বৈরি_হাওয়া #পর্ব_১১

0
8

কায়সারের চোখ আটকে গেল ঊর্মির হাতে। পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট। আলতো করে হাতটা ধরল। ঠিক তখনই ভেসে এল তার তেজি কণ্ঠ—

কে…?

নিস্পৃহ অথচ তেজি সেই শব্দটিতে করিডোরজুড়ে যেন হিমেল বাতাস বয়ে গেল। সবাই চমকে তাকাল তার দিকে। কণ্ঠটা ছিল খুব ছোট, কিন্তু প্রশ্নটা ছিল ভীষণ ভারী।

দাদি মুখ খুলতে যাবে—ঠিক তখনই আফতাব সাহেব তার হাত চেপে ধরলেন। চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, চুপ থাকতে।

কায়সার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এতদিন পাশেই ছিল, চোখে চোখে রেখেছে। মাত্র একটা দিনের জন্য বাইরে গিয়েছিল—আর তাতেই এত কিছু!

কায়সার আবার ঊর্মির দিকে তাকাল। মেয়েটা নিথর। শ্বাস চলছে, মুখজুড়ে জমে আছে চরম ক্লান্তি।

মিমি কেমন আছে?

এইবার কায়সার স্পষ্ট করে বলল।আয়াশ এগিয়ে এল।

অপারেশন শেষ। এখনো অবজারভেশনে। রিস্ক কাটেনি।

কায়সার এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল।

এই সময়ে এখানে যা হয়েছে, আমার মেয়ে আর আমার বউয়ের গায়ে যারা হাত তুলেছে—তাদের যে খুব একটা ভালো হবে না, এটা আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি। ওরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আপনারা মুক্ত ।তারপর একে একে সবকয়টার সয়তানির হিসাব নেওয়া হবে।

কণ্ঠে ছিল কঠিন নির্দেশ।
স্বর্ণা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ কাঁদো কাঁদো মুখ করে এগিয়ে এল।

কায়সার… আমি নিজ চোখে দেখেছি। ঐ মেয়েটা আমার মেয়েটাকে ফেলে দিয়েছে। মিমি তোমার রক্ত। বিয়ে করেই আমার মেয়েটাকে পর করে দিয়েছো!

কায়সার প্রথমবার পুরো শরীর ঘুরিয়ে স্বর্ণার দিকে তাকাল। চোখ দিয়েই যেন তাকে মেপে নিচ্ছে।

বললাম না—সব হিসাব-নিকাশ পরে হবে।

স্বর্ণা থমকে গেল। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
এই ফাঁকে ঊর্মির শরীরটা হালকা কেঁপে উঠল। কায়সার সঙ্গে সঙ্গে নুয়ে পড়ল।

ঊর্মি?
কোনো উত্তর নেই। কায়সার বুঝল, ক্লান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে সে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঊর্মিকে কোলে তুলে নিল।

ঠিক তখনই দাদি বলে উঠল,

ওরে, নামা—

আর একটা শব্দও না।

কায়সারের গলায় এবার চেপে রাখা আগুন।

একটা শব্দ বের হলে—আমি ভুলে যাব আপনি কে?
করিডোরে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা।

ঊর্মিকে নিয়ে যাওয়া হলো পাশের কেবিনে। নার্স স্যালাইন লাগাতে লাগল। কায়সার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে আর বাইরে—দুটো যুদ্ধ একসঙ্গে চলছে।

তখনি আয়াশ পাশে এসে দাঁড়াল।
ভাই… আমি নিজের চোখে দেখিনি। কিন্তু যা দেখেছি—সব স্বাভাবিক না।

কায়সার মাথা নাড়ল।

আমি জানি।

ঠিক তখনই ডাক্তার বেরিয়ে এল। সবার মাঝেই চাপা উৎকণ্ঠা।
বাচ্চাটা আপাদত স্টেবল ।কিন্তু মাথায় ভালোই আঘাত পেয়েছে। ইনফেকশন যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। নিয়মিত ড্রেসিং করতে হবে।

কায়সার ধীরে শ্বাস ছাড়ল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল কেবিনের সামনে।
কাঁচের ভেতর ছোট্ট শরীরটা শুয়ে আছে। ব্যান্ডেজে ঢাকা মাথা। বুক ওঠানামা করছে—এইটুকুই এখন ভরসা।

বাইরে স্বর্ণা অস্থিরভাবে হাঁটছে। দাদির মুখ শক্ত। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। এই দুজনের মাঝেই লুকিয়ে আছে অদৃশ্য রহস্য। প্রতিটা পরিবারেই এদের মতো কিছু নমুনা থাকবেই। নিজেরা যেমন সুখে থাকতে জানে না, তেমনি অন্যের সুখও সহ্য করতে পারে না।
এই নীরবতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে নতুন এক সত্য।

_____________________

ধীরে ধীরে হাসপাতালের করিডোর খালি হতে লাগল। সবাইকে বাড়ি পাঠিয়েছে কায়সার। শ্বশুরবাড়ির লোকদেরও সাফ নির্দেশ দিয়েছে—নিজ বাড়িতে যাবে না। যেতে হলে দাদি শাশুড়িকে রেখে যাবে। নাতজামাইয়ের আপ্যায়ন উপভোগ করা নাকি বাকি। সময়মতো তাদের ডাকা হবে।

কেবিনের ভেতর আলোটা নরম। স্যালাইনের ফোঁটা ধীরে ধীরে পড়ছে। ঠিক তখনই ঊর্মির চোখের পাতা কেঁপে উঠল। চোখ খুলল সে। কপাল সামান্য কুঁচকে আসে । কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে রইল। তারপর দৃষ্টি ঘুরে গেল দরজার দিকে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা—মিমি কেমন আছে? দেখার জন্য। কিন্তু প্রকাশ করল না।

পরিবেশ যেহেতু এতটাই শান্ত তাহলে মেয়েটা ভালোই আছে। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল।

দরজার বাইরে স্বর্ণার পায়ের শব্দ। সবাই চলে গেলেও সে রয়ে গেছে। কেউ হয়তো খুব একটা মাথা ঘামায়নি। রেখে গেছে তাকে। কায়সার শুধু একবার নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল।

সবাই যাওয়ার পর থেকে এপাশ থেকে ওপাশে অস্থির পায়চারি করছে । ঠিক সেই মুহূর্তে কায়সার মিমির কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। স্বর্ণা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল।
কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

কায়সার, ওই মেয়েটাকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করছ কেন?

কায়সার সরাসরি সেই ধূর্ত চোখগুলোর দিকে তাকাল। সামান্য ঝুঁকে কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
স্বর্ণা, জানো তো—মুরুব্বিদের একটা কথা আছে। চোরের দশদিন, গৃহস্থের একদিন। এই পর্যন্ত যা যা বুঝিয়েছ, ঠান্ডা মাথায় মেনে নিয়েছি দেখে কি ভেবেছ আমি বোকা?
এক মুহূর্ত থামল। তারপর আরও নিচু, আরও ঠান্ডা গলায়,
উঁহুম আমি বোকা নই।বরং তোমাকে সুযোগ দিয়েছি। শুধু ওই ছোট মেয়েটার জন্য। কিন্তু এবার তুমি খুব বড় ভুল করেছ।”

চোখে জমে উঠল কঠোরতা।
মিমি আমার মেয়ে। ঊর্মি আমার বউ। আর তুমি খুব ভালো করেই জানো—আমার জিনিসগুলোর ব্যাপারে আমি কতটা পজেসিভ।

এক চিলতে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
মেয়েটা আগে সুস্থ হোক। তারপর দুই বাড়ির দুই সয়তানকে কিভাবে বসে আনতে হয়, সেটা আমি দেখব।

স্বর্ণা থমকে গেল। এই প্রথম মনে হলো—ঝোঁকের মাথায় সে ভয়ংকর বড় ভুল করে ফেলেছে। যে কারণে কায়সার এতদিন চুপ ছিল, তা আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। এখন তাকে ভাবতেই হবে। নাহলে তার অস্তিত্বই বিপদে পড়বে।

কায়সার ফিরে তাকাল ঊর্মির কেবিনের দিকে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে সে। কিন্তু কায়সার স্পষ্ট দেখেছে—মেয়েটা আড়ি পেতে সব শুনছিল।

নিজেকে খুব চালাক ভাবে।ও কি আদৌ জানে—ও যে পাগল?

চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন আবার সেটাও বাদ দিয়ে গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছে। কায়সার সামান্য মাথা ঝাঁকাল।
মনে মনে বিড়বিড় করল,

না, একে এসব থেকে দূরে রাখতে হবে। অতিরিক্ত পাকামোর কারণে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে। কিন্তু কিভাবে সরাব?ক্ষণিক থামল।
করবোটা কি?যাই করি, বুঝে যাবে।
বিরক্ত নিঃশ্বাস বেরোল।

উফফ… মা, এক সয়তান থেকে বাঁচাতে আরেক মিচকে সয়তানের হাতে তুলে দিয়েছ আমাকে।

__________________

মিমির কেবিনের ভেতর আলোটা এবার একটু তীব্র। সাদা দেয়ালে আলো পড়ে কেমন নিষ্ঠুর লাগে। মনিটরের টিকটিক শব্দে সময়টা যেন গোনা হচ্ছে। ছোট শরীরটা নিথর পড়ে আছে। মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ। বুক ধীরে ওঠানামা করছে।
হঠাৎ করেই মিমির আঙুল নড়ে উঠল।
নার্স খেয়াল করল প্রথমে। কাছে এগিয়ে গেল।

চোখের পাতা কেঁপে উঠল মিমির। একবার, তারপর আরেকবার। চোখ খুলল সে। আলোতে চোখ ঝলসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুঁচকে গেল। ঠোঁট কাঁপল।

পাপা,,,

শব্দটা খুব ক্ষীণ। প্রায় শোনা যায় না।
কায়সার তখনই এগিয়ে এল। বুকের ভেতর আটকে থাকা শ্বাসটা ছেড়ে দিল।

মিমির চোখ ঘুরে গেল। কেবিনের ছাদ, আলো, নার্স—সব এলোমেলো। তারপর চোখ আটকে গেল কায়সারের মুখে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। যেন চিনতে সময় লাগছে।

বাবা…

চোখে জল জমল।কায়সার হাতটা ধরল। খুব আলতো করে।
“কোথায় ব্যথা লাগছে মা ?”
মিমি মাথা নাড়ল। ঠোঁট কামড়ে ধরেছে। কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারছে

চলবে,,,,

#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here