বুঝতে পারছি না নিজেকে এখন কী বলে দাবি করবো—সদ্য নববধূ, নাকি সদ্য সৎমা, নাকি বাবা–মায়ের কাছে প্রতারিত হওয়া এক সন্তান। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে আমার সদ্য বিবাহ করা স্বামীর মেয়ে। গোল গোল কৌতূহলী চোখে সে তাকিয়ে আছে নববধূর দিকে। মুখখানা স্নিগ্ধ, গোলাপকলির মতো কোমল। অথচ এই সৌন্দর্য আমার মন ভোলাতে পারছে না। বুকের ভেতর কেমন যেন ভারী কিছু চেপে বসেছে।
বিয়ে নিয়ে কত কল্পনা ছিল। অন্য সব মেয়ের মতো আমারও ফ্যান্টাসি ছিল । নিজের মানুষ, নিজের অধিকার। শুনেছি, মানুষের চরিত্র যেমন, জীবনসঙ্গীও নাকি তেমনই হয়। সেই বিশ্বাসেই কখনো প্রেমে জড়ানো হয় নি । বান্ধবীরা মজা করে বলত,
“দেখবি ঊর্মি, তুই সেকেন্ড হ্যান্ড পাবি।”
আমি হাসতাম, উড়িয়ে দিতাম। আমার কথা ছিল একটাই ,আমার স্বামীর ওপর শুধু আমার অধিকার থাকবে। কিন্তু আজ সব প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কীভাবে হলো ?কেন হলো ?কিছুই বুঝতে পারছি না। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
সদ্য ইন্টার পরীক্ষা শেষ করেছি। এডমিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ একদিন আব্বু এসে বললেন, ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে। বাবার মুখে কথাটা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, পড়ালেখা ছাড়া অন্য কিছু ভাবার দরকার নেই। অথচ আজ সেই মানুষটাই বিয়ের কথা বলছেন। বুঝলাম, তিনি সিরিয়াস। বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস আমার কোনোকালেই ছিল না। চুপচাপ মেনে নিলাম। ভেবেছিলাম, বাবা–মা যা করবেন ভালোই করবেন।
ছেলে সম্পর্কে জানতে চাইনি এমন নয়। বড় আপুকে বলেছিলাম, অন্তত একবার দেখা করতে চাই। আপু বলেছিল, দেখতে এলে দেখবি। অবশেষে সেই দিন এলো। আমাকে বসানো হলো ছেলেপক্ষের সামনে। প্রশ্ন, চুল দেখা ।যেন আমাকে গরুর মতো যাচাই করা হচ্ছে। অসম্ভব অস্বস্তি হচ্ছিল। আরও অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে,
বাবা এসব সমর্থন করছেন?
ছেলেটাও সেখানে ছিল, কিন্তু নত মাথার কারণে টের পাইনি। ভয়ের সঙ্গে সংকোচ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
ঠিক তখনই কেউ জোরালো কণ্ঠে বলে উঠলো,
এতগুলো পুরুষের সামনে চুল খুলছেন কেন? ওর পাশ থেকে সরে আসুন।
কণ্ঠস্বরটা আমাকে চমকে দিল। মাথা নিজে থেকেই উঁচু হয়ে গেল। শ্যামবর্ণের এক বলিষ্ঠ যুবক, পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, কপালে বিরক্তির ভাঁজ। প্রথমবার কোনো পুরুষের দিকে তাকিয়ে আমি এমনভাবে বিমোহিত হলাম। আপুর ধাক্কায় হুঁশ ফিরলো। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলাম। তখনই ঘোষণা এলো । মেয়ে পছন্দ হয়েছে, আজকেই বিয়ে পড়াতে চাই। উৎকণ্ঠা নিয়ে বাবার দিকে তাকালাম। তিনি চোখের ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন। আপু আমাকে নিয়ে গেল।
ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করছিলাম। দেখতে এসে বিয়ে ! এটা মানতে পারছিলাম না। মনে মনে চাইছিলাম, বাবা একটু সময় নিন। কিন্তু আমার সব আশা ভেঙে দিয়ে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেল। জোর করেই বসানো হলো বিয়ের পিঁড়িতে। কাজি এলেন, বিয়ে পড়ানো হলো। আমি তখন এক অজানা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
হঠাৎ ছোট্ট একজোড়া হাত আমার হাতে স্পর্শ করলো।
—“টুমি বুজি নটুন বুউ?”
শিশুসুলভ কথায় আমি হেসে ফেললাম। কোলে তুলে নিলাম। সে আবার বললো, “
—–টুমি তো আমাল পাপাল বুউ। তাইলে টুমি আমার মাম্মা, তাই না?”
কথার মানে তখন পুরো বুঝিনি। ভ্রু সামান্য কুঁচকালেও গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, কোনো আত্মীয়ের সন্তান। হঠাৎ কেউ জোরে ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল। চমকে উঠলাম। একজন মহিলা উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
—-ছোট মানুষ কী বলতে কী বলেছে, কিছু মনে করো না।
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম,
—- বাচ্চাটা খুব আদুরে। ভালোই লাগছিল।
তিনি অদ্ভুতভাবে বললেন,
— পাছে বিষ মনে না করলেই হয়। তখনও কথার আসল মর্মার্থ বুঝিনি।
শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেই আবার সেই শিশুটাকে দেখলাম। সে চুপচাপ আমার শাড়ির আঁচল ধরে আছে। সন্দেহ মাথা তুলতে লাগলো। বিশেষ পাত্তা দেওয়া হয় নি।
রাতে শাশুড়ি আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন,
–“ও মিমি, তোমার স্বামীর মেয়ে।”
মুহূর্তেই মাথার ভেতর সবকিছু ভেঙে পড়লো। উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
–“মানে? মজা করছেন? এটা সম্ভব না।”
তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন,
—“তোমার সঙ্গে মজা করার সম্পর্ক আমার না। এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। তোমার বাবা সব জানতেন। জেনে বুঝেই বিয়ে দিয়েছেন। তোমাকে না জানানো উনার সিদ্ধান্ত ছিল। মানিয়ে নাও। বাচ্চাটা তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার মেয়ে। অবহেলা করার চেষ্টা কোরো না। এ বাড়ির কেউ তা মেনে নেবে না।”
আমি পাথরের মতো বসে রইলাম। অতি শোকে মানুষ নাকি পাথর হয়ে যায় ।আমি তখন সেই পাথর। চারপাশ অন্ধকার লাগছিল। শেষ মুহূর্তে বাবাও আমাকে ঠকালো। এটাই কি বিশ্বাসের প্রতিদান? মনে পড়লো বিদায়ের সময় বাবার কথা—কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেছিলেন,
“ভুল বুঝিস না মা, দেখবি সুখী হবি।”
তখন ভাবিনি, সুখের আড়ালে এমন ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে আছে। কানে ক্রমাগত বাজতে লাগলো ,
“টুমি আমার মাম্মা?”
হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো। আমি নড়লাম না। সে এসে ফ্রেশ হয়ে নিল। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বললো,
“ফ্রেশ হয়ে আসো।”
কথাটা আগুনে ঘি ঢালার মতো লাগলো। রাগ চেপে বললাম,
“কচি মেয়ে পেয়ে খুশি?”
সে কিছুপল ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালো।তারপরবিরক্ত কণ্ঠে বললো,
—“কথার ধরনেই বুঝছি তুমি যথেষ্ট পেকেছো। তোমাকে কচি ধরি কীভাবে?”
কণ্ঠে কোনো অনুশোচনা নেই, শুধু অবজ্ঞা। নিজেকে সামলাতে পারলাম না। পাঞ্জাবির কলার ধরে চিৎকার করে বললাম,
“আপনি জানেন আপনি কী করেছেন? আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছেন। ঠকিয়েছন আমাকে।”
সে আমার হাত নামিয়ে দিয়ে দাম্ভিক গলায় বললো,
“এই সাহস দ্বিতীয়বার কোরো না। প্রশ্ন থাকলে তোমার বাবাকে করো। আমি জানাতে চেয়েছিলাম, উনিই নিষেধ করেছেন। আমার দরকার ছিল সন্তানকে মা দেওয়া ।বউ নয়।”
বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ঠিকই তো—আমি কাকে দোষ দেবো, যেখানে আমার আপন মানুষরাই আমাকে ঠকিয়েছে। তখন সে হুংকার দিয়ে বললো,
“লিসেন—”
চলবে…
#বৈরি_হাওয়া
#সূচনা_পব
#ফারজানা_প্রণয়_চৌরী

