বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_১৪

0
14

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_১৪
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

ঢাকা ফেরার পুরোটা রাস্তা আরাভ একটা কথাও বলেনি। গাড়ির ভেতর পিনপতন নীরবতা, শুধু ফাহিমের ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বাসায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই আরাভ ফাহিমকে একরকম ধাক্কা দিয়ে তার ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল।

রিন্নি পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, “এটা জেলখানা না স্যার! নিজের ভাইকে এভাবে বন্দি করতে পারেন না আপনি!”

আরাভ একটা অগ্নিদৃষ্টি হেনে নিজের ঘরের দিকে গটগট করে চলে গেল। রিন্নি আর দেরি না করে ফাহিমের ঘরের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বেচারা ফাহিম বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কান্না করছে, যেন তার জীবনের সব নয়না আজ অন্ধকার হয়ে গেছে।

রিন্নি জানলার গ্রিল ধরে ডাকল, “ফাহিম? ওরে পা-গলা, শান্ত হ! আমি আছি তো।”

ফাহিম মুখ তুলে তাকাল, চোখ দুটো টকটকে লাল। “ভাবী, ভাইয়া নয়নাকে ফোন করে যা তা বলেছে। নয়না আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। আমার লাইফটা এখন ব্ল্যাক হোল হয়ে গেছে ভাবী! আমি আর বাঁচব না।”

রিন্নি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আরে ধুর! তোর ভাইয়া হলো একটা লজিক্যাল রোবট। ও তোকে রাগাতে এসব করেছে। তুই একটু খেয়ে নে, আমি দেখছি ওই হিটলারকে কীভাবে সাইজ করা যায়।”

ফাহিমকে কোনোমতে সান্ত্বনা দিয়ে রিন্নি এবার পা বাড়াল নিজের ঘরের দিকে। আজ তাকে ম-রণকামড় দিতেই হবে।

ঘরে ঢুকে রিন্নি দেখল আরাভ গায়ের পাঞ্জাবিটা খুলে সোফার ওপর ছুড়ে ফেলেছে। সে রাগে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে আর বিড়বিড় করছে, “হেড স্যারের মেয়ে! আমার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে এই ছেলেটা।”

রিন্নি গিয়ে আরাভের সামনে দাঁড়াল। “স্যার, একটু শান্ত হন। ফাহিম বাচ্চা ছেলে, ভুল তো মানুষই করে।”

“শান্ত হব?” আরাভ গর্জে উঠল। “রিন্নি, আপনি বুঝতে পারছেন না। এটা শুধু প্রেম না, এটা হলো আমার প্রফেশনাল লাইফ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। আর আপনি ওকে সাপোর্ট করছেন? আপনিও তো কম অপরাধী না!”

আরাভ কোনো কথা শুনতে রাজি না। সে রিন্নিকে সরিয়ে দিয়ে বারান্দার দিকে যাচ্ছিল। রিন্নি বুঝতে পারল, শুধু কথায় এই বরফ গলবে না। সে ঝট করে আরাভের হাত ধরে টান দিল। আরাভ থমকে দাঁড়াল।

রিন্নি এবার কোনো কথা ছাড়াই আরাভকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক কাল রাতের মতো শক্ত করে। আরাভ চমকে উঠল। সে রিন্নিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, “রিন্নি! ছাড়ুন! এসব ন্যাকামি দিয়ে কাজ হবে না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।”

আরাভ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করতেই রিন্নি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আরাভ যখন রাগে ফেটে পড়ে আবার কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রিন্নি কোনো সুযোগ না দিয়ে আরাভের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

আরাভের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। আরাভ চৌধুরীর মস্তিষ্কের সব নিউরন যেন এক নিমেষে শর্ট সার্কিট হয়ে গেল। তার সেই রাগ, হেড স্যারের ভয়, ফাহিমের প্রেম সবকিছু যেন এই এক উষ্ণ ছোঁয়ায় বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর রিন্নি সরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এবার কি শান্ত হয়েছেন?”

আরাভ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার সেই দাপুটে চেহারাটা এখন একদম বোকা হয়ে গেছে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “রিন্নি… আপনি… আপনি এটা কী করলেন? এটা তো… এটা তো ডিলের বাইরে ছিল!”

রিন্নি নিজের ওড়নাটা ঠিক করে বলল, “ডিল দিয়ে কাজ হচ্ছিল না তো, তাই ডাইরেক্ট অ্যাকশনে যেতে হলো। শুনুন স্যার, ফাহিম আর নয়নাকে আলাদা করার চেষ্টা করবেন না। আপনার ভয় তো আপনার ক্যারিয়ার নিয়ে, তাই না? ফাহিম যদি নয়নাকে বিয়ে করে, তবে হেড স্যার আপনার বস না, আপনার আত্মীয় হয়ে যাবেন। তখন আর ভয় কিসের?”

আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটে ধপাস করে বসল। তার রাগ এখন পুরোপুরি পানি। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নির চোখে তখন এক বিজয়ী হাসি।

আরাভ গম্ভীর গলায় বলল, “আপনি একটা আস্ত ডাইনি! মানুষকে বশ করতে খুব ভালো জানেন।” সে একটু থেমে আবার বলল, “ঠিক আছে, আমি হেড স্যারের সাথে কথা বলব। তবে মনে রাখবেন, কোনো হারাম কাজ আমি এই বাড়িতে হতে দেব না। যদি ওদের মধ্যে সত্যি ভালোবাসা থাকে, তবে বিয়ের মাধ্যমেই সব হবে। তার আগে ফাহিম ওই মেয়ের ছায়াও মাড়াতে পারবে না। এটাই আমার শেষ কথা।”

রিন্নি খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল। “থ্যাংক ইউ স্যার! আপনি যে ভেতরে ভেতরে এত রোমান্টিক, সেটা আজ প্রমাণ হয়ে গেল।”

আরাভ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করল, “রোমান্টিক না ছাই! আপনি তো আমার ইকুয়েশনই চেঞ্জ করে দিলেন।”

রিন্নি মনে মনে বলল, “টমকে জব্দ করার জন্য মাঝে মাঝে জেরিকে একটু বাঘিনী হতে হয়!”

ফাহিমের ঘরের তালার চাবিটা আরাভ টেবিলের ওপর রেখে দিল। রিন্নি জানত, এই যুদ্ধে আজ সে জিতে গেছে। কিন্তু বাসর রাতের পর আজকের এই সারপ্রাইজ আরাভ চৌধুরীকে যে আজীবন মনে রাখতে হবে, সেটা রিন্নি খুব ভালো করেই জানে।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here