#বিপরীত মেরুর টানে
#পর্ব_১৫
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
রিন্নির স্পেশাল কিস এর ধাক্কায় আরাভ চৌধুরীর রাগের ইঞ্জিনটা একটু ঠান্ডা হয়েছিল বটে, কিন্তু বিপত্তি বাঁধল যখন তারা নয়নাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার পর। নয়নাদের ড্রয়িংরুমটা সাজানো-গোছানো। একদিকে আরাভ চৌধুরী তার সেই চিরচেনা ফর্মাল লুকে সোফায় বসে আছে, পাশে রিন্নি আর ফাহিম। আফজাল সাহেব আর রোকেয়া বেগমও এসেছেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। উল্টো দিকের সোফায় নয়নার বাবা, অর্থাৎ আরাভের ডিপার্টমেন্টের হেড স্যার আনোয়ার সাহেব গম্ভীর মুখে বসে আছেন।
আফজাল সাহেব গলা পরিষ্কার করে বললেন, “আনোয়ার সাহেব, আমাদের ছেলে ফাহিম আর আপনার মেয়ে নয়না একে অপরকে পছন্দ করে। আমরা চাচ্ছিলাম দেরি না করে শুভ কাজটা সেরে ফেলতে। আপনার কী মত?”
আনোয়ার সাহেব চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে একটা ফাইল বের করলেন। আরাভের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরাভ, তুমি তো আমার ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট টিচার। তুমি নিশ্চয়ই আইন-কানুন ভালো বোঝো। আমার মেয়ে নয়না দেখতে বড়সড় হলে কী হবে, ওর বার্থডে সার্টিফিকেটটা একটু দেখো তো।”
আরাভ ফাইলটা হাতে নিয়ে দেখল। কয়েক সেকেন্ড পরেই ওর চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। ফাইলে লেখা নয়নার বয়স মাত্র সতেরো বছর চার মাস!
খবরটা শোনা মাত্রই আরাভ সোফা থেকে এমনভাবে লাফিয়ে উঠল যেন সে কোনো বৈদ্যুতিক শকে আক্রান্ত হয়েছে।
আনোয়ার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দেখলে তো আরাভ? এই অবস্থায় আমি কীভাবে বিয়ে দিই? আমি তো আর আইনের বাইরে যেতে পারি না।”
ফাহিম আর নয়না তখন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে। পুরো পরিবেশে একটা ট্র্যাজেডি নেমে এল। আরাভ আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে রাজি না। সে রিন্নিকে ইশারা করল ওঠার জন্য।
রিন্নি আমতা আমতা করে বলল, “আঙ্কেল, মানে… আর তো মাত্র কয়েকটা মাস! ভালোবাসা কি আর…”
“থামুন আপনি!” আরাভ আর কোনো কথা না শুনে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার পেছনে রিন্নি আর ফাহিমও দৌড়াতে দৌড়াতে এল।
“রিন্নি! আপনি কি আমাকে জেলে পাঠাতে চান?” আরাভের গলার রগ ফুলে উঠল। “যাকে আপনি আমার ভাইয়ের বউ করার স্বপ্ন দেখছেন, সে তো এখনো নাবালিকা! চাইল্ড ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী এটা একটা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমি একজন প্রফেসর হয়ে এই কাজ করব?”
রিন্নি আমতা আমতা করে বলল, “আরে স্যার, মাত্র তো কয়েকটা মাস! ভালোবাসা কি আর ক্যালেন্ডার দেখে হয়?”
“থামুন আপনি!” আরাভ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে রাগে গজগজ করতে করতে আরও জোরে হাটা শুরু করল। যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলে গেল, “আমি এই অন্যায়ের মধ্যে নেই। ফাহিম আর আপনি মিলে যা খুশি করেন, আমি চললাম!”
বাসায় এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা নেমে এল। ফাহিম ঘরের কোণায় বসে কান্নায় চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। ওদিকে নয়নাও ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। রিন্নি পড়ল মহাবিপদে। আফজাল চৌধুরী আর রোকেয়া বেগমও মুখ ভার করে বসে আছেন। রিন্নি বুঝল, আরাভকে ছাড়া এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব। কারণ হেড স্যার কেবল আরাভের কথাই শুনবেন।
রিন্নি আর সাত-পাঁচ না ভেবে সোজা বেরিয়ে পড়ল আরাভকে খুঁজতে। সে জানত, রেগে গেলে আরাভ ওই লেকের ধারের নির্জন বেঞ্চটাতে গিয়ে বসে থাকে।
লেকের পাড়ে গিয়ে রিন্নি দেখল, আরাভ চশমা খুলে হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রিন্নি খুব সাবধানে পাশে গিয়ে বসল।
“স্যার… এখনো রাগ করে আছেন?” রিন্নি নিচু স্বরে ডাকল।
আরাভ মুখ ঘুরিয়ে নিল। “কেন এসেছেন? আবার কোনো নতুন ডিল নিয়ে? আবার ওই সব সস্তা কিস দিয়ে আমাকে ভোলাতে চান?”
রিন্নি একটু নড়েচড়ে বসে বলল, “আসলে… আমি ভাবছিলাম আপনি যদি রাজি হন, তবে আমি আপনাকে আরও বড় কোনো ডিল…”
আরাভ এবার তেড়েফুঁড়ে উঠল। “শুনুন রিন্নি! আমাকে কি আপনার লোভী মনে হয়? আমি কি চার আআনার চকলেট যে কিস দিলেই গলে যাব? লাগবে না আপনার কিস! ওটা আপনার কাছে অনেক দরকারি হতে পারে, আমার কাছে ওটা শুধু একটা হরমোনাল রিঅ্যাকশন ছাড়া আর কিছুই না। ওটা দিয়ে আমাকে কেনা যাবে না!”
রিন্নি মনে মনে বলল, “বাপ রে! কিস খেয়ে এখন বলছেন দরকারি না? তখন তো দেখি পাথরের মতো জমে গিয়েছিলেন!”
তবে রিন্নি দমবার পাত্রী নয়। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “স্যার, ফাহিম তো না খেয়ে পড়ে আছে। নয়নার বাবা যদি অন্য কোথাও ওর বিয়ে ঠিক করে দেয়? আপনি কি চান আপনার ভাই সারা জীবন দেবদাস হয়ে ঘুরুক?”
আরাভ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। রিন্নির অসহায় মুখটা দেখে তার পাথর মনটা একটু নরম হলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে। একটা পথ আছে। আমরা এখনই হেড স্যারের সাথে কথা বলব। বিয়েটা হবে গোপনে, শুধু কাবিন হবে। কিন্তু নয়নার বয়স ১৮ না হওয়া পর্যন্ত ফাহিম আর নয়না আলাদা থাকবে। নয়না ওর বাবার বাড়িতেই থাকবে। ১৮ পূর্ণ হলে আমরা অনুষ্ঠান করে ওকে তুলে নিয়ে আসব। রাজি?”
রিন্নি খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। “আমি রাজি স্যার! আপনি তো জিনিয়াস!”
আরাভ উঠে দাঁড়াল। “চলেন বাসায়। এই ঝামেলা মিটিয়ে আমি শান্তি চাই।”
বাসায় ফিরে আরাভ সবাইকে ডেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানাল। ফাহিম আর নয়নাও এতে রাজি হলো। রিন্নি মনে মনে দারুণ খুশি। কাজও উদ্ধার হলো, আবার আরাভকে সেই লোভ দেখানো কিসটাও দিতে হলো না। রিন্নি ভাবল সে জিতে গেছে।
সবাই যখন খুশি মনে ড্রয়িংরুম ছাড়ছে, ঠিক তখন আরাভ রিন্নির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী ভাবছো রিন্নি? কাজ হয়ে গেছে বলে ডিল ভুলে যাব?”
রিন্নি চমকে উঠল। আরাভ এবার রিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে ‘তুমি’ সম্বোধন করে বলল, “তুমি কি ভেবেছো আমার পাওনা আমি আদায় করব না? মনে রেখো, আমি কিন্তু লোভী নই, তবে আমার প্রাপ্যটা আমি সময়মতো বুঝে নিতে ভালোবাসি। ডিলটা কিন্তু এখনো তোলা রইল, ভুলে যেও না!”
আরাভ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। রিন্নির মুখটা তখন একদম কালিবর্ণ হয়ে গেল। বাঘকে খাঁচায় পুরতে গিয়ে সে কি নিজেই খাঁচায় ঢুকে পড়ল? আর এই প্রথম আরাভ তাকে ‘তুমি’ করে বলল! সেই তুমি বলার মাঝে যে কী পরিমাণ অধিকার আর দুষ্টুমি মিশে ছিল, তা ভেবে রিন্নির গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে।
রিন্নি বিড়বিড় করল, ” শা*লা! জাতে মাতাল তালে ঠিক। দূর, আমি ফেসে গেলাম !”
চলবে,,,,,
(আপনাদের কি পছন্দ হচ্ছে না। রেসপন্স এত কমিয়ে দিচ্ছেন কেন?)

