একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—১১-১২

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১১-১২

কিছু শব্দ, কিছু অনুভূতি না চাইতেও হৃদয়ে বাসা বাঁধে, চাইলেও সরানো সম্ভব হয় না। জেঁকে বসে থাকে হৃদয়ের গভীরে। শিউলির ও হয়েছে তাই। মাহাদের পাঠানো চিঠি পড়ে স্তদ্ধ হয়ে বসে আছে।
অনুভূতি শূন্য কিশোরী কন্যার মনে হুট করে অনুভূতির দোলা দিতে শুরু করেছিলো এখন থেকে তা আরো মাত্রা ছাড়ালো। পর,পর বার কয়েক চিঠির শব্দ গুলো পড়ে ফেলেছে তবুও সাঁধ মিটছে না যেন। হাতের আঁজলায় এখনো চিঠিটি শুয়ে আছে। বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে। সময়টা এতো আনন্দময় লাগছে যা আগে কখনো লাগেনি। এই চিঠি কিশোর কন্যার মনে ঝর তুললো,আঁচড়ে পড়লো কিছু অনুভূতি। যা চাঁপা পড়েছিলো হৃদয়ের গভীরে।

চিঠিটা মালা খানিক আগে দিয়েই চলে গেছে। খানিকক্ষণ পর মালা আবারো ওদের বাড়ি আসলো। ঘরে ঢুকে শিউলি কে একই ভাবে বসে থাকতে দেখলো। হাতে চিঠি আর অঁধর জুড়ে বিস্তার হাসি। মালা হতাশ প্রকাশ করে শিউলির উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

“ হায় আল্লাহ! সখী কি প্রেমে মজিলো? সময় পার হইয়া যাইতাছে কিন্তু চিঠি থেকে দৃষ্টি সরে নাই এখনো।”

শিউলির ভাবনার সুতো ছিঁড়লো। আচমকা কন্ঠে চমকেও উঠলো। অচেতন মনে অন্য কেউ ভেবে চিঠি লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করলো সর্বপ্রথম।
পরে খেয়াল আসতেই মালাকে নজরে পড়লো। চিঠি খানা লুকানোর বদলে মেলে ধরলো আবারো।
বলল,

“ প্রেম কি বুঝিনাই কখনো, তয় অচিন মানুষ রে দেখার পর বুকের ভেতর দুরুদুরু করে, চিঠি শব্দ গুলো জানার পর আরো তীব্র অনুভূতি না চাইতেও জাগতাছে সখী। আমি কি প্রেমে মরিলাম সত্যি?”

“ এ রোগ মেলা ভয়ংকর, তয় ডাক্তার সাহেব যখন সারানোর দায়িত্ব নিবার চাইতাছে সমস্যা নাই। যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনই সুন্দর ব্যবহার আর মন। গ্রামের সবাই কত প্রশংসা করতাছে।”

শিউলির ভালো লাগার মাঝেও কিছু চিন্তা থেকে গেলো। তাই তো মালা কেই শুধায়,

“ অচিন মানুষ থাকে মেলা দূর শহরে, পরিনতি সম্ভব কিভাবে? উনি বড় ঘরের ছেলে দেইখাই বুঝা যায়।”

মালা নিজেও একই উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিলো। তবে মাহাদ আর শিউলির ব্যাপার টা একটু বেশিই কঠিন। মানলেও গ্রাম ছাড়তে হবে শিউলিকে। ও হারিয়ে ফেলবে প্রাণ প্রিয় সখীরে। এতটুকু ভাবলেই ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। তবুও হেসে বলল,

“ যে নিবার সে ঠিক থাকিলেই সবই সম্ভব।”

“ তাইলে কি নদীর পাড়েতে যাইবো?”

“ হুম পশ্চিমের ঘাটে যাইস ওদিকে মানুষ থাকে না সন্ধ্যা হইলে। ভূত প্রেত আছে অনেকে বলে। তয় প্রেমে মজিলে নাকি ভয় থাকে না বুকে তাই চইলা যাইস আমি আর নাজির ভাই ও থাকবো তোদের পাহারা দিতে।”

মালা হাসতে হাসতে বললেও ভেতরে ভেতরে পুড়ছে খুব। শিউলি তার সখী বোনের থেকে কম নয়। শিউলি তখন আবারো চিঠির দিকে তাকালো।
মোহে এবং হৃদয়ের টানে ভাবলো না ভবিষ্যৎ। মালা চলে গেলে ও উঠে পড়ে চৌকি থেকে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে ওর মা রান্ধনের জন্যে লাউ কাঁটতে নিচ্ছে। ও এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ আম্মা আমারে দাও আমি কাঁটতাছি।”

আমেনা বেগম দিলো না। গোয়াল ঘরের দিকে তাকিয়ে শিউলি কে বলল,

“ পারলে গরুটাকে এনা খঁড় নিয়ে আসে দে।”

শিউলি দৌঁড়ে বাহির হলো উঠোন থেকে। মনটা ফুরফুরে থাকাতে পাখির মতন উড়তে ইচ্ছে করছে।
কোমরে গুঁজে রাখা শাড়ির আঁচল টেনে বাহির করে হওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার মতোন করে কিছুক্ষণ ছুটলো, হাসলো অনেক। দূরন্ত পাখি হবার চেষ্টা তাকে আনন্দ দিলো বেশ। দূর থেকে কেউ একজন ওর এই হাসি দেখে মুগ্ধ হলো। যা শিউলির অজানায় রইলো।

____________

পাপিয়া ঘর গোছাচ্ছিলো। হঠাৎ আলমারি গোছাতে গিয়ে একটা জিনিস পেলো। সাদা কাগজে মোড়ানো। খুলে দেখতে পেলো নেশা জাতীয় কিছু একটা। অবাক হলো না পাপিয়া। বুঝতে পারে সাহেলের তাড়ি,মদের নেশা ধরেছে অনেক আগেই। এই নেশার শিকার কত হয়েছে। ব্যথা নামক যন্ত্রণা সহ্য করেছে। তখনই আগমন ঘটলো সাহেলের। পাপিয়া তড়িৎ গতিতে আগের স্থানে জিনিসটি রেখে দিলো। নয়তো এ নিয়েও কান্ড বাঁধাতে সময় নিবে না। যাকে অবহেলার বস্তু হিসাবে দেখা হয়,তখন তার সবকিছু অসহ্য আর অমঙ্গল মনে হয়।

সাহেল দরজা বন্ধ করে আসলো। শরীর টলমল করছে। ওভাবেই পাপিয়ার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালো। তার পর গিয়ে শুয়ে পড়লো গোছানো বিছানায়। সেও এক পলক তাকিয়ে কাজে ব্যস্ত হলো। একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে নিধি আসলো। এভাবে আসাতে পাপিয়া শুধালো,

“ কি হয়েছে? তাড়াহুড়ো করে আসলে কিছু হয়েছে কি?”

নিধি হাফাচ্ছে। কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,

“ তোমার আব্বা এসেছে ভাবি। তোমারে ডাকতাছে কয়দিন দেখেনি তাই আজ দেখতে এসেছে।”

পাপিয়া পড়লো মহা ঝামেলায়। কি করে বাবার সামনে যাবে এই অবস্থায়? গালে, গলায় এখনো মাইরের দাগ। ভেতরের ব্যথা লুকিয়ে রাখতে পারলেও বাহিরের আঘাত লুকানো কঠিন। নিধি বলল আবারো,

“ যাইবা? উনি অপেক্ষা করছেন তোমারে দেখেই যাইবো চলে। আম্মা নাস্তা দিয়েছেন।”

“ না দেখে তো যাবে না। কি করবো? আঁচল টেনে গেলেও সন্দেহ করে শুধায় যদি?”

নিধি বুদ্ধি বাহির করলো।

“ মাথা থেকে দুই গাল, গলা আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখবা, বলবা শরীরে এক রোগ হয়েছে পুরো শরীর ঢাইকা রাখতে কইছে ডাক্তার। পারলে গায়ে শাল ও জড়াও একটা তাহলে সন্দেহ করবে না।”

পাপিয়া তাই করলো। বুদ্ধি পেয়ে নিধির গালে হাত রেখে হাসলো। তার পর চলে গেলো ঘর থেকে। নিধি একবার ওর ভাই জানের দিকে তাকালো।
মানুষটা ওর নিজের ভাই ভাবতেও রাগ লাগলো,ঘৃণা ও হলো তার কর্মের কথা মনে করে।

নিধি ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুটা সামনে যেতেই নাজিরের দেখা পেলো। ও নিধি কে বলল,

“ আম্মা ডাকছে তাড়াতাড়ি যা।”

নাজিরের কথায় ও দ্রুত পা চালালো। রন্ধন ঘরের একটু সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাঈদ তা নজরে আসলো কিন্তু পাত্তা দিলো না। কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে কেন এটা ভাবার বিষয়। নিধি ভাবতে ভাবতে মুখ আঁধার হয়ে এলো মনে পড়লো সকালের কথা। মাথা নিচু করে তড়িৎ গতিতে প্রবেশ করলো। সাঈদ কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলো না। তবে একটু পর আবারো বাহির হয়ে আসলো। হাতে পায়েসের বাটি।

“নিন।”

সাঈদ নিলো। সে মূলত পায়েসের বাহানায় নিধিকে খুঁজতে এসেছিলো। এসে দেখে সায়মা বেগম আছেন। অগ্যত তাকেই বলতে হয়। তিনি আবসর ডাক পাঠান নিধি কে। আশার আলো দেখে দাঁড়ালো। নিধি ও চলে আসলো।

সাঈদ পায়েস মুখে দিয়ে প্রশংসায় বলল,

“ আপনার হাতের রান্ধন অনেক সুস্বাদু। শহরে গেলে মনে পড়বে আপনার কথা।”

নিধির এক মুহূর্তের জন্য অন্য রকম অনুভূতি হলো। পর মুহূর্তে চোখে দেখা দৃশ্য ফুটে উঠতেই সে অনুভূতিতে ফিঁকে করে দিলো। হাসার চেষ্টা করলো। শুধু বলল,

“ মনে পড়ার মতো আর কেউ থাকলে বলতে পারেন আমি সাহায্য করবো যেকোনো দরকারে।”

সাঈদ ওর কথার অর্থ বুঝলো না। কেবল জানতে চাইলো,

“ কখনো যদি আপনার জন্য উপহার পাঠাই আপনি গ্রহণ করবেন? স্মৃতি হিসাবে রেখে দিবেন না হয়। আমি অধম আপনার রান্না খেয়ে যাচ্ছি এখন কিন্তু উপহার পাঠাবো পরে।”

নিধি এবার তাকালো সাঈদের পানে। চারটে দৃষ্টি একত্রে হলো। নিধি চট করে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে নজর না দেওয়াই ভালো। তবে প্রশ্ন শুনে আগ্রহ নিয়ে নিধি জানতে চাইলো,

“উপহার কিভাবে পাঠাবেন? শুধু আমার জন্য নাকি আরো কারো জন্য? ”

“ শুধু আপনার জন্য। যদি সোনার কন্যা ভালোবাসা গ্রহণ করে তবে এই গ্রামে আমি না ফিরলেও মাহাদ ফিরবে আবারো।”

নিধির ভ্রু কুঁচকে আসলো। মনে ভাবনা আসলো, কে আবার সোনার কন্যা?তা জানতে আগ্রহ হলো মন । সাঈদ হয়তো বুঝতে পারলো। তাই আগেই জবাব দিলো,

“ মাহাদ শিউলি কে সোনার কন্যা বলে ডাকে। অজান্তেই মাহাদের মতো একজন সাধারণ একটা কিশোরী কন্যার প্রেমে পড়লো ভাবতেই অবাক লাগে, জানেন?”

নিধি আপাতত স্তব্ধ। কি শুনলো ও? অবাক চিত্তে জানতে চাইলো আবারো,

“ শিউলি? কই শিউলি তো আমায় কিছু বলেনি।”

“ সে তো নিজেই জানতো না। তবে না জেনেও মাহাদ কে খুঁজে ফিরে। আজ জেনেছে চিঠির মাধ্যমে। মাহাদই লিখে পাঠিয়েছে। সন্ধ্যা বেলায় উত্তরের অপেক্ষায় নদীর ঘাটে রবে। শিউলির উত্তর জেনে কাল ফিরবো শহরে। মনমতো উত্তর পেলে মাহাদ আবারো আসবে এখানে।”

নিধি এবার আরেক দফায় অবাক হলো। সাথে নিজের করা সন্দেহ নিয়ে লজ্জাও পেলো। কি বলবে বুঝতে পারলো না। একটু পর শুধায়,

“ আপনি কখনো ফিরবেন না এ গ্রামে?”
সাঈদ চমকায়। উত্তর খুঁজে। নিধি কেবল তাকালো সাঈদের দিকে। সে তাকিয়ে আছে অন্য পানে। ওভাবেই বলল,

“ শুনুন নিধি আমি একটু ভিতু আছি। এভাবে তাকাবেন না এই দৃষ্টি ভয়ংকর কিছু বলে যা সর্বনাশ ঘটাতে পারে।”

সাঈদ একটু থেমে নিধির চোখের দিকে চায়। মেয়েটার মায়াভরা মুখশ্রী। অপছন্দের জো নেই বললেই চলে। সাঈদ দৃষ্টি উপেক্ষা করে পর মুহূর্তে আবারো বলল,

“আর শুনুন আমার ফেরা হবে না এ গ্রামে। এজন্য উপহার পাঠাবো বলেই অনুমতি নিলাম।”

সাঈদ চলে গেলো তক্ষণাৎ। নিধি তার গমনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সর্বনাশ যা ঘটার না চাইতেও ঘটে গেছে এখন যা করা সম্ভব তা হলো মনকে বুঝিয়ে নিছকই কল্পনা ভেবে মুছে ফেলা।

________

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্য ডুববে খানিক বাদে।
শিউলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখছে। নিজে,নিজে হাসছে আবার কখনে লজ্জাও পাচ্ছে। প্রেমে পড়লে বুঝি এমনই হয়। আজ সপ একটুখানি সেজেছে। সবচেয়ে সুন্দর কমলা রঙা শাড়িটা পরেছে, চোখে কাজল দিয়েছে। যেটা ওর দাদির প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে বানানো কাজল। ওর বাবার আনা লাল চুরিও পরেছে হাতে। তার নিজের কাছেই নিজেকে আজ বেশিই সুন্দর লাগছে। সাজতে মন চাচ্ছে আরো। এর মধ্যে আমেনা বেগমের ঘরে আগমন ঘটলো। মেয়েকে এই অবেলায় সাজগোছ করতে দেখে শুধালো,

“ এই অবেলায় সাজগোছ কিসের জন্যি?”

শিউলি আয়নাটা রাখলো কাঠের টেবিলে। মায়ের দিকে চেয়ে প্রতিত্তোরে বলল,

“ মালাগোর বাড়িত ওর নানা, নানি আইছে হাঁস জবাই কইরা রান্ধিছে আম্মা তাই আমারে যাইতে কইছে। আমি এমনি একটু সাজগোছ করতাছি। আব্বা কইছে সাঁজলে আমারে সুন্দর দেখায় তার জন্যে।”

আমেনা হাসে মেয়ের কান্ডে। এগিয়ে এসে কপালে চুমো খায়। একটুখানি কাজল ছুঁয়ে দেয় কপালের পাশে। বলে,

“ নজর না লাগুক।”

শিউলি ঘর থেকে বাহির হইয়া গেলো। সন্ধ্যা এখনই নামবো। গ্রামে সন্ধ্যার পর মেয়ে মানুষ বাহিরে চলাফেরা কম বললেই চলে। করিম মিয়া এখনো বাড়ি ফিরেনি। আমেনা কে বলে মালা শিউলি কে নিয়ে গেলো তাদের বাড়ি।

__________

“ জিহান আব্বা আর কতদিন বিয়া করবা না কইবা? তোমার আব্বায় রাগ হইতাছে। আজ ও কইল তোমার থেকে শুনতে। গ্রামের তোমার সমবয়সী ছেলেরা বিয়ে কইরা ফালাইতাছে।”

মায়ের কথায় জিহান বিরক্ত হলো। এটা অবশ্য যখনই বাড়ি ফিরে তখনই শুনে। তাদের কিভাবে বুঝাবে? বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্কে একজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলো সে জায়গায় অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারে না,পারবেও না। দরকার পড়লে বিয়ে করবে না। পশ্চিম পাড়ার আসাদ ভাই তো বিয়ে করেনি। বয়স পঞ্চাশের কোটায়। সে কি বেঁচে নেই? ভালোবেসেছিলো যাকে তাকে না পেয়ে একাকিত্ব বেছে নিয়েছিলো। সেও না হয় একাকিত্ব কে জড়িয়ে ধরেই রবে। এটাই বুঝালো নিজেকে। তবে মায়ের প্রতিত্তোরে জিহান অনিচ্ছা সর্তেও বলল,

“ আম্মা বিয়ে আমি এখন করতে চাই না তবুও কেন জোর করো? আব্বারে বলে দাও আমি একাই ভালো আছি।”

জাহিমা বেগম আবারো কয়েক বছর ধরে বলা একই উত্তরে অসন্তোষ প্রকাশ করলো। কিছুটা রেগে বলল,

“ তোর আব্বারে মানুষ কয় ছেলে বিয়া করাবে কখন তিনি উত্তর দিতে পারেন না। মাস্টার মানুষ লোকের কথা শুনতে বাঁধে, তার সম্মানে লাগে।”

“ আম্মা আমার জীবন আমি বুঝবো,মানুষের কথায় কি আসে যায়? মানুষ শুধু বলতে পারে কিছু দিতে নয়।”

জাহিমা বুঝলো ছেলের সঙ্গে কথা বলা বেকার তাই আর কথা বাড়ালো না। উঠে পড়লো চেয়ার থেকে। বেশি রাগালে আবার বাড়ি ফিরবে না মাসের পরে মাস। তিনি বেরিয়ে যেতেই জিহান মাথায় হাত দিয়ে বসলো। কিছু ভালো লাগছে না। সবকিছু বিষাদ লাগছে তার। না হওয়া প্রিয়তমা ভালো আছে ভেবে এতোদিন নিজেকে শান্তনা দিলেও সেদিনের পর আর সম্ভব হচ্ছে না। কি করবে তাও বুঝতে পারছে না। সমাজের তোয়াক্কা সে করতো না কিন্তু সে তো ভয় পায় সমাজ কে। অবশ্য এই ক্ষেত্রে একজন নারীর জন্য এই সমাজ বিষাক্তই। সমাজের মানুষ পুরুষের দোষ দেখে না, সব দোষ, ক্রুটিই নারীর বলে গন্য করে।

________

সূর্য অস্ত গেছে। সন্ধ্যা নেমেছে ধরণীতে। দিনের আলো ফুরিয়ে আঁধার বইছে চারদিকে। বর্ষায় নদীতে কুনো ব্যাঙ ডাকছে গলা ফাটিয়ে। ঘ্যাকোর ঘ্যাও আওয়াজে মুখরিত পরিবেশ।
মাহাদ আর নাজির নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হিমেল বাতাস বইছে। সামান্য কোঁকড়া চুল গুলো দুলছে ধীর গতিতে। একটু পর,পর মাহাদের দৃষ্টি পথের দিকে যাচ্ছে। হাঁটছে অনবরত। নাজির বুঝতে পারছে তার অস্থিরতা। শিউলির উত্তর কি হবে এই নিয়েও কিছুটা ভয়ে ও আছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে তবুও দেখা মিলছে না শিউলির। এবার অধৈর্য হয়ে মাহাদ বলে উঠলো,

“ আসবে তো? গ্রামে সন্ধ্যা হলেই তো ঘরদোর লাগিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। আমাদের অপেক্ষা বৃথা যাবে না তো?”

নাজির আশ্বাস দিয়ে বলল,

“ আসবে বলেই তো এখানে এসেছো তাহলে এতো অবিশ্বাস কেন? মালা নিয়ে আসবে কথা দিয়েছে।”

মাহাদের মতো ধৈর্যশীল ব্যক্তিও অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। নদীর পাড় দুটো। এদিকটাতে মানুষ কমই আসে। আশে পাশে গাছপালা আর ঝোপঝাড় ও আছে। দূর থেকে কারো নজরে আসা মুশকিল কেউ এখানে আছে। পায়চারির মধ্যেই মাহাদের অপেক্ষা ফুরলো। সামান্য দূরে হ্যারিকেনের আলোয় দুজনকে দেখা গেলো। মাহাদ সেদিকে তাকিয়ে রইলো। নাজির গিয়ে বসলো ঘাটে বাঁধা ছোট নৌকায়। পাশে আরো একটা নৌকা আছে ছইয়ের ভেতর অন্ধকার দেখাচ্ছে।

মালা আর শিউলি হাঁটছে। যত কাছাকাছি আসছে শিউলির বুক ধুকপুক করছে। শীতল হাওয়ায় গা শিউরে উঠছে। মালার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছে সে। এক সময় তারা মাহাদ আর নাজিরের কাছাকাছি এসে পৌঁছালো। শিউলির দৃষ্টি নিচু। মাহাদ অপলক তাকিয়ে আছে শিউলির পানে। চোখ সরাতে পারছে না যেন। তাকে দেখতে স্পষ্ট করতে সুবিধা করলো হ্যারিকেনের আলো। নাজির আর মালা এর মধ্যে সরে গিয়েছে দূরে। শিউলি একাই দাঁড়িয়ে আছে মাহাদের সামনে। হাতে হ্যারিকেন টা ধরা আছে। মাথা এখনো নিচু। মাহাদ খানিকটা এগিয়ে গেলো। সেদিনের মতো এবারো বলে উঠলো,

“ আমি কি ভয়ংকর দেখতে? যে দেখলেই মাথা নিচু করে রাখো? মনে হয় হিংস্র কেউ শুধু পালাতে চাও।”

শিউলি তড়িৎ গতিতে এবার মাথা তুললো। তাকালো মাহাদের দিকে। চোখ পড়লো চোখে। মাথা নাড়িয়ে ছাড়া,ছাড়া স্বরে বলে,

“ অচিন মানুষ কি জাদু করিলেন আমারে?
চোখের দিকে তাকালেই বুকের ভেতর কম্পন উঠে।”

মাহাদের নিঃশব্দ হাসি শিউলি টের পায়। তার পকেটে গুটিয়ে রাখা হাতদুটো বাহির করে বুকের মাঝে ভাঁজ করে রাখে। প্রতিত্তোরে বলল,

“ ভালোবাসার জাদু। তুমি আমাকে,আমি তোমাকে। আমি জাদুকর আর তুমি জাদুকরী।”

শিউলির দৃষ্টি মিটিমিটি। কখনো তাকাচ্ছে আবার কখনো দৃষ্টি মাটির দিকে। মাহাদ ওর হাত থেকে হ্যারিকেন টা নিয়ে নিলো। সে সময় আরেকটু কাছাকাছি হতে হলো। শিউলি চোখ খিঁচে দম বন্ধ করে রইলো। মাহাদ হ্যারিকেন টা নিয়েই শিউলির মুখের সামনে ধরলো। চোখে তীব্র আলোর ঝিলিকের তোপে চোখ খুললো সে। মাহাদের দৃষ্টি নিবন্ধ রইলো। হ্যারিকেনের আলোয় উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ আরো উজ্জ্বল ও মোহনীয় লাগলো। চোখ দুটো কি মায়াবী, লজ্জা মিশ্রিত হাসি আরো পছন্দনীয়। মাহাদ হুট করে আনমনে শিউলির পানে চেয়ে ধীর কন্ঠে গেয়ে উঠলো,

একটা ছিলো সোনার কন্যা মেঘ বরণ কেশ,
ভাঁটি অঞ্চলে ছিলো সেই কন্যার দেশ,
দুই চোখে তার আহারে কি মায়া
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া…..

পুরো গান মাহাদের মুখে শুনতেই শিউলি অবাক হলো। হা হয়ে সংশয় ভুলে তাকিয়ে রইলো। আশ্চর্যজনক ভাবে গানটার অধিক শব্দ তারই সঙ্গে কিভাবে যেন মিলেও যাচ্ছে। তার অবাক চিত্তে তাকিয়ে থাকা দেখে মাহাদ হেসে বলে,

“ মিল পেলে কেন ডাকি সোনার কন্যা?
গানের সোনার কন্যা অন্য কারো হলেও আমি তোমাকে একান্তই আমার করতে চাই। এর জন্য সবার আগে তোমার অনুমতি প্রয়োজন শিউলি ফুল।”

শিউলি কি উত্তর দিবে বুঝতে পারছে না। কিসের টানে ছুটে আসলো তাও জানেনা। শুধু জানে মন চাইছে আসতে তাই এসেছে। মাহাদ তার উত্তরের অপেক্ষায় চেয়ে আছে। শিউলি মিনমিনে কন্ঠে বলল,

“ আব্বাজান কে কইবেন। তিনি যাই কইবেন তাই হইবে।”

“ তা তো বলবোই তার আগে তোমার অনুমতি প্রয়োজন। তোমার আমাকে ভালো লাগে কিনা,পছন্দ হয় কি-না সেটাও আগে জানতে হবে। সবার আগে তোমার মতামতই প্রধান্য পাবে।”

“ আপনি মানুষ বড় ভালো, অপছন্দ করিবার কারণ কেউ পাইবো না, আমিও পাইতাছি না। আমার এবং আপনার আব্বা,আম্মা রাজি হইলে আমার আপত্তি থাকবো না।”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে শিউলি মাথা নিচু করে নিলো। লজ্জা সংকোচ দুই ভেতরে বাসা বাঁধলো।
মাহাদ এদিক সেদিক নজর দিলো। নদীর জল হ্যারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে সামান্য। কুনো ব্যাঙের ডাক ও ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছে। দূরে কোথাও ঝি,ঝি পোকা ডাকছে এবার। মাহাদ নিজের হাতের আঙ্গুল থেকে রুপার আংটি টা খুললো। শিউলির নজরে সবটাই পড়ছে। কিন্তু কেন খুলছে? এই প্রশ্ন মনে জাগার আগেই মাহাদ হাত খানা এগিয়ে দিলো তার দিকে। হাতের তালুতে আংটিটা রাখা আছে। শিউলি হাত গুটিয়ে চেয়ে আছে। মাহাদ ইশারা করে বলল,

“ এটা রাখো সঙ্গে,আমি ফিরলে আবার দিও ফিরিয়ে। তোমার একটা জিনিস কিছুদিনের জন্য স্মৃতি হিসাবে নিয়ে যাচ্ছি তাই বিনিময় করে যাচ্ছি। যদি আর ফেরা না-হয়। বলা তো যায় না কখন কার আয়ু ফুরিয়ে আসে।”

শিউলির বুক কেঁপে উঠলো অজানা ভয়ে। মাহাদের মুখে মৃত্যুর কথা কানে তীব্র বিষাক্ত ও অসহ্যকর শোনালো। মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে এলো। নেমে এলো আঁধার। মাহাদ শিউলির মুখশ্রী লক্ষ্য করে হেসে উঠলো। হাসতে,হাসতে ফের বলল,

“ আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে তোমায় নিতে আবারো ফিরবো, যদি তোমায় নিতে না আসি তবে কারণ হিসাবে মিথ্যুক তকমা দিও না, ভেবে নিও এই পৃথিবীতে মাহাদ নামক মানুষটি আর নেই।”

শিউলির ভেতর কেঁদে উঠলো। মাহাদের মুখে এমন কথা তার চোখে জল এনে দিলো। চোখের জল লুকাতে মাথা নিচু করে বলল,

“আপনি অশুভ কথা কইতাছেন কেন? আমার পরাণ পুড়তাছে।”

মাহাদের ভেতর ভালোলাগায় ভরে যায়। শিউলির চোখের জল তাকে হারানোর ভয়ে আসছে ভেবেও হাসলো। আনন্দের সহিত বলল,

“ শোনো,সোনার কন্যা আমি ফিরবো তোমায় সঙ্গে নিয়ে যেতে, তোমার মায়াময় চাহনি না দেখলে আমার হৃদয় সারাটি জীবন দুঃখে থাকবে। তুমি আমার জীবনে হঠাৎ করে আসা এক পশলা বৃষ্টির রেশ, যা হুট করে সর্বাঙ্গে তুমি নামক অসুখ ছড়িয়ে দিলো। এই অসুখ থেকে আমি বাঁচতে চাই না, সারাজীবন সঙ্গী করে নিয়ে থাকতে চাই।”

বলতে বলতে মাহাদ আংটিটা শিউলির হাতের তালুতে রাখলো। হাত স্পর্শ না করলেও শিউলি চোখ বন্ধ করে নিলো। বিদায় সময়ে মাহাদ ফের বলল,

“ যাও আজ রাত্রি হলো অনেক। পরেরবার আসলে তোমার এই হাত স্পর্শ করার অনুমতি যেন পাই এই প্রার্থনা কইরো। তোমায় নিয়ে এই নদীর বুকে নৌকায় করে জোসনা বিলাশ করবো এটা আমার স্বপ্ন রইলো।”

শিউলি হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো আংটিটা। হ্যারিকেন টা মাটি থেকে তুলে নিলে আরেক হাতে। বাড়ি ফিরতে পিছু ঘুরলো। কয়েক ধাপ গিয়ে আবারো থামলো। হুট করে হৃদয়ে দোলা দেওয়া মানুষটাকে আর কাল থেকে এক নজর ও দেখতে পাবে না ভেবেই মন খারাপ হলো। পিছন ফিরে আরেকবার তাকালো মাহাদের দিকে। তার চোখে মুখে হাসি লেগে আছে। এ হাসি হৃদয়ের গভীরে অনুভূতি নিয়ে জন্মানো মেয়েটার মতামত মেলার আনন্দের। শিউলি এবার আর দাঁড়ালো ছুটে গেলো মালার কাছে। সে নাজিরের সঙ্গে নদীর পাড়ে পাশাপাশি বসে গল্প করছিলো। শিউলির দৌড়ে আসাতে উঠে পড়লো। শিউলি এতক্ষণ ভয় না পেলেও এবার ভীত কন্ঠে বলল,

“ উঠ চইলা যাই কেউ দেখলে বদনাম হইবো।”

নাজির মালার আগেই উত্তর দিলো,

“ আগে পিছে আরো পাহারা আছে কেউ আসবে না এদিকটায়। হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে চলো। আমি এগিয়ে দিয়ে বাড়ি যাবো।”

মাহাদ অচেনা পুরুষ ওরে দেখলে সন্দেহ করবো এজন্য নাজির ওদের এগিয়ে দিতে গেলো। মাহাদ ধীর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলো মাতবর বাড়ির সামনে। কখন পৌঁছালো নিজেও জানে না। যখন ভাবনা ফুরোলো তাকিয়ে দেখে মাতবর বাড়ির গেইট। কি আশ্চর্য কখন পৌঁছালো? তার তো নাজিরের জন্য অপেক্ষা করার কথা ছিলো।
মাহাদ নিজেই অবাক হলো। শিউলির কথা ভাবতে গিয়ে সব ভুলে বসলো। এতো পাগল সে কবে হলো? একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ ও যে একটা মেয়ের জন্য এতোটা উতলা হতে পারে নিজেকে না দেখতে বুঝতো না সে। ভালোবাসা বুঝি এভাবেই পাগল করে?

উত্তর মেলার আগেই কেউ একজন গেইটের কাছে আসলো। মাহাদের চিনতে অসুবিধা হলো না। লোকটা ডাকে দেখে একটি ভীত হলো। মাহাদ কেবল হেসে বলল,

“ চুরি বিদ্যা বড় ভয়ংকর। শুধরে যান সময় থাকতে। এমন না হয় শেষে সব হারালেন।

চলবে………………….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here