাবে। আর আরাভ যদি সেখানে গিয়ে ওনার সেই হিটলারি মেজাজ দেখায়, তবে রিন্নির মান-সম্মান সব যাবে।
রিন্নি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “স্যার, কালকের জন্য আমার একটা ছোট অনুরোধ ছিল। মানে… আমার বাবার বাড়িতে গিয়ে আপনি কি একটু বেশি হাসাহাসি করবেন? আর ওই যে তানিন ভাই… ওনার কোনো কথায় দয়া করে রিয়াক্ট করবেন না।”
আরাভ বিছানায় হেলান দিয়ে একটা ফিজিক্স জার্নাল পড়ছিল। রিন্নির কথা শুনে সে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আড়চোখে তাকাল। “অনুরোধ? রিন্নি, যে কোনো কাজ আদায় করতে হলে তার বিনিময়ে কিছু দেওয়া দরকার হয়। আমি হাসব, তানিনকে সহ্য করব বিনিময়ে আপনি আমাকে কী দেবেন?”
রিন্নি ভুরু কুঁচকে বলল, “কী দেব মানে? আমি তো আপনার বউ! আমার কথা শোনা কি আপনার কর্তব্য না?”
আরাভ জার্নালটা বন্ধ করে খাটের ওপর রাখল। তারপর একটা ধূর্ত হাসি দিয়ে বলল, “কর্তব্য তো বটেই। কিন্তু কালকের জন্য আমাকে যে ধৈর্য ধরতে হবে, তার জন্য আমার একটা চার্জার প্রয়োজন। ঠিক করেছি আপনার সাথে একটা ডিল করব।”
রিন্নি কৌতূহলী হয়ে একটু এগিয়ে এল। “কীসের ডিল?”
আরাভ গম্ভীর মুখে বলল, “ডিলটা খুব সিম্পল। আপনি যদি আমাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন, তবে আমি কালকের বিষয়টা ভেবে দেখব। মানে, আমি চেষ্টা করব আপনার ওই কবি সাহেবের মুখে ঘুষি না মে-রে হাসিমুখে কথা বলতে।”
রিন্নি থতমত খেয়ে গেল। “কী! আমি আপনাকে জড়িয়ে ধরব? সবার সামনে না বললেও এখন তো আমরা রুমেই আছি, তাও কেমন জানি লাগছে…”
আরাভ আবার জার্নালটা হাতে নিল। “ওকে, ডিল ক্যান্সেল। কাল তবে তানিন সাহেবকে এক লাথি দিয়ে ওনাকে আপনার বাবার বাড়ির ছাদ থেকে নিচে ফেলব।”
রিন্নি ভয় পেয়ে গেল। সে জানে আরাভ যা বলে তা করতে পারে। সে অনেকক্ষণ চিন্তা করল। মনে মনে ভাবল, “একবার জড়িয়ে ধরলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। রোবট মানুষ, নিশ্চয়ই কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।”
রিন্নি খুব সাবধানে পা টিপে টিপে আরাভের সামনে এসে দাঁড়াল। “ঠিক আছে, রাজি। কিন্তু শুধু একবার!”
আরাভ শান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। সে হাত দুটো দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, “আই অ্যাম রেডি। এবার আপনার ডিল পূরণ করুন।”
রিন্নি চোখ বন্ধ করে খুব ধীরগতিতে আরাভের দিকে হাত বাড়াল। সে ভেবেছিল হালকা করে একটা ছোঁয়া দিয়েই সরে আসবে। কিন্তু রিন্নি যেই না আরাভের গায়ের কাছে এল, আরাভ হঠাৎ নিজের দীর্ঘ দুই হাত দিয়ে রিন্নিকে এমন এক হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল যে রিন্নির নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো!
আরাভ রিন্নিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। রিন্নির মনে হলো সে কোনো মানুষের আলিঙ্গনে নেই, বরং বিশাল কোনো শক্তিশালী পাহাড়ের নিচে পড়ে গেছে। রিন্নির মুখ আরাভের শক্ত চওড়া বুকের সাথে চেপে বসেছে।
রিন্নি গোঙাতে গোঙাতে বলল, “স্যার… স্যার ছাড়ুন! আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! আপনি কি আমাকে ম-ারতে চান?”
আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কেন রিন্নি? আপনিই তো বলেছিলেন জড়িয়ে ধরতে। আমি তো শুধু ডিলটা প্রোপারলি এক্সিকিউট করছি।”
রিন্নি হাত-পা ছুড়তে শুরু করল। “উফ! আপনার কি হাড়গোড় সব লোহার তৈরি? আমার জান বের হয়ে যাচ্ছে! ছাড়ুন বলছি!”
আরাভ আরও একটু জোরে চাপ দিয়ে বলল, “আরেকটু ধরুন। কালকের জন্য আমার পেশেন্স লেভেল এখনো ফুল চার্জ হয়নি। আপনার হার্টরেট তো বেশ ফাস্ট।”
রিন্নি এবার মরিয়া হয়ে আরাভের পিঠে চিমটি কাটল। “ম-রব তো! আমি মরে গেলে কাল বাবার বাড়ি যাবে কে? আপনার ওই ল্যাবের কঙ্কালটা?”
আরাভ এবার হেসে রিন্নিকে আলগা করে দিল। রিন্নি হাপাতে হাপাতে দুই হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল। ওর মুখ লাল হয়ে গেছে। সে বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে বলল, “আপনি একটা জ্যান্ত রাক্ষস! কেউ এভাবে জড়িয়ে ধরে? মনে হচ্ছিল কোনো এনাকোন্ডা আমাকে গিলে খাচ্ছে।”
আরাভ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবার বিছানায় গিয়ে বসল। “ডিল ইজ ডিল। আমি আমার শর্ত পূরণ করেছি। কাল আমি আপনার বাবার বাড়িতে গিয়ে বুদ্ধের মতো শান্ত থাকব। এবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন, মিসেস এনাকোন্ডা!”
রিন্নি রাগে গরগর করতে করতে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের গাল ডলতে লাগল। “রোবটটা যে এত শক্তিশালী আগে বুঝলে জীবনেও এই ডিল করতাম না। আমার পাঁজরের হাড়গুলো এখনো মনে হয় ভেঙে গেছে!”
ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ল ফাহিম। বাইর থেকে শোনা গেল তার ফিসফিসে গলা “ভাবী! ভাইয়া কি আপনাকে অংক করাচ্ছে? অনেক ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেলাম তো! আমি কি আব্বুকে ডাকব?”
আরাভ জানলার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “ফাহিম! তুই যদি আর এক মুহূর্ত দরজার ওপাশে থাকিস, তবে কাল তোকে আমি ওই এনাকোন্ডার মুখেই ফেলে দেব! ভাগ এখান থেকে!”
রিন্নি বিছানায় শুয়ে কম্বলটা মাথার ওপর টেনে দিল। মনে মনে বলল, “কাল বাবার বাড়ি গিয়ে তানিন ভাইকে দিয়ে একটা কবিতা শোনাবই শোনাব, দেখি এই হিটলার তখন কীভাবে হাসি ধরে রাখে!”
আরাভ লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে রিন্নির পাশে শুতে শুতে বিড়বিড় করল, “জেরিকে কব্জা করার জন্য মাঝেমধ্যে একটু বেশি বল প্রয়োগ করতেই হয়।”
চলবে,,,
(টুইস্ট সামনের পর্বে আসবে। ভাই চিন্তায় আছি রোজা রমজানে আবার অশ্লীল না হয় আল্লাহ😩)

