বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৪০](শেষ)

0
1

#বৃষ্টি_ছুঁয়ে_দিক_সন্ধ্যা – [৪০](শেষ)
|২য় খণ্ড|
#বেলতুলি
লাবিবা ওয়াহিদ

[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

ট্রেনে নিবিড়ের পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছে মৌনো। এখন রাত ক’টা বাজে ঘড়িতে দেখে নিল নিবিড়। নিবিড় মৌনোকে বলেছিল কেবিনের কথা। কিন্তু সে যাত্রীদের সাথে বসেই যেতে চায়। কে জানে মৌনোর এই সিদ্ধান্তের কারণ কি। সে তো ভীড় সহ্যই করতে পারে না। আজ অবশ্য ট্রেনে তেমন ভীড় নেই। তবুও মৌনোর মনে হচ্ছে সে নিবিড়কে এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে নিজেই বিপদে পড়ে গেছে। কারণ যাদের চোখে মৌনোর পোড়া হাত পড়ছে তারা কেমন কোণা চোখে বারবার করে তাকাচ্ছে। এতে সে গুটিশুটি মে(১)রে নিবিড়ের গা ঘেঁষে বসেছিল। মৌনো তেমন একটা নিকাবে অভ্যস্ত নয়, তবে গত কয়েক মাসে নিজেকে সামলে নিয়েছে সে, অনেকটাই আয়ত্তে চলে এসেছে বলা যায়।

নিবিড়ের পাশে বসতে বসতে কখন যে চোখ লেগে গেল। নিবিড় তাই আলতো করে মৌনোর মাথাটা নিজের কাঁধে রাখল। সে ঘুমাল না। দুজনই ঘুমিয়ে পড়লে মালপত্রের পাহারা দিবে কে?

নিবিড়ের সম্মুখেই বসা একটি ছোটো পরিবার। খুব সম্ভবত ছেলে, ছেলের মা আর বোন। ঘুমের তালে মৌনোর বাম হাতের ওপর থেকে ডান হাতটা সরে গিয়ে তার দাগটা বোঝা যাচ্ছে। সবাই কেমন সেই দাগের দিকেই তাকানো। ভদ্রমহিলা কি ভেবে বলল,
–“প্রেম কইরা পলাইতেছ নাকি? আজকালকার তো যুগ ভালা না।”

নিবিড় তাকালো সামনে। কোনো প্রকার বচলিত না হয়ে মৌনোর বা-হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। আজ তার অনামিকায় আঙটি নেই, আংটি হারানো নিয়ে বেশ ভয়ই পায় সে। নিবিড় মহিলার জবাবে বলল,
–“জি না। আমরা ম্যারিড।”

ভদ্রমহিলা চমকে গেলেন।
–“বিয়াইত্তা হইলে এত গাট্টি নিয়া যাচ্ছ কই?”

–“আমার ওয়াইফের শ্বশুরবাড়ি।”

মহিলার মেয়ে হঠাৎ তাদের কথায় ফোড়ন কাটল।
–“দুঃখিত ভাইয়া, আমার আম্মা একটু বেশিই কথা বলেন। কিছু মনে করবেন না।”

নিবিড় গম্ভীর মুখে শুধু একটু করে মাথা নাড়ায়। পরপর আবারও তাকায় ঘুমন্ত মৌনোর দিকে। কত শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। নিবিড় মিনমিন করে বলল,
–“ঘুমিয়ে থাকো মৌনো, নিজের ব্রেইনটাকে একটু বিশ্রাম দাও, তোমার অনেক বিশ্রামের প্রয়োজন।”

সকালে ওরা যখন বেলতুলি পৌঁছাল, মৌনো চেয়েছিল আগে নিজের বাসায় যাবে। কিন্তু নিবিড়ের মা নিজেই কল করে তাকে শ্বশুরবাড়ি যেতে বলেছে। রাজিয়া শেখ সবসময় বলেছেন, শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান দিতে। তাদের কথা মেনে চলছে। তাদের পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রাখা ভদ্রতার পরিচয়। এখন তার পরিবার যেমন মৌনোর জন্য আপন, তেমনই নিবিড়ের পরিবার। কেউ কারো প্রতিযোগী নয়, এখন সবাই সবার পরিবার। বিয়ের সম্পর্কের মাঝে শুধু একজন নারী এবং পুরুষই নয়, বরং দুটো পরিবারের মাঝেও সম্পর্ক তৈরি হয়। তাই মৌনো আর না করতে পারল না। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল, এত বছর তো বাবার বাড়িতেই থাকল। আজ নাহয় প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়ি উঠুক। বিয়ের অনুষ্ঠান করা তো শুধুই লোক-দেখানো। যদিও মৌনো অনুষ্ঠানের জন্য এখনো তৈরি নয়।

নিবিড়ের বাড়িতে এসে দেখল আরেক ক্যাঁচাল। কারোই নতুন বউয়ের দিকে ধ্যান নেই। আপাতত সমস্ত মনোযোগ কামরুলের পাশে থাকা মেয়েটার ওপর। মেয়েটার বয়স আনুমানিক ষোলো হবে। নাম তার মিনা। মিনা মুখে ওড়না চেপে ফোঁপাচ্ছে। কামরুল তো নিবিড়কে দেখে প্রাণ ফিরে পেল।
–“ভাই, বিচার করেন। আমারে বাঁচান।”

কামরুলের নজরই পড়ল না তার পাশে থাকা মৌনোর উপর। এমনকি ওদের লাগেজ এগিয়েও আনল না সে। পরিস্থিতি বেশ গরম। নিবিড় ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“কী হয়েছে?”

কামরুল বলার আগে মিনা বলল,
–“কামরুলে আমার লগে ফষ্টিনষ্টি করছে, অরে হয় ফাঁস দেন নয়তো আমার লগে বিয়া দেন। এডায় ম্যালা হারামী!”

–“ওই মিনা, মুখ সামলাই কথা ক। তোর লগে কহন ফষ্টিনষ্টি করছি? থাপড়াইয়া গাল লাল কইরা দিমু।”

এতে মিনা আরও কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–“দ্যাহেন, ভাইজান। দ্যাহেন! এই ভাতারের আচরণডা দ্যাহেন!”

মিনা প্রণভদের বাড়িতে কাজ করে। সেই থেকেই টুকটাক চেনা কামরুলের। কামরুল আরও দ্বিগুণ রেগে বলল,
–“ওই, শালী! তোর আমার কোন্দিক দিয়া ভাতার লাগে? চোখ টিপ আমি তোরে দিছি নাকি তুই দেস আমারে!”

এই কথাতে মিনা আরও কেঁদে উঠল। সোফিয়া খানম এবার দুজনকে একসাথে ধমক দিল। মিনা মুখ চেপে ধরল যাতে কান্নার শব্দ না বেরোয়। নিবিড় কামরুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“কামরুল, ভণিতা আমি একদম পছন্দ করি না। যা হয়েছে আমাকে খুলে বল। আফ কোর্স, সত্যিটা।”

কামরুলকে বেশ হতাশ দেখাল। হাতের বাজারের ব্যাগ দেখিয়ে বলতে শুরু করল,
–“আমি আপনেগো লেইগা বাজারে করতে গেছিলাম। ওহানে কই থেইকা মিনা আইয়া ওর ওড়নার অংশ আমার হাতে ধরাই দিল, আর মানুষজনের সামনে চিল্লাপাল্লা লাগাই দিছে যে আমি নাকি অর ওড়না ধইরা টানতেছি, ওরে নষ্ট করার তালে আছি। মাইনষে আমারে তহনই মারতে আইছিল, তহনই খালু আমারে ওহান থেইকা লইয়া আইল এহানে। কসম ভাই, এই মাইয়ারে যদি আপনেরা আমার গলায় ঝুলায়ে দেওয়ার কথা কন তইলে আমি এই বাইত আর থাকমু না।”

মিনা কামরুলকে থামিয়ে নিজের কথা বলল,
–“ঠাডা পড়া মিথ্যা কইতেছে ভাইজান। ওরে বিশ্বাস কইরেন না। ওয় আমার ওড়না টাইন্না “কাছে আহো না ফুলটুশি” কইতাছিল। আমি ডরাইয়া গেছি। এহন ওয় আমার লগে ফষ্টিনষ্টি করছে, ওয় এহন আমার লগে বিয়া বইব। আমি কিছু জানি না। ”

এই দুইকে নিয়ে মহা মুশকিলে পড়ে গেল পরিবারের লোকজন। কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যে বলছে এটা বোঝাই যাচ্ছে না। আর এই ধরণের কাণ্ডে এক হাতে তালি কখনোই বাজে না। মশিউর সাহেবের কানে এমনিতেও খবর এসেছে, এদের প্রায়ই একসাথে দেখা যেত।

মৌনো বোকা হয়ে আছে এ ঘটনায়। এখনো সরবত হাতে নিয়ে বসা সে। ক্লান্তি কাটানোর সুযোগটুকুও নেই। সে মিনাকে দেখল। মেয়েটা দেখতে মায়াবী, সহজ-সরল লাগে। কিন্তু সে ঝগড়াতে পটু। মিনা হঠাৎ মেঝেতে বসে পড়ল, সে কিছুতেই বিয়ে না করে এক পাও নড়বে না।

কয়েক ঘণ্টার সালিশের পর অবশেষে কাজী ডেকে এনে এদের বিয়ে দিতে হলো। মিনা এখনো প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি, কাছাকাছি এক সরকারি স্কুলে পড়ছে। তার মেট্রিক দেওয়ার খুব শখ, এবার টেনে পড়ছে। বিয়ের দায়িত্ব ঘাড়ে পড়ে কামরুলের মুখটা দেখার মতো হয়েছে। সে কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আছে। এই মেয়ে ধানিলঙ্কা। ভেবেছিল কয়টা দিন একটু প্রেম প্রেম কথা বলে ছাড়িয়ে নিবে মেয়েটার থেকে নিজেকে। কিন্তু এই মেয়ে তাকে বিয়ে করেই ছাড়ল। কামরুল কোথায় ভেবেছিল একটা সরল-সোজা মেয়ে দেখে বিয়ে করবে, যে স্বামীর কথায় উঠবে আর বসবে। এই মেয়ে তো তাকে বেলতুলি জুড়ে নাচিয়ে ছাড়বে।

এ কথা শুনে মিনা রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
–“ভুলিসনে যারে ফুলটুশি ডাকতি হেয় এহন তোর বউ। আর কাউরে যদি ফুলটুশি কইতে যাস তইলে তোর জিভ কাইট্টা দিমু হারামজাদা।”

সোফিয়া খানম এখন এখানে নেই। মশিউর সাহেবও গেছে বাইরে কাজীর সাথে কথা বলতে বলতে। নিবিড় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নাহিয়ানকে বিয়ের খবর দিচ্ছে। কামরুলদের মুখোমুখি বসা শেইনা আর মৌনো। মৌনো মিনার মুখের ভাষা শুনে বলল,
–“এভাবে বলতে নেই মিনা, এখন কামরু তোমার বর হয়।”

–“হ আপা, জামাই ওয় এহন। কিন্তু আপনে জানেন না এই জামাই শেয়ানায় কি করছে। নতুন কচি মাইয়া কামের বুয়া হইয়া আইছে এক বাড়ি। এই খাডাশে আমারে থুইয়া এহন ওই মাইয়ার আগে পিছে ঘুরতেছে। আগে আমারে কইত ফুলটুশি আর ওই মাইয়ারে কয় ময়নাপাখি। আমি ওরে ছাইড়া দিমু নাকি?”

–“চুপ কর।”

–“করমু না! আকাম যেহেতু করছস, ভুগবিও তুই! মিনার লগে লাইজ্ঞা পারবি ভাবছস?”

শেইনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার সেই মুখ খুলল,
–“আমার ভাবী আসল বেশিক্ষণ হলো না, তোমরা তাকে আরাম করতে না দিয়ে ঝগড়া করছ?”

দুজনে একসাথেই জিভে কামড় দিল। পরপর দুজন একসাথেই বলে উঠল,
–“ভাবী ঘরে যান।”

আবারও দুজন দুজনের দিমে রাগী চোখে তাকাল। কামরুল বলল,
–“এই বান্দী! আমারে কফি করোস ক্যা?”

–“তুই আমারে কফি খরছস বান্দীর খাইস্টা জামাই।”

এদের এই তুই-তুকারির মাঝে নিবিড় এলো। কামরুলের বাজে ভাষা শুনে তার চোয়াল শক্ত হলো।
–“এটা কী ধরণের আচরণ কামরুল? মেয়েদের এভাবে অসম্মান করা শিখিয়েছি তোকে? মিনা এখন তোর স্ত্রী! তুই যদি তোর বউকে এসব বাজে কথা বলিস তাহলে দুনিয়ার মুখ আটকাবি কেমন করে? মিনা, তোমার ক্ষেত্রেও এই শর্ত প্রযোজ্য! পড়াশোনা করছ, শিক্ষিত হয়ে অশিক্ষিতদের মতো আচরণ করবে না। কামরুল কিছু করলে সোজা বড়োদের এসে বিচার দিবে, ঠিক আছে? আর কামরুল! আবারও সাবধান করছি, খবরদার যাতে একটা বাজে শব্দও মুখ দিয়ে বের না হয়! যদি শুনি আমার হাতের ডান্ডার বারি খাবি। আমার হাত অনেক শক্তপোক্ত মনে আছে?”

কামরুল ভয় পেয়ে গেল নিবিড়ের হুমকিতে। কামরুল একবার দেখেছিল এলাকাতে, কে যেন একটা মেয়েকে ইভটিজিং করেছে। নিবিড় ওটাতে ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে এলাকার সবার সামনে পশ্চাৎ-দেশে ঠাস ঠাস করে মে(১)রেছে। সেই ব্যথায় সোজা হয়ে বসতেই পারেনি ছেলেটা। নিবিড়ের গায়ে যে কত শক্তি, সেদিন কামরুল ধরতে পেরেছিল। এরপরও কীভাবে ভুলে গেল ওই দিনটা, উলটো কত ধান্দা করে বেড়িয়েছে নিবিড়ের সাথে। সে এবার কসম কাটল,
–“কসম ভাই! আমি ওরে বউ কমু আর কিচ্ছি কমু না। আপনে খালি শিখায়া দিয়েন বউর লগে ক্যামনে কথা কইতে অয়।”

মিনা বাম হাত ঢুকিয়ে বলল,
–“আমি পারি কেমনে কথা কইতে অয়, আমার থেইক্কা শিখবেন।”

মুহূর্তেই মিনা লাজুক লাজুক একটা ভাব ধরল। মুহূর্তেই সে তুই-তোকারি থেকে আপনিতে চলে গেছে। এটা দেখে কামরুলের চোখ কপালে। মেয়েরা এত দ্রুত পল্টি কী করে নেয়?

মৌনো মুগ্ধ হয়ে নিবিড়কে দেখছে। মানুষটার মেয়ের সম্মানের প্রতি কোনো প্রকার কম্প্রোমাইজ নেই। এত সম্মান কেউ কী করে দিতে পারে এটাই জানা নেই তার। মৌনোর মোবাইলে তখন নাহিয়ানের এসএমএস আসে।
–“ভাবী তবে হয়েই গেলি। কেমন যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ির প্রথম দিন? নাকি আসার পর থেকে কামরুলের ক্যাচালেই ব্যস্ত?”

—————————————-
সন্ধ্যার পর রিমঝিম হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছে। এমন সময়েই দেখল প্রণভ তার জন্য অপেক্ষা করছে। রিমঝিম মুচকি হেসে প্রণভের কাছে এগিয়ে যায়। প্রণভ রিমঝিমের হাত ধরে হেসে রিকশা ডাকে। রিকশায় উঠতেই প্রণভ বলল,
–“মৌনো এসেছে, দেখা করতে যাবে না?”

–“আগামীকাল যাব। মা বলেছে আজ নাকি ও শ্বশুরবাড়িতে। ওখানে গিয়ে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। মৌনোর উচিত নিজে নিজেই ওখানে নিজেকে গড়ে তোলা।”

–“তা অবশ্য ঠিক বলেছ। বাড়ি কবে যাবে?”

–“আম্মা বলল বাবা নাকি নিবিড় ভাইকে দাওয়াত করেছেন আগামীকাল। তাই সকাল সকাল চলে যাব। মা একা হাতে সব সামলাতে পারবে না।”

–“আচ্ছা ঠিক আছে। আমিও আগে থেকেই বলে রেখেছি সবচেয়ে ভালো মাছটা যেন আমার শ্বশুরবাড়ির জন্য রাখে।”

রিমঝিম হো হো করে হাসল।
–“জীবনে একটা লাভ হয়েছে। তাজা মাছ খাওয়া যায়।”

প্রণভও হাসল। রিমঝিমের দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“আজ বুঝি খুব ক্লান্ত?”

রিমঝিম পানি খেতে খেতে বলল,
–“সত্যি বলব? তোমাকে দেখলে আমি সমস্ত ক্লান্তি গুলে যাই।”

প্রণভ রিমঝিমকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“তাই তো সব ফেলে সবসময় তোমার জন্য অপেক্ষা করি।”

–“কি দরকার?”

–“খুব দরকার। একমাত্র বউ বলে কথা।”

————————————-
মৌনো সারাদিন ঠিক থাকলেও রাতে দেখা দিল বিপত্তি। খাবার শেষেই প্রসঙ্গ এলো মৌনোর ঘুমানো নিয়ে। মৌনো ভেবেছিল নিজের বাড়িতে চলে যাবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা সোফিয়া খানম মোটেও সহজ ভাবে নিলেন না। চোখ-মুখে অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেল৷ শাশুড়িরা যতই ভালো হোক না কেন, তিনি কখনোই ছেলে আর বউমাকে আলাদা ঘরে শোবার অনুমতি দেন না, পছন্দও করেন না। বিয়ে যেহেতু হয়েছেই, আলাদা শুবে কেন? সোফিয়া খানমের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
–“তুমি আমার বাড়িতে থেকে নিজের বাড়িতে ঘুমানোর কথা বলছ কেন? নিবিড়ের বউ তুমি এখন মৌনো, নিবিড়ের ঘরটা এখন তোমারও।”

মৌনো অস্বস্তিতে পড়ে গেল। নিবিড় বলল,
–“ওর সময়ের প্রয়োজন মা।”

–“কিসের সময়? আমি কোনো কথা শুনছি না। চুপচাপ মৌনোকে নিয়ে ঘরে যা। অস্বস্তি শুরুতে সবারই হয়, তাই বলে আলাদা থাকবি কেন? বিয়ে করেছিস, কোনো পাপ না।”

মায়ের যুক্তির কাছে নিবিড়ও হেরে গেল, অযথা তর্ক করল না। মৌনোও মেনে নিয়ে চুপচাপ উপরে নিবিড়ের ঘরে চলে গেল। রাত বাড়ছে, দুজন একই বিছানায় অথচ কারো চোখে ঘুম নেই, মুখে কথা নেই। নিবিড় বেশ সময় নিয়ে বলল,
–“অস্বস্তি হচ্ছে?”

–“আপনার হচ্ছে না?”
–“উত্তরে ‘না’ বললে কি তুমি আমাকে লম্পট ভাববে?”

মৌনো চট করে নিবিড়ের দিকে তাকাল। নিবিড় তখনো মৌনোর দিকে তাকানো। মৌনো হতবাক হলো, কাঁথাটা টান দিয়ে কিছুটা নিজের কাছে নিয়ে নিল। নিবিড়ও একই কাজ করল। শেষমেষ কাড়াকাড়িতে না পেরে নিবিড় বলল,
–“মৌনো, ক্যান আই হাগ ইউ? তাহলে কাঁথা টানতে হবে না।”

মৌনো মুহূর্তেই লাজে লাল হয়ে গেল। তার জিভের শেষ সীমান্তে ‘না’ শব্দটা আটকে আছে অথচ মুখ থেকে বের হচ্ছে না। সে কী ট্রেনে নিবিড়ের সামান্য এক রাতের আলিঙ্গনের লোভে পড়ে গেছে? নিবিড় নীরবতাকে সম্মতি ভেবে মৌনোকে জড়িয়ে ধরল। শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“এইযে, এখানে তোমার স্থায়ী স্থান। এভাবেই আমার স্বস্তি, পবিত্র সম্পর্কের শান্তি। এই বুক শুধুমাত্র মৌনো ইশতিয়াকের জন্যই।”

মৌনো চোখ বুজে ফেলল। নিঃশ্বাসের ঘনত্ব বাড়ছে। প্রথমবারের মতো নিবিড় মৌনোর কপালে অধর ছোঁয়াল। পরপর মৌনোর সেই হাতের দাগে, যেটাকে মৌনো অসুন্দর বলে বেড়ায়।
–“এবার ঘুমাও, ক্লান্ত নিশ্চয়ই। দ্রুত ডাকলে কিছু হবে?”

মৌনো আবেশে চোখ বুজে রইলো, হঠাৎ তার গলা থেকে ঘুম মেশানো আহ্লাদ প্রকাশ পেল,
–“ঘুমাব।”

নিবিড় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
–“ভালোবাসা দূর্বল করে না, ভালোবাসা প্রেমিক মনকে শক্তি দেয়- আরও কয়েক জনম বাঁচার। বুঝেছ?”

মৌনো হ্যাঁ, না কিছুই বলল না। কিন্তু নিবিড় জানে, তার বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী।

পরেরদিন সকাল সকাল আবারও কামরুল মিনার ঝগড়া শুরু হলো। মিনা স্কুলে যাবে, সে চায় কামরুল তাকে স্কুলে দিয়ে আসুক। কিন্তু কামরুল কিছুতেই যেতে চায় না। তার আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই নাকি যে এই উটকো ঝামেলাকে আবার ঘাড়ে বয়ে স্কুলে নিয়ে যাবে। মিনা যখন দেখল ঝগড়া-ঝাটিতেও কিছু হচ্ছে না, তখন সে ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই চলে গেল নিবিড়ের কাছে বিচার দিতে। নিবিড়ের এক চোখ রাঙানিই যথেষ্ট ছিল কামরুলের বিড়ালের মতো হয়ে যেতে। সুরসুর করে বেরিয়ে গেল। বাইরে আরেক বিপত্তি। মিনা রিকশায় করে যাবে, পায়ে হেঁটে যাবে না। কামরুলের কাছে এত আবদার শরীরে বি(১)ষের কাঁটার মতো ফুটছে। কিন্তু নিবিড় এখনো তাকে নজরে রাখছে, অগত্যা রিকশা ডাকতে হয়। রিকশায় বসে মিনমিন করে বলল,
–“আল্লাহ দিছে একটা ছাগইল্ল্যা বউ। না পারি দেখতে, না পারি সইতে। আমার কি এহন বিয়ার বয়স?”

মিনা পাশ থেকে বলল,
–“আমারও কী বিয়ার বয়স? সব তুমার দোষে অইছে। বিয়াই যেমুন করতে পারতা না প্রেমের আলাপ করতে আসছিলা ক্যা?”

–“এডাই আমার জীবনের অভিশাপ অইয়া গ্যাছে। আর মনে করাইছ না ছ্যারি(মেয়ে)।”

–“কিই? আমি অভিশাপ? খারাও, বাইত গিয়াই নিবিড় ভাইরে বিচার দিমু।”

–“তুই একটু চুপ কর না মা! শান্তি দে!”

–“কি কইলা তুমি, আমি তুমার মা লাগি? রিকশা আলা চাচা দেখছেন কি অসভ্য, বউরে মা ডাকে। আবার শান্তিও চায়। সত্যি কইরা কও এই শান্তিডা ক্যা? কোন বাড়ির কামের মাইয়া? বিয়া করছ একদিনও অয় নাই এহনই আরেক মাইয়া চাইতাছ! তুমরা বেডারা এত লম্পট!”

এই কাণ্ডে কামরুলকে চরম অসহায় লাগল। এত বছর সে যত অসৎ ধান্দা করছে সব পাপের ফল একসাথে পাচ্ছে এই মেয়েকে বিয়ে করে। কোন ভূতে চাপছিল যে সে এই মাইয়ার সাথে ফ্লার্ট করতে গেছিল। এখন তো দেখছে মাইয়া মানেই শান্তির জীবন ছাড়খাড়! শান্তি বললেও অন্য মেয়ের নাম ধরে বসে থাকে। আল্লাহ কোন ধাতু দিয়ে বানিয়েছে এই মেয়েকে? কোন ধাতু?

এশা জানত না যে নিবিড় আর মৌনোর বিয়ে হয়ে গেছে। ওকে ইচ্ছাকৃতই জানানো হয়নি। কারণ ওর মুখ পাতলা। চট্টগ্রামে জানালে তার মাত্র একদিন লাগত সবাইকে বলে বেড়াতে। ও ছোটো মানুষ, বড়োদের এত প্যাচ বুঝে না। তাই সবাই খুব কৌশলে তাকে এড়িয়ে চলা হয়েছে। তবে বেলতুলিতে ফিরে ঠিকই জেনেছে। এ নিয়ে এশার কি রাগারাগি। সে গাল ফুলিয়ে বলেছিল,
–“আমাকে তোমরা পর ভাবো তাই না? মৌনো আপু ঠিকই বলে, আমাকে হাসপাতাল থেকে কুড়িয়ে এনেছে। নয়তো তোমরা কীভাবে আমার আপার বিয়ের কথা বললে না? বললে নিবিড় ভাইও তো প্রণভ দুলাভাইয়ের মতো মজা কিনে দিত।”

এশার এই কাণ্ড সকালে ঘটলেও সে বিকালের মধ্যে কয়জনকে জানিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেককে বলেছে,
–“জানো আমার আপার বিয়ে হয়েছে। কার সাথে জানো? নিবিড় ভাইয়ের সাথে। সে দেশ রক্ষা করে। অনেএক বিরায়াট মাপের মানুষ। আমাকে সবাই তোমাকে বলতে নিষেধ করেছে। তাও তোমাকে বললাম। তুমি আবার কাউকে বোলো না কেমন?”

ভাগ্য ভালো ছিল এশা যাদের সাথে বলেছে সবাই বিশ্বস্ত ছিল, তাই ঘটনা খুব একটা জানাজানি হয়নি। আজ যখন নিবিড় আসল, এশা তো সোজা নিবিড়ের কোলে গিয়ে বসে পড়ে। এটা দেখে মিনা বলে,
–“ওমা! দুলাভাইর কোলে কেউ এমনে বহে? বড়ো অইছ না? ওডা এহন তুমার বইনের সোয়ামি।”

মিনার কথা কামরুলই শুনেছে, সে দ্রুত মিনার মুখ চেপে ধরে। নিবিড় ভাইয়ের কানে গেলেই বিপদ। সে তো জানে এশাকে নিবিড় ভাই কত আহ্লাদ দেয়। এশা এখনো এতটাও বড়ো হয়নি। বড়ো হতে হতে বুঝ এসে যাবে। ভাই-বোনের সম্পর্কটাকে নষ্ট করার কি দরকার? এজন্য কামরুল আগেভাগে মিনাকে টেনে সরাল।

মৌনোরা এ বাড়ি, ও বাড়ি মিলিয়ে সাতদিন থাকল। এরপর আবারও ফিরে গেল চট্টগ্রামে। মৌনো এর মাঝে রেডিয়োতে ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে গেল। কাজলীর সাহায্যে সে ধীরে-সুস্থে কমিউনিকেশনে আরও ভালো হলো। কাজলীর জায়গায় সেই মাঝে মাঝে হোস্ট হয়। নিবিড় প্রায়ই এসে মৌনোর শো দেখে, মুগ্ধ হয়ে থাকে। মেয়েটার মানসিক অবস্থার অনেক উন্নতি দেখা যাচ্ছে আজকাল। বিশেষ করে রেডিয়োতে আসার পর। মৌনোর ধারণা, এখানে কেউ নেই তাকে দেখার। কেউ তাকে সামনা-সামনি দেখে না, বিচার করে না, তার হাত দেখে মুখ বিকৃত করে না। উলটো তাকে শোনার জন্য অসংখ্য স্রোতা আছে, যারা কেউই তাকে দেখে না, কিন্তু খুব ভালোবাসে। তাকে সাপোর্ট করে, তাকে এগিয়ে যেতে বলে। কিন্তু মৌনো তার প্রথম স্রোতাকে কখনোই ভুলেনি। তার প্রথম স্রোতা হচ্ছে নিবিড় ইশতিয়াক। যে তাকে তার পছন্দসই পেশার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। মৌনোর কোনো শো সে বাদ দেয় না। মাঝেমধ্যে তো স্রোতাদের এসএমএস এর ভীড়ে মৌনো নিবিড়েরটাও পায়। মৌনোর এত শান্তি লাগে। আজ সে এক কাণ্ড করে বসল। কেউ একজন এসএমএস এ জিজ্ঞেস করল মৌনোর জীবনে প্রেম আছে কিনা। যেহেতু মৌনো এই শো ছদ্মনামে করছে, সেও তাই খুশিমনে বলল,
–“জি, আমার একজন হালাল প্রেমিক আছে। আপনাদের মতো করেই আমাকে শুনছে, আমাকে প্রেষণা দিতে আপনাদের মতোই এসএমএস দিচ্ছে। আজ যেহেতু সেই মানুষটাও শুনছে আমাকে তাই আপনাদেরকে একটু নাহয় আমার গল্প শোনাই।

আমি মানুষটা খুব ইন্ট্রোভার্ট। হ্যাঁ, চঞ্চল ছিলাম.. তবে অনেক কথাই লুকিয়ে যাওয়ার অভ্যেস ছিল। তেমনই এক লুকিয়ে যাওয়া গল্প হচ্ছে আমি একজনকে চুপিচুপি ভালোবাসতাম। তার দেওয়া প্রথম রেশমি চুড়ি কয়েকটা ভেঙে গিয়েছিল। আমি সেই ভাঙা টুকরো গুলোকে এখনো যত্নের সাথে আগলে রেখেছি। এর মাঝে দিয়ে আমার জীবনে অনেক বড়ো এক ঝড় যায়, জানেন ওই মুহুর্ততে আমার সঙ্গ কে দিয়েছে? আমার সেই ভালোবাসার মানুষটা, যে আমাকে সম্মানের সাথে বিয়ে করেছে, তার নাম দিয়েছে। না বলা অনেক কিছুই দিয়েছে। এই মানুষটাই আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা শক্তি দেয়— দূর্বল করে না। আমি সেই শক্তি নিয়েই আপনাদের সাথে কথা বলছি, আপনাদের সাথে সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু এতকিছুর মাঝে আমার কখনো বলাই হয়নি আমি মানুষটাকে কতটা ভালোবাসি, পছন্দ করি। সরাসরি তো বলতে পারব না, তাই আপনাদের সাক্ষী রেখে তাকে আবারও বলছি.. আপনি ছাড়া আমার জীবনে অন্য কোনো পুরুষ জায়গা পায়নি.. আমার ব্যক্তিগত শক্তি। আমি আপনার ছায়াতলে থেকেই একজন শক্তির নিদর্শন হতে চাই।”

সেদিন রাতেই নিবিড় মৌনোকে বাড়ির বাইরে ডাকল। মৌনো আসতেই নিবিড় তাকে কাগজে মোড়ানো সাদা রেশমি চুড়ি বের করে দিল। মৌনো চমকে গেল। নিবিড় সেগুলো অতি যত্নে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“আর ভাঙা চুড়ি নিজের কাছে রাখতে হবে না। একটা ভাঙলে আমি আরও দশ ডজন এনে দিব। ভালোবাসার কোনো কমতি রাখব না।”

মৌনো লজ্জা পেল। মানুষটা তাহলে ঠিকই সব শুনেছে। নিবিড় সেই প্রসঙ্গে গেল না। ভালোবাসা প্রকাশ বারবার হয় না, যখন হয় সেই মুহূর্তটা বিশেষ হয়ে থাকে। তাকে বিশেষ করেই রাখতে হয়। নিবিড় মৌনোকে আচমকা জড়িয়ে ধরল। প্রথমবারের মতো মৌনো তাকে বাঁধা দিল না। এই বুকটাই যে তার শান্তিস্থল!

–“কথা দিচ্ছি, আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখেন ততদিন আমি তোমার শক্তি হবো। আমার ছায়া কখনোই তোমাকে ছাড়বে না। এই পুরুষটা সব ভালোবাসা তোমার জন্যই যত্ন করে আগলে রেখেছে। শুধু তুমি এগিয়ে যাও, নিজেকে আর আটকে রেখো না।”

মৌনো লাজুক হাসল। মিনমিন করে বলল,
–“আমি একটা শো ভেবেছি।”

–“সেটা কী?”

–“অদ্ভুত বলতে পারেন, তবে সেই শো’র নাম “বেরঙের রং”। অর্থাৎ আশেপাশে যত নারী আছে, যারা আমার মতোই অসহায় ছিল, অনেক ঝড় পার করেছে সেসব নারীদের নিয়ে। আমি প্রতি শোতে সে সমস্ত নারীদের ডাকব। ওরা নিজেদের দূর্বস্থার কাহিনী বলবে, ঠিক ভূত এফএমের মতো। যদিও কেউ না এসে ঘটনা এসএমএসের মাধ্যমে পাঠাতেও চায় তাতেও চলবে। আইডিয়াটা কেমন?”

–“খুব ইউনিক। আমার বিশ্বাস, এতে করে এগুলো যারা শুনবে তারাও বাঁচার মোটিভ পাবে, সমাজে কী হচ্ছে তাও অনেকে জানতে পারবে।”

–“একদম। সমাজে এখনো অনেক কিছুর উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমি তাদের সেই সুযোগ করে দিতে চাই। শুরুর দিকে হয়তো গুলিয়ে ফেলতে পারি, তবে আমি আশাবাদী।”

নিবিড় মুচকি হেসে মৌনোর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
–“তুমি পারবে, মিসেস।”

মৌনো লাজুক হাসল। তার এই প্রেরণাটুকুই দরকার ছিল। এখন সে নিবিড়ের মুখ উজ্জ্বলের জন্য সব করতে রাজি। মানুষটা তার নিজেরও যে খুব আদরের। হঠাৎ মৌনো নিবিড়কে দাঁড়াতে বলে বাড়ির ভেতর থেকে টিফিন ক্যারিতে করে খাবার নিয়ে আসল।
–“অনেক কিছুই রেঁধেছি আজ আপনার জন্য। বাড়িতে গিয়ে গরম করে খেয়ে নিবেন। আমি জানি আপনি কিছু খাননি।”

নিবিড় মুচকি হেসে স্ত্রীর রান্না গ্রহণ করে বলল,
–“যা বলবেন, রানি! রাঁধূনী হিসেবে তুমি কিন্তু দারুণ। লোভ সামলাতে কষ্ট হয়।”

–“বউয়ের রান্না খেতে ইচ্ছে করলে লোভ সামলানোর দরকার কি? আমাকে শুধু জানিয়ে দিবেন। আর..”

মৌনো থেমে আবার বলল,
–“আগামিকাল সাবধানে যাবেন। এবারও লম্বা সময়ের জন্য সমুদ্রে যাচ্ছেন তাই না?”

নিবিড় অবাক হলো না। নিশ্চয়ই মা তাকে জানিয়ে দিয়েছে। নিবিড় তো এখানে জানাতেই এসেছিল, কিন্তু কীভাবে বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। মৌনো আবারও নিবিড়কে জড়িয়ে ধরল,
–“ভয় পাবেন না। এবার আপনার মৌনো স্ট্রং। যেভাবে রেখে যাচ্ছেন সেভাবেই থাকবে।”

–“রেখে যেতেই যে ইচ্ছে করে না। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ি কেমন করে?”

–“ছাড়তে হবে না৷ ওটাও আমার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”

নিবিড় নিশ্চুপ থাকল কিছুক্ষণ। থেমে থেমে বলল,
–“একটা আর্জি করব?”

–“করুন।”

–“আর্জি না ঠিক। এবার ফিরে আসলে তোমাকে অনুমতির সাথে আমার কাছে নিয়ে আসব। এটাই ফাইনাল ডিসিশন। সময় অনেক দিয়েছি, আর সম্ভব না। ইট’স এন অর্ডার, মৌনো!”

মৌনো হাসল। কপালে তিন আঙুলের সাথে সেলুট করে বলল,
–“অলরাইট, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার। আপনার যা হুকুম।”

|পরিশিষ্ট|

এক বিরাট কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের আয়োজন চলছে। সেন্টারটা ঠিক চার দেয়ালে বন্দী নয়, চট্টগ্রামেরই এক নদীর কাছাকাছি এই সেন্টারটা। খোলা বড়ো মাঠ, আর গাছপালা। সামনে দৃশ্যমান নদী। সেই খোলা মাঠেই ডেকোরেশন করা হয়েছে, অনেক ধরণের মানুষের ভীড় এখানে। মৌনো এবং নিবিড়ের পরিবারের সবাই উপস্থিত। ইয়াসীন মামা তো হাসি-মুখে যার-তার সাথে ভাব জমিয়ে নিজের আগত সিনেমার প্রচার করে দিচ্ছেন। কবে তার নতুন সিনেমা রিলিজ হবে, কবে থেকে হলে হলে সিনেমা চলবে সব হাসতে হাসতে ঝেড়ে দিচ্ছেন। কিছু এলাইট শ্রেণির মানুষরাও এই প্রোগ্রামে এসেছে। খাওয়া-দাওয়া সেরে এখন সবাই অপেক্ষা করছে বর-বউয়ের। তাদের আগমন এখনো হয়নি। সবাই নিজেদের মোবাইল, ক্যামেরা নিয়ে তৈরি। ইয়ামিনও তৈরি ক্যামেরা নিয়ে। এবার আরও প্রফেশনালি ছবি তুলবে সে। এরপর আবারও সে পদ্মফুল, জাহাজ, সমুদ্র, আকাশ থেকে মৌনোদের বিয়ের ছবি বের করার এডিট করবে। ওই ভিডিও কেন যেন তার বেশ মনে ধরেছে।

এমন সময়ই নিবিড়ের কলিগ বন্ধুরা সাদা ইউনিফর্ম পরে হাজির হলো। তাদের অনুষ্ঠানে প্রবেশ করার পথের দু’ধারে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল। তাদের সবার হাতে একটা করে তলোয়ার। এমন সময়ই নিবিড় দাঁড়াল মূল ফটকে। সে কোনো শেরওয়ানি পরেনি আজ। তার ইউনিফর্মের মতোই কালো পোশাক পরেছে। চুল ছাটাই করা, দাঁড়িও কিছুটা ছাটাই করা। খুব সতেজ আর সুদর্শন লাগছে নিবিড়কে। নিবিড় আসতেই কড়তালির শব্দ পেল। এখনো নতুন বউ আসেনি, সবাই তখন ব্রাইডকে দেখতে উদগ্রীব। সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মৌনো এলো। পরনে তার লাল টকটকে লেহেঙ্গা। আবারও কড়তালি। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে বধুকে। মেহেদীর রঙে তার হাতের দাগটা কেউ খালি চোখে ধরতেই পারছে না। এ যেন নিবিড়ের রং। নিবিড় তাকে বাহু এগিয়ে দিল। মৌনো অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সেই হাত ধরল। পরপর নিবিড়ের কলিগরা তলোয়ার উঁচু করল। সেই তলোয়ার উঁচু করা পথ ধরেই কনে-বর এগিয়ে যেতে লাগল। এই চলাটা যেন শুধু আজকের নয়। আজীবনের, শেষ নিঃশ্বাস অবধি। আজ নিবিড়, মৌনো দুজনের মুখেই হাসি। তৃপ্তির হাসি, পরিপূর্ণতার হাসি, একসাথে বাঁচার হাসি।

সমাপ্ত।

বিঃদ্রঃ অবশেষে!(দীর্ঘশ্বাস) অবশেষে আমি বেলতুলি এবং বৃষ্টি ছুঁয়ে দিক সন্ধ্যা তৃপ্তির সাথে সমাপ্তি দিলাম। ঠিক কতগুলো মাস আপনাদের ঝুলিয়ে রেখেছি নিজেরও জানা নেই। তবে আপনারা শেষ পর্যন্ত থেকেছেন আপনাদের সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। ধৈর্য ধরে আমার লেখা পড়ার জন্য, ওদের ভালোবাসার জন্য। গল্প জুড়ে অনেক অনেক ভুলত্রুটি ছিল, আপনারা তা খুবই সুলভ করে শুধরে দিয়েছেন.. এতে আমি অনেক কিছুই শিখতে পেরেছি। এই গল্প লিখতে গিয়ে আমি অনেকবার হোঁচট খেয়েছি, লিখতে পারিনি কিন্তু তবুও আপনারা আমার সঙ্গ ছাড়েননি। আপনাদের থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার শক্তিতেই আজ এই গল্পটি শেষ হলো।

একটা বিশেষ অনুরোধ, শেষ বারের মতো এই গল্পটা নিয়ে আপনাদের কাছে মন্তব্য চাই। আপনাদের মন্তব্য পড়ে আমি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাই। আপনাদের জন্যই এই গল্পটার খোলা এন্ডিং দেয়া। আপনারা যার যেরকম ইচ্ছা, সে অনুযায়ী কল্পনা করে নিন ওদের সংসার জীবন কেমন। আমার কেন যেন খোলা এন্ডিং দিতে খুব ভালো লাগে। এক্ষেত্রে পাঠকরা স্বাধীন, নিজেদের মতো করে ওদের ভাবে, চিন্তা করে, কল্পনা করে।

আমি জানি না এই গল্প আপনাদের মনে দাগ কাটতে পেরেছে কিনা, তবে আমি খুব চেষ্টা করেছি আমার একশো শতাংশ দেওয়ার। আমি জানি দিতে পারিনি, তাই এই অধমকে মাফ করে দিবেন।

আমাকে ভুলে যাবেন না কিন্তু, আমি আবারও নতুন গল্প নিয়ে আপনাদের কাছে ফিরব ইনশাআল্লাহ। নতুন কিছু নিয়ে, যা আপনাদের ইনশাআল্লাহ ভালো লাগবে। আপাতত আমি বিশ্রাম নেই, কেমন? ভালোবাসিইই প্রিয়রা❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here