বিপরীত_মেরুর_টানে #আটাশতম_পর্ব

0
11

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আটাশতম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু ল্যাপটপের কুলিং ফ্যানটা একটা গুনগুন শব্দ করছিল। রিন্নি আরাভের কাঁধে মাথা রেখে স্ক্রিনের সেই লাল বিন্দুটার দিকে তাকিয়ে আছে। ম্যাপের ওপর বিন্দুটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে স্থির হয়ে গেছে শহরের শেষ প্রান্তে পরিত্যক্ত একটা টেক্সটাইল মিল।

আরাভ কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে রিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটা ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে কিন্তু তার হাতটা এখনো আরাভের শার্টের হাতা শক্ত করে ধরে আছে। সে ল্যাপটপটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে রিন্নিকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।

রিন্নি চমকে উঠে চোখ খুলল। “কী করছেন স্যার? হ্যাকিং শেষ?”

আরাভ রিন্নিকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে ওর গায়ের ওপর ঝুঁকে এল। আবছা নীল আলোয় আরাভের চশমার কাঁচটা মায়াবী দেখাচ্ছে। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “হ্যাকিং শেষ জেরি, এবার একটু ‘হার্ট রেট’ চেক করার পালা। তুমি কি জানো, যখন তুমি আমার কাঁধে মাথা রাখো, তখন আমার প্রসেসরের স্পিড অর্ধেক হয়ে যায়? তোমার চুলের গন্ধে আমার লজিক গেটগুলো সব শর্ট সার্কিট হয়ে যাচ্ছে।”

রিন্নি লজ্জা পেয়ে বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকল। “আপনি তো আমায় মা-রবেন একদিন আপনার এই সব অদ্ভুত কথায়! কাল সকালে কি সত্যিই আমরা ওখানে যাব?”

আরাভ রিন্নির হাত থেকে বালিশটা সরিয়ে ওর কপালের ওপর নিজের কপাল ঠেকাল। “যাব। তবে তোমাকে নিয়ে আমার ভয় হচ্ছে। তুমি যে চঞ্চল, কখন যে কী করে বসো! শোনো রিন্নি, এই লড়াইটা আমার বুদ্ধির সাথে ওদের অন্ধকারের। কিন্তু তুমি হলে আমার সেই লাইট সোর্স, যাকে ছাড়া আমি পথ হারাব। কাল সকালে তোমাকে আমার একদম পাশে থাকতে হবে।”

আরাভ রিন্নির গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে ওকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। রিন্নি অনুভব করল আরাভের শরীরের উত্তাপ। (নেক্সট পর্ব তাড়াতাড়ি পাওয়ার জন্য ফলো করুন আরিবা নাওশীন-Ariba Nawshin পেজে)

সকাল সাতটা। সূর্যটা কেবল লাল আভা ছড়াচ্ছে। চৌধুরী ভিলার সবাই যখন ঘুমে, তখন আরাভ আর রিন্নি চুপিচুপি গ্যারেজে এসে দাঁড়াল। আজ আরাভ কোনো দামী স্যুট পরেনি, তার পরনে একটা কালো হুডি আর কার্গো প্যান্ট। রিন্নি পরেছে একটা ক্যাজুয়াল জিন্স আর টপ, মাথায় একটা টুপি।

আরাভ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রিন্নিকে একটা ছোট পিস্তলের মতো ডিভাইস দিল। রিন্নি আঁতকে উঠে বলল, “এটা কী! আমি তো গুলি করতে জানি না!”

আরাভ হেসে ফেলল। “পা-গলি! এটা ইলেকট্রিক শকার। যদি কোনো বিপদ দেখবে, শুধু বাটনটা টিপে ওদের গায়ে টাচ করবে। বাকিটা এই ডিভাইস সামলে নেব। আর হ্যাঁ, নিজেকে জেমস বন্ডের হিরোইন ভেবো না, তুমি আমার পার্টনার।”

গাড়িটা ঝড়ের গতিতে হাইওয়ে ধরে ছুটছে। শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে ওরা যখন সেই পরিত্যক্ত মিলের সামনে পৌঁছাল, তখন চারপাশটা খাঁ খাঁ করছে। মিলের দেয়ালগুলো শ্যাওলা ধরা, জানালার কাঁচ সব ভাঙা।

আরাভ গাড়িটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রিন্নির হাত ধরল। “পা টিপে টিপে চলো। মনে রেখো, ভেতরে ক্যামেরা থাকতে পারে।”

ওরা যখন পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরেু ঢুকল, তখন এক সোঁদা গন্ধ নাকে এল। রিন্নি আরাভের হাতটা খামচে ধরে আছে। হঠাৎ একটা আর্তনাদ শোনা গেল। ওটা কোনো মহিলার কণ্ঠ।

আরাভ দেয়ালের আড়াল দিয়ে উঁকি দিল। দেখল বিশাল এক হলের মাঝখানে মিসেস সুরাইয়াকে একটা চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। উনার মুখ দিয়ে র-ক্ত ঝরছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো এসইউভির ড্রাইভার যার নাম টাইগার।

টাইগার সুরাইয়াকে ধমক দিচ্ছে, “বল! চিপটার মেইন কোড কোথায়? আরাভ চৌধুরী কি তোকে ওটা দিয়ে দিয়েছে? বল নইলে আজ তোকে ডার্ক ওয়েবের লাইভ স্ট্রিমিংয়ে খতম করে দেব!”

সুরাইয়া কষ্টে হাসলেন। “আরাভ বোকা নয় টাইগার। সে জানে তোমাদের মতো হায়েনাদের ডেরায় কী দিতে হয়। কোডটা তোমরা কোনোদিনই পাবে না।”

রিন্নি ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে ফিসফিস করে আরাভকে বলল, “স্যার! ওরা তো ওনাকে মে-রে ফেলবে! কিছু একটা করুন!”

আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “শান্ত হও জেরি। আমি ওদের সিস্টেমে একটা ভাইরাস অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছি। ঠিক ১০ সেকেন্ড পর এখানে ইলেকট্রিসিটি কাট-অফ হবে। তখন তুমি সুরাইয়ার কাছে দৌড়ে গিয়ে ওনার বাঁধন কাটবে, আর আমি ওই গুন্ডাগুলোকে সামলে নিব। রেডি?”

রিন্নি মাথা নাড়ল। আরাভ ওর কপালে একটা দ্রুত চুমু খেল। “সাবধানে থেকো আমার জান। হার মানবে না!”

১০… ৯… ৮… ৫… ১!

পুরো কারখানা হঠাৎ অন্ধকারে ডুবে গেল। ব্যাকআপ জেনারেটর চালু হতে অন্তত ৩০ সেকেন্ড সময় নেবে। এই অন্ধকারের সুযোগ নিল আরাভ। সে একটা ছায়ার মতো টাইগারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

রিন্নি অন্ধকারেই মোবাইল টর্চের আলো জ্বেলে সুরাইয়ার দিকে দৌড়ে গেল। ওনার হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে রিন্নি বলল, “ম্যাম! ভয় পাবেন না, আমরা এসেছি!”

সুরাইয়া অবাক হয়ে রিন্নিকে দেখে বললেন, “রিন্নি? তোমরা এখানে কেন? পালাও! ওরা আরও অনেকে আসছে!”

ঠিক তখনই জেনারেটর চালু হয়ে গেল। আলো আসতেই রিন্নি দেখল আরাভ একাই চার-পাঁচজন গুন্ডার সাথে ফাইট করছে। আরাভের ওই গম্ভীর প্রফেসর লুকটা এখন গায়েব, সে এখন এক বিধ্বংসী যোদ্ধা। তার প্রতিটা পাঞ্চ আর কিক যেন নিখুঁত ফিজিক্সের ক্যালকুলেশন।

টাইগার পিস্তল বের করতে যেতেই আরাভ একটা লোহার রড দিয়ে ওর হাতটা জ্যাম করে দিল। টাইগার চিৎকার করে উঠল। আরাভ ওর কলার চেপে ধরে দেওয়ালে ঠেকিয়ে বলল
“আমার ল্যাপটপে হাত দিয়েছিলে সহ্য করেছি, কিন্তু আমার বউয়ের দিকে নজর এটার ক্ষমা নেই। তোর বসকে গিয়ে বলিস, আমার জেরি সাথে তার কিসের সম্পর্ক আমি জানি না কিন্তু আরাভ চৌধুরী শুধু ফাইল হ্যাক করে না, সে হ্যাকারদের জীবনও হ্যাক করতে জানে!”

রিন্নি সুরাইয়াকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিল তার স্বামীকে। সে ভাবতেই পারেনি এই মানুষটা এত ভালো ফাইট করতে পারে।

হঠাৎ পেছন থেকে একজন লোক রিন্নির দিকে ছুরি নিয়ে তেড়ে এল। রিন্নি ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “স্যার!”

আরাভ পেছন না ফিরেই এক ঝটকায় তার পকেট থেকে একটা ছোট মেটাল বল ছুড়ে মা-রল। বলটা লোকটার কপালে লেগে ওখানেই নক-আউট হয়ে গেল। আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে হাসল। “আমি বলেছিলাম না জেরি? আমার অ্যালগরিদমে পরাজয় নেই।”

একটু পরেই পুলিশের গাড়ি আর গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন চলে এল। মিসেস সুরাইয়াকে হাসপাতালে পাঠানো হলো। যাওয়ার সময় তিনি আরাভকে একটা পেনড্রাইভ দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “আরাভ, আসল খেলা এখন শুরু হবে। ওরা তোমার ফ্যামিলিকে টার্গেট করছে।”

গাড়িতে ফেরার পথে আরাভ একদম চুপ। সে এক হাতে ড্রাইভ করছে আর অন্য হাতে রিন্নির হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। রিন্নি দেখল আরাভের হাতের তালুতে একটা আঁচড় লেগেছে।

“আপনার হাতটা কাটল কী করে?” রিন্নি অস্থির হয়ে রুমাল দিয়ে মুছতে গেল।

আরাভ গাড়িটা রাস্তার পাশে থামাল। সে রিন্নির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ রিন্নিকে জড়িয়ে ধরল। রিন্নি অনুভব করচ্ছে আরাভ কাঁপছে।

“কী হয়েছে স্যার? বিপদ তো কেটে গেছে।”

আরাভ রিন্নির ঘাড়ে মুখ গুঁজে ধরা গলায় বলল, “আজ যদি তোমার কিছু হতো রিন্নি? আমি কেন তোমাকে নিয়ে গেলাম সেখানে? আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না। তুমি জানো না, যখন ওই লোকটা তোমার দিকে ছুরি নিয়ে যাচ্ছিল, আমার হার্ট কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রিন্নি, তুমি শুধু আমার বউ নও, তুমি আমার আত্মা। আমি ব্লু চিপ হারাতে রাজি, কিন্তু তোমাকে নয়।”

রিন্নি আরাভের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। তার চোখেও পানি। এই পাথরের মতো মানুষটা তাকে কতটা পা*গলের মতো ভালোবাসে। রিন্নি ফিসফিস করে বলল, “আপনার জেরি এত সহজে আপনাকে ছেড়ে যাবে না স্যার। আমি তো আপনার হার্টবিট হ্যাক করে বসে আছি।”

আরাভ রিন্নির মুখটা দুহাতে আগলে ধরল। ওর চোখে তখন এক আকাশ ভালোবাসা আর এক চিমটি পাগলামি। সে রিন্নির কপালে আর গালে অসংখ্য ছোট ছোট চুমু দিয়ে বলল, “বাসায় চলো। আর শোন, আজ থেকে তোমার প্রাইভেট টিউটর হিসেবে আমি তোমাকে শুধু ফিজিক্স পড়াব না, তোমাকে শিখাব কীভাবে একজন দক্ষ ফাইটার হতে হয়। কারণ যার জীবনের সাথে তোমার জীবন জড়িয়েছো তাতে বিপদ সাথেই সংসার বেশি করতে হবে।”

রিন্নি হাসল।

বাসায় ফেরার পর:
ফাহিম ড্রয়িংরুমে বসে একটা বড় বাটি নিয়ে বিরিয়ানি খাচ্ছিল। ওদের দেখে সে চমকে উঠল। “আরে! ভাইয়া আর ভাবী! তোমরা সকালে ডেইট করতে গিয়ে কি ড্রেস চেঞ্জ করে এলে? আর ভাবীর নাকে ধুলো কেন? তোমরা কি ধুলোবালি খেলা করছিলে নাকি?”

আরাভ গম্ভীর মুখে ফাহিমের বিরিয়ানির বাটিটা কেড়ে নিল। “ফাহিম, তুই আজ থেকে সাত দিন শুধু সিদ্ধ ভাত খাবি। আর নয়নার সাথে ফোনে কথা বলা বন্ধ।”

ফাহিম হাহাকার করে উঠল, “কেন! আমি কী করলাম?”

আরাভ রিন্নিকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, “তুই বিরিয়ানির সাথে যে ট্যাক্স টা দেওয়ার কথা ছিল, সেটা দিসনি। আজ রাতে চৌধুরী ভিলার নেটওয়ার্ক আমি বন্ধ করে দিচ্ছি। গুড নাইট!”

রিন্নি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল। সে জানে, এই বাড়িতে শান্তি হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তাদের এই বিপরীত মেরুর টান চিরস্থায়ী।

পরদিন সকালে আরাভ রিন্নিকে নিয়ে ভার্সিটি যায়, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল প্রিন্সিপালের রুমে সেই সোনিয়া কান্নাকাটি করছে। সোনিয়া দাবি করছে আরাভ নাকি তাকে কাল রাতে বাজে মেসেজ দিয়েছে!

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here