#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৫০
সময় যেন এক বহমান নদী। সেই নদীর পাড় ভাঙা-গড়ার খেলায় অনেক পানি গড়িয়েছে। ড্রাগনের বিষাক্ত নীল কুয়াশা এখন অতীত, আর ডক্টর জামানের অনুতপ্ত জীবন এখন নির্জন এক আশ্রমে।
ম্যানশনের লাইব্রেরি ঘরটাতে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে। সাত বছরের ফাহিম মেহগনি কাঠের বিশাল টেবিলের ওপর একটা পুরনো ডায়েরি নিয়ে বসে আছে। এটা রিন্নির সেই ডায়েরি, যেখানে ও ওর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির টুকরো লিখে রাখত। ফাহিম ছেলেটা আজব রকমের শান্ত। ওর চোখের গভীরতা দেখে মাঝে মাঝে আরাভও ভয় পায়। ও ঠিক যেন আরাভে সে অতীতের গম্ভীর রূপ তাও ভয়ংকর।
আরাভ দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে দেখছিল। হাতে তার সেই প্রিয় ব্ল্যাক কফি। সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে ফাহিমের মাথায় হাত রাখল।
“কী পড়ছো ফাহিম?”
ফাহিম মুখ তুলে তাকাল। ওর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। “বাবা, মা কি সত্যিই ম-রে গিয়েছিল? এখানে লেখা আছে মা নাকি আকাশের তারা হয়ে গিয়েছিল।”
আরাভ আলতো করে ফাহিমের পাশে বসল। “না বাবা, মা কোনোদিন হারায়নি। মা তোমার নামের মাঝেই বেঁচে ছিল। আর আজ তো মা আমাদের সাথেই আছে।”
ফাহিম ম্লান হাসল। “আমি জানি। তাই তো আমি চাচুর নামটা খুব সাবধানে রাখি।” সাত বছরের এক শিশুর মুখে এমন কথা শুনে আরাভ স্তব্ধ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, কিছু আত্মা সত্যিই ফিরে আসে, সম্পর্কের পূর্ণতা দিতে।
ঠিক সেই সময় নিচতলা থেকে একটা বিকট চিৎকারে লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল।
“বাবা! মা আমার লিপস্টিক কেড়ে নিয়েছে! এখনই ওকে বলো ফেরত দিতে!”
আরাভ কপালে হাত দিল। পাঁচ বছরের আরান্না যার চলাফেরা, কথা বলা আর জেদ একদম আরাভ চৌধুরীর ছোট সংস্করণ। ও লিপস্টিক দিয়ে সারা মুখে ড্রয়িং করেছে। রিন্নি ওকে ধাওয়া করছে তোয়ালে নিয়ে।
আরাভ নিচে নেমে আসতেই আরান্না দৌড়ে এসে আরাভকে জড়িয়ে ধরল। “বাবা, বাঁচাও! তোমার বউ আমাকে মা-রছে!”
রিন্নি হাফাতে হাফাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। “আরাভ! তুমি তোমার এই মেয়েকে আজ শাসন করো। ও আমার দামী লিপস্টিক দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ‘আরাভ ইজ এ ডঙ্কি’ লিখেছে! তোমার মেয়েকে এখনই বুয়ার কাছে দিয়ে আসো!”
আরাভ হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। সে আরান্নাকে কোলে তুলে নিল। “মা, আয়নায় বাবাকে গাধা কেন লিখলে?”
আন্নি আরাভের নাক টিপে দিয়ে বলল, “কারণ তুমি মায়ের সব কথা শোনো। মা বকলেও তুমি কিছু বলো না। তাই তুমি গাধা! আর মা কেন আমার লিপস্টিক কেড়ে নেবে? ওটা তো আমার বাবার টাকার কেনা!”
আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “শুনেছো? ওর লজিক তো ঠিকই আছে। ও তো আমারই উত্তরাধিকারী।”
রিন্নি তোয়ালেটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। “আমি হার মেনেছি তোমাদের কাছে। বাপ আর মেয়ে মিলে আমাকে প-াগল করে ছাড়বে। জীবনডা আমার পুরো বেদনার হয়ে গেল!”
আরাভ আরান্নাকে নামিয়ে দিয়ে রিন্নির পাশে এসে বসল। রিন্নির কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি আজও হিংসা করো জেরি?”
রিন্নি আরাভের চোখে চোখ রাখল। ওর সেই মায়াবী বেগুনি চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই। সে হাসল। “মেয়েটা তো আপনারই মতো। ওকে দেখলে মনে হয়, আমি সেই পুরনো আরাভকে ফিরে পেয়েছি যে কথা কম বলত কিন্তু ভালোবাসত পাহাড়ের মতো।”
রাতের ডিনার শেষে পুরো পরিবার বাগানে বসেছে। রিন্নির মা-বাবা আর আরাভের বাবা-মা একসাথে পুরনো দিনের গল্প করছেন। মাঝখানে ফাহিম আর আরান্না ঘাসের ওপর দৌড়াদৌড়ি করছে। আরাভ আর রিন্নি একটু দূরে দোলনায় বসে আছে।
আরাভ রিন্নির হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিয়ে আঙুল দিয়ে খুঁটছিল।
“জেরি, মনে আছে সেই প্রথম দিনের কথা? যখন তুমি আমার ল্যাবে চুরি করতে এসে ধরা পড়েছিলে?”
রিন্নি মাথা নিচু করে হাসল। “মনে থাকবে না কেন? আপনি তো তখন আস্ত একটা হিটলার ছিলেন। ভাবিনি সেই হিটলার একদিন আমার বাচ্চার বাবা হবে।”
আরাভ রিন্নিকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। “জীবনের অংকগুলো বড্ড অদ্ভুত, তাই না? আমরা ভেবেছিলাম আমরা বিপরীত মেরু, একে অপরকে শুধু বিকর্ষণ করব। কিন্তু সেই বিকর্ষণটাই আমাদের আজ এমন এক আকর্ষণে বেঁধে ফেলেছে যা ছিঁড়ে ফেলার সাধ্য কারো নেই।”
রিন্নি আরাভের বুকে কান পেতে ওর হৃদস্পন্দন শুনল। “স্যার, ড্রাগন কি আজ শাস্তিতে আছে?”
আরাভ আকাশের দিকে তাকাল। “ড্রাগন হোক বা টাইগার সবাই ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের এই উপন্যাসে এখন আর কোনো ভিলেন নেই জেরি। এখন আছে শুধু তুমি, আমি আর আমাদের এই ছোট পৃথিবী।”
বাতাসে বকুল ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। দূরে আরান্না আর ফাহিমের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। রিন্নি চোখ বুজল। ওর মনে হলো, জীবনের এই প্রান্তরে এসে সব যুদ্ধ থেমে গেছে।
বিপরীত মেরুর টান যখন চূড়ান্ত হয়, তখন তারা আর আলাদা থাকে না। তারা মিলেমিশে এক হয়ে যায়। ঠিক যেমন আরাভ আর রিন্নি দুই ভিন্ন সত্তা, কিন্তু এক অবিচ্ছেদ্য আত্মা।
আরাভ ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, জেরি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”
রিন্নি উত্তর দিল না, শুধু আরাভের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া সেই ম্যানশনটা আজ এক সুখী রাজপ্রাসাদের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
পুরো ম্যানশন যখন খুশির জোয়ারে ভাসছে, তখন বারান্দার অন্ধকার কোণে একলা দাঁড়িয়ে ছিল নয়না। ওর বুকের ভেতরটা আজ বড্ড ফাঁপা লাগছে। সাত বছরের ফাহিম যখন হুবহু ওর সেই পুরনো ফাহিমের মতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে হাসে, তখন নয়নার কলিজাটা ছিঁড়ে যেতে চায়। এই ছোট ফাহিমের প্রতি ওর যে টান, তা কেবল ফুফুর মায়া নয় এ যেন নিজের হারানো ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার এক অবুঝ হাহাকার। ও মাঝেমধ্যেই আড়ালে গিয়ে কাঁদে, কারণ এই আনন্দের উৎসবে ওর চোখের পানি বড্ড বেমানান।
নয়না পানিভরা চোখে আকাশের সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রটির দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, “ফাহিম রে, আজ থেকে ১১ বছর আগে যদি তুই ড্রাগনের সামনে নিজের বুকটা পেতে না দিতিস, তবে এই সুখী পরিবারটা আজ কেবল শ্মশান হয়ে থাকত। তোর বলিদানের র-ক্তে ভেজা মাটিতেই আজ আরাভ ভাই আর ভাবীর এই সুখের বাগান ফুটেছে।” নয়না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “সবাই তো র-ক্ত-মাং-সের সংসার করে, আর আমি? আমি তোর স্মৃতি দিয়ে মনে মনে এক কল্পনার সংসার পেতেছি। দিনশেষে কিছু মানুষের জীবনে বাস্তবের চেয়ে কল্পনাতেই সংসারটা বেশি সুন্দর হয়।”
সমাপ্ত
( অবশেষে শেষ হয়ে গেল এই বিপরীত মেরুর টান। কেমন জানো খালি খালি লাগছে। আর দেখা হবে না আরাভের সাথে সেই হ্যাকারটার সাথে। ভুলে যেও না এই টম এন্ড জেরিকে। এরপর কেমন গল্প পড়তে যাও চাইলে পরামর্শ দিতে পারো।)

