#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৯
আরাভের বিশাল ম্যানশনটি এখন আর সেই শীতল, গম্ভীর মাফিয়া দুর্গ নেই। যে করিডোরগুলোতে একসময় শুধু বুলেটের শব্দ আর ভারী বুটের আওয়াজ পাওয়া যেত, সেখানে এখন ভেসে বেড়ায় একজোড়া ছোট পায়ের শব্দ আর খিলখিল হাসির সুর। সকালের মিষ্টি রোদ জানলার ভারী পর্দা ভেদ করে ডাইনিং টেবিলে এসে পড়েছে।
আরাভ তার ব্ল্যাক কফি হাতে বসে আছে, কিন্তু তার মনোযোগ কফিতে নেই। তার নজর পাশের চেয়ারে বসে থাকা পাঁচ বছরের ফাহিমের দিকে। ফাহিম একদম শান্ত। ঠিক পাঁচ বছর আগে আরাভ যাকে হারিয়েছিল, এই ছেলেটা যেন তারই বিপরীত। কিন্তু ফাহিমের কথা বলার ধরন, শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকা সবই সেই পুরনো ফাহিমের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু শান্তি যেখানে আছে, সেখানে অশান্তিও আছে। আর সেই অশান্তির নাম ‘আরান্না’।
“মা! আমার স্যান্ডউইচ থেকে শসা সরাও! আমি বলেছি না আমি সবুজ কিছু খাব না!” আরান্নার চিৎকারে আরাভের কফির কাপটা কেঁপে উঠল।
তিন বছরের আরান্না ডাইনিং চেয়ারে দাঁড়িয়ে রীতিমতো ভাষণ দিচ্ছে। তার পরনে একটা ছোট ফ্রক, আর চুলে দুটো ঝুঁটি। চোখদুটো ঠিক আরাভের মতো তামাটে আর তীক্ষ্ণ। রিন্নি রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল।
“আরান্না! একদম দুষ্টুমি করবে না। ফাহিম ভাইয়াকে দেখো, ও কত শান্তভাবে খাচ্ছে,” রিন্নি শাসানোর চেষ্টা করল।
আরান্না হাত ভাজ করে বসল। “ভাইয়া তো বোরিং। আমি বোরিং হবো না। বাবা, তুমি মাকে বলো শসা সরাতে!”
আরাভ আড়চোখে রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নি চোখ রাঙাতেই আরাভ গলা ঝেড়ে বলল, “আরান্না মা, শসা খেলে গায়ের রঙ ফর্সা হয়। তোমার মায়ের মতো সুন্দর হতে চাইলে সব খেতে হবে।”
আরান্না একটা বাঁকা হাসি দিল, যা হুবহু আরাভের সিগনেচার স্মাইল। “আমার মায়ের মতো সুন্দর তো আমি অলরেডি আছি। আমার বাবার মতো পাওয়ারফুল হতে হবে, আর বাবা শসা খায় না, আমি জানি!”
আরাভ হেরে গিয়ে কফিতে চুমুক দিল। রিন্নি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরান্নার প্লেট থেকে শসা সরিয়ে দিল। রিন্নি এখন আর সেই স্মৃতিকাতর মেয়েটি নেই। সে এখন একাধারে দক্ষ গৃহিণী আর আরাভের ব্যবসার প্রধান পরামর্শদাতা। তার বেগুনি চোখ দুটো এখন আত্মবিশ্বাসে টলমল করে।
নাস্তা শেষ করে আরাভ যখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে, তখন আরান্না এসে তার প্যান্টের পা জড়িয়ে ধরল।
“বাবা, আজ তুমি যাবে না। আজ আমার সাথে পুতুল খেলবে।”
আরাভ নিচু হয়ে আরান্নাকে কোলে তুলে নিল। “মা, বাবার আজ একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। তোমার জন্য বড় একটা চকলেট নিয়ে আসব বিকেলে, প্রমিস।”
আরান্না মুখ ফুলিয়ে বলল, “চকলেট লাগবে না। তুমি আজ আমার কাছে ঘুমাও না প্লিজ! কাল রাতেও তো তুমি ফাহিম ভাইয়ার রুমে ছিলে।”
আরাভ আরান্নার কপালে চুমু দিয়ে বলল, “আজ রাতে আমি তোমার কাছেই থাকব, ঠিক আছে?”
রিন্নি পাশ থেকে আলতো করে বলল, “আরাভ, ওকে বেশি লাই দিচ্ছ। ও কিন্তু দিন দিন তোমার চেয়েও বেশি জেদি হয়ে উঠছে।”
আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে হাসল। “আমার কার্বন কপি হয়েছে যখন, জেদ তো থাকবেই। কিন্তু রিন্নি, আমাদের ফাহিম… ও কি আজও কিছু বলেনি?”
রিন্নি মাথা নাড়ল। ফাহিম খুব কম কথা বলে। সে যেন নিজের এক গোপন জগতে বাস করে। আরাভ ফাহিমের কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখল। “ফাহিম, বাবা আসছি। কোনো সমস্যা হলে মা বা আমাকে বলবে, ঠিক আছে?”
ফাহিম মাথা নাড়ল। “সাবধানে যেও বাবা।”
আরাভ ম্যানশন থেকে বেরিয়ে এসইউভিতে উঠল। পেছনে নয়না আর বডিগার্ডদের বহর। ড্রাগন এখন রিহ্যাব সেন্টারে তিলে তিলে ম-রছে, কিন্তু টাইগারের কিছু অবশিষ্টাংশ এখনো শহরে রয়ে গেছে। আরাভ তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না।
বিকেলে আরাভ যখন কাজ শেষ করে ফিরছিল, তখন নয়না একটা ফাইল এগিয়ে দিল।
“ভাইয়া, ড্রাগনের অবস্থা খুব খারাপ। ও নাকি বারবার রিন্নির নাম ধরে চিৎকার করছে। ওর হ্যালুসিনেশনগুলো এখন ওকে প-াগলের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।”
আরাভ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। “ওকে ওর কর্মফল ভোগ করতে দাও নয়না। ও আমাদের যে ক্ষতি করেছে, তার কোনো ক্ষমা নেই। তবে আমার চিন্তা শিশকে নিয়ে। পাঁচ বছর ও রিন্নির পাশে ছিল। ও এখন কোথায় আছে, কোনো খবর পেয়েছ?”
নয়না কিবোর্ডে কিছু সার্চ করে বলল, “শিশ এখন লন্ডনে আছে। ও সেখানে একটা আর্ট গ্যালারি চালাচ্ছে। ওর একতরফা প্রেমটা ও এখন ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে। তবে ও আর কোনোদিন এদিকে ফিরে আসার চেষ্টা করেনি।”
আরাভ একটু স্বস্তি পেল। শিশের জন্য ওর মায়া হয়, কারণ শিশ আসলে পরিস্থিতির শিকার ছিল। সে রিন্নিকে ভালোবেসেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসা ছিল মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে।
রাত দশটা। ম্যানশন এখন শান্ত। ফাহিম তার পড়ার টেবিলে বসে ড্রয়িং করছে। রিন্নি আরান্নাকে নিয়ে বিছানায় শুতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আরাভ রুমে ঢুকল।
আন্নি হঠাৎ করে আরাভের গালে একটা চুমা দিল। “বাবা, আমি তো তোমার প্রিন্সেস।”
আরাভের সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে পানি হয়ে গেল। সে আরান্নাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। রিন্নি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এই দৃশ্যটার দিকে। এই সেই মানুষ, যে একসময় পাথর ছিল। যে ভালোবাসা বুঝত না। আজ সে তার মেয়ের একটা চুমুর কাছে অসহায়।
হঠাৎ নিচের তলায় কলিং বেল বাজল। এই মাঝরাতে কে আসতে পারে? আরাভ সতর্ক হয়ে উঠল। ও বালিশের নিচ থেকে গানটা বের করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রিন্নি বাধা দিল।
“শান্ত হও আরাভ। সিসিটিভিতে দেখো।”
স্ক্রিনে দেখা গেল রিন্নির মা-বাবা আর আরাভের বাবা-মা একসাথে এসেছেন। সবার হাতে অনেকগুলো গিফট বক্স। আরাভ আর রিন্নি দ্রুত নিচে নেমে এল।
রিন্নির বাবা হেসে বললেন, “আমরা থাকতে পারলাম না। আজ আমাদের ফাহিমের জন্মদিন ছিল না? ১০ বছর আগে এই দিনে ও হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজ আমাদের এই ছোট্ট ফাহিমের জন্মদিন। আমরা সারপ্রাইজ দিতে এসেছি।”
আরাভ ভুলে গিয়েছিল। ও আজ কাজে এত ব্যস্ত ছিল যে ফাহিমের জন্মদিনের কথা ওর মাথায় ছিল না। ফাহিম সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। ওর চোখে আজ প্রথমবারের মতো একটা বড় হাসি দেখা গেল।
দাদামণি আর নানুভাই যখন ফাহিমকে জড়িয়ে ধরল, তখন পুরো ম্যানশনটা যেন আলোয় ভরে উঠল।
আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জেরি, তুমি কি আজও বলবে যে বিপরীত মেরুগুলো একে অপরকে বিকর্ষণ করে?”
রিন্নি আরাভের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। “না স্যার। বিপরীত মেরুগুলো যখন একবার প্রেমে পড়ে, তখন তারা একে অপরের সাথে লীন হয়ে যায়। ঠিক যেমন আমি আর আপনি।”
ডাইনিং রুমে কেক কাটা হলো। ফাহিম শান্তভাবে কেক কাটল, আর আরান্না সেই কেক নিয়ে সারা মুখে মাখল। রিন্নির মা আর আরাভের মা একসাথে বসে গল্প করছেন। দুই বাবা মিলে ভবিষ্যতের ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করছেন।
আরাভ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের মুক্ত বাতাসটা আজ অনেক বেশি মিষ্টি লাগছে। রিন্নি পেছন থেকে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।
“কী ভাবছো?”
আরাভ ঘুরে রিন্নিকে নিজের দুহাতের বেড়াজালে বন্দি করল। “ভাবছি, যদি সেদিন ওই অ্যাক্সিডেন্ট না হতো, তবে কি আমরা আজ এখানে থাকতাম? হয়তো থাকতাম, কিন্তু ভালোবাসার এই গভীরতাটা কি আমরা বুঝতাম?”
রিন্নি মাথা নাড়ল। “বিচ্ছেদ ছাড়া মিলনের আনন্দ বোঝা যায় না স্যার। আমাদের ওই পাঁচ বছরের বিরহ আজ আমাদের এই বন্ধনটাকে হীরের মতো শক্ত করে দিয়েছে।”
আরাভ রিন্নির কপালে একটা দীর্ঘ চুমু আঁকল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি জেরি। আজীবন এভাবেই আগলে রাখব।”
রিন্নি মৃদু হেসে বলল, “আমিও তোমাকে ভালোবাসি স্যার। তবে আপাতত আরান্নাকে সামলান, ও আপনার ল্যাপটপে জুস ঢেলে দিয়েছে মনে হচ্ছে!”
আরাভ চিৎকার করে রুমের দিকে দৌড় দিল, আর রিন্নি হাসতে হাসতে বিছানায় বসে পড়ল। এই খুনসুটি, এই ঝগড়া আর এই বুক ভরা ভালোবাসা নিয়েই তাদের ‘বিপরীত মেরুর টান’ আজ এক সার্থক পরিণতির পথে।
চলবে,,,,,

