বিপরীত_মেরুর_টানে #সাতাশতম_পর্ব

0
11

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#সাতাশতম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

গাড়িটা যখন চৌধুরী ভিলার গ্যারেজে এসে থামল, রিন্নির বুকটা তখনো কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হাইওয়েতে ওই গতির খেলা আর আরাভের স্টিয়ারিং ঘোরানোর সেই নিখুঁত ভঙ্গি রিন্নি যেন কোনো অ্যাকশন মুভির ভেতর থেকে মাত্র বাস্তব পৃথিবীতে পা রাখল।

আরাভ গাড়ি থেকে নেমে চশমাটা একবার মুছে নিল। ওর চেহারায় কোনো ভয়ের ছাপ নেই, বরং এক ধরণের তৃপ্তির আভা। সে রিন্নির দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। “নামুন মিস জেরি। আপনার হার্টরেট কি এখনো ফিজিক্সের সূত্র মানছে না?”

রিন্নি আরাভের হাত ধরে গাড়ি থেকে নামল। ওর হাতটা তখনো কাঁপছে। “আপনি কি সব সময় এভাবেই প-াগলামি করেন? ওই কালো গাড়িটা যদি আমাদের ধাক্কা দিত?”

আরাভ রিন্নিকে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। গ্যারেজের আবছা আলোয় আরাভের চোখ দুটো আজ বড্ড বেশি উজ্জ্বল। সে রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল–
“ধাক্কা দেওয়ার সুযোগ আমি কাউকে দিই না রিন্নি। আমার ক্যালকুলেশনে ভুলের কোনো জায়গা নেই। তবে হ্যাঁ, তোমাকে সাথে নিয়ে এই প্রথম কোনো লাইভ মিশন করলাম। কেমন লাগল প্রফেসরের প্রাইভেট রাইড?”

রিন্নি মুখ লাল করে আরাভের বুকে একটা কিল মে-রে সরিয়ে দিল। “শয়তান একটা! চলুন ভেতরে, মা হয়তো চিন্তা করছেন।”

ঘরে ঢুকেই রিন্নির চক্ষু চড়কগাছ! ড্রয়িংরুমে ফাহিম একটা বড় কার্টন নিয়ে বসে আছে, আর ওর পাশে নয়না দাঁড়িয়ে। নয়নাকে দেখে রিন্নি অবাক হলো, “কিরে নয়না? তুই এই অসময়ে?”

নয়না আমতা আমতা করে বলল, “ভাবী, ফাহিম আমাকে ডেকে পাঠাল। একটা আজব পার্সেল এসেছে আপনার নামে। কুরিয়ারওয়ালা দিয়ে গেছে, কিন্তু প্রেরকের কোনো নাম নেই।”

আরাভ ঝট করে এগিয়ে এল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ফাহিমের হাত থেকে পার্সেলটা নিয়ে খুব সাবধানে খুলল। ভেতরে কোনো বোমা বা চিপ নেই, আছে শুধু একটা পুরনো খাম।

খামটা খুলতেই একটা সাদা-কালো ছবি বেরিয়ে এল। রিন্নির ছোটবেলার ছবি। রিন্নি ফ্রক পরে একটা বাগানে দাঁড়িয়ে আছে, আর ওর পেছনে একটা আবছা মানুষের ছায়া। ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা “The Equation is still Incomplete.”

রিন্নি ছবিটা দেখে শিউরে উঠল। “এটা তো আমার নানুবাড়ির বাগানের ছবি! কিন্তু এই ছবি তো আমাদের অ্যালবামেও নেই। কে পাঠাল এটা?”

আরাভ ছবিটা নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল। সে ফাহিমকে ইশারা করল নয়নাকে নিয়ে অন্য ঘরে যেতে।
ফাহিম বুঝতে পারচ্ছে পরিস্থিতি সিরিয়াস। সে নয়নার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, “চল নয়না, বড়দের ব্যপারে আমাদের নো এন্ট্রি। আমরা বাইরে যাই। ”

ওরা চলে যাওয়ার পর আরাভ রিন্নিকে নিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেই রিন্নি দেখল ওর আলমারির পাল্লাটা হা হয়ে খোলা! সব কাপড়চোপড় এলোমেলো।

“আরাভ! দেখুন! কেউ কি ঘরে ঢুকেছিল?” রিন্নি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।

আরাভ দ্রুত আলমারির ভেতরে হাত দিয়ে একটা গোপন ড্রয়ার চেক করল। সেখানে ওর সেই ব্লু চিপের ব্যাকআপ ড্রাইভটা ছিল। ড্রাইভটা সেখানে অক্ষত আছে দেখে আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সে রিন্নিকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় বসাল। “শান্ত হও জেরি। ওরা চিপটা পায়নি। ওরা আসলে তোমাকে ভয় দেখাতে চাইছে। ওই ছবিটা আর এই আলমারি খোলা রাখা সবই একটা সাইকোলজিক্যাল গেম।”

রিন্নি কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ওরা কি আমাদের ঘরেও চলে এসেছে? মা-আব্বু তো নিচেই ছিলেন। কারো কিছু হয়নি তো? কেউ কিছু টের পেল না?”

আরাভ রিন্নির দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গরম নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “ওরা প্রফেশনাল হ্যাকার রিন্নি। ওরা তালা না ভেঙেও ঘরে ঢুকতে পারে। কিন্তু ওরা একটা ভুল করেছে। ওরা আমার ঘরে পা রেখেছে এটা ওদের জীবনের শেষ ভুল হতে যাচ্ছে।”

আরাভ হঠাৎ রিন্নিকে একদম নিজের গায়ের সাথে লেপ্টে ধরল। রিন্নির ভয়ার্ত মুখটা আরাভের বুকের মাঝে লুকানো। আরাভ খুব কোমল স্বরে বলল, “আজ থেকে তুমি এক মুহূর্তের জন্যও আমার চোখের আড়াল হবে না। এমনকি বাথরুমে গেলেও আমি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকব। বুঝলে?”

রিন্নি এই বিপদের মাঝেও একটু হেসে ফেলল। “আপনি কি পা-গল? লোকে কী বলবে?”

আরাভ রিন্নির চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে ওর চোখের গভীরে তাকাল। “লোকে কী বলবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার সার্ভারের সবচেয়ে দামী ডাটা হলো তুমি। আর সেই ডাটা হ্যাক করার ক্ষমতা আমি শয়তানকেও দিইনি।”

আরাভ এবার রিন্নির ঠোঁটে নিজের অধিকারটা আলতো করে স্থাপন করল। কোনো রুক্ষতা নেই, শুধু এক সমুদ্র নিরাপত্তা আর ভালোবাসার ছোঁয়া। আরাভ চৌধুরীর এই রোবটিক শরীরের ভেতর একটা আগ্নেয়গিরি বাস করে, যা শুধু রিন্নির জন্য জ্বলে ওঠে।

আরাভ রিন্নিকে ছেড়ে দিয়ে ল্যাপটপটা হাতে নিল। “আজ রাতে আমি ঘুমাচ্ছি না গিন্নি। আমি ট্র্যাকিং করছি ওই পার্সেলটা কোথা থেকে এসেছে। তুমি ঘুমাও।”

রিন্নি আরাভের হাতটা টেনে ধরল। “না, আপনি একা জাগবেন না। আমিও আপনার সাথে থাকব। আমাকেও হ্যাকিং শেখান না স্যার? অন্তত ওই সোনিয়ার ফেসবুক আইডিটা তো হ্যাক করি!”

আরাভ হেসে ফেলল। “সোনিয়াকে নিয়ে তোমার হিংসেটা কি কোনোদিন কমবে না? আচ্ছা ঠিক আছে, বসো আমার পাশে। আজ তোমাকে শেখাব কীভাবে আইপি অ্যাড্রেস বাউন্স করতে হয়।”

চৌধুরী ভিলার সেই নিস্তব্ধ রাতে, যেখানে বাইরে শত্রুরা ওত পেতে আছে, সেখানে একটা প্রদীপ জ্বলছিল। আরাভ আর রিন্নি পাশাপাশি বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখল। এই লড়াইটা শুধু কোডিংয়ের নয়, এই লড়াইটা ওদের অস্তিত্বের।

আরাভ টাইপ করতে করতে হঠাৎ থেমে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “জেরি, যদি কোনোদিন বড় কোনো বিপদ আসে, তুমি কি আমার হাত ছেড়ে দেবে?”

রিন্নি আরাভের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আপনার অ্যালগরিদমে তো পরাজয় নেই স্যার, তাহলে আমার ডিকশনারিতে ছেড়ে যাওয়া শব্দটা থাকবে কেন?”

আরাভ মুচকি হাসল। স্ক্রিনে তখন লাল রঙের একটা ম্যাপ ফুটে উঠেছে। একটা সিগন্যাল বারবার ব্লিংক করছে। আরাভ ফিসফিস করে বলল
“পেয়েছি! ওরা আমাদের শহরেরই একটা পুরনো কারখানায় লুকিয়ে আছে। কাল সকালে আমরা সেখানে যাব জেরি। তবে প্রফেসর আর স্টুডেন্ট হিসেবে নয়।”

চলবে…
(মনে হচ্ছে রুক্ষ গ্রীষ্মে মরুভূমিতে মাইলে পর মাইল হাটছি কাধে যেন আকাশ সমান বোঝা। শতাব্দী হয়ে গেল না পেলাম একটু পানি, না পেলাম একটু ছায়া। যতবার পানি মনে করে গেয়েছি কাছে ততবার বুঝিছি মরীচিকা। আমি অবাক হয়ে যায় এসব মানুষরা অন্যকে কষ্ট দিলে জীবনের কতটা পৈশাচিক আনন্দটাই না পায়। তাদের সুখের কতটা বিভৎস। কবে আবার গল্প দিব জানি না। মানসিক অবস্থা বর্ণনা করার মতো না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here