#বিপরীত_মেরুর_তানে
#ছাব্বিশতম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
ভার্সিটির করিডোর দিয়ে যখন আরাভ চৌধুরী তার সেই পরিচিত গাম্ভীর্য নিয়ে হেঁটে যায়, তখন আশেপাশের বাতাসও যেন একটু থমকে দাঁড়ায়। রিন্নি এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছিল তার ‘হিটলার’ বরকে।
সাদা শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো, হাতে দামী ঘড়ি আর চোখে সেই তীক্ষ্ণ চশমা আরাভকে দেখলে মনে হয় সে যেন কোনো জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করতে করতে হাঁটছে।
রিন্নি মনে মনে হাসল। কেউ কি জানে, এই গম্ভীর প্রফেসরের ল্যাপটপে লুকিয়ে আছে এমন এক ‘ব্লু চিপ’ যা পুরো দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা বদলে দিতে পারে।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর ভার্সিটির বিশাল লাইব্রেরিটা একদম ফাঁকা হয়ে গেছে। রিন্নি একটা কর্নারের টেবিলে বসে ফিজিক্সের মোটা একটা বই খুলে ঝিমোচ্ছিল। গত কয়েকদিনের ধকল ওর শরীরে এখনো রয়ে গেছে। হঠাৎ ওর ঘাড়ের কাছে কারোর তপ্ত নিশ্বাসের স্পর্শে সে চমকে উঠল।
পিছন ফিরে দেখল আরাভ দাঁড়িয়ে আছে। ওর ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি, যেটা দেখলে রিন্নির হার্টরেট এম্নিতেই বেড়ে যায়।
আরাভ খুব নিচু স্বরে বলল, “লাইব্রেরিতে ঘুমানোটা কি আপনার সিলেবাসের অংশ মিস রিন্নি? নাকি আমি পড়াই বোরিং লাগে বলে এখানে এসে স্বপ্ন দেখছেন?”
রিন্নি অপ্রস্তুত হয়ে বইটা টেনে নিয়ে বলল, “আরে না না! আমি তো জাস্ট… এই থিওরিটা বুঝছিলাম না।”
আরাভ রিন্নির পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। লাইব্রেরির এই কোণাটা একদম নির্জন, শুধু পুরনো বইয়ের সোঁদা গন্ধ আর ধুলিকণার নাচানাচি। আরাভ রিন্নির হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। ওর স্পর্শে রিন্নির শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল।
আরাভ রিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বইয়ের থিওরি পরে বুঝলেও হবে জেরি। আগে বলো, আজ সারাদিন আমাকে এক নজর দেখার জন্য কতবার করিডোরে এসে উঁকি মে- রেছো?”
রিন্নি মুখ লাল করে বলল, “কচু আমার! আমি কেন আপনাকে দেখতে যাব? আমি তো তানিয়ার সাথে কথা বলছিলাম।”
আরাভের চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই সাইকো-রোমান্টিক চাউনিটা ফুটে উঠল। সে রিন্নির চিবুকটা আঙুল দিয়ে আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। “মিথ্যে বলো না। তোমার ওই চোখের মণির রিফ্লেকশন বলছে, তুমি ক্লাসের পুরো ৫০ মিনিট শুধু আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে। কেন? প্রফেসরের প্রেমে নতুন করে পড়লে নাকি?”
রিন্নি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আরাভের শার্টের কলারটা একটু টেনে ধরে বলল, “আপনার মাথা! আর প্রেমে পড়লে আপনার কী? আপনি তো শুধু ল্যাপটপ বোঝেন। আচ্ছা স্যার, ওই ব্লু চিপের রহস্যটা কি আজ একটু বলবেন? ওই সুরাইয়া মহিলা কেন এসেছিল সেইদিন?”
আরাভের চেহারা পলকে গম্ভীর হয়ে গেল। রোমান্টিক আবহটা যেন এক ঝটকায় রহস্যের কুয়াশায় ঢাকা পড়ল। সে লাইব্রেরির চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে নিল। তারপর রিন্নির কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল
“রিন্নি, ডার্ক ওয়েবে একটা গ্রুপ আছে যাদের নাম ‘দ্য শ্যাডো’। ওরা আমাদের দেশের ব্যাংকিং সিস্টেম হ্যাক করার জন্য একটা ভাইরাস তৈরি করেছে। আমার তৈরি করা ওই ব্লু চিপটা হলো একমাত্র অ্যান্টি-ভাইরাস। সুরাইয়া একজন গোয়েন্দা, সে আমাকে সতর্ক করতে এসেছিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়।”
রিন্নি রুদ্ধশ্বাসে বলল, “কোথায়?”
আরাভ রিন্নির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “ওরা জেনে গেছে আমিই এই চিপটার মেকার। আর ওরা এটাও জেনে গেছে যে আমার সবচেয়ে বড় পাসওয়ার্ডটা হলো তুমি। আমি ল্যাপটপে একটা সিগন্যাল পেয়েছিলাম কেউ আমাদের বাড়ির আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করার চেষ্টা করছে।”
রিন্নির বুকটা ধক করে উঠল। তার মানে তাদের ওই রোমান্টিক খুনসুটিগুলোর মাঝেও কেউ আড়ি পাতছে? আরাভ রিন্নির ভয়ার্ত মুখ দেখে ওর কপালে একটা হালকা চুমু দিয়ে বলল
“ভয় পেও না। তোমাকে রক্ষা করার জন্য আমি আমার সারা জীবনের কোডিং জ্ঞান বাজি রেখেছি। লাইব্রেরির এই সিসিটিভিগুলো আমি আগেই লুপে ফেলে দিয়েছি, যাতে কেউ আমাদের এই কথাগুলো শুনতে না পায়।”
রিন্নি অবাক হয়ে বলল, “আপনি এত কিছু কখন করলেন?”
আরাভ মুচকি হাসল। “যখন তুমি ওই মোটা বইটা উল্টেপাল্টে দেখছিলে। শোনো রিন্নি, আমার ভালোবাসা হলো একটা এনক্রিপ্টেড কোড, যা ডিকোড করার ক্ষমতা শুধু তোমার আছে।”
আরাভ এবার রিন্নির হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল। খুব আদুরে ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘ চুম্বন দিয়ে বলল, “বাসায় চলো। আজ আর একা যেতে হবে না আমিই নিয়ে যাই। এমনিও যা জিনিস তোমার জন্য আলাদা বিপদের দরকার নেই। একাই যথেষ্ট নিজেকে বিপদে ফেলার জন্য। বাবাহ্! একদিনের কাজের জন্য জ্বর বাজাই ফেলছে। কি বিয়ে করলাম। অন্য বউরা বাড়ির সব করে প্রতিদিন, আর তুমি একদিনেই শেষ!”
রিন্নি হেসে ফেলল। আরাভ চৌধুরীর রহস্য আর রোমান্স একই সুতোয় গাঁথা। সে যেমন অন্ধকার জগতের হ্যাকারদের সাথে লড়াই করছে, তেমনই নিজের জেরিকে আগলে রাখার জন্য সে এক মায়াবী দুর্গ তৈরি করেছে।
ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে গাড়ি চালাচ্ছিল আরাভ। রিন্নি লক্ষ্য করল আরাভ বারবার লুকিং গ্লাসে তাকাচ্ছে।
“কী হয়েছে স্যার? কেউ পিছু নিয়েছে?” রিন্নি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
আরাভ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে শান্ত গলায় বলল, “একটা কালো রঙের এসইউভি গত তিনটে মোড় ধরে আমাদের ফলো করছে। রিন্নি, সিটবেল্ট শক্ত করে বাঁধো। আজ তোমাকে একটা হাই স্পিড ফিজিক্সের ডেমো দেখাব।”
আরাভ হঠাৎ এক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়িটা ঝড়ের বেগে হাইওয়েতে উঠে পড়ল। রিন্নি সিট আঁকড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে বুঝতে পারছে, তাদের জীবনের প্রতিটি মোড়ে এখন বিপদ ওত পেতে আছে।
কিন্তু তার পাশে যখন আরাভ চৌধুরীর মতো একজন মানুষ আছে, তখন সে ভয় পাবে কেন?
আরাভ গাড়ি চালাতে চালাতেই রিন্নির হাতটা এক হাতে শক্ত করে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেও না জেরি। তোমার বরের অ্যালগরিদমে পরাজয় বলে কোনো শব্দ নেই।”
গাড়িটা ঝড়ের গতিতে একটা সরু গলির ভেতর ঢুকে পড়ল এবং চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনের কালো গাড়িটা ওদের হারিয়ে ফেলে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আরাভ গাড়ি থামিয়ে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বিজয়ী হাসি হাসল। “দেখলে তো? প্রফেসরের ক্লাসে শুধু থিওরি থাকে না, প্র্যাক্টিক্যালও থাকে। এখন চলো, বাসায় গিয়ে ফাহিমের জ্বালাতন সহ্য করতে হবে।”
রিন্নি একটা লম্বা শ্বাস ফেলল।
চলবে,,,,

