#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পঁচিশতম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
সকালের রোদেলা আকাশটা আজ চৌধুরী ভিলার জানলার গ্রিল দিয়ে উঁকি মারছে। রিন্নির জ্বরটা এখন একদম নেই, কিন্তু শরীরে এক অদ্ভুত অলসতা। কাল রাতের সেই মায়াবী মুহূর্তগুলোর রেশ এখনো ওর চোখেমুখে। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে রিন্নি দেখল আরাভ এখনো গভীর ঘুমে। চশমা ছাড়া ওকে একদম ছোট বাচ্চার মতো নিষ্পাপ লাগছে। রিন্নি ভাবল, “এই মানুষটাই কি কাল রাতে অত রোমান্টিক কথা বলছিল?”
রিন্নি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁটটা দেখল কামড়ের দাগটা এখন হালকা লালচে হয়ে আছে। রিন্নি মনে মনে হাসল।
সকাল আটটা। চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমে আজ অন্যরকম ব্যস্ততা। রিন্নি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কামিজের ওড়নাটা পিন দিয়ে আটকাচ্ছে। গত কয়েকদিনের সেই জ্বর আর ঘরবন্দি দশা কাটিয়ে আজ সে আবার ভার্সিটি যাচ্ছে। রিন্নি ভাবছিল, এক সপ্তাহ ক্লাসে না যাওয়ায় কতগুলো লেকচার মিস হয়েছে কে জানে!
আরাভ তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরোল। পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার, চোখে সেই পরিচিত চশমা। ওকে দেখলে এখন আর কেউ বলবে না যে কাল রাতে এই মানুষটাই রিন্নির সাথে ( ভাই বুঝে নে )। এখন সে পুরোদস্তুর গম্ভীর প্রফেসর আরাভ চৌধুরী।
আরাভ রিন্নির পাশে এসে দাঁড়াল। নিচু স্বরে বলল, “তৈরি? মনে রেখো রিন্নি, ভার্সিটির গেট পার হওয়ার পর আমি তোমার স্বামী নই, আমি তোমার টিচার। সেখানে কোনো ল্যাদখোরপনা চলবে না।”
রিন্নি ভেঙচি কেটে বলল, “জানি জানি! আপনার ওই হিটলারি রূপ দেখার জন্য আমি বসে নেই। চলুন এবার।”
নাস্তার টেবিলে আফজাল চৌধুরী আর রোকেয়া বেগম বসে আছেন। আফজাল সাহেব পেপার পড়তে পড়তে বললেন, “যাক, আজ তবে ভার্সিটি যাচ্ছিস তোরা? ঘরটা তো গত কয়েকদিন হাসপাতাল হয়ে গিয়েছিল।”
আরাভ শুধু মাথা নাড়ল। সে চায় না বাড়ির কেউ জানুক যে সে আসলে কোনো ডিজিটাল সিকিউরিটি মিশনে আছে। বাড়ির লোকজন জানে সে শুধু একজন ফিজিক্সের প্রফেসর। আরাভ শান্তভাবে নাস্তা শেষ করে রিন্নিকে ইশারা করল বের হওয়ার জন্য।
ফাহিম পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, “ভাইয়া! ভাবীকে যেন আবার ক্লাসের মাঝে দাঁড় করিয়ে রাখিস না। নয়না বলল ও নাকি তোর ক্লাসে খুব ভয় পায়!”
আরাভ কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়ির চাবি হাতে নিল।
ভার্সিটির গেটে গাড়ি থামতেই রিন্নি ঝটপট নেমে পড়ল। আরাভ গাড়ি পার্ক করে যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছে, তখন চারপাশ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আরাভ চৌধুরীর পার্সোনালিটিটাই এমন যে সে হাঁটলে মনে হয় কোনো হলিউড মুভির নায়ক হাটছে।
রিন্নি ক্লাসের সামনের বেঞ্চে বসে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিল। ঠিক তখনই সোনিয়া আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা উদয় হলো। সোনিয়া খুব ভাব নিয়ে বলল, “কিরে রিন্নি? এক সপ্তাহ ডুব দিয়েছিলি কেন? তোর বর… থুড়ি, স্যার তো একাই ক্লাস নিচ্ছিলেন না। আমাদের তো খুব মন খারাপ ছিল।”
রিন্নি মুচকি হেসে বলল, “মন খারাপ করে লাভ নেই সোনিয়া। স্যার তো এখন ক্লাসে ঢুকবেন, মন ভরে দেখে নিও।”
ঠিক তখনই আরাভ ক্লাসে ঢুকল। সাথে সাথে পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। আরাভ ডেস্কে নিজের ল্যাপটপ আর নোটস রেখে একবার পুরো ক্লাসের ওপর চোখ বুলাল। রিন্নির সাথে চোখাচোখি হতেই আরাভ খুব পেশাদার ভঙ্গিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
“গুড মর্নিং এভরিওয়ান। গত এক সপ্তাহ আমি কিছু জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলাম, তাই আপনাদের ল্যাব ক্লাসগুলো নেওয়া হয়নি। আজ আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।”
আরাভ লেকচার শুরু করল। রিন্নি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিল লোকটাকে। যে মানুষটা ঘরে বসে রিন্নিকে ‘জেরি’ বলে ক্ষ্যাপায়, সে এখানে দাঁড়িয়ে কত সাবলীলভাবে কঠিন সব থিওরি বোঝাচ্ছে। মাঝে মাঝে আরাভ রিন্নিকে প্রশ্ন করছে, আর রিন্নি ঠিকমতো উত্তর না দিতে পারলে আরাভ কড়া চোখে তাকাচ্ছে।
লেকচার শেষে আরাভ বলল, “রিন্নি, আপনি আমার সাথে ল্যাবে দেখা করবেন। আপনার গত সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্টগুলো এখনো জমা পড়েনি।”
পুরো ক্লাসের ছাত্রীরা রিন্নির দিকে হিংসে ভরা চোখে তাকাল। সোনিয়া ফিসফিস করে বলল, “দেখলি? স্যার কত কড়া! নিজের কাউকেও ছাড় দেয় না।”
ল্যাবে রিন্নি একা দাঁড়িয়ে ছিল। আরাভ ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে টেনে দিল। সে ল্যাপটপটা টেবিলে রেখে রিন্নির খুব কাছে এগিয়ে এল।
“আপনার অ্যাসাইনমেন্ট কোথায় মিসেস গিন্নি?” আরাভের গলায় সেই প্রফেশনাল গাম্ভীর্য।
রিন্নি ঠোঁট উল্টে বলল, “আপনি তো জানেন আমি অসুস্থ ছিলাম। অ্যাসাইনমেন্ট লিখব কখন?”
আরাভ এবার রিন্নির কোমরে হাত দিয়ে ওকে নিজের দিকে টেনে নিল। রিন্নি চমকে উঠে বলল, “আরে! কেউ দেখে ফেলবে তো! এটা ল্যাবরেটরি!”
আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কেউ দেখবে না। আমি সিসিটিভি হ্যাক করে রেখেছি। এখন বলো জেরি, ক্লাসের ওই হিটলার প্রফেসরকে দেখে খুব ভয় পাচ্ছো?”
রিন্নি আরাভের শার্টের কলারটা খামচে ধরে বলল, “ভয় পাব কেন? আপনি তো শুধু ক্লাসেই বাঘ, ঘরে তো আপনি আমার বিড়াল!”
আরাভ হাসল। সে রিন্নির কপালে একটা হালকা চুমু দিয়ে বলল, “ভার্সিটিতে আমার শত্রু অনেক রিন্নি। তাই এখানে আমাকে একটু বেশিই কড়া থাকতে হয়। তুমি যেন কোনোভাবেই আমার স্পেশাল কেউ সেটা প্রকাশ না পায়। বুঝতে পেরেছো?”
রিন্নি মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই ল্যাবের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। আরাভ এক সেকেন্ডে রিন্নিকে ছেড়ে দিয়ে ফিজিক্সের একটা ইনস্ট্রুমেন্ট হাতে তুলে নিল।
“ইয়েস? ভেতরে আসুন।”
সোনিয়া ভেতরে ঢুকল। “স্যার, আমার এই সার্কিটটা একটু প্রবলেম করছে। আপনি কি একটু দেখে দেবেন?”
আরাভ গম্ভীর মুখে সার্কিটটা নিল। রিন্নি এক কোণায় দাঁড়িয়ে হাসছিল। সোনিয়া ভাবছে সে স্যারকে পটাচ্ছে, অথচ সে জানেই না যে তার সামনেই স্যারের আসল জেরি দাঁড়িয়ে আছে।
আরাভ সোনিয়াকে সার্কিট বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করল। তারপর রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “বিকেলে আমরা একসাথে ফিরব না। তুমি ফাহিমের সাথে যাবে। আমার কিছু কাজ আছে ওই ডাটা নিয়ে। সাবধানে থেকো।”
রিন্নি একটু মন খারাপ করল কিন্তু আরাভের চোখের সিরিয়াসনেস দেখে সে কিছু বলল না। সে জানে, এই লড়াইটা অনেক বড়।
চলবে,,,

