বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৯] #বেলতুলি লাবিবা ওয়াহিদ

0
2

#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৩৯]
|২য় খণ্ড|
#বেলতুলি
লাবিবা ওয়াহিদ

[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

মৌনো ইয়াসীন মামার সাথে একটা রেডিয়ো অফিসে এসেছে। এখানের অনেকেই ইয়াসীনের চেনা। সবাই কেমন তাকে দেখে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে অবশ্য মৌনোর কিছুটা অদ্ভুতই লাগছে। ইয়াসীন মামা সবার সাথে কথা বলতে বলতে এক সময় একটা কেবিনের সামনে মৌনোকে নিয়ে গেলেন। কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরে একজন আরজে তার ডিউটিতে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত এখন কোনো শো চলছে।

ইয়াসীন হঠাৎ মৌনোকে মোবাইল এগিয়ে দিল।
–“নে, কথা বল। নিবিড় কল করেছে।”

মৌনো ইতঃস্তত অনুভব করল। তবুও মামার সামনে বেঁকে বসল না। নীরবে মোবাইলটা নিয়ে কানে লাগাল। চাপা স্বরে নিবিড়কে সালাম দিল।
–“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। পৌঁছে গেছ?”

–“জি।”

–“আমি জানি তুমি রেডিয়ো’র শো গুলো পছন্দ করো। রেডিয়োর প্রতি তোমার আলাদা নেশা। আজকে সামনে থেকে দেখো ওরা কীভাবে কথা বলছে, কিভাবে সব সামলাচ্ছে। যদি মনে হয় তুমি আগ্রহী তাহলে জয়েন করে নিয়ো। আমার অনুমতি নিয়ে দুশ্চিন্তার দরকার নেই। বুঝেছ?”

মৌনো অল্প করে বলল,
–“হুঁ।”

–“মামাকে ফোনটা দাও।”

মৌনো আবারও ইয়াসীনকে মোবাইল ফিরিয়ে দিল। নিবিড় ওপাশ থেকে কি বলল শুনল না, তবে ইয়াসীন মামা শুধু ওকে, আচ্ছাতেই কথা শেষ করল।

মৌনোর সাথে নিবিড়ের বিয়ের আজ প্রায় আটাশ দিন। মৌনো সেদিন কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে বলেছিল যেন নিবিড় তার সাথে যোগাযোগ না করে। নিবিড়ও তা মেনে নিয়েছে। সেও চায় না মৌনোর উপর কোনো চাপ ফেলতে। বিয়ে যেহেতু হয়েই গেছে আর চিন্তা কিসের? মেয়েটা তো এখন তারই। মামাদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছে যেন সরাসরি মৌনোকে সবকিছু সাহায্য করে। আর নিবিড় আছেই দূরে দূরে। মৌনো যখন ভার্সিটি আসা যাওয়া করে নিবিড় তখন দূরে থাকে। সে এবার লম্বা ছুটি পেয়েছে। ঢাকা যায়নি এখনো। কেন যেন চট্টগ্রামেই পড়ে আছে। দূরে গেলে যদি মৌনোর আবার কোনো বিপদ হয়?

মৌনো পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির চিন্তা করছিল। কিন্তু মনের মতো কিছুই হচ্ছিল না। তার যে মানুষের সামনে যেতে, তাদের সাথে মিশতে এখনো ভীষণ ভয়। অচেনা মানুষদের ভীড়ে গেলে আবারও পুরানো ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াবে। এসব নিবিড় শুনল ইয়ামিন মামার থেকে। মৌনো বাড়িতে কি করে না করে সবকিছুর একশো শতাংশ খবর পৌঁছানো যেন ইয়ামিন মামার গুরু দায়িত্ব। সেখান থেকেই নিবিড় তাকে রেডিয়ো অফিসের কথা জানায়। আজকাল রেডিয়োর চর্চা সবখানে চলছে৷ তার চেয়েও বড়ো কথা, মৌনোর প্রায়ই বিভিন্ন রেডিয়ো শো শোনা হয়। বৃহস্পতিবার রাতের ভূত এফএম তো কখনোই মিস দিত না। সে যতই ভয়ে জমে থাকুক না কেন।

মৌনো খুব মনোযোগ দিয়ে কথা বলার অঙ্গিভঙ্গি দেখল। তার সম্মুখে বসা আরজে কাজলী এখন স্রোতাদের পাঠানো এসএমএস পড়ছে আর আপুটা খুব সুন্দর হেসে হেসে উত্তর দিচ্ছে। মৌনো মুহূর্তের জন্য যেন সবই ভুলে গেল। তাদের এখানে অনুমতি দেয়া হলেও কোনো প্রকার শব্দ করা নিষেধ। সে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো সিস্টেমটা দেখছে। সে যখন রেডিয়ো শুনত তখন মনে মনে ভাবত ওপাশের সবকিছু কেমন হবে? এত সুন্দর গলা কাদের? সেই কণ্ঠস্বরের মানুষরা কারা? আর কীভাবেই বা পুরো ব্যাপারটার প্রসেস করে?

কাজলীর শো শেষ হতেই সে মৌনোর সাথে আলাপ করল। পরিচিত হলো। মানুষটা ম্যাজিকের মতো করে আবারও মৌনোকে সব ভুলিয়ে দিল। দুইদিন পর মৌনো যখন আবার আসল তখন মৌনো তাকে প্রশ্ন করল,
–“আপনি কেন রেডিয়োতে আরজে হওয়ার চিন্তা করলেন আপু?”

কাজলী খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বলল,
–“আমার একটা ব্যাকস্টোরি আছে মৌনো। আমি ভাবতাম আমি কখনোই কারো মন রাখতে পারি না। কারণ আমি কথা-বার্তায় খুব অপটু ছিলাম। মানুষ দেখতে মুখ দিয়ে কথা বেরুতো না। এরপর চাকরির জন্য এলাম। বলল আরজে হতে, আমি নাকি চাইতে শো জমাতে পারব। শুধু প্রেক্টিসের দরকার হবে। আমার হতাশা এবার শক্তি হয়ে ফিরল। আমি ধীরে ধীরে চেষ্টা করতে থাকলাম। শুরুতে অনেক ভুল হতো, তবে শুধরে নিতাম।

এখন কী মনে হয় জানো? আমার জন্য মানুষ হাসছে, সুখে থাকছে। এটা জানতে পারলে আমার নিজের বেঁচে থাকাটা সুখের লাগে। এজন্য স্রোতাদের সাথে আমি আরও সুন্দর করে মিশে যাই।”

মৌনো মুগ্ধ হলো কাজলীর বচনভঙ্গিতে। তার মাথায় প্রতিধ্বনিত হলো আবার, স্রোতাদের সুখের কারণ হওয়াও সম্ভব? মৌনো মুহূর্তেই মনে পড়ল তার সুখের দিনগুলোর কথা। মৌনোও যে একজন সুখী স্রোতা ছিল। যেই শো গুলো পছন্দ করত সবগুলোই তাকে সুখ দিয়েছে। সামান্য কলেজ থেকে বেতের বারি খেয়ে আসলেও সে বাড়িতে এসে মায়ের ফোন থেকে পছন্দের শো শুনলেই সব ভুলে যেত। একবার দুবার তো এসএমএস করারও সাহস দেখিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে একটা এসএমএসেরই রিপ্লাই এসেছিল। মৌনো ভাবল কিছুটা, নিজের হাতের দিকে তাকাল। আজকাল তার হাতের দুঃখ হয় না আর। এই হাতের অনামিকায় একটা ছোটো আংটি আছে। যেই আংটি তার অসুন্দর হাতটাকেও এক আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। মৌনো একজনের নামে হালাল ভাবে বুকড।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ইয়ামিন মামা সবাইকে টিভির ঘরে ডেকে পাঠাল। সে নাকি বিশেষ কিছু এনেছে। এটা সবাইকে দেখাবে। শুধু এলো না বড়ো মামী আর মেঝো মামী, সাথে শরীফও। তারা সবাই বেশ রেগে আছে মৌনোর হঠাৎ বিয়েতে। রাজিয়া শেখরা কী করে পারল মৌনোর অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিতে! এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা। ওরা আরও উলটো বুশরার বিয়ে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। চোখের পলকে কখন বিয়ে হয়ে যায় কে জানে?

নিবিড়কেও দাওয়াত দিয়ে এনেছে। নিবিড় প্রতিবারের মতোই মিষ্টি, ফলমূল নিয়ে এলো। মামা শ্বশুরদের বাড়ি বলে কথা। সে তো আর খালি হাতে আসতে পারে না। মৌনো নিবিড়কে দেখে দ্রুত অন্যদিকে ফিরে গেল। ভেবেছিল তার পাশে নিবিড় বসবে না, কিন্তু দেখা গেল সবাই ঠেলেঠুলে নিবিড়কে মৌনোর পাশেই বসাল। মৌনোর গা কেমন শিউরে উঠল, তবে নিবিড় আর নড়চড় করল না। আজ সৌভাগ্যক্রমে বুশরাও শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে।

ইয়ামিন মামা যখন দেখল সবাই এসেছে তখন ইয়ামিন মামা সিডি বের করে চালু করল। মুহূর্তেই টিভির আলো জ্বলতে শুরু করল। এক দুইটা ইন্ট্রো হলো। এর মাঝেই কোত্থেকে একটা শাপলা এলো। শাপলা থেকে মৌনো আর নিবিড়ের বিয়ের ছবি বেরিয়ে এলো। পরপর ওদের ছবি বেরুলো জাহাদ থেকে, সমুদ্র থেকে, প্লেন থেকে, পাখির পেটের থেকে। বাচ্চারা খুব মনোযোগ সহকারে দেখল। কিন্তু মৌনোর মুখ বিকৃত হয়ে আছে। অস্ফুটস স্বরে বলল,
–“ছি, মামা! এসব কী? এভাবে ছবির স্লাইড বের হচ্ছে কেন?”

ইয়ামিন মামা উলটো ধমক দিয়ে বলল,
–“তুই চুপ কর! তুই বেশি জানোস? আজকাল এসবই অনেক জনপ্রিয়, সবার ঘরে ঘরে এসব ভিডিও-ই চলছে। তুই বুঝবি কী গাধা?”

–“আমি গাধা হলেও ভালো, তাও তোমাদের মতো রুচি এত খারাপ নয়।”

নিবিড়ের চোখ তখনো টিভি থেকে সরেনি। মৌনো এদিকে লজ্জায় কাহিল। এখন আবার মৌনোর কান্নাকাটির ছবিগুলা আসছে। ছি! এই মামাটা চরম বেইজ্জতি করে ছাড়ল। নিবিড় হঠাৎ বলল,
–“এতটা মন্দও লাগছে না।”

এ নিয়ে সবাই তাকে উস্কাতে শুরু করল,
–“হুম হুম। পছন্দ হবে না কেন? বউকে দেখতে তো ভালোই লাগবে হুম।”

শিহাব এবার ইয়াসীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“মামা, তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। তোমার থেকে ছোটো সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ইয়ামিন মামার বাবুও আসতে চলেছে আর তুমি এখনো কুমার হয়ে ঘুরে বেড়াও।”

ইয়াসীন মামা শিহাবের এই খোঁচা তোয়াক্কাই করল না। উলটো হাই তুলে বলল,
–“লজ্জা তোর নিজেরও হওয়া উচিত। তোর ছোটো বোন বুশরার বিয়ে হয়ে গেল আর তুই আজ অবধি একটা মেয়ে পটাতে পারলি না। অন্যকে বলার আগে নিজেকে আয়নায় দেখতে হয়।”

বাকিরা সবার মতো কথা বলায় ব্যস্ত আর নিবিড় তাকাল মৌনোর দিকে।
–“আমি আগামীকাল ঢাকায় যাচ্ছি। যাবে আমার সাথে? এক সপ্তাহের মতো থাকব। মা বাবা সবাই তোমাকে দেখতে চাচ্ছে।”

মৌনো তাকাল নিবিড়ের দিকে কিন্তু জবাব দিল না। রাতে নিবিড়কে জোর করেই রেখে দিল মামারা। রাতের খাবার না খাইয়ে তো ছাড়বেই না। মৌনো কী ভেবে যেন নিবিড়ের জন্য রান্না করল, একদম হুট করেই। তার কেমন যেন লাগছিল নিবিড়ের জন্য। মৌনো জানে এতগুলা দিন নিবিড় তার জন্যই পড়ে ছিল এখানে। কে জানে, কি খেয়েছে না খেয়েছে। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। তাই ভাবল ঝটপট কিছু করা যাক। মানুষটাকে তো আর সে কম শাস্তি দিল না। অথচ নিবিড়ের শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল না। তবুও মৌনোর সব চাওয়া মাথা পেতে মেনে নিয়েছে।

মৌনো হাতের কাছে চিংড়ি মাছ পেয়েছে। নিবিড় আবার চিংড়ি খুব পছন্দ করে। তাই সেগুলোতে মশলা মাখিয়ে রাজিয়া শেখের মতো কড়া করে ভাজল।

রান্নাঘরে মৌনোর দিকে ফিরেও তাকাল না বড়ো মামী। তবে সেঝো মামী এতটাও মুখ ফিরিয়ে রাখেননি, মৌনোর প্রয়োজন হলে আসে। সালমা মামী খুব একটা রান্নাঘরে আসতে পারে না। তবে মাঝেমধ্যে কাজ করে দিয়ে যায়। যেহেতু বাবু হবে শুরু থেকেই সবাই তার খেয়াল রাখার চেষ্টা করছে। বাড়ির ছোটো ছেলের অনাগত বাচ্চা বলে কথা।

খাবার টেবিলে মৌনো লজ্জায় যেতে পারল না। কিন্তু সালমা টেনে নিয়ে গেল তাকে। বসিয়ে দিল নিবিড়ের পাশেই। সাথে সবাইকে এও জানিয়ে দিল মৌনো নিবিড়ের জন্য এই পদ রেঁধেছে। সবাই এতে স্বস্তি পায়, যাক। মৌনো তাহলে ধীরে ধীরে এই সম্পর্কটাকে মেনে নিচ্ছে। সবাই তাকে খোঁচাল ভীষণ। মৌনো তো লজ্জায় মাথাই তুলতে পারল না। সে যদি জানত বিয়ে করা মানে এত লজ্জার শিকার হতে হবে, সে তো কখনোই বিয়ে করত না।

সবাই যখন মৌনোকে জ্বালাতে ব্যস্ত, নিবিড় তখন একটা চিংড়ির উপরের খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে মৌনোর পাতে তুলে দিল। পরপর খুবই নরম গলায় বলল,
–“এবার খাও। পুরোটা শেষ করবে।”

®লাবিবা ওয়াহিদ
চলবে~~

[যারা পড়বেন তারা দ্রুত রেসপন্স করবেন যেন পর্বটি অন্যান্য পাঠকদের ফিডেও পৌঁছায়। পড়লে অবশ্যই মন্তব্য করবেন]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here