#এক_মেঘলা_দিনে
#অন্তিম_পর্ব
#আনিকা_আফসা
কেটে গেছে দুইদিন। রুদ্রের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি এখনো। রুদ্রের বাবা এসেছিলেন প্রথমদিনই, ছেলেকে দেখে গেছেন। ছেলের এই অবস্থা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। আজ তৃতীয় দিন, আজকের মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে রুদ্র কোমায় চলে যেতে পারে, পুরোপুরি। আর একবার কোমায় চলে গেলে কেউ বলতে পারবে না রুদ্র আদৌও সুস্থ হবে কিনা। আই সি ইউ এর দরজার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেছি। পড়নে একটা হালকা নীল রঙের গোল জামা, রুদ্রের পছন্দের রং। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম রুদ্রের দিকে। এখনো নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে । মেশিনের শব্দ কানে আসছে । চোখ তুলে তাকালাম একটা মেশিনের দিকে, রুদ্রের হার্টবিটের রেখাগুলো ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। মেশিনের নিয়মিত বিপ বিপ শব্দটা পুরো কেবিনজুড়ে ছড়িয়ে আছে। শব্দগুলো শুনলেই বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠছে আমার।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রুদ্রের বিছানার পাশের একটা টুলে বসলাম। দুইদিন আগেও রুদ্র কত জেদটাই না করেছিলো আমাকে নিয়ে যেতে আর এখন?
কাঁপা হাতে রুদ্রের হাতটা নিজের হাতে নিলাম।
“রুদ্র..”
আমার গলাটা ধরে এলো। রুদ্রের বেডের সাথে দুই কনুই রেখে রুদ্রের ঠান্ডা হাতটা নিজের গালের সাথে চেপে ধরলাম। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আমি আবার বললাম,
“তুমি কি উঠবে না রুদ্র? দেখো তোমার জন্য কতগুলো মানুষ অপেক্ষা করছে। আচ্ছা মানলাম আমার উপর রেগে আছো, তোমার বাবা তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে । অন্তত তার জন্য হলেও তোমার চোখ দুটো মেলো রুদ্র প্লিজ। দেখো আমার উপর তুমি যত খুশি রাগ করে থাকো, ইচ্ছা হলে আমাকে মারোও আমি কেন তোমায় বিশ্বাস করলাম না? তোমার যা ইচ্ছা তাই করো, কিন্তু এভাবে নিস্তেজ হয়ে থেকো না রুদ্র। আজ না উঠলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়ে যাবে রুদ্র। প্লিজ উঠো , প্লিজ।”
এই বলে কাঁদতে কাঁদতে চোখ বন্ধ করে রাখলাম। রুদ্রের সাড়াশব্দ আসছে না দেখে ভেঙে পড়লাম। রুদ্রের হাত ছেড়ে রুদ্রের বিছানায় মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম এবং বলতে লাগলাম,
“আমি একটা মাথামোটা, আমি কেন তোমাকে বিশ্বাস করতে পারলাম না? চোখের ভুল দেখায় তোমাকে কেন বিচার করলাম? আমি কেন এতবড় ভুল করলাম? কেন? রুদ্র প্লিজ উঠো, আমাকে ছেড়ে যেও না। আমার কিটি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, বাবাও চলে গেছে এমনকি তৃষাও। তুমি অন্তত এমন করোনা। তুমি চলে গেলে তো আমি বেঁচে থেকেও মরে যাবো। প্লিজ রুদ্র উঠো না,,,,”
এই বলে কাঁদতে লাগলাম, তখনই শুনতে পেলাম,
“আরে বাবা উঠেছি উঠেছি, এমন মরা কান্না কেঁদে আমার কানের বারোটা বাজাস না তো আনি।”
আমি মুহূর্তেই থেমে গেলাম। কান্নার মাঝেই শরীরটা জমে গেল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছি না আমি কী শুনলাম। ধীরে ধীরে মাথা তুললাম।
রুদ্রের দিকে তাকাতেই দেখি তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসিটা ফুটে উঠেছে। চোখ দুটো আধখোলা, কিন্তু সেগুলোতে আগের মতোই প্রাণ আছে।
আমি কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইলাম এবং আস্তে বললাম,
“রু,,,দ্র?”
রুদ্র ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বলল,
“হুম, আমিই। স্বপ্নে না বাস্তবেই। এত কাঁদছিস কেন? হাসপাতালের সবাই ভাববে আমি মারা গেছি।”
আমি হতবাক হয়ে বললাম,
“তুমি জেগে উঠেছো?”
রুদ্র বলল,” না স্বপ্নে কথা বলছি।
আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম এবং বললাম,
“মানে?”
রুদ্র হালকা হাসল।
“জ্ঞান আমার কয়েক ঘণ্টা আগেই ফিরেছে।”
“কি!”
“হুম। ডাক্তারকে বলেছিলাম কাউকে না জানাতে।”
“কেন?”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“কারণ আমি দেখতে চেয়েছিলাম কে আমার জন্য কি কি ভাবে।”
আমার চোখ আবার ভিজে উঠল। আমি বললাম,
“তুমি জানো, তুমি একটা অসহ্য মানুষ?”
“জানি।”
“আমি এখানে দুই দিন ধরে মরে যাচ্ছি আর তুমি পরীক্ষা নিচ্ছ?”
“পরীক্ষা না আনি। জীবনে অনেকেই মুখে ভালোবাসার কথা বলে। আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম, তোর চোখেও সেই কথাগুলো আছে কিনা।”
আমি রাগে তার বুকে হালকা একটা ঘুষি মারলাম।
“খারাপ লোক!”
রুদ্র ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল,
“আহ! আমি কিন্তু সত্যিই আহত।”
“হওয়া উচিত।”
“তবুও একটা লাভ হয়েছে।”
“কি?”
“আজ প্রথমবার তোর মুখে শুনলাম, তুই আমাকে হারাতে ভয় পাস।”
আমি বললাম,”যখন থেকে ভালোবাসি তখন থেকেই হারাতে ভয় পাই। ”
রুদ্র সরু চোখে তাকিয়ে বলল,”বলছিস ভালোবাসিস? ভালোবাসলে আমার আংটিটা ফেলে দিতে পারতি? ”
আমি বললাম,” কে বলেছে ফেলে দিয়েছি?”
এই বলে গলার ঐ চেইনটা রুদ্রকে দেখালাম। এতক্ষণ জামার নিচে থাকায় রুদ্র খেয়াল করেনি। রুদ্র অবাক হয়ে তাকালো। তারপর হঠাৎ একটা প্রাণবন্ত হাঁসি হেঁসে বলল,
“তারমানে তখন ওসব মিথ্যা ছিলো?”
আমি বললাম,”তোমার দেয়া কোনো জিনিস ফেলবো এটা হতে পারে না। যত রাগই করে থাকি তুমি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই তোমার জ্ঞান ফিরেছে এটা আমি বলে আসি সবাইকে।”
আমি যেতে নিলেই রুদ্রের মুঠোয় থাকা আমার হাত রুদ্র চেপে ধরলো খানিক। আমি থেমে গেলাম। রুদ্র বলল,
“পরে, আগে তোমাকে ভালো করে দেখতে দেও।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। রুদ্র ধীরে ধীরে আমার মুখের দিকে তাকাল। যেন দুই দিন নয়, দুই যুগ পর দেখছে আমাকে।
তার চোখে এমন এক প্রশান্তি, এমন এক স্বস্তি, যা আমি আগে কখনো দেখিনি।
“কি দেখছো?”
আমি আস্তে জিজ্ঞেস করলাম। রুদ্র হালকা হাসল এবং বলল,
“আমার বেঁচে থাকার কারণ।”
কথাটা শুনেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম। রুদ্র আবার বলল,
“জানিস আনি, মাঝেমধ্যে জ্ঞান আর অজ্ঞানতার মাঝখানে যখন ডুবে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি হয়তো আর ফিরতে পারব না।”
আমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
“এসব বলো না।”
“বলতেই দাও।”
সে আস্তে করে বলল,
“প্রতিবারই একটা মুখ ভেসে উঠছিল চোখের সামনে।”
আমি চুপ করে রইলাম। রুদ্র বলল,
“তোর মুখ।
আমার চোখ আবার ভিজে উঠল। রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
“তখন মনে হচ্ছিল, না,,, এখনও যাওয়া যাবে না। একটা জেদি মেয়েকে অনেক কথা বলা বাকি আছে।”
আমি কান্না লুকাতে মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে রুদ্র বলল,
“এই যে! আবার কাঁদছিস?”
“তোমার জন্যই।”
“আচ্ছা, তাহলে একটা কাজ কর।”
“কি?”
“একবার হাস।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম এবং বললাম,
“হাসব কেন?”
“কারণ গত দুই দিন ধরে আমি চোখ খুলেই প্রথম যে জিনিসটা দেখতে চেয়েছিলাম, সেটা হলো তোর হাসি।”
কান্নার মাঝেই আমার ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। রুদ্র সেই হাসিটার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“এই তো,,,এখন মনে হচ্ছে সত্যিই ফিরে এসেছি।”
আমি রুদ্রের হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললাম,
“আর কখনো এমন ভয় পাইয়ো না আমাকে।”
রুদ্র চোখ বন্ধ করে মৃদু হাসল এবং বলল,
“চেষ্টা করব। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত।”
“কি?”
“পরের জন্মেও যদি তোকে পাই, তখনও ঠিক এভাবেই বিরক্ত করব।”
আমি হেঁসে ফেললাম। রুদ্র তাকিয়ে রইলো। ধীরে ধীরে আমার হাঁসি কমে গেলো। মনে পড়ে গেলো রুদ্রের সাথে করা অন্যায়। রুদ্র ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হলো?”
আমি বললাম,”তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি না? ”
রুদ্র বলল,”হুম, খুব।”
আমার চোখ ভিজে উঠলো এবং আমি বললাম,
“আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমি খুব,,, খুব সরি। নিজের চোখে দেখা একটা ভুল জিনিসের উপর ভিত্তি করে তোমার সাথে এত অন্যায় করেছি। তুমি কি এখনও আমার উপর রাগ করে আছো?”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল,
“রাগ করিনি বললে মিথ্যে বলা হবে।”
আমার বুকটা ধক করে উঠল। রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
“যখন তুই আমার কথা না শুনে অন্যদের কথা বিশ্বাস করলি, তখন খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এতদিনেও হয়তো আমার উপর তোর ভরসা তৈরি হয়নি।”
আমি মাথা নিচু করে ফেললাম।
“সরি,,,”
“এই মেয়েটা, আবার সরি?”
আমি কিছু বললাম না। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“জানিস, গুলিটা যতটা না ব্যথা দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি ব্যথা দিয়েছে তোর অবিশ্বাস।”
আমার চোখ থেকে টুপ করে একটা জলবিন্দু পড়ে গেল। রুদ্র সেটা দেখে নরম গলায় বলল,
“কিন্তু একটা কথা কি জানিস?”
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম।
“কি?”
“ভালোবাসার মানুষদের উপর রাগ বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল আবার। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তাহলে,,, ক্ষমা করে দিয়েছো?”
রুদ্র ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“অর্ধেক।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“অর্ধেক?”
“হুম।”
“বাকি অর্ধেক?”
রুদ্র একটু ফিসফিস করে বলল,
“সেটা তোর কাছে পাওনা আছে।”
“কি পাওনা?”
“একটা জড়িয়ে ধরা।”
আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
রুদ্র আবার বলল,
“দুই দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে এসেছি। এতটুকু আবদার কি করতেই পারি না?”
কান্নার মাঝেও আমার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
“তুমি সত্যিই অসহ্য।”
“জানি।”
“একদম অসহ্য।”
“সেটাও জানি।”
আমি মাথা নেড়ে হেসে ফেললাম। আর রুদ্র? সে শুধু তাকিয়ে রইল আমার দিকে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা আবার ফিরে পেয়েছে। রুদ্র আবার তাগাদা দিয়ে বলল,
“শুধু হাসলে লাভ হবে না ম্যাম, যেটা বলেছি সেটা করুন।”
আমি বললাম,”তোমার সারা শরীরেই তো ব্যান্ডেজ। আর আমি জড়িয়ে ধরলে ব্যাথা পাবে না?”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“পাবো।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,
“তাহলে?
“তবুও চাই।”
আমি চুপ করে গেলাম।রুদ্র ধীরে ধীরে বলল,
“আনি, কিছু ব্যথা আছে যেগুলো মানুষ হাসিমুখে সহ্য করে।”
“আর এটা সেরকম একটা ব্যথা?”
“হুম। তোর আলিঙ্গনের জন্য হলে হাজারবারও যেকোনো ব্যাথা সহ্য করতে পারবো।”
আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
রুদ্র এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আনি, জানিস,,, যখন মনে হচ্ছিল আমি হয়তো আর ফিরব না, তখন একটা জিনিসের জন্য সবচেয়ে বেশি আফসোস হচ্ছিল।”
“কি?”
“তোকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরতে পারিনি।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
“তাই এখন সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাই না।”
আমি চোখের পানি মুছে বললাম,
“একদম অসহ্য তুমি।”
“সেটা তো আগেই বলেছিস।”
“তবুও,,,”
“তবুও?”
আমার আর কিছু বলার রইল না। ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে গেলাম। রুদ্র ফিসফিস করে বলল,
“এই তো,,, অবশেষে আমার জেদি মেয়েটা ফিরে এসেছে।”
আমি সাবধানে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। একদম আস্তে। যেন ব্যাথা না পায়। রুদ্র তার হাত আমার পিঠে রাখলো এবং বলল,
“জানিস আমি কেন ফিরেছি? কারণ আমি চাইনি আমাদের গল্পটা ওই জায়গায় শেষ হোক।”
তার কণ্ঠটা খুব শান্ত, খুব নরম শোনালো। সে আবার বলল,
“তাই ফিরেছি।”
আমার চোখ আবার ভিজে উঠল ,
“আমার জন্য?”
রুদ্র হালকা হেসে বলল,
“না, পাশের বেডের রোগীর জন্য।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে একটা চাপড় দিলাম।
“উফ! আবার মারলি!”
“সিরিয়াস কথা বলতে পারো না?”
“পারলে তো আমি আমি হতাম না।”
আমার অজান্তেই হাসি চলে এলো। রুদ্র সেই হাসিটার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর খুব আস্তে বলল,
“এই হাসিটার জন্যই তো এত লড়াই।”
তারপর রুদ্র চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর কানের কাছে খুব আস্তে বলল,
“এখন ক্ষমা করলাম।”
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
“পুরোপুরি?”
রুদ্র বলল,
“না।”
আমি সোজা হয়ে তাকালাম এবং বললাম,
“আবার কি চাই?”
রুদ্র দুষ্টু হেসে বলল,
“বাকি অর্ধেক ক্ষমার জন্য আরও কয়েক বছর তোর আমার পাশে থাকতে হবে।”
আমি হেসে ফেললাম। তারপর শুনতে লাগলাম রুদ্রের অবাধ্য হৃদস্পন্দনের আওয়াজ। ভাগ্যিস গুলিটা এই হৃদযন্ত্রকে ছুঁতে পারেনি। অনেকদিন পর বুকভরা শান্তি অনুভব করছিলাম। দূর থেকে মনে হচ্ছিল একটা গান ভেসে আসছে,
পৃথিবী একদিকে,,,,তুমি আরেকদিকে আমার।
আমি তোমার কাছেই যাবো, এই পথে যতই নামুক আঁধার ♪♪
♪♪আমি দুনিয়া ছাড়তে পারি, আমি জিতেও হারতে পারি । পারবো না শুধু, বাঁচতে কভু ,,,,তুমি ছাড়া,,,♪♪
হোওওওও
♪♪আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো তুমি ছাড়া,
আমি পাগল হয়ে যাবোওও তুমি ছাড়া,
আমি ধ্বংস হয়ে যাবো তুমি ছাড়া,
আমি সময়কে থামিয়ে দেবোওওওওও♪♪
,,,,তুমিইই ছাড়া,, হুমমমম
তুমিই ছাড়া,,,তুমিই ছাড়া ,,,হুমমম,,
তুমি ছাড়া,,, হোওওও
___________সমাপ্ত__________
পরিশিষ্ট ,,,
“ওয়াও, রুদ্র । আমরা অবশেষে মরিশাসে এসেই গেলাম।”
রুদ্র হালকা হাসলো। মরিশাসের সকালটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত কোনো প্রার্থনার মতো।
নীল সমুদ্র দূরে না,এতটাই কাছে মনে হচ্ছে, যেন আকাশ নিজেই নেমে এসে পানিতে হাত রেখেছে। ঢেউগুলো ধীরে ধীরে বালুর উপর এসে ভেঙে যাচ্ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে, কোনো তাড়া নেই, কোনো হাহাকার নেই।
সৈকতের ধারে নারকেল গাছগুলো বাতাসে হেলে পড়ছে। পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ছে সোনালি রেখার মতো, বালুর ওপর ছড়িয়ে আছে আলো আর ছায়ার নরম খেলা।
আমি বালুর উপর খালি পায়ে হাঁটছি রুদ্রের হাত ধরে। ভেজা বালু পায়ের নিচে নরমভাবে ডুবে যাচ্ছে। কেটে গেছে তিনটা মাস। সব বদলে গেছে। অয়নের ফাঁসি হয়েছে । আমার আর রুদ্রের বিয়ে হয়েছে । সানভি ও রিয়াদেরও একটা সংসার হয়েছে। তবে ওদের হয়েছে কট ম্যারেজ। সানভির বাবার কাছে রিয়াদ কট খেয়েছে , তারপর সানভির বাবা দুজনের চারহাত এক করে দিয়েছে। ভাবতেই মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো। রুদ্র আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“হ্যাপি হানিমুন ডিয়ার ওয়াইফি।”
আমি রুদ্রের কথায় হাসলাম তারপর কাঁধে মাথা রেখে বললাম,” বিয়ের তৃতীয় মাসের শুভেচ্ছা আপনাকেও ডিয়ার হাসবেন্ড ।”
রুদ্র আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,”তো আপনি প্রস্তুত আছেন তো?”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,”কিসের জন্য?”
রুদ্র কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু বলতেই লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেলো। রুদ্র তা দেখে মিটিমিটি হাসলো। আমি আমতা আমতা করে বললাম,
“সমুদ্রতে ফোকাস করুন, দেখুন কত মানুষ মজা করছে।”
রুদ্র তাকাতে গেলেই আমি ওর চোখ ধরে বললাম,
“না , না , ওদিকে একদম তাকাবেন না। এইদিকে তাকান। ঐ দেখেন রেস্টুরেন্ট, আমার খিদে পেয়েছে ,চলুন খাবেন”
ঐদিকে কতগুলো মেয়ে ছিলো , যেগুলো ছোট ছোট ড্রেস পড়ে এসেছিলো তাই রুদ্রকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে চলে এলাম। রুদ্র আমার পাগলামিতে মাথা নেড়ে হাসলো। আমরা গিয়ে বসলাম রেস্টুরেন্টের একটা টেবিলে। হঠাৎ মাথাটা ভার ভার লাগছে।
রুদ্র খাবার অর্ডার দিতে গিয়েছিল। টেবিলে বসে আমি হাত দুটো টেবিলের ওপর রেখে একটু মাথা নিচু করলাম। হঠাৎ করেই গা ভারী লাগছে, বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে ভরে উঠছে।
রেস্টুরেন্টের চারপাশে ভাজাপোড়ার গন্ধ, সি-ফুডের ঘ্রাণ, সব মিলিয়ে মাথাটা ঘুরে উঠল একটু। আমি ধীরে ধীরে শ্বাস নিলাম, কিন্তু তবুও অস্বস্তিটা যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই রুদ্র ফিরে এলো। হাতে মেন্যু, চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টু ভাব।
“কি নেবে বল,”
কথাটা মাঝপথে থেমে গেল। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে ফেলল কিছু একটা ঠিক নেই।
“আনি, কি হয়েছে?”
আমি মাথা নাড়লাম, “কিছু না,,, একটু মাথা ঘুরছে।”
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে আমার পাশে বসে পড়ল। মেন্যুটা এক পাশে রেখে আমার কপালে হাত রাখল।
“তোমার শরীর ঠিক লাগছে না কেন? মরিশাস এসে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে,,এই প্ল্যান ছিল?”
আমি চুপ করে রইলাম। অস্বস্তিটা বাড়ছিলো। তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিলাম। রুদ্র হাত ধরে বলল,
“চলো, ডাক্তারের কাছে যাই। ”
আমি রুদ্রের হাত ধরে বললাম,”সমস্যা নেই, ঠিক আছি আমি, বসো তুমি।”
রুদ্র কিছু বলতে নিলো কিন্তু আমি তাকে চুপচাপ বসিয়ে দিলাম। গার্লিক বাটার প্রন কারি অর্ডার করলাম আমরা । ওয়েটার সেটা নিয়ে রাখলো আমার সামনে। কারির গন্ধটা আমার নাকে যেতেই পেটসুদ্ধ মুচড়ে উঠলো। পেটের সব উগলে বের হয়ে আসতে চাইলো। আমি মুখ চেপে দৌড়ে ওয়াশরুমের দিকে গেলাম। আমার এই অবস্থা দেখে রুদ্র আমার পিছু এলো। আমি ওয়াশ রুমের বেসিনের সামনে এসেই গড়গড় করে বমি করে দিলাম। রুদ্র আমার এই অবস্থা দেখে আমাকে আগলে ধরে দাঁড়ালো, পিঠে আলতো হাতে মালিশ করে দিলো। বমি করে শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে পড়লো , আমি শরীরের ভার ছেড়ে দিলাম রুদ্রের উপর। রুদ্র আমাকে ধরে দাঁড়িয়ে বেসিনের পানি দিয়ে আমার মুখ ধুইয়ে দিলো। এখন একটু ভালো লাগছে। রুদ্র বলল,
“কি হয়েছে তোমার?”
আমি বললাম,”বুঝতে পারছি না, শুধু বমি পাচ্ছে। আরো একবার হয়েছে।”
রুদ্র কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,”আরো একবার? আমাকে বলো নি কেন?”
আমি বললাম,”তোমাকে বললে শুধু শুধু টেনশন করবে তাই বলিনি।”
রুদ্র কিছুক্ষণ কড়া চোখে তাকিয়ে রইলো তারপর ঝট করে আমাকে কোলে তুলে নিলো। আমি হকচকিয়ে উঠলাম এবং বললাম,
“আরে কি করছো? আমি পারবো। ”
রুদ্র ধমকে বলল,”চুপ থাকো। আর একটা কথা বললে খবর আছে।”
আমি বললাম,”মানুষ কি বলবে?”
“মানুষ মাই ফুট, আমার কাছে তোমার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।”
হোটেলে ফিরতেই রুদ্র রিসেপশনে এক সেকেন্ডও নষ্ট করলো না। রিসিপশনে গিয়ে বলল,
“ডাক্তার চাই। এখনই।”
রিসেপশনের মেয়েটা একটু ঘাবড়ে গেল। তখন রুদ্র আরেকটু গম্ভীর গলায় বলল, “My wife is not feeling well. I need a doctor now.”
আমি পাশে দাঁড়িয়ে রুদ্রের দিকে তাকালাম, চোখে একটা অদ্ভুত নরম দৃষ্টি।
রুদ্র সেটা খেয়াল করেও না দেখার ভান করলো।
রুদ্র আমাকে আমাদের রুমে নিয়ে এলো। এক মুহূর্তও ছাড়ছে না হাতটা। যেন আমি উধাও হয়ে যাবো যদি একটু ঢিলে দেয়।
আমি আস্তে করে বললাম, “রুদ্র, আমি ঠিক আছি,, একটু বেশি রিঅ্যাক্ট করছো তুমি।”
সে আমার দিকে তাকাল না। আমার দিকে চোখ রেখে বলল, “তুমি চুপ থাকো।”
তার গলাটা এমন ছিল না যে রাগ করছে,,বরং ভয় মিশে ছিল।
আমি একটু থমকে গেলাম।
“আমি সত্যিই ঠিক আছি,,”
এইবার সে আমার দিকে পুরোপুরি ঘুরে তাকাল।
চোখ দুটো সরু।
“আনি।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে চুপ।
এই একটা ডাকেই বুঝে গেলাম, এখন আর তর্ক করার সুযোগ নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে হোটেল রুমে ডাক্তার এসে গেল।
আমি সোফায় বসে আছি, আর রুদ্র ঠিক আমার পাশে দাঁড়িয়ে। আমার হাতটা এখনো তার মুঠোর ভেতর।
ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করতে শুরু করল। রুদ্র এক সেকেন্ডও চোখ সরাচ্ছে না।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তুমি এভাবে তাকিয়ে থাকলে ডাক্তার নার্ভাস হয়ে যাবে।”
রুদ্র ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি চাই সে নার্ভাস হোক, যদি ভুল কিছু বলে।”
আমি চোখ ছোট করে তাকালাম। “
রুদ্র”
সে একটু নিচু গলায় বলল, “তুমি চুপ থাকো আনি। আর একটা কথা বলবে না।”
মহিলা ডাক্তারটি আমার নার্ভ চেক করলেন। তারপর আমার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার সার্কেল ঠিক আছে?
ডাক্তার প্রশ্নটা করতেই আমি একটু থমকে গেলাম।
“সার্কেল,,?”
মাথার ভেতরটা যেন একটু ঝাপসা হয়ে এলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্র একদম নড়ল না, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম তার হাতটা একটু শক্ত হয়ে গেছে আমার আঙুলের উপর।
ডাক্তার আবার ধীরে বললেন, “মানে, আপনার পিরিয়ড নিয়মিত হচ্ছে তো? শেষ কবে হয়েছে মনে আছে?”
এইবার আমার বুকের ভেতরটা হালকা অস্বস্তিতে কেঁপে উঠল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আমি,,,খেয়াল করিনি।”
রুদ্র এবার হঠাৎ আমার দিকে তাকাল। চোখে প্রশ্ন।
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“ঠিক আছে। আমি একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট সাজেস্ট করছি।”
এই শব্দটা রুমের বাতাসটাকেই যেন থামিয়ে দিল।
আমি এক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস আটকে ফেললাম।
“প্র,,,কি?”
আমার গলা শুকিয়ে গেল। পাশে রুদ্র একদম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, “লক্ষণগুলো মিলছে। বমি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা,প্রাথমিকভাবে সম্ভাবনা আছে। নিশ্চিত হতে টেস্ট করতে হবে।”
ডাক্তার হেঁসে বললেন,”মিস্টার রুদ্র রাইট? আই থিংক আপনার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট। তবে টেস্ট করিয়ে শিওর হওয়া ভালো। শিওর হয়ে মিষ্টি মুখ কিন্তু অবশ্যই করাবেন।”
এই বলে ডক্টর মিষ্টি হেঁসে চলে গেলেন। আমি আমার উদরে হাত রাখলাম, কিছু অনুভবের চেষ্টা তারপর রুদ্রের দিকে তাকালাম, সে এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম,
“তোমার আবার কি হলো?”
রুদ্র বলল,”আমি বুঝছি না আমার কি রিয়েক্ট করা উচিত। এটা কি সত্যি?”
আমি হাসলাম, রুদ্র আবার বললো,
“যদি এটা সত্যি হয় তবে ,,,,আমি বাবা হতে চলেছি। আই কান্ট বিলিভ।”
আমি তাকিয়ে রইলাম রুদ্রের দিকে। রুদ্র এগিয়ে এসে আমার কপালে দীর্ঘসময় নিয়ে একটা চুমু খেলো তারপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“তুমি আমার জীবনে এসে আমার জীবনটাকে অসাধারণ করে দিয়েছো সুইটহার্ট। আমাকে পরিপূর্ণ করেছো তুমি। ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য, ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। আমি কথা দিচ্ছি আমি আরো ভালো হাসবেন্ড এবং বেস্ট পাপা হবো । ”
আমি হেঁসে বললাম,”তুমি আমার কাছে বেস্ট হাসব্যান্ড ফরএভার আর আমি জানি আমাদের বেবি হলে তুমি একজন বেস্ট বাবাও হবে ”
রুদ্র আমাকে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে বলল,”ইনশাআল্লাহ।”
আমিও জড়িয়ে ধরলাম। রুদ্র মুখ উঠিয়ে বলল,
“তাহলে এই খুশিতে একটা আদর তো তোমার পাওয়া উচিত।”
এই বলে আমার ঠোঁটের দিকে এগোতে নিলে আমি মুখ ওর চেপে ধরে বললাম,
“আরে পাঠিকারা আছে তো।”
রুদ্র বলল,
“আরে আপনারা এখনো কি করছেন? যান নিজেদের কাজে। আপনাদের জন্য কি এখন বউকে আদরও করতে পারবো না? যান যান।”
দুজন একসাথে বললাম,”বিদায় পাঠক বৃন্দ।”
________ বিদায় 🥺 লেখিকার তরফ থেকেও__
সবাইকে বিদায়, এই গল্পে একটা আবেগ ছিল আমার যেহেতু নিজের নাম দিয়ে। সবাইকে ভালোবাসা এত সুন্দর সাপোর্ট এর জন্য।

