গভীর রাত। গ্রামের গাছপালার মাঝ দিয়ে এক মেয়ে আপনমনে দৌড়াচ্ছে। পিছনে তিনজন লোক মশাল হাতে মেয়েটাকে তাড়া করছে। তবুও মেয়েটা থেমে যায়নি। তার বাঁচতেই হবে। পালাতে হবে তাকে। এবার না পালাতে পারলে হয়তো সে আর কখনো পালাতে পারবে না।
গাছপালার ভিড়ে দৌড়ানোর শব্দে কিছু কুকুরও ঘেউ ঘেউ করে ওঠে,দূর পথে শিয়াল আপন মনে ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে মেয়েটা কোনো ভয় নেই। এসব প্রাণীর সামনে মানুষরূপী প্রাণীগুলো আরো ভয়ংকর। সে বাঁচতে চায়। নতুন একটা জীবন পেতে চায় সে। খারাপ লোকদের হাতে পরে সে নিজের জীবন নষ্ট করতে চায় না।
কিছুটা পথ আরেকটু দৌড়াতেই সামনে মেইন রাস্তায় উঠে গেল। এখন কোথায় যাবে সেটাই বুঝতে পারছে না। পেছনের লোকগুলোও ওর কাছাকাছি চলে এসেছে। তবুও একটা বাস পেয়ে উঠে পড়লো সে। বাসের সিটে বসে হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন। বাসের লোকগুলো কৌতুহল নিয়ে তাকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। তাতে মেয়েটা খুব একটা পাওা নেই। সিটের সাথে গা এলিয়ে হেলান দিয়ে বসলো । হাতে আছে মাএ দুই হাজার টাকা। এইটুকু টাকা দিয়ে সে কি করবে জানে না। ক্লান্ত শরীর হওয়ায় চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেল।
হঠাৎ হাতে কিছুর স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলতেই দেখলো লোক তিনটা তার সামনে উপস্থিত। একটা লোক শয়তানি হাসি দিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। কি জঘন্য সেই হাসি। লোকটা মেয়েটার কাছে এসে হাতটা ধরতেই মেয়েটা চিৎকার করে ওঠে।
ঘুমের মাঝেই স্বপ্নটুকু দেখেই ভয় পেয়ে উঠে বসে মেয়েটা । আশপাশে ভালো মতো দেখেই বুঝলো সে বাসে বসে আছে। কন্টাক্টর এসে বলছে সে তার গন্তব্যে চলে এসেছে। মেয়েটা চুপচাপ এবার বাস থেকে নেমে এলো। গন্তব্য তার অজানা। অপরিচিত জায়গায় কীভাবে থাকবে সেটা তার নিজেরও জানা নেই।
~★~
অমিত, অনিল ও আহান সোফায় বসে গল্প করছে। তাদের গল্পের টপিক তাদের আরেক বন্ধু শুভ । কারণ সে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়।ফ্রেন্ডরা সকলেই ব্যস্ত হয়ে পরায় আজ কথা ছিল চার বন্ধু একসাথে আড্ডা দিবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। শুভকে কয়েকবার কল করেছে তারা। কিন্তু কলটাও রিসিভ করছে না। এতে তারা খুবই বিরক্ত। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে তিনজনই অবাক হয়ে তাকালো। আহান বলে উঠল,
-নিশ্চয়ই শুভ এসেছে। আজকে শালার খবর আছে।
অমিত ও অনিলও তার সাথে সহমত পেশন করল। অমিত গিয়ে দরজা খুলতেই হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। অমিতকে স্তব্ধ দেখে অনিল ও আহান এসে অবাক হলো। অনিল অবাক হয়ে বলল,
-কিরে শাঁকচুন্নি তুই এখানে?
আহান অনিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আরে শাকচুন্নি কোথায় এ-তো পরী!
অমিত ওদের কথায় পাওা না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-হুমু তুই হঠাৎ!
হুমায়রা চুপচাপ ভিতরে ঢুকে বলল,
-কেন আসতে পারি না?
-না না পারিস। কিন্তু হঠাৎ এভাবে না বলে এলি তাই!
-মামনিকে কল করেই এসেছি্।
এরই মাঝে অনিল হাসা শুরু করে দিতেই সকলে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। তা দেখে আহান জিজ্ঞেস করল,
-হাসছিস কেন? পাগল হয়ে গেলি নাকি?
-আরেহ বল তো মা আজ বাসায় না থেকে চাচির বাসায় কেন গিয়েছে?
-কেন?
-এই শাঁকচুন্নিটা আসবে বলে।
কথাটা বলে অনিল আবারো হাসতে শুরু করল। আহান ও অমিতের হাসি আসলেও ঠোট টিপে হেসে তারা নিজেদের সংযত করে রাখল। অমিত বলল,
-হুমু যা তুই ফ্রেশ হয়ে নে।
হুমায়রা মাথা নাড়িয়ে উপরের দিকে উঠতে গেলে অনিল বলল,
-খবরদার আমার রুমে যাবি না।
অনিলের কথায় হুমায়রার পা থামলো। চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল,
-ভেবেছিলাম মামনির ঘরে যাবো। কিন্তু তুমি বারণ করলে কেন? এখন আমি তোমার ঘরেই যাবো।
বলে হুমায়রা উপরের দিকে উঠে গেল। আহান কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-হুমু! এটা কি ওর নাম? নাকি ব্যঙ্গ করে বলছিস?
-না ওর পুরো নাম হুমায়রা। আমরা সংক্ষেপে আদর করে হুমু বলি।
-ওওহ। তোদের কি হয় রে? আগে তো দেখিনি।
-আমার খালার মেয়ে।
এরই মাঝে আবারও কলিং বেল বাজায় অনিল গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে শুভ এসেছে। কিন্তু এখন তারা আর বকা দেয়ার মুডে নেই বলে আজকের মতো শুভ বেঁচে গেল। আহান শুভকে পাওা না দিয়ে বলল,
– দোস্ত তোদের বোনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবি না? কি কিউট রে। আমি তো ফিদা।
অনিল ভ্রুঁ কুঁচকে কিছুক্ষণ আহানকে দেখে নিলো। এরপর বলল,
-হুম চল।
শুভ জিজ্ঞেস করল,
-ওদের বোন কোথা থেকে টপকে পড়লো রে?
-আরেহ্ ওদের খালাতো বোন এসেছে। চল যাই পরিচিত হই।
সবাই এবার সেই অনুযায়ী ঘরে চলে এলো। এসে দেখলো হুমায়রা মাএই শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। ওরা সবাই গিয়ে বিছানায় জায়গা দখল করে নিলো। অমিত জিজ্ঞেস করল,
-হুমু তুই হঠাৎ আসলি যে? কোনো কাজে? না মানে গত কয়েকবছর হলো আসলি না। আজ হঠাৎ করেই চলে এলি!
হুমায়রা কথার প্রতিউওর না করে ফার্স্ট এইড বাক্সটা নিয়ে অমিতের কাছে দিয়ে হাত বারিয়ে দিলো। অনিল ভ্রুঁ কুচকে জিজ্ঞেস করল,
-হাত কেটেছিস কীভাবে?
-এমনি বাস থেকে নামার সময় কেটে গেছে।
-বিচ্ছুরর মতো এতো তিরিং বিরিং করলে পাবিই তো ব্যথা। ঠিক হয়েছে। এখন বল হঠাৎ করে আসার কারণ?
-তোমাদের ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছি। তো মামনি বলল এখানে থেকে পড়তে। তাই এলাম্। কাল গিয়ে ভর্তি হবো।
-কিইই…তুই আমাদের ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিস!
-হুম। তো?
-যা খুশি কর। কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে।
-কিসের শর্ত?
-এক..ভার্সিটিতে আমরা কেউ কাউকে চিনি না। দুই..ভার্সিটি মানেই র্যাগিং হবে। আমরাও র্যাগ দিতে পারি। তো একদম আমাদের কাছে এসে কান্নাকাটি, ন্যাকামো করবি না। আর তিন..ভার্সিটিতে কে কি করেছি,কি হয়েছে না হয়েছে এসব বিষয় বাসায় বলতে আসবি না।
-ওকে। কিন্তু কথাটা আপনারাও মাথায় ভালোমতো ঢুকিয়ে রাখেন। পরে ভার্সিটিতে উল্টোপাল্টা কিছু করলে,কেউ র্যাগ দিতে এসে নিজেরা র্যাগ খেলে আমাকে কিছু বলতে পারবে না।
-এহ আসছে ও র্যাগ দিবে। ভার্সিটির ব্যাপারে তোর কোনো ধারণা আছে পুঁচকি।
-তুমি পুঁচকি। যাই হোক। ঝগড়ার মুডে নেই আমি। কথাগুলো মাথায় গেথে রেখো।
-আমাদের মাথায় থাকবেই। হোয়াটএভার ওরা আমার ফ্রেন্ড আহান আর শুভ।
হুমায়রা একনজর তাকিয়ে দেখলো ওদেরকে। আহান হাসি দিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই হুমায়রা বলল,
-তো আমি কি করবো?
হুমায়রা এইটুকু কথাতেই চুপ হয়ে গেল সবাই। ততক্ষণে অমিতেরও হাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়ে গেছে। হুমায়রা জিজ্ঞেস করল,
-ঘরে খাওয়ার কিছু নেই? খুব ক্ষুধা লেগেছে।
অনিল বলল,
-হুম আছে তো গরুর মাংস, ভাত।
এতেই হুমায়রার হয়েছে্। চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আহান যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
-তোদের বোনের অনেক দেমাক যা বুঝলাম।
-হুম তা তো আছেই। ঢং ও বেশি। শর্তগুলো তোরাও মাথায় রাখবি৷ ভার্সিটির কেউ যেন না জানে ও আমাদের বোন।
শুভ ভ্রুঁ কুচকে জিজ্ঞেস করল,
-জানতে পারলে কি হবে?
– ভার্সিটিতে কিছু হলেই আমাদের কাছে আসবে। ন্যাকামো করবে। আর যা আমি চাই না। বিরক্তিকর।
অনিলের এমন কথায় শুভ বোকার মতো কিছুক্ষণ দেখে বলে,
-বোন আছে তাই বিরক্তবোধ করছিস। যার নেই সে বোখে। শুকরিয়া কর। ইশ আমার একটা বোন থাকতো।
শুভর এমন কথায় সকলে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। যে ছেলে সব সময় ভাব দেখিয়ে এসেছে একা হওয়া ভাগ্যের। আজ সে বলছে বোন হওয়া খুবই ভালো! অমিত বোকার মতো দেখে বলল,
-দোস্ত তাহলে তোর বাসায় নিয়ে যা না।
-সময় হলে..
কথাটা শুভ আনমনে বলে ফেলল। অনিল ভ্রু কুঁচকে বলল,
-মানে?
-কিছুই না। মজা করলাম।
এরই মাঝে আহান বলল,
– ওকে। আচ্ছা থাক। কিছু কাজ মনে পড়লো করতে হবে। কাল ভার্সিটিতে দেখা হবে। শুভ যাবি এখন?
শুভও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,
-ওকে মামা। আমিও চলি এখন।
বলে আহান ও শুভ দু’জন এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো।
—————-
সন্ধ্যা হতেই নীলা বেগম বাসায় এসে হাজির হলেন। এসেই অমিতকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-হ্যারে হুমু কি চলে এসেছে? ও আসবে মনেই ছিল না।
-হ্যা মা চলে এসেছে৷ ঘুমাচ্ছে তোমার ঘরে।
-ওহ্। ওর জন্য রুমটা পরিষ্কার করতে হবে। একটু মায়ের হাতে হাতে সাহায্য কর তো। আয়।
এরই মাঝে অনিল বিরক্ত নিয়ে বলল,
-মা ও কি এখন এখানেই থাকবে?
-হ্যা। কেন?
-দূর ভালো লাগে না। ও কেন এখানে থাকবে?
-কেন রে আগে তো ঠিকই বলতি ও তোদের সাথে থাকলে খুব ভালো হতো। এখন এমন করছিস কেন?
-দূর। ভালো লাগে না। প্রতিদিন ন্যাকামো করবে। আমার বন্ধুরা আড্ডা দিতে আসে প্রতিদিন। ও মাঝখানে এসে বিরক্ত করবে।
-আচ্ছা ওকে বলে দিবো তোদের থেকে যেন দূরে থাকে।
-হুম। বলে দিও।
মাএই হুমায়রা ঘুম থেকে উঠে নিচে আসছিল। ওদের কথা শুনে নিচে না এসে আবারো ঘরে চলে গেল। এছাড়া আর কি-ই বা করার। নিজেকে নিজে এই বলে শান্তনা দিলো,
“পরের বাসায় থাকতে হলে একটু কথা শুনতেই হবে। ”
আবার ভেবে নিলো ভার্সিটিতে ভর্তি হলে সে আবাসিক হলে থাকার জন্য আবেদন করবে। আগামীকাল তার ভার্সিটির প্রথমদিন। এখন এই নিয়েই সে ভাবতে চায়। অন্য কোনো ব্যাপার মাথায় ঢুকাতে চায় না।
#চলবে….?
#বোকামন
#Tahsin_Atoshi
#সূচনা_পর্ব

