এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_৯

0
2

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_৯
#আনিকা_আফসা

পরেরদিন আবারো ভার্সিটি গেলাম। রিয়াদ, তৃষা আর সানভি সবাই এসেছে কিন্তু অয়ন আজও আসেনি দেখে খানিক অবাক হলাম। আমরা আসলে ও অবশ্যই আসবে । কাল ফোন দিলাম ধরলোও না। ছেলেটা আবার অসুস্থ হলো নাকি?

ক্লাস শেষে ভাবলাম একবার অয়নের বাড়িতে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। ভার্সিটি শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে রিকশা করে অয়নের বাড়ির সামনে থামলাম। চোখ বুলিয়ে নিলাম বাড়িটায়। তারপর সামনে এগিয়ে দরজায় কড়া নাড়লাম। কিন্তু কারো সাড়া পাওয়া গেল না তাই আমি আমার কড়াঘাত চালিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর অয়ন এসে দরজা খুলতেই আমাকে এখানে দেখে অবাক হলো। আমি খেয়াল করলাম আমাকে দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো। আমি অবাক হয়ে বললাম,

“কি হয়েছে অয়ন? তোর শরীর কি খারাপ? হঠাৎ কাল চলে এলি? আজ ভার্সিটিতেও গেলি না?”

অয়ন মাথা নেড়ে বলল,”নাহ্, শরীর ঠিক আছে”

আমি হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে বললাম,”তাহলে ভার্সিটি যাস নি যে? ফোনও তুলছিস না”

অয়ন হঠাৎ বলল,”কেন তুলবো তোর ফোন? তুই কে হোস আমার?”

আমি অবাক হয়ে বললাম,”এটা কেমন কথা অয়ন? আমরা বন্ধু না? আমি কে হই মানে কি অয়ন? তুই কি আমাকে নিজের বন্ধু মনে করিস না?”

অয়ন তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,”আমি তো তোকে সেটাই ভাবতাম কিন্তু তুই হয়তো সেটা মনে করিস না”

“মানেহ্?”

অয়ন আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”হ্যাঁ, তুই আমাকে বন্ধুই মনে করিস না আনি। যদি বন্ধু মনে করতিস তাহলে এমন করে আমাকে অপমান করাতি না তাও তোর প্রেমিককে দিয়ে”

আমি অবাক হয়ে বললাম,”আমার প্রেমিক মানে? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? কিসব বলছিস?”

অয়ন বললো,”আমি ঠিকই বলছি। রুদ্র আফতাব চৌধুরী তোর প্রেমিক না?”

আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। মুখ কুঁচকে বললাম,

“এই তোর কি হয়েছে বলতো? এসব কি আবোলতাবোল বলছিস?”

অয়ন বাড়ির উঠোনে বসে পড়লো, আমিও বসলাম। অয়ন বলল,

“সেদিন তুই শরবত বানাতে যাওয়ার পর ঐ রুদ্র আফতাব চৌধুরী জানিস আমাকে কত কথা শুনিয়েছে? জানিয়েছে সে নাকি তোর বয়ফ্রেন্ড তাই আমি যেন তোর থেকে দূরে থাকি। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে”

আমি হতবাক হলাম। এসব বলেছে তারউপর মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে? অয়ন আবার বলল,

“তুই জানিস আমার কত খারাপ লেগেছে? তোকে আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবি। আর উনি আমাকে কি না কি শোনালো। আমাকে বলছিল আমাকে নাকি গুম করে দিবে। তোর যখনই প্রয়োজন হয়েছে তুই দরকারে আমাকে পাসনি আনি? তাহলে তোর বিএফ দিয়ে আমাকে হুমকি দেয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? আমাকে তুই নিজেই বলতি অয়ন তোকে আমার লাগবে না, তুই আমাকে আর বিরক্ত করিস না। আরে আমি নিজে চলে যেতাম। আমাকে এভাবে অপমান করে কি হলো তোর আনি?”

আমি হাত নেড়ে বললাম,”বিশ্বাস কর আমি কিছু বলিনি। আর উনি আমার বয়ফ্রেন্ড নন। উনি এসব কেন বলেছেন আমি নিজেও এই নিয়ে আশ্চর্য। এসব তো উনি বলবেন না কখনো”

অয়ন তখনই বললো,”ওও তারমানে আমি মিথ্যে বলছি? তোর ঐ রুদ্রকে এখন তুই আমার থেকে বেশি বিশ্বাস করিস?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,”না , আমি তেমনটা মিন করিনি। আচ্ছা শান্ত হ, রুদ্র যা করেছেন খুবই খারাপ করেছেন। আমি এইজন্য তাকে ছাড়বো না। উনি কে হয় আমার? আমার লাইফে নাক গলিয়ে আমার ফ্রেন্ডকে অপমান করেছেন, এটার কৈফিয়ত ওনাকে দিতেই হবে। ”

এই বলে অয়নের দিকে তাকালাম। অয়নের কাঁধে হাত রেখে বললাম,

“তুই আপসেট থাকিস না অয়ন। আমি আজ একটা বিহিত করেই ছাড়বো। ”

অয়ন চোখ নামিয়ে বলল,”সমস্যা নেই আনি। তুই তো আমার ফ্রেন্ডই। নিজের বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমার জন্য ঝামেলা করিস না। আমি সব ভুলে যাবো সমস্যা নেই ”

আমি শক্ত কন্ঠে বললাম,”উনি আমার বয়ফ্রেন্ড না, ওনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। উনি শুধুমাত্র আমার আপুর ফ্রেন্ড । আমার কিছুই না”

এই বলে অয়নের থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। দ্রুত রিকশা করে বাসায় আসলাম। মাথার মধ্যে নানা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি মাথা চেপে ধরলাম। রুদ্র হঠাৎ এমন কেন করলো? ওনার আচরণ আমার এমনিই সুবিধার লাগছিলো না। আর উনি কি বললেন? উনি আমার বয়ফ্রেন্ড? কোন জন্মের ? উফ্, এক জ্বালা শেষ হতে না হতেই আমার জীবনে অন্য এক জ্বালা কেন এসে পড়ে?”

——

বাসায় এসেই ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিচ থেকেই রুদ্রকে ছাদে দেখেছিলাম। আমায় দেখে হাত নেড়েছেন। ধুপধাপ পা ফেলে ছাদে উঠলাম । ছাদে আসতেই রুদ্রের দেখা পেলাম। রেলিংয়ের সাথে উল্টোদিকে ফিরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তেড়ে গেলাম রুদ্রের কাছে এবং জিজ্ঞেস করলাম,

“সমস্যা কি আপনার? অয়নকে কি বলেছেন আপনি?”

রুদ্র হয়তো আমার এইসময়ের প্রশ্নের জন্য তৈরিই ছিল। তারমধ্যে কোনো বিশেষ ভাবাবেগ হলো না। শান্ত কন্ঠেই বলল,
“কি বলেছি?”

আমি আঙুল উঁচিয়ে বললাম,”একদম খামখেয়ালি করবেন না। আপনি ওকে বলেননি আমার থেকে দূরে থাকতে? আপনি ওকে এটা বলেছেন , আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড? কোন কালের বয়ফ্রেন্ড আপনি আমার? আর তারউপর আপনি ওকে মারার হুমকিও দিয়েছেন?”

রুদ্র আগের মতোই শান্ত কন্ঠে বলল,” ওহ্, এসব বলেছে?”

আমি বললাম,”হ্যাঁ, এসবই বলেছে। আর সম্পূর্ণ সত্য বলেছে। আপনার সাহস হয় কি করে অয়ন আর আমার বিষয়ে নাক গলানোর? ইনফ্যাক্ট আপনি আমার ফ্রেন্ডদের মধ্যেই বা কেন ঢুকছেন? আর এসব বলার কারণ কি?”

রুদ্র আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”আমি এসব বলিনি। শুধু অয়নকে তোর থেকে দূরে থাকতে বলেছি। বাকিসব আমি বলিনি”

আমি হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে বললাম,”ঠিক আছে, মানলাম আপনি ওসব বলেননি। কিন্তু আপনার অয়নকে আমার থেকে দূরে থাকার কথাই কেন বলতে হলো? কেন বলেছেন আপনি? কোন অধিকারে?”

রুদ্র আমার দিকে হঠাৎ এগিয়ে এলো। আমি ভড়কে পিছু সরে রেলিংয়ের সাথে মিশে দাঁড়ালাম। রুদ্র আমার দুই পাশে হাত রেখে রেলিংয়ের উপর ভর দিলো তারপর হালকা ঝুঁকে হাস্কি কন্ঠে বলল,

“ভালোবাসার অধিকারে বলেছি”

আমি থমকে গেলাম। থমকানো গলায় বললাম,

“ভা-ভালোবাসার অ-অধিকারে মানে?”

রুদ্র আরেকটু ঝুঁকে বললেন,”মানে ভালোবাসার অধিকারে। আমি তোকে ভালোবাসি। আর সেই অধিকারেই বলেছি। আমার ভালোলাগে না অন্য কোনো ছেলে তোর দিকে অন্য কোনো নজরে দেখুক তাই বলেছি”

আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। কান্নারা দলা পাকিয়ে আসছে। তারপর হঠাৎ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললাম,

“ওহ্, তো? আপনি আমাকে ভালোবাসেন এখন আমি কি করবো?

রুদ্র আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমাকে ভালোবাসবি”

আমিও সেভাবে তাকিয়েই বললাম,”তারপর?”

“আমাকে বিয়ে করবি”

“তারপর?”

“আমার ডজন ডজন বাচ্চার মা হবি?”

আমি বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে ভ্রু গুটিয়ে বললাম,

“আর তারপর?”

রুদ্র একগাল হেসে বলল,”আমার সাথে এই লম্বা জীবনটা পাড় করবি”

আমি মাথা নেড়ে হালকা হেঁসে বললাম,”এটা আপনার স্বপ্নে সম্ভব মিস্টার। বাস্তবে এমন কিছুই হবে না”

রুদ্র আমার সারামুখ পর্যবেক্ষণ করে বলল,”স্বপ্নকে কিভাবে বাস্তবে রুপ দিতে হয় সেটা রুদ্র খুব ভালো করেই জানে”

আমি মুখ শক্ত করে বললাম,”আপনার লজ্জা করছে না? একটুও লজ্জা লাগছে না এসব কথা বলতে? নাকি বিদেশ থেকে খাঁটি নির্লজ্জ হয়ে ফিরেছেন?”

রুদ্র তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,” তোর সামনে খাঁটি কেন , পৃথিবীর নাম্বার ওয়ান নির্লজ্জ হলেও দোষের কিছু নেই ”

আমি মুখ কুঁচকে তাকালাম। বললাম,

“শুনুন!! আপনি যাই করুন আমি গলবো না। আপনি আমার মনটাকে পাথর করে ছেড়েছেন। আপনার মতো মানুষ যারা অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করতে জানে না তাদের আবার কিসের ভালোবাসা? আপনি তো সেইদিনই বলেছিলেন আমার মতো মেয়েদের সাথে আপনার যায় না? এখন কোথা থেকে এতো ভালোবাসা উতলে পড়ছে? মন ঘুরে গেছে? তারপর পাঁচ বছর পর আবার মন ঘুরে যাবে আর আমাকে আবার অপমান করবেন? আমি কি মানুষ নাকি আপনার হাতের খেলনা?”

বলতে বলতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। রুদ্র অসহায় চোখে তাকালো আমার দিকে। হাত বাড়িয়ে চোখের জল মুছে দিতে চাইলো কিন্তু আমি ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললাম,

“ছোঁবেন না আমাকে। যখন তখন দেখছি আমাকে ছুঁয়ে দিচ্ছেন। সমস্যা কি আপনার? মেয়ে দেখলে শুধু ছুঁতে মন চায়? হাত নিশপিশ করে ছুঁতে?”

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,”আনি আমি তো কেবল,,,”

আমি হাত উঁচিয়ে বললাম,”আমি কিছু শুনতে চাই না। আমার থেকে দূরে থাকুন রূদ্র ভাই। ”

হাত জোড় করে বললাম,”দেখুন আপনার কাছে হাত জোড় করছি , প্লিজ আপনাকে আমার জীবনে চাইনা। আমার জীবনে আমি কার সাথে মিশবো সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। আমার বিষয়ে নাক গলানো বন্ধ করুন। আর আমার সামনে আসা , আমার সাথে কথা বলাও বন্ধ করুন। গোটা আপনিটাকে এখন আমার ভালোলাগে না, বরং অস্বস্তি লাগে। অস্বস্তি বোঝেন? আপনার সংস্পর্শে এলেও আমার অস্বস্তি হয়। তাই আমার থেকে দূরে থাকুন। আমি অয়নের সাথে মিশবো, আরো বেশি করে মিশবো। আপনি কিছুই করতে পারবেন না। ”

এই বলে রুদ্রকে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম। চোখ দিয়ে আজও পানি পড়ছে। কিন্তু আজ কষ্টের কারণটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ আমি। কিজন্য কাঁদছি তা আমার অজানা। রুদ্রের জন্য কাঁদছি না নিজের জন্য তা জানা নেই। সিঁড়ির কাছে আসতেই আপুর দেখা পেলাম। আমি চোখ নামিয়ে আপুকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম । নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইলাম। চোখের অশ্রুকণারা বালিশ ভেজাতে শুরু করলো । আমি নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে রইলাম বিছানায়। কানে শুধু রুদ্রের আমাকে ভালোবাসার কথা বলাটাই বাজছে। যা শোনা আমার জন্য স্বপ্নের ছিল তা আজ শুনতে পেরেছি কিন্তু আজ রুদ্রের প্রতি আমার ভালোবাসা আমায় করা রুদ্রের আচরণের নিচে চাপা পড়ে আছে।

****

আনিকা যেতেই রুদ্র পিছন ফিরলো। চোখ লাল হয়ে আছে। আনিশাকে নজরে এলো তার। চোখ ফিরিয়ে পিছনে ফিরে দুই হাত দিয়ে রেলিং চেপে ধরে দাঁড়ালো। আনিশা এগিয়ে এসে ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“বলেছিলাম রুদ্র। পাঁচ বছর অনেকটা সময় একটা মানুষ বদলানোর জন্য”

রুদ্র মাথা নাড়লো, আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“সত্যিই অনেক বদলে গেছে তোর বোন।”

বলে জোর করে হেঁসে আবার বলল,”আমাকে ওর অস্বস্তি লাগে? আর মানুষও ভালো চিনতে শিখেছে । ওর থেকেই তো জানলাম আমার মেয়ে দেখলেই শুধু ছুঁতে মনচায়”

আপু রুদ্রের কাঁধে হাত রেখে বলল,

“চিন্তা করিস না, ও এসব রাগে বলেছে। বুঝিসই তো। ওর কাছে এখন এসব তিক্ত হয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে যে লোকটা অপমান করে চলে গেছে , সে এখন ভালোবাসার কথা বললে যে কারোরই তো রাগ লাগবে বল? ওকে একটু সময় দে আর মানানোর চেষ্টা কর। আব্বু তো আজকেও কথা বলতে বলেছিল তোদের বিয়ের ব্যাপারে। তোদের বিয়ে তো আগে থেকেই ঠিক করা। কিন্তু এখন আনিকে জিজ্ঞেস করলে ডিরেক্ট রিজেক্ট করে দিবে। তাই আমি জিজ্ঞেস করছি না , আব্বুকে অন্য বুঝ দিচ্ছি। যাইহোক, তুই মন খারাপ করিস না আর কিভাবে আমার বোনের মন জয় করবি তা নিয়ে ভাব। সফলতা তোর দুয়ারেই আসবে”

এই বলে পিঠে হালকা চাপড় মেরে চলে গেল। রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবতে লাগলো , আদৌও কি আনি তার হবে? তাকে আগের মতো ভালোবাসবে? তার যে রুদ্রের প্রতি অনেক অভিমান! এই অভিমানের পাহাড় কি আদৌও রুদ্র গলাতে পারবে??

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here